Amardesh
আজঃ ঢাকা, সোমবার ১১ জানুয়ারি ২০১০, ২৮ পৌষ ১৪১৬, ২৪ মহররম ১৪৩১     আপডেট সময়ঃ সময় : রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

চুক্তি লঙ্ঘন করে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করছে ভারত : ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত বাংলাদেশ : গঙ্গা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য চরম আত্মঘাতী : বিশেষজ্ঞ

এমএ নোমান
ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার ত্রিশ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির পর থেকে ফারাক্কা পয়েন্টে পানিপ্রবাহ কমিয়ে দিয়েছে ভারত। চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে এবং শর্তের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে শুকনো মৌসুমের ৫ মাসে ভারত গঙ্গা নদীর বেশিরভাগ পানিই চ্যানেলের মাধ্যমে একতরফাভাবে সরিয়ে হুগলি ও ভাগীরথি নদীতে নিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও ফারাক্কার উজানে ১৮টি চ্যানেল ও ছোট-বড় প্রায় তিনশ’টি খালের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার করে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ ও বিহারসহ অন্যান্য প্রদেশের মরু এলাকায় নিয়ে সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে সবুজের সমারোহ গড়ে তুলছে ভারত। ফলে বাংলাদেশ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। এ তথ্য জানিয়েছেন যৌথ নদী কমিশন ও ফারাক্কার পানিচুক্তি পর্যবেক্ষণে গঠিত বাংলাদেশ কারিগরি দলের সদস্যরা। তারা বলেন, ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহ কমে গেলে আলোচনার মাধ্যমে পানিবণ্টন ও নাব্য রক্ষার জন্য ভারত গঙ্গা নদী খনন করবে বলে চুক্তিতে বাধ্যবাধকতা থাকলেও গত ১৩ বছরে তা একবারও হয়নি। ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৫ মাসে ফারাক্কা পয়েন্টে যে পরিমাণ পানি থাকার কথা ছিল, তা থাকছে না। প্রতিবছরই তা কমে আসছে। ত্রিশ বছরমেয়াদি ফারাক্কা চুক্তিকে বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী ও চরম প্রবঞ্চনা হিসেবে উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ফারাক্কা পয়েন্টে যে পরিমাণ পানি আসবে, শুধু তা-ই ভাগাভাগি করে নেয়ার কথা বলা হয়েছে চুক্তিতে। ফারাক্কা পয়েন্টের উজানে ভারত বাঁধ দিয়ে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করতে পারবে না, এ ধরনের কোনো শর্ত চুক্তিতে নেই। ফলে ভারত চুক্তির এ দুর্বল দিকটা কাজে লাগিয়ে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় সব পানিই প্রত্যাহার করে নামমাত্র কিছু অংশ ফারাক্কা পয়েন্টে সরবরাহ করছে। অন্যান্য বছর ভারত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে এসে ফারাক্কায় পানির সরবরাহ কমিয়ে দিলেও এবছর ডিসেম্বর থেকেই কমানো শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা। তারা বলেন, গত ১৫ নভেম্বর মূল পয়েন্টে পানি ছিল ১১.৪২ মিটার, ১ ডিসেম্বর ১০.৮৮ মিটার এবং ১৫ ডিসেম্বর ছিল ১০.৭৭ মিটার। গত কয়েক দিনে তা আরও কমে ১০.