প্রধান বিচারপতি অবসরে যাওয়ার একমাস পরও রায় লেখা হয়নি
অলিউল্লাহ নোমান
অবসরে যাওয়ার একমাস পরও রায় লেখেননি সাবেক প্রধান বিচারপতি তাফাজ্জাল ইসলাম। পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিলের রায় একমাসেও লেখা হয়নি। গতকাল পর্যন্ত রায়ের বিচারপতিরা স্বাক্ষর করেননি। গত ২ ফেবু্রয়ারি তত্কালীন প্রধান বিচারপতি তাফাজ্জাল ইসলামের নেতৃত্বে আপিল বিভাগ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে দুটি পৃথক আপিল খারিজ করে দিয়ে হাইকোর্ট বিভাগের রায় মোডিফিকেশন এবং আপিল বিভাগের অবজারভেশন দেয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়। কী মোডিফিকেশন ও কী অবজারভেশন দেয়া হবে তা আদালতে বলা হয়নি। এই রায়ের পর একমাস ৭ দিন পার হয়ে গেছে। ৫ দিনের মাথায় রায় ঘোষণাকারী প্রধান বিচারপতি তাফাজ্জাল ইসলাম অবসরে চলে গেলেন। আপিলকারীরা এখনও জানতে পারেননি আপিলের রায়ে কী মোডিফিকেশন এবং অবজারভেশন দেয়া হয়েছে।
তিনি ৭ ফেব্রুয়ারি অবসরে যাওয়ার পর একমাস পার হয়ে গেছে। অবসরে যাওয়ার একমাস পরও আপিলের রায়ে বিচারপতিদের স্বাক্ষর হয়নি।
আপিল আবেদনের পক্ষের আইনজীবী সাবেক বিচারপতি ও সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠতম অ্যাডভোকেট টিএইচ খানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে আমার দেশকে তিনি বলেন, পঞ্চম সংশোধনীর রায়টির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় আছি। আমাদের উপস্থাপিত যুক্তিগুলো কীভাবে খণ্ডন করা হলো তা দেখতে চাই। কারণ, আপিল খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। আমাদের যুক্তিগুলো খণ্ডন করেই আপিলটি খারিজ করা হবে। বিচারপতিরা কীভাবে কোন যুক্তিতে আমাদের উত্থাপিত ব্যাখ্যা ও যুক্তি খণ্ডন করেছেন তা-ই এখন দেখার বিষয়। তিনি বলেন, বিচারপতিরা অবসরে যাওয়ার পরও রায় লেখা এবং ব্যাকডেটে স্বাক্ষর করার রেওয়াজ আছে। তবে এ ধরনের সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় বেশি বিলম্ব করা উচিত নয় বলে মনে করি।
হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে দুটি পৃথক আপিলের একটির আপিলকারী ব্যারিস্টার মুন্সি আহসান কবীর। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রধান বিচারপতি অবসরে চলে যাওয়ার একমাস পরও রায়টি সম্পন্ন করে দিতে পারলেন না। কী কারণে লিভ টু আপিল মঞ্জুর করা হলো না তা এখনও জানতে পারলাম না।
অপর একটি আপিলের আবেদনকারী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আমার দেশকে বলেন, সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় এভাবে বিলম্ব করা অনৈতিক কাজ বলে মনে করি। তিনি বলেন, বিচারপতি তাফাজ্জাল ইসলাম অবসরে যাওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগে ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে লিভ টু আপিল শুনানি গ্রহণ করলেন। শুনানির প্রস্তুতির জন্য আমাদের পক্ষ থেকে সময় চাওয়া হয়েছিল। প্রধান বিচারপতি সময় দিলেন না। তিনি শুনানি গ্রহণ করলেন। শুনানি শেষে শুধু লিভ টু আপিল ডিসমিস উইথ মোডিফিকেশন্স অ্যান্ড অবজারভেশন বলে রায় দিলেন। কী কারণে লিভ মঞ্জুর করা হলো না, কী কারণে পূর্ণাঙ্গ আপিল শুনানির সুযোগ দেয়া হলো না সেটা আজও জানা গেল না। তিনি বলেন, রায় দেয়ার সময় ধরে নেয়া হয় বিচারপতিরা সব প্রস্তুতি নিয়েই রায় দেন। কিন্তু এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ মামলায় ওপেনকোর্টে সংক্ষিপ্ত রায় দেয়ার পর প্রধান বিচারপতি অবসরে চলে গেলেন। এখনও পূর্ণাঙ্গ রায়টি স্বাক্ষর করে সরবরাহ করতে পারলেন না। এতে প্রমাণ হয় বিচারপতির অবসরে যাওয়ার আগে এই গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় চূড়ান্ত করে দিয়ে যাওয়ার মতো সময় ছিল না অথচ তিনি নিজ উদ্যোগে মামলাটি শুনলেন। অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের ঘটনা বিচার বিভাগের জন্য খারাপ নজির হয়ে থাকবে।
মুন সিনেমা হলের মালিকানাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা একটি রিট আবেদনের শুনানি শেষে ২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের তত্কালীন বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। রায় ঘোষণার মাত্র ২ দিন আগে বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর হাইকোর্ট বিভাগের অস্থায়ী বিচারপতি থেকে স্থায়ী বিচারপতি পদে নিয়োগ পান। এই রায়ের বিরুদ্ধে তখন লিভ টু আপিল করে তত্কালীন চারদলীয় জোট সরকার। লিভ টু আপিলের প্রেক্ষিতে রায়ের কার্যকারিতা তখন স্থগিত করা হয়। ২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা থেকে যাওয়ার মাত্র কিছুদিন আগে হাইকোর্ট বিভাগের রায় ঘোষণাকারী বিচারপতিদ্বয় রায়ের কপি চূড়ান্ত করে স্বাক্ষর করেন। রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি না পাওয়ায় তখন লিভ টু আপিলের শুনানির উদ্যোগ তত্কালীন সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
