অগ্নিঝরা মার্চ : রেডিও পাকিস্তানের নাম হয় ‘ঢাকা বেতার কেন্দ্র’
মাহাবুবুর রহমান
গণবিক্ষোভে টালমাটাল, অস্থির ছিল একাত্তরের মার্চ মাস। ১ মার্চ গণপরিষদের সভা স্থগিত করার পরও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আন্দোলন দিন দিন দানা বেঁধে ওঠে। ৪ মার্চ দেশের বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা ও সেনাবাহিনীর গুলিতে তিন শতাধিক মানুষ নিহত হন। এদিন এক বিবৃতিতে শেখ মুজিবুর রহমান অফিস ও ব্যাংকের সময়সূচি ঘোষণা করেন। তবে শেখ মুজিবুর রহমান তখনও ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য সরকারের সঙ্গে একদিকে আলোচনা, অন্যদিকে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ৪ মার্চ দৈনিক আজাদ পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘পল্টনের জনসমুদ্রে শেখ মুজিব : শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখুন, অবলিম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর দাবি’। ওইদিন এক বিবৃতিতে মওলানা ভাসানী স্বাধিকার আন্দোলনে কোনো ধরনের আপস না করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘৭ কোটি বাঙালিকে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সার্বভৌমত্ব অর্জনে বাধা দিলে বীর বাঙালি চূড়ান্ত সংগ্রামে অবতীর্ণ হইবে।’ (দৈনিক আজাদ, ৫ মার্চ, ১৯৭১)। এদিকে ৪ মার্চ শিল্পী, কুশলী ও বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উদ্যোগ নিয়ে রেডিও পাকিস্তান ঢাকার নাম বদলে রাখা হয় ‘ঢাকা বেতার কেন্দ্র’।
দৈনিক আজাদের ১৯৭১ সালের মার্চের পত্রিকা থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ওই মাসের প্রথম দিন থেকেই ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ রাজপথ প্রকম্পিত করে। একইসঙ্গে সরকারের সঙ্গে আলোচনাও অব্যাহত রাখেন শেখ মুজিব। সরকারের অনড় নীতি ও হত্যা-গ্রেফতার-নির্যাতন শুরু হলে এ আন্দোলন গণআন্দোলনে রূপ নেয়। তখন মওলানা ভাসানীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভিজ্ঞ নেতারা ক্ষমতা হস্তান্তরের আন্দোলন বাদ দিয়ে ‘স্বাধিকার আন্দোলন’ গড়ে তোলার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানসহ দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
প্রথম দিকে শেখ মুজিবুর রহমান আলোচনার মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে আন্দোলন করলেও সময়ের আবর্তে তিনি তা ‘স্বাধিকার আন্দোলন’ হিসেবে এগিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেন। আর এরপর থেকে যতই দিন যাচ্ছিল, এক দফা দাবি অর্থাত্ স্বাধীনতার জন্য ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষার তীব্রতা ততই বাড়ছিল। সেই ইতিহাস প্রতিরোধের-প্রতিবাদের, অধিকার আদায়ে ইস্পাতদৃঢ় প্রত্যয়ের, প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন দেশ হিসেবে পাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের প্রস্তুতির ইতিহাস।
৫ ও ৬ মার্চের হরতাল পালনের আহ্বান জানিয়ে শেখ মুজিব ৪ মার্চ একটি বিবৃতি দেন। ৫ মার্চ দৈনিক আজাদে প্রকাশিত ওই বিবৃতির শিরোনাম ছিল, ‘হরতাল সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বিবৃতি, অফিস ও ব্যাংকের সময়সূচি ঘোষণা’। তিনি ওই বিবৃতিতে ৫ মার্চের হরতালে বেতন পরিশোধসহ কিছু লেনদেনের সুবিধা বিধানের জন্য সরকারি-বেসরকারি অফিস ও ব্যাংকগুলোর নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