৬০ মিটারে নেমে এসেছে। ফলে চলতি শুষ্ক মৌসুমে গত বছরের তুলনায় পানি প্রাপ্তি অর্ধেকে নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের হায়দরাবাদ হাউসে ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী এইচডি দেবগৌড়া ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩০ বছরমেয়াদি পানিচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তিতে ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত পাঁচ মাস পানিবণ্টনের সময়কাল ধরা হয়। জানুয়ারির প্রথম ১০ দিনের কিস্তিতে বাংলাদেশ চুক্তি অনুযায়ী ৬৭ হাজার ৫১৬ কিউসেক পানি পাওয়ার কথা। প্রতিবছর জানুয়ারির প্রথম কিস্তিতে ভারত বাংলাদেশকে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি দিলেও ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত তা কমিয়ে ৯ থেকে ১৫ হাজার কিউসেকে নিয়ে আসে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ওই সময়ে ভারত কম করে হলেও ৪০ হাজার কিউসেক পানি চ্যানেলের মাধ্যমে হুগলি ও ভাগিরথি নদীতে নিয়ে যায়। গঙ্গায় পানির প্রবাহ কমে গিয়ে সর্বনিম্ন যে পরিমাণ পানিই থাকুক না কেন, বাংলাদেশ ওই অবস্থায় সর্বনিম্ন ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাবে। আর যদি মোট পানির পরিমাণ ৩৫ হাজার কিউসেকের নিচে হয়, তাহলে উভয় দেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত পানি বিশেষজ্ঞরা আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে তা বণ্টন করে নেবে। পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্য এপ্রিল পর্যন্তই গঙ্গায় পানিপ্রবাহ কমে আসে। ১৯৯৬ সালে চুক্তির আগে কোনো বছরই শুকনো মৌসুমে পানির পরিমাণ ৫৫ হাজার কিউসেকের নিচে আসেনি। কিন্তু চুক্তির পরের বছরই এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে পানির পরিমাণ কমে মাত্র ৯ হাজার কিউসেকে নেমে আসে। এ ধরনের পরিস্থিতি প্রায় বছরই হচ্ছে। চুক্তির শর্তের কথা উল্লেখ করে প্রতিবছরই ভারতকে আলোচনায় বসার জন্য অনুরোধ করা হলেও ভারত একবারের জন্যও বৈঠকে বসতে রাজি হয়নি বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছর দু’দেশের পর্যবেক্ষণ দল হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে পদ্মায় পর্যবেক্ষণ করেছে। এবছর বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড উত্তরাঞ্চলীয় হাইড্রোলজি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ কবিরুল ইসলাম এবং ভারতের দু’সদস্যবিশিষ্ট দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রকৌশলী শ্যাম নারায়ণ সিং। পানির প্রাপ্যতা সম্পর্কে আমার দেশকে মোঃ কবিরুল ইসলাম জানান, চুক্তি অনুযায়ী আমরা অর্ধেক পানি পাচ্ছি। পয়েন্টে যে পরিমাণ পানি থাকবে, শুধু তা-ই ভাগাভাগি হবে। এখন পয়েন্টে যদি এক লাখ কিউসেক থাকে, তবে সেটুকুই হারাহারিভাবে ভাগ হবে। আর যদি এক হাজার কিউসেক থাকে, সেটাও হারাহারিভাবে ভাগ হবে। এখন ফারাক্কা পয়েন্টেই আমাদের পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
ফারাক্কার ইতিবৃত্ত : ফারাক্কার পানিচুক্তি ও এর ইতিবৃত্ত বর্ণনা করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা জানান, শুষ্ক মৌসুমে হুগলি ও ভাগিরথি নদী শুকিয়ে গিয়ে কলকাতা বন্দর মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ায় ফারাক্কায় এক মাইল লম্বা একটি ব্যারাজ নির্মাণ করে গঙ্গার পানি সেখানে নেয়ার পরিকল্পনা নেয় ভারত। ১৯৬২ সালে এ ব্যারাজের নির্মাণ কাজ শুরু করে তারা। আন্তর্জাতিক নদীশাসন আইনের বিধান লঙ্ঘন করে ভারত ওই বাঁধ নির্মাণ করায় ১৯৬৮ সালে তত্কালীন পাকিস্তান সরকার এর বিরুদ্ধে জাতিসংঘে আপত্তি পেশ করে। জাতিসংঘে পাকিস্তানের