পঞ্চম সংশোধনীতে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয় : শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের শুরুতে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম সংযোজন করা হয়। এছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য চার মূলনীতির মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গায় সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, সমাজতন্ত্রের জায়গায় ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়, ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার এবং জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র সংযোজন করা হয়।’ সংবিধানের ৮(ক) অনুচ্ছেদ সংযোজন করে আরও বলা হয়, ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসই হইবে যাবতীয় কার্যাবলীর ভিত্তি।’
এছাড়া চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত একদলীয় বাকশাল শাসনব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ করে রাষ্ট্রপতির এখতিয়ারে ন্যস্ত করা হয়। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একদলীয় শাসন ব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র, বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রপতির অধীনে ও এখতিয়ার থেকে সুপ্রিমকোর্টের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। বিচারপতির চাকরি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির ইচ্ছার ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সাংবিধানিক এই পদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাকশাল কায়েমের পাশাপাশি সংসদীয় পদ্ধতির সরকার থেকে রাষ্ট্রপতি শাসিত একদলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।
১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধান ও চতুর্থ সংশোধনী পর্যন্ত এদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। শহীদ জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অনুমোদন দেয়া হয়। পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের আপিলের চূড়ান্ত রায়ে কী বলা হয়, তার ওপর নির্ভর করছে এদেশে ধর্মীয় রাজনীতির ভাগ্য।
২০০৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিভাগের তত্কালীন বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ মুন সিনেমা হলের মালিকানাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে রায় দেন। তবে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপিতে বিচারপতিদের স্বাক্ষরের পর সার্টিফাইড কপি না পাওয়ায় লিভ টু আপিলের শুনানি সম্ভব হয়নি। চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগে সার্টিফাইড কপি সরবরাহ করা হয়। বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর সিদ্ধান্ত নেয়, আগের সরকারের দায়ের করা লিভ টু আপিল আর চালাবে না। লিভ টু আপিলটি সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার আবেদন জানানো হয়। এই আবেদনের আগেই গত বছরের মার্চ মাসে ব্যারিস্টার মুন্সি আহসান কবীর, অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম ও অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান ভুইয়া নামে সুপ্রিমকোর্টের তিন আইনজীবী মামলাটিতে আপিল বিভাগে পার্টি হিসেবে অন্তর্ভুক্তির আবেদন জানান। তাদের পর বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনও মামলাটিতে পার্টি হিসেবে অন্তর্ভুক্তির আবেদন করেন। এই আবেদনগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গত বছরের ৩ মে আপিল বিভাগের ফুলকোর্টে শুনানি হয়। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ তাদের পার্টি হিসেবে অন্তর্ভুক্তির অনুমোদন দেন। তারা নিয়মিত লিভ টু আপিল দায়ের করেন। গত ৩ জানুয়ারি মামলাটি আপিল বিভাগের শুনানির তালিকায় এলে সরকারের পক্ষ থেকে দায়ের করা লিভ টু আপিল প্রত্যাহার আবেদন মঞ্জুর করে আদেশ দেয়া হয়। একই সঙ্গে তিন আইনজীবী ও খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের দায়ের করা লিভ টু আপিল আবেদন শুনানির জন্য দিন ধার্য করা হয়। ১৮ জানুয়ারি শুনানির জন্য পরবর্তী দিন ধার্য ছিল। সেদিন লিভ টু আপিলের পক্ষে শুনানির প্রস্তুতির জন্য আট সপ্তাহ সময়ের আবেদন করা হয়। সরকার পক্ষ সময়ের আবেদনের বিরোধিতা করে। আদালত কোনো সময় না দিয়ে পরেরদিন থেকে শুনানি শুরুর নির্দেশ দেন। এতে ১৯ জানুয়ারি থেকে শুনানি শুরু হয়। নির্ধারিত ৬টি কার্যদিবসে শুনানি শেষে ২ ফেবু্রয়ারি রায় ঘোষণা করেন আপিল বিভাগ।