৪ মার্চ দৈনিক আজাদ পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘পল্টনের জনসমুদ্রে শেখ মুজিব : শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখুন, অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর দাবি’। এ সংবাদে শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষণা হিসেবে উল্লেখ করা হয়, ‘সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করিয়া গণপ্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর না করা পর্যন্ত বাঙালী জাতি এক পয়সাও খাজনা-ট্যাক্স দেবে না এবং সকল ব্যাপারে সর্বাত্মক অসহযোগিতা চালাইয়া যাইবে।’
শেখ মুজিবুর রহমানের এ ক্ষমতা হস্তান্তরের আন্দোলনকে এক দফার স্বাধিকার আন্দোলনে রূপ দেয়ার আহ্বান জানান মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ৪ মার্চ এক বিবৃতিতে মওলানা ভাসানী বলেন, ‘৭ কোটি বাঙালীকে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সার্বভৌমত্ব অর্জনে বাধা দিলে বীর বাঙালী চূড়ান্ত সংগ্রামে অবতীর্ণ হইবে। আগামী ১২ মার্চ আহূত কৃষক-কর্মী সম্মেলনে তিনি লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে তাঁহার উক্ত এক দফার চূড়ান্ত কর্মসূচি ঘোষণা করিবেন। ১২ মার্চের পূর্বেই সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদের কুপরামর্শ উপেক্ষা করিয়া বর্তমান সরকার ৭ কোটি বাঙালীর এই সঙ্গত দাবি স্বীকার করিয়া লইবেন বলিয়া তিনি আশা প্রকাশ করেন। অন্যথায় কয়েকটি শহরে কেবল নয়, ৬২ হাজার গ্রামের অযুত জনতা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে যে কোনো ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠা করিবে। আলোচনার নামে কোনো আপসকামিতা নয় বলিয়া হুশিয়ারি উচ্চারণ করিয়া মওলানা ভাসানী বলেন, ‘বাংলার কোনো মানুষ এখন আর আপস করিতে রাজি নয়।’ (দৈনিক আজাদ, ৫ মার্চ ১৯৭১)।
উনিশশ’ একাত্তরের ৪ মার্চ আন্দোলন জোরদার করার লক্ষ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে হরতাল পালিত হয় দেশব্যাপী। সারা বাংলায় সেদিন হরতাল ছিল অর্ধদিবস, ভোর ৬টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত। ওইদিন ২ মার্চ সরকারের ঘোষিত কারফিউ ৪ মার্চ প্রত্যাহার করা হয়।
পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিটি বাঙালী ছিলেন প্রতিবাদমুখর, সংগ্রামে আন্দোলনে একাত্ম। একাত্তরের এই দিনে ঘটে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই দিন রেডিও পাকিস্তান ঢাকার নাম বদলে রাখা হয় ‘ঢাকা বেতার কেন্দ্র’। সেদিনের সেই ঘটনা চলমান আন্দোলনে যোগ করে নতুন মাত্রা। বীর বাঙালী ক্রমেই এগিয়ে যেতে থাকে দেশমাতৃকাকে ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের নিগূঢ় থেকে মুক্ত করার চূড়ান্ত লড়াইয়ের দিকে।
দৈনিক আজাদের ১৯৭১ সালের মার্চের পত্রিকা থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ওই মাসের প্রথম দিন থেকেই ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ রাজপথ প্রকম্পিত করে। একইসঙ্গে সরকারের সঙ্গে আলোচনাও অব্যাহত রাখেন শেখ মুজিব। সরকারের অনড় নীতি ও হত্যা-গ্রেফতার-নির্যাতন শুরু হলে এ আন্দোলন গণআন্দোলনে রূপ নেয়। তখন মওলানা ভাসানীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভিজ্ঞ নেতারা ক্ষমতা হস্তান্তরের আন্দোলন বাদ দিয়ে ‘স্বাধিকার আন্দোলন’ গড়ে তোলার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানসহ দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
প্রথম দিকে শেখ মুজিবুর রহমান আলোচনার মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে আন্দোলন করলেও সময়ের আবর্তে তিনি তা ‘স্বাধিকার আন্দোলন’ হিসেবে এগিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেন। আর এরপর থেকে যতই দিন যাচ্ছিল, এক দফা দাবি অর্থাত্ স্বাধীনতার জন্য ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষার তীব্রতা ততই বাড়ছিল। সেই ইতিহাস প্রতিরোধের-প্রতিবাদের, অধিকার আদায়ে ইস্পাতদৃঢ় প্রত্যয়ের, প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন দেশ হিসেবে পাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের প্রস্তুতির ইতিহাস।
