আন্তর্জাতিক নদী কমিশন গঠনের ধুয়া নয়াদিল্লির
ইলিয়াস খান
ভারত তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন ইস্যু ঝুলিয়ে রাখতে চীনবিরোধী ‘আন্তর্জাতিক যৌথ নদী কমিশন’ গঠনের ধুয়া তুলেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফরে তিস্তা চুক্তির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারের বদলে দেশটি প্রতিবেশীদের নিয়ে নদী কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যমে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, মূলত নিজেদের প্রয়োজনে চীনকে চাপে রাখতেই দিল্লি জোট গঠন প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের উত্স চীনের ‘ইয়ারলুং সাংপো’র মুখে বাঁধ ঠেকাতেও এই জোট কাজে লাগাতে চায় দিল্লি।
ভারতের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট পানি বণ্টন চুক্তি চায় ঢাকা। কারণ এই নদীর পানিপ্রবাহ প্রতি বছর কমে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর। শেখ হাসিনার সফরসূচি ঘোষণার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু চুক্তির বিষয়ে ভারতের কাছ থেকে আশাব্যঞ্জক কোনো আশ্বাস পাওয়া যায়নি।
তিস্তার উত্পত্তি তিব্বতে। সেখান থেকে আসা দুটি ধারা উত্তর সিকিমে মিশে তিস্তা নাম নিয়েছে। তারপরে তা ভারতের কিছু অংশ অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ভারতে আসা তিস্তার জলপ্রবাহও লক্ষণীয়ভাবে কমে গেছে। কূটনৈতিক সূত্র জানায়, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের কাছে ভারত হস্তান্তর করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে পৃথক একটি যৌথ নদী কমিশনেরও প্রস্তাব দিয়েছে নয়াদিল্লি। প্রস্তাব অনুযায়ী এই কমিশনের কাজ হবে বিভিন্ন দেশের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা নদীগুলোর পানি বণ্টন নিয়ে সমস্যা মেটানো।
বস্তুত আন্তর্জাতিক এই নদী কমিশনের প্রস্তাব এই প্রথম বাংলাদেশকে দিচ্ছে ভারত। এই উপমহাদেশের মধ্যে প্রবাহিত অনেক নদীর প্রকৃত উত্স চীনের তিব্বতে। নানা কারণে সেখান থেকে আসা পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে। কিন্তু পানি বণ্টন নিয়ে পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হচ্ছে নিম্ন অববাহিকার দেশগুলোর মধ্যে। ভারত চায়, নতুন এই আন্তর্জাতিক নদী কমিশন একদিকে যেমন এই ধরনের নদীগুলোর জলপ্রবাহের হিসাব রাখবে, তেমনই পানির পরিমাণ কমে যাওয়া নিয়ে একযোগে চীনের সঙ্গে দরবার করবে।
ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নয়াদিল্লি বিষয়টি নিয়ে অনেকবারই বেইজিংয়ের দ্বারস্থ হয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণের সুবিধার জন্য চীন ব্রহ্মপুত্রসহ কয়েকটি নদীর উেসর পানি প্রবাহের হিসাব নিয়মিত দিল্লিতে পাঠাতেও রাজি হয়েছে। কিন্তু এই পর্যন্তই। পানির প্রবাহ বাড়ানোর বিষয়ে কোনোদিনই তেমন কর্ণপাত করেনি চীন। ভারত মনে করে, তিন-চারটি দেশ একযোগে সরব হলে বেইজিংও বিষয়টি নিয়ে তত্পর হতে বাধ্য। দিল্লির আশা, সঙ্কট যখন তীব্র, এমন একটি গঠনমূলক প্রস্তাব ঢাকা নিশ্চয়ই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে দেখবে।
এদিকে ব্রহ্মপুত্রের উত্স চীনের ‘ইয়ারলুং সাংপো’র মুখে বাঁধ ঠেকাতে ঢাকার সমর্থন চাচ্ছে দিল্লি। এই সমর্থনের আশায় ভারত টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ বিষয়ে ‘ধীরে চলা নীতি’ও নিয়েছে।
চীন ইয়ারলুং সাংপো নদীতে বাঁধ দিয়ে প্রায় ৪০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুত্ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন একতরফাভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে ভাটির দেশ বাংলাদেশ ও ভারত সর্বনাশের মুখে পড়বে। বাংলাদেশে যমুনা ও ভারতে ব্রহ্মপুত্র মরে যাবে। জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হতে পারে। চীন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করলেও ভারতের আসাম সরকার দাবি করেছে যে, বেইজিং এরই মধ্যে বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু করেছে। তারা গত বছরের ১৬ মার্চ এই প্রকল্পটি অনুমোদন এবং ২ এপ্রিল নির্মাণ কাজ শুরু করেছে। এই বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করার জন্য সাউথ ব্লকের মধ্যেই ব্যাপক তত্পরতা শুরু করেছে। ২৪ অক্টোবর চীনের প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াপাও’র সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। থাইল্যান্ডের পর্যটন শহর চা-অ্যাম হুয়া হিনে আয়োজিত আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে তারা এ আলোচনা করেন। ডুসিথ থানি হোটেলে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠককালে বিষয়টি আলোচনায় এলেও চীনা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে বাঁধ নির্মাণ করা না করার বিষয়ে কোনো আশ্বাস পাওয়া যায়নি। ভারত এখনও আপ্রাণ চেষ্টা করছে এই প্রকল্প বন্ধ বা স্থগিত করতে বেইজিংকে রাজি করাতে।
