Amardesh
আজঃ ঢাকা, বৃহস্পতিবার ৪ মার্চ ২০১০, ২০ ফাল্গুন ১৪১৬, ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩১     আপডেট সময়ঃ সময় : রাত ১.৩০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 কার্টুন
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

ঢাবিতে আবু বকর খুন : পুলিশ ও প্রক্টরের দোষ এড়াতে সচেষ্ট ছিল তদন্ত কমিটি

স্টাফ রিপোর্টার
ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবু বকরের মৃত্যু কীভাবে হয়েছে তা শনাক্ত করতে পারেনি সিন্ডিকেট গঠিত তদন্ত কমিটি। এফ রহমান হল ছাত্রলীগের সভাপতি ও হল কর্তৃপক্ষের ওপর দায় চাপানো এবং পুলিশ ও প্রক্টরকে অভিযোগ থেকে রক্ষার চেষ্টা হয়েছে পুরো তদন্তে। ছাত্র-শিক্ষক ও সাংবাদিকদের সাক্ষ্য নিয়েও তদন্ত কমিটি রহস্যজনক আচরণ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের নির্দেশে পুলিশের টিয়ারশেলে আবু বকরের মৃত্যু হয়েছে সাক্ষীদের সাক্ষ্য-প্রমাণে তা উঠে এলেও তদন্ত রিপোর্টের মূল্যায়নে তা স্বীকার করা হয়নি। তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে ১০ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হলেও আবু বকরের মৃত্যুর জন্য কে বা কারা দায়ী—এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলেনি তদন্ত কমিটি। তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়, ‘কি দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত আবু বকরের মৃত্যু ঘটেছে, তা সুনির্দিষ্ট করে বলতে হলে বিশেষজ্ঞদের দ্বারা সময় নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত আবশ্যক।’
তদন্ত রিপোর্টের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, হল ছাত্রলীগ সভাপতি আরবি বিভাগের এমএ শ্রেণীর ছাত্র মোঃ সাইদুজ্জামান ফারুকের একক আধিপত্য বিস্তারের ফলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের উপস্থিতি আব্যশক ছিল। প্রভোস্ট ও প্রক্টরের অনুরোধে অনুমতিক্রমেই পুলিশ হলে প্রবেশ করে। হলে পুলিশ না এলে আরও অনেক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা ছিল। তবে হলের অভ্যন্তরে এতসংখ্যক (৩৬) টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা সঠিক ব্যবস্থা ছিল বলে কমিটি মনে করে না। সাক্ষ্য-প্রমাণ ও তথ্য-উপাত্ত থেকে কমিটি এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে, গুলি বা ধারালো কোনো অস্ত্রের আঘাতজনিত কারণে আবু বকরের মৃত্যু হয়নি। হাতুড়ি, ইট, মোটা রডের মাথা অথবা শক্ত অন্যকোনো কিছুর আঘাতে আবু বকরের মৃত্যু হয়েছে। তবে অবস্থাদৃষ্টে ও সাক্ষ্য-প্রমাণে শক্ত বস্তুর মতো টিয়ারশেলের সম্ভাব্যতাও রয়েছে। তবে ঠিক কি দিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে আবু বকরের মৃত্যু হলো তা সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে বিশেষজ্ঞ দ্বারা উচ্চপর্যায়ের তদন্ত প্রয়োজন। আহত আবু বকরের চিকিত্সক নিউরো সার্জন আসিফ বরকতুল্লাহ কমিটিকে বলেন, সিটি স্ক্যানে দেখা যায় আবু বকরের মাথার ডান পাশে ফ্রাকচার বা খুলি ফাটা আছে। এর মধ্যে