নিরাপত্তাহীনতায় মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা : প্রতিনিয়ত অপমানিত লাঞ্ছিত হচ্ছেন ছাত্রলীগ যুবলীগের হাতে
কাদের গনি চৌধুরী
চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। সরকারি দলের হাতে প্রতিনিয়ত তাদের লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে। গত এক বছরে অর্ধশতাধিক ইউএনও এবং এসি ল্যান্ড নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সরকারি দলের নেতাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সমর্থন না দিলেই সেখানে নেমে আসছে অমানবিক নির্যাতন। মাঠ প্রশাসনে কর্মরত এসব কর্মকর্তার নিরাপত্তার জন্য কোনো উদ্যোগই নেই সরকারের। এমনকি এ পর্যন্ত কতজন কর্মকর্তা লাঞ্ছিত হয়েছেন তার হিসাব পর্যন্ত নেই সংস্থাপন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে।
এদিকে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেয়ায় সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। ফুঁসে উঠছেন মাঠ কর্মকর্তারা। ভয়ে অনেকে মাঠ প্রশাসনে যেতে চাইছেন না। আবার অনেক কর্মকর্তা প্রত্যাহার চেয়ে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন।
গত সোমবার রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার রাজাবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের জায়গা অবৈধ দখলমুক্ত করতে গিয়ে দখলদারদের হামলায় লাঞ্ছিত হয়েছেন গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং এসি ল্যান্ড। এ সময় অবৈধ উচ্ছেদকারীদের ইট-পাটকেলের আঘাতে রাজাবাড়ী ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা তারাজুল ইসলামসহ অন্তত ৮ জন আহত হয়েছেন। রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের কাছে উপজেলার রাজাবাড়ী ভূমি অফিসের সামনে অবৈধভাবে স্থাপিত বেশকিছু দোকানপাট উচ্ছেদের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ড. জুলিয়া মঈন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহবুব আলম ও গোদাগাড়ী মডেল থানার পুলিশ কর্মকর্তাসহ ওই এলাকায় যান। সেখানে ইউএনও অবৈধ দোকানদারদের মালামাল সরানোর নির্দেশ দিলে অনেকেই তা সরানোর কাজ যখন শুরু করেন। এ সময় উপজেলা যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক রাজু তার দলবল নিয়ে হামলা চালায়।
একই দিন হবিগঞ্জের ইউএনওকে অফিস থেকে বের করে দিয়ে রুমে তালা ঝুলিয়ে দেয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ক্যাডাররা।
২২ ফেব্রুয়ারি সরকারি জায়গায় মার্কেট তৈরিতে বাধা দেয়ায় কচুয়ায় এসি ল্যান্ডের মাথা ফাটিয়েছে ছাত্রলীগের কর্মীরা। চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলা এসি ল্যান্ড মোস্তাফিজুর রহমান ওইদিন সন্ধ্যায় তার অফিসে বসে কাজ করার সময় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আওলাদের নেতৃত্বে সরকারি দলের ক্যাডাররা গিয়ে পিটিয়ে তার মাথা ফাটিয়ে দেয়।
২৬ ফেব্রুয়ারি ছাত্র ও যুবলীগের ক্যাডারের হাতে নোয়াখালী সোনাইমুড়ীর ইউএনওকে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে। ওইদিন দুপুরে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং এসি ল্যান্ড মোজাম্মেল হক সরকারি সম্পত্তি দখলে বাধা দেয়ায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ক্যাডাররা তার ওপর চড়াও হয়। চিহ্নিত ক্যাডাররা তার অফিসে গিয়ে হামলা চালিয়ে তাকে শারীরিকভাবে নাজেহাল করে।
কিছুদিন আগে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ নুরুজ্জামান স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যানের লোকদের হাতে মারাত্মকভাবে আহত হন। টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলা চেয়ারম্যানের হাতে সেখানকার ইউএনও লাঞ্ছিত হন। গত এপ্রিল মাসে উপজেলা চেয়ারম্যান ওই ইউএনওকে অফিস ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র অফিস করার নির্দেশ দেন। বাগেরহাটে ডিসি অফিসে সভা চলাকালে সরকারি দল সমর্থক এক উপজেলা চেয়ারম্যান ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দিয়েছে ইউএনওর। এভাবে প্রতিনিয়ত সরকারি কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে।
