Amardesh
আজঃ ঢাকা, মঙ্গলবার ১২ জানুয়ারি ২০১০, ২৯ পৌষ ১৪১৬, ২৫ মহররম ১৪৩১     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

গ্যাস সেক্টরে সোয়া তিন বছরে অর্জন শূন্য

এম আবদুল্লাহ
দেশের গ্যাস সেক্টরে বিগত সোয়া তিন বছরে কোনো অর্জন নেই। নতুন কোনো কূপ খনন করার উদ্যোগ নেয়া হয়নি এ সময়ে। চলেনি গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম। কথার ফুলঝুরি ছাড়া এ খাতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বিগত তত্ত্বাবধায়ক ও বর্তমান মহাজোট সরকার। তিনটি গ্যাসক্ষেত্রে উত্পাদন আগের তুলনায় কমে গেছে।
২০০৬ সালের অক্টোবরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার বিদায় নেয়ার পর তিন বছর তিন মাস অতিক্রান্ত হতে চলেছে। এখনও গ্যাস সঙ্কটের জন্য দোষ চাপানো হচ্ছে সেই জোট সরকারের ওপর। অথচ চারদলীয় জোট সরকার গ্যাস উত্পাদন বাড়াতে ব্যাপক অবদান রেখে গেছে। দৈনিক ১০৫ কোটি ঘনফুট উত্পাদন নিয়ে ২০০১ সালে যাত্রা শুরু করে খালেদা জিয়ার সরকার। ২০০৬ সাল পর্যন্ত গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে বর্তমানে প্রায় দ্বিগুণ ১৯৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্পাদন হচ্ছে। বিবিয়ানা থেকে ৬৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ায় মোট উত্পাদন ২০০ কোটি ঘনফুট অতিক্রম করার কথা থাকলেও অন্য ক্ষেত্রগুলোতে জোট সরকারের সময়ের তুলনায় উত্পাদন কমে যাওয়ায় তা হচ্ছে না। বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ২৩০ কোটি ঘনফুটের বেশি। গত এক মাসে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১৯৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে পেট্রোবাংলা। এরমধ্যে বিদ্যুতে দেয়া হচ্ছে ৬৬ কোটি ঘনফুট। সার কারখানায় ২৪ কোটি এবং আবাসিক শিল্প, সিএনজিসহ অন্য গ্রাহকদের ১০৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেয়া হচ্ছে। জানা যায়, প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ হারে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। উত্পাদন না বাড়ায় সবক্ষেত্রেই দেখা দিয়েছে গ্যাস সঙ্কট।
তিন বছরের ব্যর্থতার খেসারত দিতে হচ্ছে এখন গোটা দেশকে। ভয়াবহ সঙ্কটে পড়েছেন শিল্প, বাণিজ্য ও আবাসিক গ্রাহকরা। নজিরবিহীনভাবে সবরকম নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ রাখা সত্ত্বেও পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুত্ খাতে গ্যাসের সরবরাহ কমিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে পেট্রোবাংলা। এমনিতে গ্যাসের অভাবে প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ কম উত্পাদন হচ্ছে। গ্যাসের অভাবে শিল্প উত্পাদনে ধস নেমেছে। সংযোগ না পেয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে হাজার কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ। আবাসিক গ্রাহকরা অতীতে কখনও এতটা তীব্র গ্যাস সঙ্কটের কবলে পড়েননি। চুলা জ্বলছে না দিন-রাতের বেশিরভাগ সময়। রান্নাবান্না বিঘ্নিত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। গ্যাস সঙ্কটে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন রাজধানী ঢাকার অধিকাংশ এলাকার মানুষ।
পরিকল্পনা আছে বাস্তবায়ন নেই : বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার ১০ মাসের মাথায় গ্যাস উত্পাদন বাড়ানোর জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের কথা ঘোষণা করে পেট্রোবাংলা। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ১০ কোটি ঘনফুট উত্পাদন বাড়ার কথা ছিল। এক্ষেত্রে বাখরাবাদ গ্যাসফিল্ডে নতুন দুটি কূপ চালুর মাধ্যমে ২ কোটি, তিতাসের ১৪ নম্বর কূপ থেকে আড়াই কোটি, মেঘনা-১ থেকে দেড় কোটি ও নাইকো পরিচালিত ফেনী ক্ষেত্র থেকে চার কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্পাদন বাড়ানোর কথা। বাস্তবে তিতাস থেকে মাত্র দেড় কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়েছে। তিতাসের এই নতুন কূপটিও খননের উদ্যোগ নিয়েছিল বিগত জোট সরকার।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে অন্তত ১২টি নতুন কূপ থেকে দৈনিক ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের কথা বলা হয়েছে। আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে লিজের প্রক্রিয়াধীন সমুদ্রবক্ষের ক্ষেত্রগুলোসহ অন্যান্য ক্ষেত্র থেকে ১শ’ কোটি ঘনফুট গ্যাসের উত্পাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা জানানো হয়েছে সম্প্রতি পেট্রোবাংলার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে।