গোল একটা ফ্রাকচার ভেতরে দাবানো। আর মাথার চামড়ার নিচে হাড্ডির ওপরে পর্দা আর ব্রেনের মাঝখানে রক্ত জমাট ছিল। এটাকে ডাক্তারি ভাষায় একিউড মিটোমা বলা হয়। এটা খুব খারাপ। এ লক্ষণ থাকলে মাত্র ৫ শতাংশ বাঁচে। তিনি বলেন, আবু বকরকে ওটিতে নিয়ে গেলাম। দেখলাম মাথার ডান পাশে একটা গোল এক টাকা কয়েনের মতো জখম ছিল। সেই জখমের নিচে চামড়াটা একদম থেঁতলে গেছে। আমরা মাথার চামড়া এবং মাসল একসঙ্গে তুলে নিচের দিকে নামালাম। নামানোর পর দেখি, এখানে একটা পাঁচ সেন্টিমিটার বাই পাঁচ সেন্টিমিটার কিছু একটা রাউন্ড হালকা তিন মিলিমিটার ভেতরে দাবানো ছিল। আমরা হাড্ডি খুলে ফুটা করে ওখান থেকে স’ দিয়ে কাটি। তারপর হাড্ডিটা সরাই। তার নিচে দেখি মগজের পর্দাটা সম্পূর্ণ অক্ষত। ওটার কোনো ফুটা নেই। ময়নাতদন্তকারী ডা. জুবায়দুর রহমান তদন্ত কমিটিকে বলেন, ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে রক্তক্ষরণজনিত কারণে রোগীর মৃত্যু ঘটে। এছাড়া আবু বকরের রুমমেট (৪০৪) মোঃ রেজাউল করিম, মোঃ ইমরুল হাসান, মোঃ আনিসুর রহমান কমিটিকে বলেছেন, তাদের কক্ষ বরাবর কোনাকুনি অবস্থানে ৫ তলার ৫০৩ নম্বর কক্ষ থেকে নিক্ষিপ্ত পুলিশের টিয়ারশেলের আঘাতেই আবু বকরের মৃত্যু হয়েছে।
যাদের দায়ী করা হয়েছে : আবু বকর হত্যার এবং ওই দিনের সংঘর্ষে মূল ব্যক্তি হিসেবে সাইদুজ্জমান ফারুককেই দায়ী করা হয়েছে। একইসঙ্গে হল প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।
কমিটির রিপোর্ট প্রভাবিত : কমিটির রিপোর্ট প্রভাবিত করার প্রমাণ মিলেছে। অধিকাংশ সাক্ষী আবু বকরের মৃত্যু টিয়ারশেলের আঘাতে হয়েছে বলেছেন। অথচ তদন্ত কমিটির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, গুলি বা ধারালো কোনো অস্ত্রের আঘাতে নয় বরং হাতুড়ি, ইট, মোটা রডের মাথা বা শক্ত অন্য কোনো বাস্তব আঘাতে আবু বকরের মৃত্যু হয়েছে। বরং পুলিশের সাফাই গেয়ে তদন্ত কমিটি বলেছে, পুলিশের টিয়ারশেলে আবু বকরের আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায় না। অধিকাংশ সাক্ষী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রক্টর, প্রভোস্ট ও পুলিশের ব্যর্থতার কথা বললেও প্রক্টরকে রক্ষা করতে তদন্ত রিপোর্টে নানা কৌশল অবলম্বন করা হয়। এমনকি সাক্ষ্যদের বক্তব্যও গোপন করা হয়।
সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত : গত মঙ্গলবার রাতে সিন্ডিকেট সভা রিপোর্টের ভিত্তিতে ১০ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। এরা হচ্ছে ছাত্রলীগ হল সভাপতি হলের ৩১৮ (ক) ও (খ) নম্বর কক্ষের মোঃ সাইদুজ্জামান ফারুক, ছাত্রলীগ কর্মী মনসুর আহমেদ রনি (আইইআর, মাস্টার্স, কক্ষ-৪১৪), মোঃ আসাদুজ্জামান জনি (দর্শন, ৩য় বর্ষ, কক্ষ-৩১১), আলম-ই-জুলহাস জুয়েল (একাউন্টিং, ৩য় বর্ষ, কক্ষ-২১১), আবু জাফর মোঃ ছালাম (তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার, মাস্টার্স, কক্ষ-৫০৩), তৌহিদুল খান তুষার (মার্কেটিং, ৩য় বর্ষ, কক্ষ-২১১), এনামুল হক (আইন, মাস্টার্স, কক্ষ-৩১৯), মফিদুল ইসলাম খান তপু (অর্থনীতি, ২য় বর্ষ, কক্ষ-২০৪), রকিব উদ্দিন (একাউন্টিং, ৩য় বর্ষ, কক্ষ-২১১) এবং মেহেদী হাসান লিয়ন (বাংলা, ২য় বর্ষ, কক্ষ-৫১৭)। এছাড়া সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসানকে কেন বহিষ্কার করা হবে না এ মর্মে ২ সপ্তাহের মধ্যে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে।
