অশান্ত রাজশাহী
আ’লীগ ও পুলিশের তাণ্ডবে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে, নিরাপত্তাহীনতায় মানুষ। তিন শতাধিক জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী গ্রেফতার। ৪৬ জন রিমান্ডে, পরিস্থিতি উস্কে দেয়ার অভিযোগ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও মেয়র লিটনের বিরুদ্ধে
সরদার এম আনিছুর রহমান রাজশাহী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবিরের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক নিহত হওয়ার ঘটনায় ক্রমেই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে। আ’লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশের বেপরোয়া তাণ্ডব চলছে। ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠছে রাজশাহীসহ সারাদেশ। রাজশাহী শহরের মোড়ে মোড়ে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। জামায়াত-শিবির গ্রেফতারে চিরুনি অভিযান চলছে। পাড়া-মহল্লা-গ্রামে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ ক্যাডারদের সঙ্গে নিয়ে বাসাবাড়ি, মেস এবং মসজিদ-মাদ্রাসায় ব্যাপক তল্লাশি চালানো হচ্ছে। সাধারণ ছাত্র-জনতাও অযথা হয়রানি থেকে রেহাই পাচ্ছে না। হয়রানি এড়াতে হাজার হাজার ছাত্র রাজশাহী ছেড়ে চলে গেছে। এতে শহরের সর্বত্রই ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যেও ধস নেমেছে। ওই ঘটনার জের ধরে গত বুধবার রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে পুলিশের গুলিতে শিবির নেতা হাফিজুর রহমান শাহীন (২৫) এবং চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের ছুরিকাঘাতে শিবিরকর্মী এম মহিউদ্দিন নিহত হয়েছে। রাজশাহীসহ সারাদেশে গ্রেফতার করা করেছে তিন শতাধিক জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীকে। এর মধ্যে রাজশাহীতেই ৪৬ জনকে গ্রেফতার করে ৫ ও ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের জের ধরে প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জেও আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশের তাণ্ডব ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার পর বাঘা ও দুর্গাপুরে জামায়াতের কার্যালয়ে হামলা-ভাংচুর হয়েছে। দুর্গাপুর জামায়াত নেতা নুরুজ্জামান লিটনের বাড়িতে পেট্রোল দিয়ে অগ্নিসংযোগ এবং রাজশাহী মহানগরীর বাণীবাজার বাটার মোড়ে ইসলামী ইনস্যুরেন্স অফিসে ভাংচুর করা হয়েছে। সব মিলে অশান্ত রাজশাহীসহ সারাদেশেই চলছে সহিংসতা। এদিকে ঘটনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু ও রাজশাহীর মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের ‘জামায়াত-শিবির উত্খাতের’ ঘোষণায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, এই হত্যাকাণ্ডকে পুঁজি করে বিরোধীদের দমনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের ১৩১ নম্বর কক্ষে দীর্ঘদিন থেকেই (বৈধ সিটে) অবস্থান করছিল হল শাখার শিবির কর্মী হাফিজ। তবে ওই কক্ষে হল প্রশাসনের কোনো অনুমতি ছাড়াই জোরপূর্বক বেশ কিছুদিন অবস্থান করে ছাত্রলীগ কর্মী ও হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্র আসাদ। ঘটনার দিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে আসাদ কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মী নিয়ে ১৩১ নম্বর কক্ষ জোরপূর্বক দখল করতে গেলে শিবির কর্মী হাফিজ এর প্রতিবাদ করে। এ সময় উভয়ের মধ্যে কথাকাটাকাটি শুরু হয়। এসময় আসাদ তার সহযোগীদের বিষয়টি অবহিত করলে ১০-১২ জন নেতাকর্মী নিয়ে ছাত্রলীগ নেতা কাওছার সশস্ত্র অবস্থায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। এ সময় উভয় গ্রুপের নেতাকর্মীরা উত্তেজিত হয়ে উঠলে এক পর্যায়ে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। এ সময় শিবিরের ১ জনসহ ছাত্রলীগের আসাদ ও কাওছার গুরুতর আহত হয়। খরব পেয়ে প্রক্টরিয়াল বডি পুলিশ দিয়ে বঙ্গবন্ধু হলের চারপাশ ঘিরে হলের গেটে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে তল্লাশি শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে পুলিশ এবং অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা পুরো ক্যাম্পাস ঘিরে হলগুলো নিজেদের দখলে নিয়ে যায় এবং প্রক্টরের উপস্থিতিতে হল অভ্যন্তরে শিবির কর্মীদের নির্যাতন করে। ছাত্রলীগ কর্মীরা এসময় রড, হকিস্টিক, চাইনিজ কুড়াল দিয়ে প্রায় ১০-১২ জন শিবির কর্মীকে আহত করে এবং শিবির নিয়ন্ত্রিত অর্ধশত কক্ষ ভাংচুর করে।