গতকাল আমার দেশের সঙ্গে আলাপকালে ইউএনও এবং এসি ল্যান্ডরা সংস্থাপন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি কাজ করতে গিয়ে প্রতিদিন অফিসাররা মার খাচ্ছেন, অথচ তারা কিছুই করছেন না। অতীতে যখনই প্রশাসনের ওপর আঘাত এসেছে ঐক্যবদ্ধভাবে তা প্রতিহত করা হয়েছে। কিন্তু এবার কিছুই করছেন না তারা। সিনিয়র এক সরকারি কর্মকর্তা মাঠ কর্মকর্তাদের ওপর বারবার হামলার পর ও সরকারের নীরবতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসন একটি ঐতিহ্যবাহী ক্যাডার। এ ক্যাডারের গায়ে কেউ হাত দিতে সাহস পেত না। এরশাদ সরকারের সময় একবার পূর্বধলায় সরকারি দলের এক এমপি ইউএনওর গায়ে হাত তোলার পর প্রশাসনের সব কর্মকর্তা একজোট হয়ে এর প্রতিবাদ জানান। বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্টকে পর্যন্ত বিষয়টি জানান। এর ফলে ওই এমপিকে ক্ষমা চাইতে হয়। সিলেটে এক উপমন্ত্রী সরকারি কর্মকর্তাকে গালি দেয়ার পর ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তারা দেশের কোথাও তাকে প্রটোকল না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এক পর্যায়ে ওই উপমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে ছাড়া পান। অথচ এখন প্রতিদিনই সরকারি কর্মকর্তারা মার খাচ্ছেন, কেউ প্রতিবাদও করছেন না।
ইউএনও নিয়োগ ও বদলির ক্ষমতা পাচ্ছেন বিভাগীয় কমিশনাররা
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিয়োগ ও বদলির ক্ষমতা পাচ্ছেন বিভাগীয় কমিশনাররা। এতদিন সংস্থাপন মন্ত্রণালয় থেকে ইউএনও নিয়োগ দেয়া হতো। সরকারের প্রভাবশালী একটি মহলের ইচ্ছায় ইউএনও নিয়োগ ও বদলির ক্ষমতা বিভাগীয় কমিশনারদের ওপর অর্পণ করা হচ্ছে বলে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। অবশ্য সংস্থাপন মন্ত্রণালয় দাবি করছে, মাঠ প্রশাসন কার্যক্রমকে আরও সাবলীল, গতিশীল ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন করার দায়িত্ব বিভাগীয় কমিশনারদের ওপর অর্পণ করা হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ৪ ফেব্রুয়ারি মপবি/মাপ্রসাপ্র/১(১০)/২০০৮/৭৪নং স্মারকে ইউএনওদের নিয়োগ ও বদলির ক্ষমতা বিভাগীয় কমিশনারদের ওপর অর্পণ প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে। এ সম্মতি পাওয়ার পর সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের সচিব ইকবাল মাহমুদ ওই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চূড়ান্ত সম্মতির জন্য খসড়া প্রস্তাবনাও তৈরি করেছেন। শিগগির এ প্রস্তাবনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপনের জন্য যে খসড়া প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে, ‘কমিশনাররা মাঠ প্রশাসনের অতি গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বোচ্চ পদ এবং ওই পদধারী মাঠ প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। কমিশনাররা মাঠ পর্যায়ের সাধারণ প্রশাসন, রাজস্ব প্রশাসন ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালনসহ সরকার ও মাঠ প্রশাসনের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেন। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসনের যাবতীয় কার্যক্রমের তদারকি ও বিভাগের আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি তত্ত্বাবধান করেন। বিভাগীয় কমিশনাররা সবসময় বিভাগে কর্মরত সহকারী কমিশনার, সহকারী কমিশনার (ভূমি), সিনিয়র সহকারী কমিশনার, নেজারত ডেপুটি কালেক্টর ও জেনারেল সার্টিফিকেট অফিসারদের বদলি ও পদায়ন করে থাকেন। মাঠ প্রশাসন কার্যক্রমকে আরও সাবলীল, গতিশীল ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন করার দায়িত্ব বিভাগীয় কমিশনারদের ওপর অর্পণ করা প্রয়োজন। এতে বিভাগীয় কমিশনারদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জোরালো হবে। কাজের গতিশীলতা বাড়বে। একই সঙ্গে সরকারের প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজতর হবে। তাছাড়া এতে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের কাজের পরিধি ও চাপ কমবে। ফলে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণ কার্যক্রম বাস্তবায়নে অধিকতর মনোনিবেশ করতে পারবে।’
এদিকে, সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইউএনওদের সঙ্গে সরকারি দলের নেতা, এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যানদের বনিবনা হচ্ছিল না। এর ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে ইউএনওদের লাঞ্ছিত হতে হয়েছে। সরকারি দলের সংসদ সদস্য ও ওই দলের নেতাদের অভিযোগ, ইউএনওরা তাদের কথা শোনেন না। সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা প্রতিদিনই তার এলাকার ইউএনওকে বদলি করে পছন্দের একজনকে নিয়োগ দেয়ার জন্য তদবির নিয়ে হাজির হন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের আবদার রক্ষা করা হতো না। এ কারণে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের ওপর সরকারি দলের এমপিরা সন্তুষ্ট ছিলেন না।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ ও বদলির ক্ষমতা বিভাগীয় কমিশনারদের হাতে দেয়া হলে মাঠ প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে বলে সরকারি কর্মকর্তারা জানান। তাদের মতে, সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যানরা বিভাগীয় কমিশনারদের সহজে চাপ সৃষ্টি করতে পারবেন, তাদের এলাকায় পছন্দের কর্মকর্তাকে ইউএনও নিয়োগ দিতে; যা সংস্থাপন সচিবকে দিয়ে সম্ভব হয় না। কারণ সংস্থাপন সচিবকে ইউএনও নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে ফিটলিস্ট দেখে নিয়োগ দিতে হয়। তাছাড়া সংস্থাপন সচিব প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করেন বলে সরকারি দলের মন্ত্রী, এমপিদের অন্যায় আবদার পাশ কাটিয়ে যেতে পারেন, যা বিভাগীয় কমিশনারদের পক্ষে হয়তো সম্ভব হবে না।
এদিকে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেয়ায় সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। ফুঁসে উঠছেন মাঠ কর্মকর্তারা। ভয়ে অনেকে মাঠ প্রশাসনে যেতে চাইছেন না। আবার অনেক কর্মকর্তা প্রত্যাহার চেয়ে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন।
গত সোমবার রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার রাজাবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের জায়গা অবৈধ দখলমুক্ত করতে গিয়ে দখলদারদের হামলায় লাঞ্ছিত হয়েছেন গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং এসি ল্যান্ড। এ সময় অবৈধ উচ্ছেদকারীদের ইট-পাটকেলের আঘাতে রাজাবাড়ী ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা তারাজুল ইসলামসহ অন্তত ৮ জন আহত হয়েছেন। রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের কাছে উপজেলার রাজাবাড়ী ভূমি অফিসের সামনে অবৈধভাবে স্থাপিত বেশকিছু দোকানপাট উচ্ছেদের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ড. জুলিয়া মঈন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহবুব আলম ও গোদাগাড়ী মডেল থানার পুলিশ কর্মকর্তাসহ ওই এলাকায় যান। সেখানে ইউএনও অবৈধ দোকানদারদের মালামাল সরানোর নির্দেশ দিলে অনেকেই তা সরানোর কাজ যখন শুরু করেন। এ সময় উপজেলা যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক রাজু তার দলবল নিয়ে হামলা চালায়।