এছাড়া হল প্রভোস্ট ও আবাসিক শিক্ষককে অব্যাহতি দেয়া হোক বলে সিন্ডিকেট সুপারিশ করেছে। সেই সঙ্গে আবু বকর হত্যার জন্য পুলিশ প্রশাসনের একটি তদন্ত দাবি করে সিন্ডিকেট।
হল প্রশাসনের বক্তব্য : হল প্রভোস্টের ব্যর্থতা সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. মোঃ আবদুস সাত্তার বলেন, ঘটনার দুই/তিন দিন আগে থেকেই আমি ছুটিতে ছিলাম। আমার দায়িত্ব না থাকা সত্ত্বেও ওইদিন আমি ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্টকে সহায়তা করতে ঘটনাস্থলে যাই। ওই সময় আমি আমার দায়িত্ব যথাযথ পালন করেছি। তিনি বলেন, ওইদিন প্রক্টর ঘটনাস্থলে ছিলেন। প্রক্টরের নির্দেশে পুলিশ টিয়ারশেল ছুড়েছে। পুলিশ ছাত্রদের পেটালো, তার জন্য কি পুলিশ ও প্রক্টর দায়ী নয়?
এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্ট মোঃ আবুল কাশেম বলেছেন, ঘটনার দিন স্পটে প্রভোস্ট, প্রক্টর ও পুলিশ সবাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একসঙ্গে কাজ করেছি। তাই দায়ভার শুধু হল প্রশাসনের নয়। সবারই ব্যর্থতা রয়েছে। হাসপাতালে আবু বকরকে মৃত ঘোষণা করায় ওইদিন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্ররা বিক্ষোভ করেছিল।
তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে সংবাদ সম্মেলন: প্রায় এক মাসের তদন্তে মেধাবী ছাত্র আবু বকরের হত্যাকারী কে তা শনাক্ত করতে না পারলেও সিন্ডিকেট গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট নিয়ে গতকাল সংবাদ সম্মেলন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আআমস আরেফিন সিদ্দিক। তার সঙ্গে ছিলেন প্রোভিসি অধ্যাপক ড. হারুন অর রশীদ ও প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম খান। প্রশাসনিক ভবনের পুরাতন সিনেট লাউঞ্জে সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত রিপোর্টের আদলেই ওই ঘটনার দায়ভার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরকে রক্ষার চেষ্টা করেন ভিসি। উপস্থিত একজন সাংবাদিক তদন্ত রিপোর্টে তার সাক্ষ্য যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়নি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, “সংবাদ সংগ্রহে করতে গিয়ে আমিও সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হই। প্রক্টর ড. সাইফুল ইসলাম খান আমার সামনেই পুলিশকে হলে ঢুকে নির্দেশ দেন ‘যাকে পাও তাকেই মেরে রুমের ভেতরে পাঠিয়ে দেও’।” এসব তথ্য সাক্ষ্যে বলা হলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়নি বলে ওই রিপোর্টার সংবাদ সম্মেলনে দাবি করলে প্রোভিসি ড. হারুন অর রশীদ বলেন, তখন ছিল যুদ্ধক্ষেত্র। আফগানিস্তানের মতো অবস্থা। তখন প্রক্টরের কিছুই করার ছিল না।
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?