ম্যানহোলে লাশ রহস্যাবৃত : সংঘর্ষে নিহত ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেনের লাশ নিয়ে রহস্য ক্রমেই দানা বাঁধছে। কীভাবে ম্যানহোলে লাশ গেল এ নিয়ে ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি আরও বেশি স্পর্শকাতর করে তুলতে পরিকল্পিতভাবে এটি করা হতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্যক্ষদর্শী শাহ মখদুম হলের এক কর্মচারী বলেন, সংঘর্ষের পর ভোর ৫টা পর্যন্ত ফারুকের লাশ হল গেটের সামনেই পড়েছিল। কিন্তু সকাল সাড়ে ৬টার পর আমির আলী হলের পেছনে ম্যানহোলে লাশ কিভাবে গেল—এ প্রশ্ন এখন সবার মনে।
ঘটনা কি কোন্দলের জের? : মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগে অভ্যন্তরীণ কোন্দল চলে আসছিল। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষও হয়। ওই দিন সংঘর্ষে ছাত্রলীগের আহতরা বলছেন, জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দিয়ে হলে প্রবেশ করে তাদের ওপর হামলা করা হয়েছে। এতে অনেকেরই ধারণা, নতুনভাবে গঠিত ছাত্রলীগের পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরাই এ হামলা চালাতে পারে।
মামলা, গ্রেফতার : সংঘর্ষে ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক নিহত এবং ওই দিনের ঘটনায় এ পর্যন্ত রাজশাহীতে ৪টি মামলায় সহস্রাধিক শিবির নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে ১০৮ জনকে। এদের মধ্যে ২৮ জনকে ৭ দিনের এবং ১৮ জনকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। মামলা করেছেন মতিহার থানার এসআই এরশাদুল আলম, রাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাজেদুল ইসলাম অপু, ছাত্রলীগ কর্মী রাহেদুল ও রুহুল আমীন। এছাড়া রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও দুই শতাধিক জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
পরিস্থিতি উস্কে দেয়ার অভিযোগ : এদিকে ঘটনার পর পরিস্থতি আরও উস্কে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু ও রাজশাহীর মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের বিরুদ্ধে। তারা পরিস্থিতি শান্ত করার পরিবর্তে জামায়াত-শিবির উত্খাতের ঘোষণা দিয়ে ছাত্রদের উস্কে দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াত-শিবিরের নেতারা। মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি বলছেন, ওই তিন ব্যক্তি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থেকে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছেন। এরই প্রেক্ষিতে তারা হামলা-ভাংচুর করছে।
সুশীল সমাজের প্রতিক্রিয়া : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রবীণ শিক্ষক প্রফেসর আব্দুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, আমার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে এতটা নোঙরা তাণ্ডব দেখিনি। ফারুক হত্যাকাণ্ডের বিচার নয়, বরং এ যেন বিরোধীদের দমন-নিপীড়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করাই তাদের উদ্দেশ্য।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর রফিকুল ইসলাম বলেন, গত এক বছরে ছাত্রলীগের হাতে বেশ কয়েকজন মেধাবী ছাত্র নিহত হলেও সরকার সেসব বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। কিন্তু আজ ফারুক হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশে যে ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করা হয়েছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক।
মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ২০০৯ সালের ১৩ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির নেতা শরিফুজ্জামান নোমানীকে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা খুন করলেও প্রশাসনের কোনো সক্রিয় ও সন্তোষজনক ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়নি।
বিএনপি ও যুবদলের প্রতিক্রিয়া : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবির সংঘর্ষের ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী মহানগরী আমীর আতাউর রহমানকে গ্রেফতার করায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সাবেক সিটি মেয়র, বিএনপি’র কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও রাজশাহী মহানগর সভাপতি মিজানুর রহমান মিনু এবং মহানগর সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. শফিকুল হক মিলন।
যুবদলের নিন্দা ও প্রতিবাদ : জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী মহানগরী আমীর আতাউর রহমানকে পুলিশ গ্রেফতার করায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জাতীয়তাবাদী যুবদলের রাজশাহী মহানগর সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, সাধারণ সম্পাদক আসলাম সরকার ও সাংগঠনিক সম্পাদক ওয়ালিউল হক রানা।
ছাত্রদলের নিন্দা : গত সোমবার রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে হুমকি-ধমকি দিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করা এবং সন্ত্রাসী ঘটনার জন্য নিন্দা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃবৃন্দ। বিবৃতিতে ছাত্রদল নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশব্যাপী শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রলীগ যে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে তা কোনো সভ্য রাষ্ট্রে চলতে পারে না। শিক্ষাঙ্গন আজ অস্থিতিশীল।
এসব বিষয়ে রাজশাহীর পুলিশ কমিশনার নওশের আলী বলেন, রাজশাহীতে স্বাভাবিক পরিবেশ বিরাজ করছে। কোনো ভীতি অবস্থা নেই। যারা সহিংস ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। নগরীতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের বিষয়ে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার জন্যই এটা করা হয়েছে।
সরদার এম আনিছুর রহমান রাজশাহী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবিরের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক নিহত হওয়ার ঘটনায় ক্রমেই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে। আ’লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশের বেপরোয়া তাণ্ডব চলছে। ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠছে রাজশাহীসহ সারাদেশ। রাজশাহী শহরের মোড়ে মোড়ে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। জামায়াত-শিবির গ্রেফতারে চিরুনি অভিযান চলছে। পাড়া-মহল্লা-গ্রামে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ ক্যাডারদের সঙ্গে নিয়ে বাসাবাড়ি, মেস এবং মসজিদ-মাদ্রাসায় ব্যাপক তল্লাশি চালানো হচ্ছে। সাধারণ ছাত্র-জনতাও অযথা হয়রানি থেকে রেহাই পাচ্ছে না। হয়রানি এড়াতে হাজার হাজার ছাত্র রাজশাহী ছেড়ে চলে গেছে। এতে শহরের সর্বত্রই ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যেও ধস নেমেছে। ওই ঘটনার জের ধরে গত বুধবার রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে পুলিশের গুলিতে শিবির নেতা হাফিজুর রহমান শাহীন (২৫) এবং চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের ছুরিকাঘাতে শিবিরকর্মী এম মহিউদ্দিন নিহত হয়েছে। রাজশাহীসহ সারাদেশে গ্রেফতার করা করেছে তিন শতাধিক জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীকে। এর মধ্যে রাজশাহীতেই ৪৬ জনকে গ্রেফতার করে ৫ ও ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের জের ধরে প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জেও আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশের তাণ্ডব ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার পর বাঘা ও দুর্গাপুরে জামায়াতের কার্যালয়ে হামলা-ভাংচুর হয়েছে। দুর্গাপুর