তিনি ৭ ফেব্রুয়ারি অবসরে যাওয়ার পর একমাস পার হয়ে গেছে। অবসরে যাওয়ার একমাস পরও আপিলের রায়ে বিচারপতিদের স্বাক্ষর হয়নি।
আপিল আবেদনের পক্ষের আইনজীবী সাবেক বিচারপতি ও সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠতম অ্যাডভোকেট টিএইচ খানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে আমার দেশকে তিনি বলেন, পঞ্চম সংশোধনীর রায়টির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় আছি। আমাদের উপস্থাপিত যুক্তিগুলো কীভাবে খণ্ডন করা হলো তা দেখতে চাই। কারণ, আপিল খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। আমাদের যুক্তিগুলো খণ্ডন করেই আপিলটি খারিজ করা হবে। বিচারপতিরা কীভাবে কোন যুক্তিতে আমাদের উত্থাপিত ব্যাখ্যা ও যুক্তি খণ্ডন করেছেন তা-ই এখন দেখার বিষয়। তিনি বলেন, বিচারপতিরা অবসরে যাওয়ার পরও রায় লেখা এবং ব্যাকডেটে স্বাক্ষর করার রেওয়াজ আছে। তবে এ ধরনের সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় বেশি বিলম্ব করা উচিত নয় বলে মনে করি।
হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে দুটি পৃথক আপিলের একটির আপিলকারী ব্যারিস্টার মুন্সি আহসান কবীর। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রধান বিচারপতি অবসরে চলে যাওয়ার একমাস পরও রায়টি সম্পন্ন করে দিতে পারলেন না। কী কারণে লিভ টু আপিল মঞ্জুর করা হলো না তা এখনও জানতে পারলাম না।
অপর একটি আপিলের আবেদনকারী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আমার দেশকে বলেন, সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় এভাবে বিলম্ব করা অনৈতিক কাজ বলে মনে করি। তিনি বলেন, বিচারপতি তাফাজ্জাল ইসলাম অবসরে যাওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগে ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে লিভ টু আপিল শুনানি গ্রহণ করলেন। শুনানির প্রস্তুতির জন্য আমাদের পক্ষ থেকে সময় চাওয়া হয়েছিল। প্রধান বিচারপতি সময় দিলেন না। তিনি শুনানি গ্রহণ করলেন। শুনানি শেষে শুধু লিভ টু আপিল ডিসমিস উইথ মোডিফিকেশন্স অ্যান্ড অবজারভেশন বলে রায় দিলেন। কী কারণে লিভ মঞ্জুর করা হলো না, কী কারণে পূর্ণাঙ্গ আপিল শুনানির সুযোগ দেয়া হলো না সেটা আজও জানা গেল না। তিনি বলেন, রায় দেয়ার সময় ধরে নেয়া হয় বিচারপতিরা সব প্রস্তুতি নিয়েই রায় দেন। কিন্তু এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ মামলায় ওপেনকোর্টে সংক্ষিপ্ত রায় দেয়ার পর প্রধান বিচারপতি অবসরে চলে গেলেন। এখনও পূর্ণাঙ্গ রায়টি স্বাক্ষর করে সরবরাহ করতে পারলেন না। এতে প্রমাণ হয় বিচারপতির অবসরে যাওয়ার আগে এই গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় চূড়ান্ত করে দিয়ে যাওয়ার মতো সময় ছিল না অথচ তিনি নিজ উদ্যোগে মামলাটি শুনলেন। অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের ঘটনা বিচার বিভাগের জন্য খারাপ নজির হয়ে থাকবে।
মুন সিনেমা হলের মালিকানাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা একটি রিট আবেদনের শুনানি শেষে ২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের তত্কালীন বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। রায় ঘোষণার মাত্র ২ দিন আগে বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর হাইকোর্ট বিভাগের অস্থায়ী বিচারপতি থেকে স্থায়ী বিচারপতি পদে নিয়োগ পান। এই রায়ের বিরুদ্ধে তখন লিভ টু আপিল করে তত্কালীন চারদলীয় জোট সরকার। লিভ টু আপিলের প্রেক্ষিতে রায়ের কার্যকারিতা তখন স্থগিত করা হয়। ২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা থেকে যাওয়ার মাত্র কিছুদিন আগে হাইকোর্ট বিভাগের রায় ঘোষণাকারী বিচারপতিদ্বয় রায়ের কপি চূড়ান্ত করে স্বাক্ষর করেন। রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি না পাওয়ায় তখন লিভ টু আপিলের শুনানির উদ্যোগ তত্কালীন সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
