Amardesh
আজঃ ঢাকা, বৃহস্পতিবার ৪ মার্চ ২০১০, ২০ ফাল্গুন ১৪১৬, ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩১     আপডেট সময়ঃ সময় : রাত ১.৩০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 কার্টুন
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

বাংলাদেশ ঘিরে ১৪ মিনি ফারাক্কা

ইলিয়াস খান
‘বাংলাদেশ ঘিরে এখন ১৪ ‘মিনি ফারাক্কা’। ভারত নির্মিত এসব ‘ফারাক্কার’ কারণে মারাত্মক পানি সঙ্কটে পড়ছে বাংলাদেশ। দু’দেশের মধ্যে প্রবহমান অভিন্ন নদীর পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে নয়াদিল্লি কোনো আন্তর্জাতিক আইন-কানুনেরও তোয়াক্কা করছে না।’ বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মিয়া মুহাম্মদ আদেল সম্প্রতি এক লেখায় এসব তথ্য উল্লেখ করেছেন। ‘ভাটির দেশগুলোকে দ্বিগুণ ভোগান্তিতে ফেলে উজানের দেশগুলো একই পরিমাণ লাভবান হচ্ছে’ শীর্ষক এই লেখায় তিনি বিশ্ব পানি পরিস্থিতি, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন পদ্ধতি, পানির প্রবাহ আটকাতে বাঁধ নির্মাণে করণীয় ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরেন।
ড. আদেল উল্লেখ করেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে অভিন্ন নদীর পানি সরবরাহ নিয়ে ভারত দ্বৈতনীতি গ্রহণ করেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে তারা যে আচরণ করছে বাংলাদেশের সঙ্গে করছে ঠিক তার বিপরীত।
আদেলের লেখা অনুযায়ী, ফারাক্কার মতো বড় বাঁধ ছাড়াও বাংলাদেশের চারপাশ ঘিরে কমপক্ষে ১৪টি মিনি ফারাক্কা বাঁধ দিয়েছে ভারত। এছাড়া ছোট ছোট বিভিন্ন নদীতেও বাঁধ দেয়া হয়েছে। এর ফলে মার্চ থেকে মে—এই শুষ্ক মৌসুমে মারাত্মক পানি সঙ্কটে পড়ছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে পানির প্রবাহ ঠিক না থাকায় নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবাহ বেড়ে গেলে বন্যা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জলপাইগুড়ি জেলার মেকলিগঞ্জ মহকুমার কাশিয়াবাড়ীতে বাঙ্গু নদীর ওপর বাঁধ দেয়া হয়েছে। নওগাঁর অদূরে ভারতের বালুরঘাটের ঝিনাইপোজে বাঁধ দেয়া হয়েছে কুশি নদীতে। এর ফলে ছোট যমুনা নদীতে পানিস্বল্পতা দেখা দিয়েছে। পঞ্চগড়ের অদূরে ভিতরঘর সীমান্তে তালমা নদীতে বাঁধ দেয়া হয়েছে। নদীয়া জেলার গঙ্গারাজপুর থেকে ৮ কিলোমিটার ভাটিতে ভৈরব নদীতে আড়াআড়ি বাঁধ দেয়া হয়েছে। এই বাঁধের উজানে জলাঙ্গী নদীতে বসানো হয়েছে একটি রেগুলেটর। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের ঝিনাইদহ ও যশোর জেলার নদীগুলোতে পানির প্রবাহে সমস্যা হচ্ছে এই ভৈরব বাঁধের কারণে। পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণার বাংলাদেশ সীমান্তে বাঁধ দেয়া হয়েছে কোডলা নদীতে। এর ফলে বাংলাদেশ অংশেও পানির স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। মধুমতি নদীতে বাঁধ দেয়া হয়েছে কাকলমারিতে। গত শতকের ষাটের দশকে বাঁধ দেয়া হয় শিলিগুড়ির আম্বারি-ফালাকাটাইয়া করোতোয়া নদীতে। ফলে এই নদীর বাংলাদেশ অংশের নীলফামারী, নওগাঁ, বগুড়াসহ বিভিন্ন জেলা শুষ্ক হয়ে যাচ্ছে। মেঘালয়ের পাহাড়ি এলাকায় জন্ম জিঞ্জিরাম নদীর। এই নদী বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলা দিয়ে ঢুকে দুদিকে প্রবাহিত হয়ে একটি শাখা ফরিদপুরের বোয়ালমারীর কাছে যমুনা নদীতে এবং অন্যটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোলাবাড়িতে পুরনো ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
এই নদীর উজানে বাঁধ দেয়ায় ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উত্পাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
গোমতীর উত্পত্তি ত্রিপুরার পাহাড়ি এলাকায়। কুমিল্লার সোনাই সারি সেচ প্রকল্প এই নদীর পানি প্রবাহের ওপর নির্ভলশীল। এই প্রকল্পের জন্য ১৫০ থেকে ২০০ কিউসেক পানির প্রয়োজন। কিন্তু গোমতীর উজানে মাথরানি নামক স্থানে বাঁধ নির্মাণ করায় সেচকাজ ব্যাহত হচ্ছে। গোমতী বাংলাদেশে ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ। ডাকাতিয়া এর শাখা এবং বুড়ি এর উপ-শাখা।