জামায়াত নেতা নুরুজ্জামান লিটনের বাড়িতে পেট্রোল দিয়ে অগ্নিসংযোগ এবং রাজশাহী মহানগরীর বাণীবাজার বাটার মোড়ে ইসলামী ইনস্যুরেন্স অফিসে ভাংচুর করা হয়েছে। সব মিলে অশান্ত রাজশাহীসহ সারাদেশেই চলছে সহিংসতা। এদিকে ঘটনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু ও রাজশাহীর মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের ‘জামায়াত-শিবির উত্খাতের’ ঘোষণায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, এই হত্যাকাণ্ডকে পুঁজি করে বিরোধীদের দমনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের ১৩১ নম্বর কক্ষে দীর্ঘদিন থেকেই (বৈধ সিটে) অবস্থান করছিল হল শাখার শিবির কর্মী হাফিজ। তবে ওই কক্ষে হল প্রশাসনের কোনো অনুমতি ছাড়াই জোরপূর্বক বেশ কিছুদিন অবস্থান করে ছাত্রলীগ কর্মী ও হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্র আসাদ। ঘটনার দিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে আসাদ কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মী নিয়ে ১৩১ নম্বর কক্ষ জোরপূর্বক দখল করতে গেলে শিবির কর্মী হাফিজ এর প্রতিবাদ করে। এ সময় উভয়ের মধ্যে কথাকাটাকাটি শুরু হয়। এসময় আসাদ তার সহযোগীদের বিষয়টি অবহিত করলে ১০-১২ জন নেতাকর্মী নিয়ে ছাত্রলীগ নেতা কাওছার সশস্ত্র অবস্থায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। এ সময় উভয় গ্রুপের নেতাকর্মীরা উত্তেজিত হয়ে উঠলে এক পর্যায়ে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। এ সময় শিবিরের ১ জনসহ ছাত্রলীগের আসাদ ও কাওছার গুরুতর আহত হয়। খরব পেয়ে প্রক্টরিয়াল বডি পুলিশ দিয়ে বঙ্গবন্ধু হলের চারপাশ ঘিরে হলের গেটে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে তল্লাশি শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে পুলিশ এবং অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা পুরো ক্যাম্পাস ঘিরে হলগুলো নিজেদের দখলে নিয়ে যায় এবং প্রক্টরের উপস্থিতিতে হল অভ্যন্তরে শিবির কর্মীদের নির্যাতন করে। ছাত্রলীগ কর্মীরা এসময় রড, হকিস্টিক, চাইনিজ কুড়াল দিয়ে প্রায় ১০-১২ জন শিবির কর্মীকে আহত করে এবং শিবির নিয়ন্ত্রিত অর্ধশত কক্ষ ভাংচুর করে।
ম্যানহোলে লাশ রহস্যাবৃত : সংঘর্ষে নিহত ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেনের লাশ নিয়ে রহস্য ক্রমেই দানা বাঁধছে। কীভাবে ম্যানহোলে লাশ গেল এ নিয়ে ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি আরও বেশি স্পর্শকাতর করে তুলতে পরিকল্পিতভাবে এটি করা হতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্যক্ষদর্শী শাহ মখদুম হলের এক কর্মচারী বলেন, সংঘর্ষের পর ভোর ৫টা পর্যন্ত ফারুকের লাশ হল গেটের সামনেই পড়েছিল। কিন্তু সকাল সাড়ে ৬টার পর আমির আলী হলের পেছনে ম্যানহোলে লাশ কিভাবে গেল—এ প্রশ্ন এখন সবার মনে।
ঘটনা কি কোন্দলের জের? : মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগে অভ্যন্তরীণ কোন্দল চলে আসছিল। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষও হয়। ওই দিন সংঘর্ষে ছাত্রলীগের আহতরা বলছেন, জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দিয়ে হলে প্রবেশ করে তাদের ওপর হামলা করা হয়েছে। এতে অনেকেরই ধারণা, নতুনভাবে গঠিত ছাত্রলীগের পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরাই এ হামলা চালাতে পারে।
মামলা, গ্রেফতার : সংঘর্ষে ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক নিহত এবং ওই দিনের ঘটনায় এ পর্যন্ত রাজশাহীতে ৪টি মামলায় সহস্রাধিক শিবির নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে ১০৮ জনকে। এদের মধ্যে ২৮ জনকে ৭ দিনের এবং ১৮ জনকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। মামলা করেছেন মতিহার থানার এসআই এরশাদুল আলম, রাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাজেদুল ইসলাম অপু, ছাত্রলীগ কর্মী রাহেদুল ও রুহুল আমীন। এছাড়া রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও দুই শতাধিক জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