দু’দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধান না হলে নয়াদিল্লি বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘে যাবে। সেক্ষেত্রে ভারতের পাশাপাশি ভাটির দেশ বাংলাদেশের সমর্থনও জরুরি। বিষয়টি মাথায় নিয়েই এগুচ্ছে নয়াদিল্লি।
সূত্র জানায়, নয়াদিল্লি বিষয়টি নিয়ে এর মধ্যেই ঢাকার সঙ্গে আলোচনা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের সঙ্গে জাতিসংঘে যাওয়ার ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দেয়া হয়নি। কারণ, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রবহমান অনেক নদীতে এর মধ্যেই ভারত বাঁধ দিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা মরুকরণের দিকে এগুচ্ছে। এরপর আবার বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে নানাভাবে বিপন্ন করার জন্য মনিপুরের টিপাইমুখে বাঁধ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই বাঁধ নির্মিত হলে উপরোল্লিখিত অঞ্চলের কমপক্ষে তিন কোটি মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভয়াবহ ভূমিকম্প ঝুঁকির মুখে পড়বে বৃহত্তর সিলেটসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল। বাংলাদেশের জনগণ এই বাঁধ নির্মাণ উদ্যোগের প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। এখন নিজেরা বিপদের সম্মুখীন হওয়ায় নয়াদিল্লি ঢাকার কাছে সহযোগিতার জন্য ধরনা দিচ্ছে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম নদ ব্রহ্মপুত্র। চীন, ভারত, বাংলাদেশ—এই তিন দেশের মধ্য দিয়ে নদটি প্রবাহিত। চীনের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ব্রহ্মপুত্রের ২ হাজার ৯শ’ কিলোমিটার জলরাশির মৃত্যুপরোয়ানাই সই হবে। আন্তর্জাতিক এই নদী চীনে ‘ইয়ারলুং সাংপো’, ভারতে ব্রহ্মপুত্র এবং বাংলাদেশে যমুনা নামে পরিচিত। চীন নদীর উত্সমুখ ‘ইয়ারলুং সাংপো’ নদীতে ওই বাঁধ দেয়ার এই প্রকল্প গ্রহণের পর ভারতে এ নিয়ে হৈচৈ পড়ে গেছে। ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা এর ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে এর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলছেন। এ নিয়ে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা বিশাল নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। নিবন্ধে চীনের এই একতরফা উদ্যোগের সমালোচনার পাশাপাশি ভারতেরও সমালোচনা করা হয়েছে। আনন্দবাজার পত্রিকা বলেছে, ‘আন্তর্জাতিক নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি রাজনীতিতে ভারতও সিদ্ধহস্ত। কখনও ফারাক্কায় বাঁধ দিয়ে পদ্মায় পানিপ্রবাহ রুদ্ধ করেছে ভারত, আবার কখনও ঝিলামে ‘বাগলিহার’ আর শতদ্রুতে ‘ভাকরা নাঙ্গাল’ তৈরি করে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশকে মরুভূমি বানিয়েছে ভারত। বড় বাঁধের রাজনীতিই এখন দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।’
ভারত বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘে গেলে বাংলাদেশের সহযোগিতা চাইতে পারে—এ বিষয় ঢাকার করণীয় নিয়ে পানি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী আ ন হ আকতার হোসেন বলেন, ভারত তো এই আচরণ দীর্ঘদিন থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে করে আসছে। চুক্তি অনুযায়ী ফারাক্কা বাঁধ থেকে বাংলাদেশের এখন ৫৫ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার কথা। কিন্তু দেয়া হচ্ছে মাত্র ২৫ হাজার কিউসেক। বাংলাদেশেরও তো ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়া উচিত। তিনি বলেন, আবদুর রাজ্জাক সাহেবরা তো টিপাইমুখ বাঁধের পক্ষে অনেক কথা বলেছেন। এখন তারা কী বলবেন?