পঞ্চম সংশোধনীতে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয় : শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের শুরুতে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম সংযোজন করা হয়। এছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য চার মূলনীতির মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গায় সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, সমাজতন্ত্রের জায়গায় ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়, ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার এবং জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র সংযোজন করা হয়।’ সংবিধানের ৮(ক) অনুচ্ছেদ সংযোজন করে আরও বলা হয়, ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসই হইবে যাবতীয় কার্যাবলীর ভিত্তি।’
এছাড়া চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত একদলীয় বাকশাল শাসনব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ করে রাষ্ট্রপতির এখতিয়ারে ন্যস্ত করা হয়। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একদলীয় শাসন ব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র, বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রপতির অধীনে ও এখতিয়ার থেকে সুপ্রিমকোর্টের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। বিচারপতির চাকরি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির ইচ্ছার ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সাংবিধানিক এই পদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাকশাল কায়েমের পাশাপাশি সংসদীয় পদ্ধতির সরকার থেকে রাষ্ট্রপতি শাসিত একদলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।
১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধান ও চতুর্থ সংশোধনী পর্যন্ত এদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। শহীদ জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অনুমোদন দেয়া হয়। পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের আপিলের চূড়ান্ত রায়ে কী বলা হয়, তার ওপর নির্ভর করছে এদেশে ধর্মীয় রাজনীতির ভাগ্য।
২০০৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিভাগের তত্কালীন বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ মুন সিনেমা হলের মালিকানাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে রায় দেন। তবে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপিতে বিচারপতিদের স্বাক্ষরের পর সার্টিফাইড কপি না পাওয়ায় লিভ টু আপিলের শুনানি সম্ভব হয়নি। চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগে সার্টিফাইড কপি সরবরাহ করা হয়। বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর সিদ্ধান্ত নেয়, আগের সরকারের দায়ের করা লিভ টু আপিল আর চালাবে না। লিভ টু আপিলটি সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার আবেদন জানানো হয়। এই আবেদনের আগেই গত বছরের মার্চ মাসে ব্যারিস্টার মুন্সি আহসান কবীর, অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম ও অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান ভুইয়া নামে সুপ্রিমকোর্টের তিন আইনজীবী মামলাটিতে আপিল বিভাগে পার্টি হিসেবে অন্তর্ভুক্তির আবেদন জানান। তাদের পর বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনও মামলাটিতে পার্টি হিসেবে অন্তর্ভুক্তির আবেদন করেন। এই আবেদনগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গত বছরের ৩ মে আপিল বিভাগের ফুলকোর্টে শুনানি হয়। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ তাদের পার্টি হিসেবে অন্তর্ভুক্তির অনুমোদন দেন। তারা নিয়মিত লিভ টু আপিল দায়ের করেন। গত ৩ জানুয়ারি মামলাটি আপিল বিভাগের শুনানির তালিকায় এলে সরকারের পক্ষ থেকে দায়ের করা লিভ টু আপিল প্রত্যাহার আবেদন মঞ্জুর করে আদেশ দেয়া হয়। একই সঙ্গে তিন আইনজীবী ও খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের দায়ের করা লিভ টু আপিল আবেদন শুনানির জন্য দিন ধার্য করা হয়। ১৮ জানুয়ারি শুনানির জন্য পরবর্তী দিন ধার্য ছিল। সেদিন লিভ টু আপিলের পক্ষে শুনানির প্রস্তুতির জন্য আট সপ্তাহ সময়ের আবেদন করা হয়। সরকার পক্ষ সময়ের আবেদনের বিরোধিতা করে। আদালত কোনো সময় না দিয়ে পরেরদিন থেকে শুনানি শুরুর নির্দেশ দেন। এতে ১৯ জানুয়ারি থেকে শুনানি শুরু হয়। নির্ধারিত ৬টি কার্যদিবসে শুনানি শেষে ২ ফেবু্রয়ারি রায় ঘোষণা করেন আপিল বিভাগ।
-
প্রথম পাতা


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


