Amardesh
আজঃ ঢাকা, মঙ্গলবার ১২ জানুয়ারি ২০১০, ২৯ পৌষ ১৪১৬, ২৫ মহররম ১৪৩১     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

হাসিনা-মনমোহন বৈঠকে আশ্বাসের ফুলঝুরি : তিন চুক্তি দুই এমওইউ স্বাক্ষর : আশুগঞ্জ বন্দর দিয়ে স্থায়ী ট্রানজিট চেয়েছে ভারত

বশীর আহমেদ, নয়াদিল্লি থেকে
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আনুষ্ঠানিক বৈঠকে উভয় দেশ প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়িয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বহুল প্রত্যাশিত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি, সমুদ্রসীমা ও সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি কিংবা পণ্যের অবাধ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে বিশাল বাণিজ্য বৈষম্য দূর করার কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ বা কার্যকর অগ্রগতি না হলেও আশ্বাস মিলেছে এসব বিষয়ে। ভারত এবার শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে আশুগঞ্জ দিয়ে স্থায়ী ট্রানজিট সুবিধা চেয়েছে। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি ভারত সফরকালে সাময়িক ট্রানজিট সুবিধা প্রদানে বাংলাদেশের সম্মতির কথা জানিয়েছিলেন। বিবিসির গতরাতের সংবাদে বলা হয়েছে, এবার শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে আশুগঞ্জ দিয়ে ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন স্থানে পণ্য পরিবহনে স্থায়ী ট্রানজিট সুবিধা দাবি করেছে ভারত। বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, তিস্তার পানিসহ অন্যান্য নদীর পানিবণ্টন ইস্যুও আলোচনায় এসেছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে শিগগির এ নিয়ে যৌথ নদী কমিশন ও মন্ত্রীপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সমুদ্রসীমা বিরোধ নিয়ে তৃতীয় পক্ষের কাছে আরবিট্রেশনে ভারতের বিরুদ্ধে নালিশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে মনমোহন সিং দ্বিপাক্ষিকভাবে এ সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মাটি ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ব্যবহার করতে না দেয়া, কানেকটিভিটির নামে আশুগঞ্জ দিয়ে ভারতকে পোর্ট অব কল সুবিধা দিয়ে পণ্য ট্রানজিটের সুযোগ প্রদান, দু’দেশের মধ্যে রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণসহ নানা বিষয়ে সহযোগিতার ব্যাপারে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেছেন। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য ভারত প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের ৫০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়ার যে প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ তা বাড়ানোর দাবি করলে ভারত সেটা বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে। রেল ট্রানজিট সুবিধা নিতে ভারত এ বিষয়ে খুবই আগ্রহী বলে জানা গেছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে ১০১টি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দাবি করা হলে ভারত ৪৭টি পণ্যের ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং আবারও আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, টিপাইমুখ বাঁধের ব্যাপারে ভারত এমন কিছু করবে না যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়। তিনি জানান, শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে বলেছেন, সন্ত্রাস দমনে দুই দেশ একযোগে কাজ করবে। দুই দেশের জনগণের কল্যাণে বাংলাদেশ কাজ করে যাবে। সন্ত্রাসমুক্ত দক্ষিন এশিয়া গড়তে এবং সন্ত্রাস দমনে ভারতের সঙ্গে একযোগে কাজ করবে বাংলাদেশ। তিনি জানান, দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে প্রায় দেড় ঘণ্টা স্থায়ী বৈঠক হৃদ্যতাপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভারতীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৫টা থেকে ৭টা পর্যন্ত হায়দরাবাদ ভবনে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রায় দেড় ঘণ্টার আনুষ্ঠানিক বৈঠক শেষে দু’দেশের মধ্যে অপরাধ সংক্রান্ত বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা, দণ্ডাদেশ পাওয়া অপরাধীদের হস্তান্তর এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও অবৈধ মাদক পাচার রোধ সংক্রান্ত পূর্বনির্ধারিত তিনটি চুক্তি এবং বিদ্যুত্ বিনিময় ও বিদ্যুত্ খাতে যৌথ বিনিয়োগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময় সংক্রান্ত দুটি সমঝোতা স্মারক দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সহায়তা করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, পানিসম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন, প্রধানমন্ত্রীর তিন উপদেষ্টা এইচ.