৫ ও ৬ মার্চের হরতাল পালনের আহ্বান জানিয়ে শেখ মুজিব ৪ মার্চ একটি বিবৃতি দেন। ৫ মার্চ দৈনিক আজাদে প্রকাশিত ওই বিবৃতির শিরোনাম ছিল, ‘হরতাল সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বিবৃতি, অফিস ও ব্যাংকের সময়সূচি ঘোষণা’। তিনি ওই বিবৃতিতে ৫ মার্চের হরতালে বেতন পরিশোধসহ কিছু লেনদেনের সুবিধা বিধানের জন্য সরকারি-বেসরকারি অফিস ও ব্যাংকগুলোর নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
৪ মার্চ দৈনিক আজাদ পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘পল্টনের জনসমুদ্রে শেখ মুজিব : শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখুন, অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর দাবি’। এ সংবাদে শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষণা হিসেবে উল্লেখ করা হয়, ‘সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করিয়া গণপ্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর না করা পর্যন্ত বাঙালী জাতি এক পয়সাও খাজনা-ট্যাক্স দেবে না এবং সকল ব্যাপারে সর্বাত্মক অসহযোগিতা চালাইয়া যাইবে।’
শেখ মুজিবুর রহমানের এ ক্ষমতা হস্তান্তরের আন্দোলনকে এক দফার স্বাধিকার আন্দোলনে রূপ দেয়ার আহ্বান জানান মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ৪ মার্চ এক বিবৃতিতে মওলানা ভাসানী বলেন, ‘৭ কোটি বাঙালীকে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সার্বভৌমত্ব অর্জনে বাধা দিলে বীর বাঙালী চূড়ান্ত সংগ্রামে অবতীর্ণ হইবে। আগামী ১২ মার্চ আহূত কৃষক-কর্মী সম্মেলনে তিনি লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে তাঁহার উক্ত এক দফার চূড়ান্ত কর্মসূচি ঘোষণা করিবেন। ১২ মার্চের পূর্বেই সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদের কুপরামর্শ উপেক্ষা করিয়া বর্তমান সরকার ৭ কোটি বাঙালীর এই সঙ্গত দাবি স্বীকার করিয়া লইবেন বলিয়া তিনি আশা প্রকাশ করেন। অন্যথায় কয়েকটি শহরে কেবল নয়, ৬২ হাজার গ্রামের অযুত জনতা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে যে কোনো ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠা করিবে। আলোচনার নামে কোনো আপসকামিতা নয় বলিয়া হুশিয়ারি উচ্চারণ করিয়া মওলানা ভাসানী বলেন, ‘বাংলার কোনো মানুষ এখন আর আপস করিতে রাজি নয়।’ (দৈনিক আজাদ, ৫ মার্চ ১৯৭১)।
উনিশশ’ একাত্তরের ৪ মার্চ আন্দোলন জোরদার করার লক্ষ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে হরতাল পালিত হয় দেশব্যাপী। সারা বাংলায় সেদিন হরতাল ছিল অর্ধদিবস, ভোর ৬টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত। ওইদিন ২ মার্চ সরকারের ঘোষিত কারফিউ ৪ মার্চ প্রত্যাহার করা হয়।
পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিটি বাঙালী ছিলেন প্রতিবাদমুখর, সংগ্রামে আন্দোলনে একাত্ম। একাত্তরের এই দিনে ঘটে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই দিন রেডিও পাকিস্তান ঢাকার নাম বদলে রাখা হয় ‘ঢাকা বেতার কেন্দ্র’। সেদিনের সেই ঘটনা চলমান আন্দোলনে যোগ করে নতুন মাত্রা। বীর বাঙালী ক্রমেই এগিয়ে যেতে থাকে দেশমাতৃকাকে ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের নিগূঢ় থেকে মুক্ত করার চূড়ান্ত লড়াইয়ের দিকে।
-
প্রথম পাতা


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