একই দিন হবিগঞ্জের ইউএনওকে অফিস থেকে বের করে দিয়ে রুমে তালা ঝুলিয়ে দেয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ক্যাডাররা।
২২ ফেব্রুয়ারি সরকারি জায়গায় মার্কেট তৈরিতে বাধা দেয়ায় কচুয়ায় এসি ল্যান্ডের মাথা ফাটিয়েছে ছাত্রলীগের কর্মীরা। চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলা এসি ল্যান্ড মোস্তাফিজুর রহমান ওইদিন সন্ধ্যায় তার অফিসে বসে কাজ করার সময় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আওলাদের নেতৃত্বে সরকারি দলের ক্যাডাররা গিয়ে পিটিয়ে তার মাথা ফাটিয়ে দেয়।
২৬ ফেব্রুয়ারি ছাত্র ও যুবলীগের ক্যাডারের হাতে নোয়াখালী সোনাইমুড়ীর ইউএনওকে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে। ওইদিন দুপুরে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং এসি ল্যান্ড মোজাম্মেল হক সরকারি সম্পত্তি দখলে বাধা দেয়ায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ক্যাডাররা তার ওপর চড়াও হয়। চিহ্নিত ক্যাডাররা তার অফিসে গিয়ে হামলা চালিয়ে তাকে শারীরিকভাবে নাজেহাল করে।
কিছুদিন আগে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ নুরুজ্জামান স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যানের লোকদের হাতে মারাত্মকভাবে আহত হন। টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলা চেয়ারম্যানের হাতে সেখানকার ইউএনও লাঞ্ছিত হন। গত এপ্রিল মাসে উপজেলা চেয়ারম্যান ওই ইউএনওকে অফিস ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র অফিস করার নির্দেশ দেন। বাগেরহাটে ডিসি অফিসে সভা চলাকালে সরকারি দল সমর্থক এক উপজেলা চেয়ারম্যান ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দিয়েছে ইউএনওর। এভাবে প্রতিনিয়ত সরকারি কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে।
গতকাল আমার দেশের সঙ্গে আলাপকালে ইউএনও এবং এসি ল্যান্ডরা সংস্থাপন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি কাজ করতে গিয়ে প্রতিদিন অফিসাররা মার খাচ্ছেন, অথচ তারা কিছুই করছেন না। অতীতে যখনই প্রশাসনের ওপর আঘাত এসেছে ঐক্যবদ্ধভাবে তা প্রতিহত করা হয়েছে। কিন্তু এবার কিছুই করছেন না তারা। সিনিয়র এক সরকারি কর্মকর্তা মাঠ কর্মকর্তাদের ওপর বারবার হামলার পর ও সরকারের নীরবতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসন একটি ঐতিহ্যবাহী ক্যাডার। এ ক্যাডারের গায়ে কেউ হাত দিতে সাহস পেত না। এরশাদ সরকারের সময় একবার পূর্বধলায় সরকারি দলের এক এমপি ইউএনওর গায়ে হাত তোলার পর প্রশাসনের সব কর্মকর্তা একজোট হয়ে এর প্রতিবাদ জানান। বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্টকে পর্যন্ত বিষয়টি জানান। এর ফলে ওই এমপিকে ক্ষমা চাইতে হয়। সিলেটে এক উপমন্ত্রী সরকারি কর্মকর্তাকে গালি দেয়ার পর ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তারা দেশের কোথাও তাকে প্রটোকল না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এক পর্যায়ে ওই উপমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে ছাড়া পান। অথচ এখন প্রতিদিনই সরকারি কর্মকর্তারা মার খাচ্ছেন, কেউ প্রতিবাদও করছেন না।
ইউএনও নিয়োগ ও বদলির ক্ষমতা পাচ্ছেন বিভাগীয় কমিশনাররা
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিয়োগ ও বদলির ক্ষমতা পাচ্ছেন বিভাগীয় কমিশনাররা। এতদিন সংস্থাপন মন্ত্রণালয় থেকে ইউএনও নিয়োগ দেয়া হতো। সরকারের প্রভাবশালী একটি মহলের ইচ্ছায় ইউএনও নিয়োগ ও বদলির ক্ষমতা বিভাগীয় কমিশনারদের ওপর অর্পণ করা হচ্ছে বলে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। অবশ্য সংস্থাপন মন্ত্রণালয় দাবি করছে, মাঠ প্রশাসন কার্যক্রমকে আরও সাবলীল, গতিশীল ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন করার দায়িত্ব বিভাগীয় কমিশনারদের ওপর অর্পণ করা হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ৪ ফেব্রুয়ারি