ভারতের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট পানি বণ্টন চুক্তি চায় ঢাকা। কারণ এই নদীর পানিপ্রবাহ প্রতি বছর কমে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর। শেখ হাসিনার সফরসূচি ঘোষণার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু চুক্তির বিষয়ে ভারতের কাছ থেকে আশাব্যঞ্জক কোনো আশ্বাস পাওয়া যায়নি।
তিস্তার উত্পত্তি তিব্বতে। সেখান থেকে আসা দুটি ধারা উত্তর সিকিমে মিশে তিস্তা নাম নিয়েছে। তারপরে তা ভারতের কিছু অংশ অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ভারতে আসা তিস্তার জলপ্রবাহও লক্ষণীয়ভাবে কমে গেছে। কূটনৈতিক সূত্র জানায়, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের কাছে ভারত হস্তান্তর করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে পৃথক একটি যৌথ নদী কমিশনেরও প্রস্তাব দিয়েছে নয়াদিল্লি। প্রস্তাব অনুযায়ী এই কমিশনের কাজ হবে বিভিন্ন দেশের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা নদীগুলোর পানি বণ্টন নিয়ে সমস্যা মেটানো।
বস্তুত আন্তর্জাতিক এই নদী কমিশনের প্রস্তাব এই প্রথম বাংলাদেশকে দিচ্ছে ভারত। এই উপমহাদেশের মধ্যে প্রবাহিত অনেক নদীর প্রকৃত উত্স চীনের তিব্বতে। নানা কারণে সেখান থেকে আসা পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে। কিন্তু পানি বণ্টন নিয়ে পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হচ্ছে নিম্ন অববাহিকার দেশগুলোর মধ্যে। ভারত চায়, নতুন এই আন্তর্জাতিক নদী কমিশন একদিকে যেমন এই ধরনের নদীগুলোর জলপ্রবাহের হিসাব রাখবে, তেমনই পানির পরিমাণ কমে যাওয়া নিয়ে একযোগে চীনের সঙ্গে দরবার করবে।
ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নয়াদিল্লি বিষয়টি নিয়ে অনেকবারই বেইজিংয়ের দ্বারস্থ হয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণের সুবিধার জন্য চীন ব্রহ্মপুত্রসহ কয়েকটি নদীর উেসর পানি প্রবাহের হিসাব নিয়মিত দিল্লিতে পাঠাতেও রাজি হয়েছে। কিন্তু এই পর্যন্তই। পানির প্রবাহ বাড়ানোর বিষয়ে কোনোদিনই তেমন কর্ণপাত করেনি চীন। ভারত মনে করে, তিন-চারটি দেশ একযোগে সরব হলে বেইজিংও বিষয়টি নিয়ে তত্পর হতে বাধ্য। দিল্লির আশা, সঙ্কট যখন তীব্র, এমন একটি গঠনমূলক প্রস্তাব ঢাকা নিশ্চয়ই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে দেখবে।
এদিকে ব্রহ্মপুত্রের উত্স চীনের ‘ইয়ারলুং সাংপো’র মুখে বাঁধ ঠেকাতে ঢাকার সমর্থন চাচ্ছে দিল্লি। এই সমর্থনের আশায় ভারত টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ বিষয়ে ‘ধীরে চলা নীতি’ও নিয়েছে।
চীন ইয়ারলুং সাংপো নদীতে বাঁধ দিয়ে প্রায় ৪০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুত্ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন একতরফাভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে ভাটির দেশ বাংলাদেশ ও ভারত সর্বনাশের মুখে পড়বে। বাংলাদেশে যমুনা ও ভারতে ব্রহ্মপুত্র মরে যাবে। জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হতে পারে। চীন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করলেও ভারতের আসাম সরকার দাবি করেছে যে, বেইজিং এরই মধ্যে বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু করেছে। তারা গত বছরের ১৬ মার্চ এই প্রকল্পটি অনুমোদন এবং ২ এপ্রিল নির্মাণ কাজ শুরু করেছে। এই বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করার জন্য সাউথ ব্লকের মধ্যেই ব্যাপক তত্পরতা শুরু করেছে। ২৪ অক্টোবর চীনের প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াপাও’র সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। থাইল্যান্ডের পর্যটন শহর চা-অ্যাম হুয়া হিনে আয়োজিত আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে তারা এ আলোচনা করেন। ডুসিথ থানি হোটেলে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠককালে বিষয়টি আলোচনায় এলেও চীনা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে বাঁধ নির্মাণ করা না করার বিষয়ে কোনো আশ্বাস পাওয়া যায়নি। ভারত এখনও আপ্রাণ চেষ্টা করছে এই প্রকল্প বন্ধ বা স্থগিত করতে বেইজিংকে রাজি করাতে।