পরিস্থিতি উস্কে দেয়ার অভিযোগ : এদিকে ঘটনার পর পরিস্থতি আরও উস্কে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু ও রাজশাহীর মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের বিরুদ্ধে। তারা পরিস্থিতি শান্ত করার পরিবর্তে জামায়াত-শিবির উত্খাতের ঘোষণা দিয়ে ছাত্রদের উস্কে দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াত-শিবিরের নেতারা। মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি বলছেন, ওই তিন ব্যক্তি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থেকে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছেন। এরই প্রেক্ষিতে তারা হামলা-ভাংচুর করছে।
সুশীল সমাজের প্রতিক্রিয়া : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রবীণ শিক্ষক প্রফেসর আব্দুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, আমার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে এতটা নোঙরা তাণ্ডব দেখিনি। ফারুক হত্যাকাণ্ডের বিচার নয়, বরং এ যেন বিরোধীদের দমন-নিপীড়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করাই তাদের উদ্দেশ্য।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর রফিকুল ইসলাম বলেন, গত এক বছরে ছাত্রলীগের হাতে বেশ কয়েকজন মেধাবী ছাত্র নিহত হলেও সরকার সেসব বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। কিন্তু আজ ফারুক হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশে যে ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করা হয়েছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক।
মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ২০০৯ সালের ১৩ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির নেতা শরিফুজ্জামান নোমানীকে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা খুন করলেও প্রশাসনের কোনো সক্রিয় ও সন্তোষজনক ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়নি।
বিএনপি ও যুবদলের প্রতিক্রিয়া : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবির সংঘর্ষের ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী মহানগরী আমীর আতাউর রহমানকে গ্রেফতার করায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সাবেক সিটি মেয়র, বিএনপি’র কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও রাজশাহী মহানগর সভাপতি মিজানুর রহমান মিনু এবং মহানগর সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. শফিকুল হক মিলন।
যুবদলের নিন্দা ও প্রতিবাদ : জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী মহানগরী আমীর আতাউর রহমানকে পুলিশ গ্রেফতার করায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জাতীয়তাবাদী যুবদলের রাজশাহী মহানগর সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, সাধারণ সম্পাদক আসলাম সরকার ও সাংগঠনিক সম্পাদক ওয়ালিউল হক রানা।
ছাত্রদলের নিন্দা : গত সোমবার রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে হুমকি-ধমকি দিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করা এবং সন্ত্রাসী ঘটনার জন্য নিন্দা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃবৃন্দ। বিবৃতিতে ছাত্রদল নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশব্যাপী শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রলীগ যে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে তা কোনো সভ্য রাষ্ট্রে চলতে পারে না। শিক্ষাঙ্গন আজ অস্থিতিশীল।
এসব বিষয়ে রাজশাহীর পুলিশ কমিশনার নওশের আলী বলেন, রাজশাহীতে স্বাভাবিক পরিবেশ বিরাজ করছে। কোনো ভীতি অবস্থা নেই। যারা সহিংস ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। নগরীতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের বিষয়ে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার জন্যই এটা করা হয়েছে।
-
জাতীয়


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