ত্রিপুরা হয়ে আসা খোয়াই নদীর ওপর চাকমা ঘাট ও কল্যাণপুরে বাঁধ দেয়া হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে এই নদী থেকে ৩০০ কিউসেক পানি প্রবাহিত হয়। ২৫ হাজার একর জমিতে বোরো ধান চাষ হয় এই নদীর পানি দিয়ে। কিন্তু এই নদীর পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত এখনও কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি।
ত্রিপুরার কেলা শহরের কাছাকাছি কাঞ্চনবাড়ী এলাকায় মনু নদীর ওপর বাঁধ দিয়েছে ভারত। মনু বাংলাদেশে ৮৩ কিলোমিটার দীর্ঘ। শীতকালে এই নদীতে পানির প্রবাহ থাকে ৫শ’ থেকে ৬শ’ কিউসেক। বন্যা মৌসুমে এই প্রবাহ হয় ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার কিউসেক।
ধলাই নদীর উত্পত্তিও ত্রিপুরার দক্ষিণাঞ্চলে। ৬৭ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে মৌলভীবাজার দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে এ নদী। ত্রিপুরার কুলাই জেলার ধলাই নামক স্থানে এই নদীর ওপর বাঁধ দেয়া হচ্ছে। পুরোপুরি নির্মিত হলে বাংলাদেশ আর পানিই পাবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ডাউকী নদীর উত্পত্তি আসামের উমগাত নদী থেকে। সিলেটের জাফলং দিয়ে এই নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। গত শতকের সত্তরের দশকে ডাউকীতে স্থায়ী গ্রোয়েন বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। ৪৩ মিটার লম্বা, ৯ মিটার চওড়া ও ৯ মিটার উচ্চতার এই বাঁধের কারণে ডাউকীর স্বাভাবিক প্রবাহ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
পুনর্ভবা নদীর জন্ম বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও জেলার দেউলিতে। ভারতে প্রবেশের আগে দিনাজপুরের কাছে করোতোয়ার শাখা নদী ধীপার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এরপর এটি চলে গেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে। এর পর ভারতে প্রবেশ করে হাড়ভাঙ্গা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। পুনরায় এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করে মহিমপুরের কাছে মহানন্দা নদীতে মিলিত হয়েছে। ভারত কমরডাঙ্গার কাছে এই নদীতে বাঁধ দিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে ব্যাপক পানি স্বল্পতার সৃষ্টি হয়েছে।
এছাড়াও ইছামতি-কালিন্দী, বেতনা-কোদালিয়া, ভৈরব-কাবোডাক, আত্রাই, দেওনাই-যমুনেশ্বরী, বুড়ী তিস্তা, সাঙ্গিল, ধরলা, ভোগাই, কুশিয়ারা, সোনাই বড়দল, জুড়ি, ফেনী—এসব নদীর ওপর ছোট-বড় অনেক বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।
এসব মিনি ফারাক্কা নির্মাণের সময় ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনা করেনি। নতুন করে নির্মাণ করছে টিপাইমুখ বাঁধ। বাংলাদেশ ব্যাপক প্রতিবাদ জানালেও ভারত তাতে কান না দিয়ে বাঁধ নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনা না করা প্রসঙ্গে ড. আদেল উত্তর আমেরিকার কলাম্বিয়া নদীর ওপর বাঁধ দেয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে আলাপ-আলোচনা চলেছে তার উদাহরণ দেন। তিনি উল্লেখ করেন, কানাডায় উত্পত্তির পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এই নদী প্রশান্ত মহাসাগরে গিয়ে মিলেছে। বন্যা মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র কলাম্বিয়ারণ পরিকল্পনা করে। কিন্তু কানাডা আপত্তি তোলায় যুক্তরাষ্ট্র এই পরিকল্পনা বাতিল করে। কানাডার আপত্তির কারণ ছিল—এই বাঁধ নির্মিত হলে কিছু পাহাড়ি এলাকায় বন্যা হতে পারে। এরপর দুই দেশ দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে। শেষ পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচকাজ, জলবিদ্যুত্ উত্পাদন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা শেষে ১৯৬১ সালে এক চুক্তিতে পৌঁছে। চুক্তি অনুযায়ী, কানাডা মাইকা বাঁধ, রিভেলস্টক বাঁধ এবং এ্যারো লেকে পানি সংরক্ষণাগার গড়ে তোলে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রে বন্যা হতে না পারে। পক্ষান্তরে যুক্তরাষ্ট্র কানাডাকে বন্যার ক্ষয়ক্ষতির শতকরা ৫০ ভাগ ক্ষতিপূরণ দেয়। দুই দেশ সমানভাবে পানি বিদ্যুত্ ভাগ করে নেয়। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছর পর সেচ কাজের জন্য বাঁধ নির্মাণ করে।
ড. আদেল মনে করেন, ভারত একতরফাভাবে অভিন্ন নদীর ওপর যে বাঁধ নির্মাণ করছে এর প্রতিবাদ জানানো উচিত। একই সঙ্গে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণও করতে হবে।
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?