দু’দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধান না হলে নয়াদিল্লি বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘে যাবে। সেক্ষেত্রে ভারতের পাশাপাশি ভাটির দেশ বাংলাদেশের সমর্থনও জরুরি। বিষয়টি মাথায় নিয়েই এগুচ্ছে নয়াদিল্লি।
সূত্র জানায়, নয়াদিল্লি বিষয়টি নিয়ে এর মধ্যেই ঢাকার সঙ্গে আলোচনা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের সঙ্গে জাতিসংঘে যাওয়ার ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দেয়া হয়নি। কারণ, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রবহমান অনেক নদীতে এর মধ্যেই ভারত বাঁধ দিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা মরুকরণের দিকে এগুচ্ছে। এরপর আবার বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে নানাভাবে বিপন্ন করার জন্য মনিপুরের টিপাইমুখে বাঁধ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই বাঁধ নির্মিত হলে উপরোল্লিখিত অঞ্চলের কমপক্ষে তিন কোটি মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভয়াবহ ভূমিকম্প ঝুঁকির মুখে পড়বে বৃহত্তর সিলেটসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল। বাংলাদেশের জনগণ এই বাঁধ নির্মাণ উদ্যোগের প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। এখন নিজেরা বিপদের সম্মুখীন হওয়ায় নয়াদিল্লি ঢাকার কাছে সহযোগিতার জন্য ধরনা দিচ্ছে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম নদ ব্রহ্মপুত্র। চীন, ভারত, বাংলাদেশ—এই তিন দেশের মধ্য দিয়ে নদটি প্রবাহিত। চীনের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ব্রহ্মপুত্রের ২ হাজার ৯শ’ কিলোমিটার জলরাশির মৃত্যুপরোয়ানাই সই হবে। আন্তর্জাতিক এই নদী চীনে ‘ইয়ারলুং সাংপো’, ভারতে ব্রহ্মপুত্র এবং বাংলাদেশে যমুনা নামে পরিচিত। চীন নদীর উত্সমুখ ‘ইয়ারলুং সাংপো’ নদীতে ওই বাঁধ দেয়ার এই প্রকল্প গ্রহণের পর ভারতে এ নিয়ে হৈচৈ পড়ে গেছে। ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা এর ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে এর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলছেন। এ নিয়ে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা বিশাল নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। নিবন্ধে চীনের এই একতরফা উদ্যোগের সমালোচনার পাশাপাশি ভারতেরও সমালোচনা করা হয়েছে। আনন্দবাজার পত্রিকা বলেছে, ‘আন্তর্জাতিক নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি রাজনীতিতে ভারতও সিদ্ধহস্ত। কখনও ফারাক্কায় বাঁধ দিয়ে পদ্মায় পানিপ্রবাহ রুদ্ধ করেছে ভারত, আবার কখনও ঝিলামে ‘বাগলিহার’ আর শতদ্রুতে ‘ভাকরা নাঙ্গাল’ তৈরি করে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশকে মরুভূমি বানিয়েছে ভারত। বড় বাঁধের রাজনীতিই এখন দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।’
ভারত বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘে গেলে বাংলাদেশের সহযোগিতা চাইতে পারে—এ বিষয় ঢাকার করণীয় নিয়ে পানি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী আ ন হ আকতার হোসেন বলেন, ভারত তো এই আচরণ দীর্ঘদিন থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে করে আসছে। চুক্তি অনুযায়ী ফারাক্কা বাঁধ থেকে বাংলাদেশের এখন ৫৫ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার কথা। কিন্তু দেয়া হচ্ছে মাত্র ২৫ হাজার কিউসেক। বাংলাদেশেরও তো ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়া উচিত। তিনি বলেন, আবদুর রাজ্জাক সাহেবরা তো টিপাইমুখ বাঁধের পক্ষে অনেক কথা বলেছেন। এখন তারা কী বলবেন?
-
প্রথম পাতা


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