টি ইমাম, ড. মশিউর রহমান ও গওহর রিজভী, পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েস প্রমুখ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে সহায়তা করেন অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি. চিদাম্বরাম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস.এম কৃষ্ণা, রেলমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা রাও।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের দেয়া ভোজসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, বাংলাদেশের মাটি প্রতিবেশী ও বিশ্বের কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। দারিদ্র্যমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ দক্ষিণ এশিয়া গঠনের অঙ্গীকার ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দিল্লি সফর শুরু করেন। এছাড়া তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেছেন, এ সফরে দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি করা হবে না। অপরদিকে দিল্লির নেতারাও বলেছেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্রের যে অভিযাত্রা শুরু হয়েছে, তাতে দু’দেশের সম্পর্ক স্থাপনে নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। দু’দেশেই সমমনা সরকার ক্ষমতায় থাকার ফলে বন্ধুত্বের যে সেতু সৃষ্টি হয়েছে, তাতে পারস্পরিক সহযোগিতা ও আঞ্চলিক শান্তি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে দীর্ঘপথ এগিয়ে যাওয়া যাবে।
এর আগে রাষ্ট্রপতি ভবনে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা শেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ভারতের অকৃত্রিম বন্ধু। মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা আমাদের শরণার্থীদের শুধু আশ্রয়ই দেয়নি, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি সহায়তা করেছে। পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা একটি শান্তিপূর্ণ, দারিদ্র্যমুক্ত দক্ষিণ এশিয়া গড়ে তুলতে চাই।
নয়াদিল্লিতে গতকাল সারাদিন ব্যস্ত সময় কাটান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নয়াদিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সূচনা হয়। তিনি রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর সমাধিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। দুপুরে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিলের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ভবনে দেখা করেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়াও গতকাল তার সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসএম কৃষ্ণ, অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি এবং বিরোধীদলীয় নেতা সুষমা স্বরাজ তার হোটেল স্যুটে সাক্ষাত্ করেন। বিকাল সাড়ে ৪টায় ১০ নম্বর জনপথে ক্ষমতাসীন জোট ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্সের (ইউপিএ) চেয়ারপার্সন ও কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্ করেন তিনি। বিকাল সাড়ে পাঁচটায় নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে শুরু হয় বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। বৈঠকে যোগ দেন শেখ হাসিনা ও ড. মনমোহন সিং। এর আগে দুই নেতা ১৫ মিনিট একান্তে কথা বলেন। ঐতিহাসিক বৈঠকের পরই সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে দু’দেশের মধ্যে ৩টি চুক্তি ও দুটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এরপর রাত সোয়া ৮টায় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দেয়া নৈশভোজে অংশ নেন শেখ হাসিনা। আজ সকালে ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইন্দিরা গান্ধী শান্তিপদক গ্রহণ করবেন। দুপুরে ভারতীয়দের ব্যবসায়ীদের দেয়া মধ্যাহ্নভোজে যোগদান ও তাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করবেন। রাতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে নৈশভোজে অংশ নেবেন। আগামীকাল জয়পুর হয়ে আজমীর শরীফে খাজা মইনুদ্দিন চিশতির (রহঃ) মাজার জিয়ারত শেষে প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা ফিরে আসার কর্মসূচি রয়েছে।
জানা গেছে, আজ না হলেও আগামীকাল শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রাক্কালে দুই দেশের যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হতে পারে। এতে শীর্ষ পর্যায়সহ বিভিন্ন পর্যায়ে দু’দেশের মধ্যে সম্মত বিষয়গুলো স্থান পাবে।