মপবি/মাপ্রসাপ্র/১(১০)/২০০৮/৭৪নং স্মারকে ইউএনওদের নিয়োগ ও বদলির ক্ষমতা বিভাগীয় কমিশনারদের ওপর অর্পণ প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে। এ সম্মতি পাওয়ার পর সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের সচিব ইকবাল মাহমুদ ওই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চূড়ান্ত সম্মতির জন্য খসড়া প্রস্তাবনাও তৈরি করেছেন। শিগগির এ প্রস্তাবনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপনের জন্য যে খসড়া প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে, ‘কমিশনাররা মাঠ প্রশাসনের অতি গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বোচ্চ পদ এবং ওই পদধারী মাঠ প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। কমিশনাররা মাঠ পর্যায়ের সাধারণ প্রশাসন, রাজস্ব প্রশাসন ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালনসহ সরকার ও মাঠ প্রশাসনের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেন। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসনের যাবতীয় কার্যক্রমের তদারকি ও বিভাগের আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি তত্ত্বাবধান করেন। বিভাগীয় কমিশনাররা সবসময় বিভাগে কর্মরত সহকারী কমিশনার, সহকারী কমিশনার (ভূমি), সিনিয়র সহকারী কমিশনার, নেজারত ডেপুটি কালেক্টর ও জেনারেল সার্টিফিকেট অফিসারদের বদলি ও পদায়ন করে থাকেন। মাঠ প্রশাসন কার্যক্রমকে আরও সাবলীল, গতিশীল ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন করার দায়িত্ব বিভাগীয় কমিশনারদের ওপর অর্পণ করা প্রয়োজন। এতে বিভাগীয় কমিশনারদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জোরালো হবে। কাজের গতিশীলতা বাড়বে। একই সঙ্গে সরকারের প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজতর হবে। তাছাড়া এতে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের কাজের পরিধি ও চাপ কমবে। ফলে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণ কার্যক্রম বাস্তবায়নে অধিকতর মনোনিবেশ করতে পারবে।’
এদিকে, সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইউএনওদের সঙ্গে সরকারি দলের নেতা, এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যানদের বনিবনা হচ্ছিল না। এর ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে ইউএনওদের লাঞ্ছিত হতে হয়েছে। সরকারি দলের সংসদ সদস্য ও ওই দলের নেতাদের অভিযোগ, ইউএনওরা তাদের কথা শোনেন না। সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা প্রতিদিনই তার এলাকার ইউএনওকে বদলি করে পছন্দের একজনকে নিয়োগ দেয়ার জন্য তদবির নিয়ে হাজির হন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের আবদার রক্ষা করা হতো না। এ কারণে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের ওপর সরকারি দলের এমপিরা সন্তুষ্ট ছিলেন না।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ ও বদলির ক্ষমতা বিভাগীয় কমিশনারদের হাতে দেয়া হলে মাঠ প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে বলে সরকারি কর্মকর্তারা জানান। তাদের মতে, সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যানরা বিভাগীয় কমিশনারদের সহজে চাপ সৃষ্টি করতে পারবেন, তাদের এলাকায় পছন্দের কর্মকর্তাকে ইউএনও নিয়োগ দিতে; যা সংস্থাপন সচিবকে দিয়ে সম্ভব হয় না। কারণ সংস্থাপন সচিবকে ইউএনও নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে ফিটলিস্ট দেখে নিয়োগ দিতে হয়। তাছাড়া সংস্থাপন সচিব প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করেন বলে সরকারি দলের মন্ত্রী, এমপিদের অন্যায় আবদার পাশ কাটিয়ে যেতে পারেন, যা বিভাগীয় কমিশনারদের পক্ষে হয়তো সম্ভব হবে না।
-
শেষের পাতা


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