পেট্রোবাংলা আশার বাণী শুনিয়ে বলছে, গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উত্পাদন বাড়ানোর যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে তাতে ২০১২-১৩ সালে প্রতিদিন গ্যাস উত্পাদন হবে ৩১৫ থেকে ৩১৬ কোটি ঘনফুট। তখনকার চাহিদা নিরূপণ করা হয়েছে ২৯৭ কোটি ঘনফুটের মতো। ফলে তখন ১৮-১৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস তখন উদ্বৃত্ত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য-পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত তিন বছরে গ্যাসের উত্পাদন বেড়েছে প্রায় ৬৭ কোটি ঘনফুট। এর প্রায় পুরোটাই এসেছে মার্কিন তেল কোম্পানি শেভরন পরিচালনাধীন বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে। এই গ্যাস উত্পাদনে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা বর্তমান মহাজোট সরকারের কোনো অবদান নেই। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার তত্কালীন ইউনোকলের মাধ্যমে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের পদক্ষেপ নেয়। পরে ইউনোকল তাদের সব সম্পদ শেভরনের কাছে বিক্রি করে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে চলে যায়।
পেট্রোবাংলার গ্যাস উত্পাদন সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিগত জোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময় ২০০১-০২ অর্থবছরে গ্যাসের দৈনিক গড় উত্পাদন ছিল ১০৫ কোটি ঘনফুট। ওই সরকার ক্রমাগতভাবে গ্যাসের উত্পাদন বাড়িয়ে বিদায়ী অর্থবছর ২০০৬-০৭-এ উন্নীত করে গেছে ১৫৫ কোটি ঘনফুটে। অর্থাত্ ৫ বছরে জোট সরকার গ্যাসের উত্পাদন ৫০ কোটি ঘনফুট বাড়াতে সক্ষম হয়েছিল। শুধু তাই নয়, সাবেক ইউনোকল ও বর্তমানে শেভরনের মালিকানাধীন বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন এবং কূপ খননের সিংহভাগ কাজ সম্পন্ন হয় জোট সরকারের সময়েই। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর জোট সরকার বিদায় নেয়ার মাত্র চার মাসের মাথায় বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র উত্পাদনে যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের উত্পাদন উদ্বোধন করেন। এ ফিল্ড থেকে এখন দৈনিক ৬৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্পাদিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা স্বীকার করেছেন, জোট সরকার সময়োপযোগী পদক্ষেপ না নিলে এখন বিবিয়ানা থেকে মোট উত্পাদনের এক-তৃতীয়াংশ গ্যাস পাওয়া যেত না।
গ্যাস উত্পাদন বৃদ্ধির পূর্বশর্ত হচ্ছে কূপ খনন। ২০০১ জোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময় যেখানে উত্পাদনশীল কূপের সংখ্যা ছিল ৬২টি, সেখানে এখন উত্পাদনরত কূপের সংখ্যা ৭৯। শুধু বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ডেই ১২ কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। তিন বছরে নতুন কোনো কূপ খননের পদক্ষেপ তো নেয়াই হয়নি; বরং ৪টি পুরনো কূপ উত্পাদন ক্ষমতা হারিয়েছে।
তিন গ্যাসক্ষেত্রে উত্পাদন হ্রাস : তিন বছরের ব্যবধানে সালদা নদী, সাংগু ও মৌলভীবাজার গ্যাসফিল্ডে উত্পাদন কমে গেছে। সালদা নদী গ্যাসক্ষেত্রে দৈনিক উত্পাদন ছিল ১ কোটি ৬ লাখ ঘনফুট। এখন সেখান থেকে উত্পাদন হচ্ছে ৮১ লাখ ঘনফুট। একইভাবে সাংগু গ্যাসক্ষেত্রে দৈনিক উত্পাদন ছিল ৬ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট। ৩ কোটি ঘনফুটের বেশি হ্রাস পেয়ে এখন সেখান থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৩ কোটি ৪৬ লাখ ঘনফুট। মৌলভীবাজার গ্যাসফিল্ড থেকে এক বছর আগেও পাওয়া যাচ্ছিল দৈনিক ৮ কোটি ঘনফুট। এখন সেখানে দৈনিক উত্পাদনের পরিমাণ নেমে গেছে ৫ কোটি ঘনফুটে।
গত এক বছরে গ্যাস খাতের উন্নয়নে ব্যর্থতার কারণ জানতে পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?