প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে ভারতের শীর্ষস্থানীয় ৩টি পত্রিকা বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে গতকাল। ইংরেজি পত্রিকা দ্য হিন্দু, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া ও দ্য ডিপ্লোম্যাট এই ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে।
যে চুক্তিগুলো সই হলো : গতকাল ড. মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে শেখ হাসিনার বৈঠকের পর দু’দেশের মধ্যে অপরাধ বিষয়ক ৩টি চুক্তি এবং বিদ্যুত্ আমদানি, ঋণ সহায়তা ও দু’দেশের সংস্কৃতি বিনিময় বিষয়ক সমঝোতা স্মারক সই হয়। সন্ত্রাস দমনে তিন চুক্তি হলো, সাজাপ্রাপ্ত বন্দিবিনিময় চুক্তি, অপরাধ দমনে আইনি সহায়তা বিনিময় চুক্তি ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ, সংঘটিত অপরাধ ও অবৈধ মাদকদ্রব্য প্রতিরোধ চুক্তি। দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এসব চুক্তি সই হয়। ডিসেম্বরে দিল্লিতে স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের দশম বৈঠকে সাজাপ্রাপ্ত বন্দিবিনিময় চুক্তিসহ তিন চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। নয়াদিল্লিতে ওই বৈঠকে সন্ত্রাস ও নিরাপত্তা ইস্যুতে তিনটি চুক্তির খসড়া পর্যালোচনার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। এর আগে সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ-ভারত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠকে এ তিন চুক্তি সইয়ে দু’দেশ সম্মতি জানিয়েছিল। সাজাপ্রাপ্ত বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় সাজাপ্রাপ্ত বন্দিরা নিজ নিজ দেশে সামাজিকভাবে পুনর্বাসনের সুযোগ পাবে। এর আওতায় ফৌজদারি অপরাধের কারণে দণ্ডিত ও সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা নিজ দেশে সাজা ভোগ করতে চাইলে তা ভোগ করার সুযোগ পাবে। দণ্ডপ্রাপ্ত নাগরিক নিজ দেশে ফেরার জন্য নিজে বা আইনগত প্রতিনিধির মাধ্যমে সরকারের কাছে বন্দি হিসেবে হস্তান্তর হতে আবেদন করতে পারবে। এ বন্দি হস্তান্তরের শর্ত হলো, আবেদনকারী মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হলে এ সুযোগ পাবে না। একই ধরনের চুক্তি তৃতীয় দেশের সঙ্গে থাকলে ভারত ও বাংলাদেশ ট্রানজিট সুবিধা দেবে বলে খসড়া চুক্তিতে বলা হয়েছে। এছাড়া অপর দুটো চুক্তি অপরাধ দমনে আইনি সহায়তা বিনিময় চুক্তি সার্কের অধীনে এরই মধ্যে সই করা একটি চুক্তি। এটি দু’দেশের মধ্যে কার্যকর করতে দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে সই হয়েছে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস প্রতিরোধ, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং অবৈধ মাদক পাচার রোধ চুক্তিও সার্কের অধীনে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর থাকা একটি প্রটোকলের দ্বিপক্ষীয় বাস্তবায়ন। তবে যৌথভাবে সন্ত্রাস দমনের কথা বলা হয়েছে এ চুক্তিতে। কোনো সন্ত্রাসী চক্র ও তাদের সহযোগীরা দু’দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালালে এবং রাষ্ট্রীয় সীমানা ব্যবহার করলে দু’দেশ সাধারণ ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করতে পারবে।
রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় শেখ হাসিনার আশ্বাস : আনুষ্ঠানিক বৈঠক শেষে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের দেয়া নৈশভোজ অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় বলেন, আমি আপনাদের নিশ্চয়তা দিতে পারি যে, বাংলাদেশ তার ভূখণ্ডে যে কোনো ধরনের সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। প্রতিবেশী বা বিশ্বের যে কোনো দেশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী তত্পরতা চালাতে বাংলাদেশ তার ভূমি ব্যবহার করতে দেবে না। তিনি আরও বলেন, আমি বিশ্বাস করি, কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে সহায়তা দু’দেশকেই সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমাদের টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় দু’দেশের অঙ্গীকার নিশ্চিত করতে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যাপক পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান নিয়ামক হছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা। কৃষিপ্রধান হিসেবে বাংলাদেশের সারা বছরই প্রয়োজনীয় পানির নিশ্চয়তা দরকার। গঙ্গার নিয়মিত প্রবাহ নিশ্চিত করতে ১৯৯৬ সালে দু’দেশ ৩০ বছর মেয়াদি ঐতিহাসিক পানিবণ্টন চুক্তি করেছিল। যেটা দু’দেশের সহযোগিতার সত্যিকারের চেতনা। এটা ধরে রেখেই আমরা তিস্তাসহ অন্যান্য যৌথ নদীর পানিবণ্টন নিয়ে সমঝোতায় আসতে চাই।
অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য কানেকটিভিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ অঞ্চলে উন্নত যোগাযোগ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন যুগের সূচনা করবে। যা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশকেই লাভবান করবে। আমাদের আলোচনা প্রকৃত অর্থেই খুব ফলপ্রসূ হয়েছে। এমনকি আমরা জ্বালানি, পর্যটনসহ অন্যান্য খাত নিয়েও কথা বলেছি। সীমান্ত ব্যবস্থাপনাসহ দীর্ঘদিন থেকে অমীমাংসিত অনেক ইস্যুতেই লক্ষণীয় অগ্রগতি হয়েছে। এছাড়াও যেসব চুক্তি সই এবং সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা অবশ্যই একটি তাত্পর্যপূর্ণ অর্জন। এটা দু’দেশের জনগণের জীবনযাত্রাতে ইতিবাচক ফল রাখবে। বাংলাদেশ ও ভারত শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক ধরে রাখছে। এ সহাবস্থানের নীতির ভিত্তি হলো মহাত্মা গান্ধী ও জওয়াহেরলাল নেহরুর আদর্শ। আমাদের পারস্পরিক শান্তির নীতির ভিত্তি হলো স্বাধীনতা, সত্ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ এবং একে অন্যের সার্বভৌমত্বের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। এই সম্পর্কের শিকড় প্রোথিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়।
শেখ হাসিনা বলেন, লাখো বাংলাদেশীর সঙ্গে ১৮ হাজার ভারতীয় সৈন্যের রক্তে আমাদের এই স্বাধীনতা এসেছে। দু’দেশ আঞ্চলিক সহযোগিতার বাইরেও নিজেদের মধ্যে বহুমাত্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের অধিকতর প্রবেশাধিকার নিয়ে ড. মনমোহন সিংয়ের সিদ্ধান্ত দু’দেশের মধ্যে এই সম্পর্কের একটি শক্তিশালী বন্ধনেরই বহিঃপ্রকাশ।
এখন দরকার সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলে বাণিজ্য বাড়ানো। এজন্য দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা অনিষ্পন্ন বিভিন্ন ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করতে হবে।
রাষ্ট্রপতি ভবনে হাসিনাকে সংবর্ধনা : সকাল ৯টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রপতি ভবনে স্বাগত জানান ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। তিনি প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের উপস্থিত মন্ত্রী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লালগালিচা শোভিত পথ দিয়ে হেঁটে যান সংবর্ধনা মঞ্চের দিকে। ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সুসজ্জিত অশ্বারোহী দল তাকে এসকর্ট করে নিয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রীকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভিজাত মাউন্টেইন ব্যাটালিয়নের একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার দেয়।
গার্ড অব অনার শেষে প্রধানমন্ত্রীকে ভারতীয় এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, আপনার এই সফরের মূল উদ্দেশ্য কি? জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান সমস্যা হচ্ছে দারিদ্র্য। আমরা এ অঞ্চল দারিদ্র্যমুক্ত এবং শান্তিপূর্ণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাই। বাংলাদেশ-ভারত যৌথ এবং ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে তা সম্ভব হবে বলে আমি আশাবাদী। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, আমি বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণের শুভেচ্ছা নিয়ে এসেছি। ভারত ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণকে ব্যাপক সহযোগিতা দেয়। বিশেষ করে স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আমার এ সফরের ফলে ভবিষ্যতে দু’দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদার হবে। প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রপতি ভবনে গার্ড অব অনার দেয়ার সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ওই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসএম কৃষ্ণ, অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জিসহ শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচটি ইমাম, ড. গওহর রিজভী, ড. মশিউর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ বিকালে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর দিনের বিভিন্ন কর্মসূচির বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, আনুষ্ঠানিক বৈঠকের আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে প্রায় ১৫ মিনিট একান্তে কথা বলেন। তিনি জানান, বৈঠক শেষে আজই (গতকাল)
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?