Amardesh
আজঃ ঢাকা, শনিবার ২০ মার্চ ২০১০, ৬ চৈত্র ১৪১৬, ৩ রবিউসসানি ১৪৩১     আপডেট সময়ঃ সময় : রাত ১.৩০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

গণবিজ্ঞপ্তি : পাহাড়ি বাঙালিদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া, জনসংহতির প্রত্যাখ্যান

আবু তাহের মুহাম্মদ, খাগড়াছড়ি
গণবিজ্ঞপ্তি জারি নিয়ে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। গতকাল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি আনুষ্ঠানিকভাবে এ গণবিজ্ঞপ্তি প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি দিয়েছে। অন্যদিকে কমিশনে বাঙালিদের কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন। তারা গণবিজ্ঞপ্তি সাবর্জনীন না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে খাগড়াছড়ি শহরের মাস্টারপাড়া এলাকায় স্থাপিত কমিশনের প্রধান কার্যালয় সংস্কার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। নির্মাণ করা হচ্ছে নিরাপত্তা পাচীর, গেট, এজলাসসহ বিচারিক নানা অবকাঠামো। সহসাই এ কার্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনেরও কথা রয়েছে বলে জানা গেছে।
গত ১৪ মার্চ খাগড়াছড়িতে ভূমি কমিশন সচিব মোঃ আবদুল হামিদ এ গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেন। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ৬০ দিনের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্তদের আবেদন করতে বলা হয়েছে। ভারত প্রত্যাগত পুনর্বাসিত উপজাতীয় শরণার্থীদের জমিজমা বিষয়ক বিরোধ এবং জায়গা, জমি ও পাহাড় অবৈধভাবে বন্দোবস্ত দেয়ার ফলে বেদখল ও ক্ষতিগ্রস্তরা আবেদন করতে পারবেন। কমিশনের সচিব মোঃ আবদুল হামিদ জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও কমিশন আইনের ক্ষমতাবলে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তির দরখাস্ত আহ্বান করা হয়েছে। তিনি জানান, ভূমি কমিশন আইনের ৬-এর ক, খ ও গ’র ধারায় সংশ্লিষ্ট সবাই আবেদন করার সুযোগ পাবেন।
ভূমি সমস্যাকে কেন্দ্র করেই মূলত পাহাড়ে সংঘাত আর সহিংস ঘটনায় পাহাড়ি বাঙালিদের মাঝে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সম্প্রতি রাঙামাটির বাঘাইহাটে অগ্নিসংযোগসহ সহিংসতার পেছনেও রয়েছে এ ভূমি সমস্যা। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা সমাধানে ২০০১ সালের ১৭ জুলাই ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংসদে পাস হয়। আইন অনুযায়ী সুপ্রিমকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মোঃ আবদুল করিমকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় চেয়ারম্যান করে ২০০১ সালের নভেম্বর। চেয়ারম্যানসহ ৯ সদস্যের কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান সন্তু লারমা বা তার প্রতিনিধি, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, তিন সার্কেল চিফ বা রাজা এবং চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার বা তার মনোনীত একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার। কিন্তু কমিশন গঠনের ৬ মাসের মাথায় তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। ২০০৪ সালের ১ নভেম্বর বিচারপতি এএম মাহমুদুর রহমানকে ভূমি কমিশনের দ্বিতীয় চেয়ারম্যান নিযুক্ত করে সরকার। এরপর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা কমিশন থেমে যায় ২০০৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কমিশন চেয়ারম্যানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ প্রায় আড়াই বছর চেয়ারম্যানশূন্য থাকে কমিশন। চেয়ারম্যান নিয়োগ, জনবলসহ নানা সঙ্কট আর সীমাবন্ধতার কারণে তা আর কার্যকর হয়ে ওঠেনি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সুপ্রিমকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীকে কমিশনের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর মূলত সত্যিকার অর্থে কমিশন সচল হতে শুরু করে। কমিশন চেয়ারম্যান বিভিন্ন স্থানে সফর করে ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলেন। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে আলাদা আলাদাভাবে বৈঠক করেন। গত ২৭ জানুয়ারি কমিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আরসি চেয়ারম্যান সন্তু লারমার উপস্থিতিতে কমিশনের পূর্ণাঙ্গ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউসে।
কমিশনের কাজ দ্রুত শুরু করার জন্য খাগড়াছড়ি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে সরকার তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর ৮ জন কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে। তারা এরই মধ্যে কাজেও যোগ দিয়েছেন। পুরোদমে বিচার কাজ শুরুর আগেই কমিশনের জন্য অন্তত ১৫-২০ জনের পুলিশ সদস্য নিয়োগ করা হবে। অন্যদিকে রাঙামাটি ও বান্দরবানে পৃথক শাখা অফিস বসানোর জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হয়েছে। খুব সহসা সেখানেও অফিস ও আদালত স্থাপন করা হবে। খাগড়াছড়িতে কমিশনের প্রধান কার্যালয় হলেও স্ব স্ব জেলায়ই বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বিচার কাজ চলবে।
বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া : আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় ওরফে সন্তু লারমা কমিশনের সর্বশেষ বৈঠক শেষে বলেছিলেন, ২০০১ সালের পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনের বেশকিছু ধারা উপধারা শান্তি চুক্তির সঙ্গে বিরোধাত্মক ও সাংঘর্ষিক। যতক্ষণ বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধন করা না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত ভূমি কমিশনের কাজে গতিশীলতা আসবে না এবং ভূমি কমিশনকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। এদিকে গতকাল বিকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার সম্পাদক এক বিবৃতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এ গণবিজ্ঞপ্তিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আলাপ-আলোচনা ছাড়া এবং সাংঘর্ষিক ধারাগুলো সংশোধনের আগে এ উদ্যোগ নেয়ায় তারা তা প্রত্যাখ্যান করে বলে জানিয়েছেন।
খাগড়াছড়ি জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সাবেক পিপি ও পার্বত্য বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট মঞ্জুর মোর্শেদ ভূঁইয়া বলেন, এ আইনে কোনো অপিলের সুযোগ নেই। ভূমি কমিশনে ৯ সদস্যের মধ্যে তিন রাজা, তিন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও আঞ্চলিক পরিষদের প্রতিনিধি ৭ জনই উপজাতীয়দের প্রতিনিধিত্ব করায় এবং বাঙালিদের কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকায় কমিশনের একপেশে সিদ্ধান্তে বাঙালিদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা মোঃ শাহাজউদ্দিন বলেন, গণবিজ্ঞপ্তিতে শুধু শরণার্থীদের বিষয়টি পরিষ্কার করা হলেও অন্যভাবে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। তিনি বলেন, গণবিজ্ঞপ্তি সার্বজনীন হওয়া উচিত ছিল। একপক্ষীয় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি সম্ভব নয়। তিনি জরিপের আগে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কঠিন হবে বলে উল্লেখ করেন।
জুম্ম শরণার্থী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষিত চাকমা বকুল বলেন, চুক্তি অনুযায়ী বিরোধাত্মক ধারা ও আইন সংশোধন ছাড়া তা কার্যকর করা ঠিক হবে না।
ইউনাইটেড পিপল্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সভাপতি প্রসিত খিসা পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমিবিরোধ নিষমত্তির আগে পাহাড়ি জনগণের প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন। কিসের ভিত্তিতে বিরোধ নিষমত্তি করা হবে তা আগে ঠিক করতে হবে। তিনি দাবি করেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত প্রথাগত আইনে তারা জমির মালিক হলেও তাদের সরকারি মালিকানার দলিলপত্র নেই।
পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী বলেন, নানা ইস্যুতে ভূূমি কমিশনের উদ্যোগ ও গণবিজ্ঞপ্তি জারির বিরোধিতা করছে যারা আসলে তারা পার্বত্য সমস্যার সমাধান চায় না। সমস্যা জিইয়ে রেখে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চায়।
ভোল্ট পাল্টালেন ভূমি কমিশন চেয়ারম্যান : ভূমি কমিশন চেয়ারম্যান বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এর আগে বিভিন্ন বৈঠক শেষে বিরোধ নিষ্পত্তির আগে ভূমি জরিপের কথা বললেও সন্তু লারমাসহ পাহাড়িদের বিরোধিতার মুখে এখন সে অবস্থান থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। এক সময় তিনি জরিপের আগে ভূূমি বিরোধ অসম্ভব বলে উল্লেখ করে সরকারকে জরিপ কাজ সম্পন্ন করার অনুরোধ জানালেও বর্তমানে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়টিকে তিনি প্রাধান্য দিচ্ছেন। তবে তা কতটুকু কার্যকর হবে তা নিয়ে অনেকে সংশয় প্রকাশ করেছেন। খাগড়াছড়ি আইনজীবী সমিতির অন্যতম সদস্য অ্যাডভোকেট আক্তার উদ্দিন মামুন বলেন, ভূূমি জরিপের আগে বিরোধ নিষ্পত্তি করতে গেলে মাঝপথে তা থমকে দাঁড়াবে এবং এ উদ্যোগ ভেস্তে যাবে।
কীভাবে হবে বিরোধ নিষ্পত্তি ও বিচার প্রক্রিয়া : কমিশনের সচিব মোঃ আবদুল হামিদ জানান, আবেদনের পর যাচাই বাছাই শেষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিপক্ষকে নোটিশ জারি ও আবেদনকারীকে তা অবহিত করা হবে। এর মধ্যেই মামলা প্রস্তুত হবে। বিচারের তালিকায় লিপিবদ্ধ হবে। কমিশনের সদস্যরা আদালতে বসে কাগজপত্র দেখে উভয়ের কথা শুনে মতামতসহ নোট দেবেন। কমিশন চেয়ারম্যান বিরোধ নিষ্পত্তির চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করবেন। তিনি হাইকোর্টের নিয়মে বিচার বিরোধ সমাধা করবেন। তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে পৃথক তিনটি আদালত বসবে। বিচারের ক্ষেত্রে কমিশনের চেয়ারম্যানসহ ৫ সদস্যের মধ্যে ৩ জন উপস্থিত থাকলেই আদালত বিচারকার্য পরিচালনা করতে পারবেন। ৫ জন হলেন ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান বা তার প্রতিনিধি, পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, সার্কেল চিফ (রাজা), চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার বা তার মনোনীত একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার।
জরিপ আগে না বিরোধ নিষ্পত্তি আগে এ নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও সাধারণ পাহাড়ি বাঙালিরা চায় ভূমি সমস্যার সমাধান হোক । ফিরে আসুক পাহাড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা।
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?