ওই আপত্তির ওপর আলোচনা শেষে ভারত ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত ফারাক্কা ব্যারাজের নির্মাণ কাজ স্থগিত রাখবে বলে অঙ্গীকার করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারত পুনরায় ফারাক্কা ব্যারাজের নির্মাণ কাজ শুরু করে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে আপত্তি দেয়া হলে ভারতের আগ্রহে ১৯৭২ সালে দু’দেশের মধ্যে পানি সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে পানি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে যৌথ নদী কমিশন গঠন করা হয়। যৌথ নদী কমিশন ও বাংলাদেশ সরকারের অজ্ঞাতসারেই ভারত ফারাক্কা ব্যারাজের নির্মাণ কাজ শেষ করে। ভারত মাত্র ৪০ দিনের জন্য ফারাক্কা ব্যারাজ চালু করে ৪০ হাজার কিউসেক পানি হুগলি নদীতে নেয়ার জন্য বাংলাদেশের অনুমতি চায়। ১৯৭৪ সালের ৩০ মে বাংলাদেশের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে গঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর ব্যাপারে প্রথম চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৪০ দিনের জন্য পরীক্ষামূলক ফারাক্কা ব্যারাজের ফিডার ক্যানেল চালু করার অনুমতি দেয়া হয় ভারতকে। ফারাক্কা ব্যারাজকে বাংলাদেশের জন্য মরণ ফাঁদ উল্লেখ করে ওই সময়ই মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ফারাক্কা অভিমুখে ঐতিহাসিক লংমার্চ করেন। চল্লিশ দিনের কথা বলে চুক্তি করে ভারত ওই ব্যারাজ বন্ধ না করায় শেখ মুজিব সরকার লিখিতভাবে ভারতের কাছে প্রতিবাদ করে। ওই প্রতিবাদের মাত্র কয়েক দিনের মাথায় শেখ মুজিব নিহত হন। শেখ মুজিব মারা যাওয়ার পর ভারত শুষ্ক মৌসুমে একতরফাভাবে গঙ্গার প্রায় সব পানিই প্রত্যাহার করে নেয়। ১৯৭৭ সালে ফের যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ফারাক্কার মাধ্যমে পানি প্রত্যাহারের আপত্তি করে এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে বিষয়টি উত্থাপন করে। এরশাদ সরকারের আমলে ১৯৮২ ও ১৯৮৫ সালে দু’বার অন্তবর্তীকালীন চুক্তি হয়। ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের বৃহত্তর রাজশাহীসহ কয়েকটি জেলায় মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় ও কৃষিসহ চাষাবাদ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ সরকার পুনরায় ফারাক্কা ইস্যুটি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন ও কমনওয়েলথ হেড অব গভর্নমেন্ট কনফারেন্স এবং সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে উত্থাপন করে বিশ্বব্যাপী জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করে। আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটিসহ বিভিন্ন সংস্থা বিশ্বের পরিবেশ সংগঠনগুলোর দ্বারস্থ হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই ভারতের সঙ্গে ত্রিশ বছরমেয়াদি একটি আত্মঘাতী চুক্তি করে।
আত্মঘাতীর ফারাক্কা চুক্তি : ফারাক্কা চুক্তিকে বাংলাদেশের জন্য চরম আত্মঘাতী হিসেবে উল্লেখ করে সাবেক সচিব ও বিশিষ্ট পানিবিশেষজ্ঞ ড. আনহ আখতার হোসেন আমার দেশকে বলেন, চুক্তিতে বলা হয়েছে যে, ফারাক্কা পয়েন্টে যে পরিমাণ পানি থাকবে তা-ই দু’দেশ ভাগ করে নেবে। কিন্তু ভারত ফারাক্কা ব্যারাজের উজানে আর কোনো বাঁধ দিতে পারবে না—এমন কোনো শর্ত চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়নি। চুক্তির এ দুর্বলতার সুযোগে ভারত ফারাক্কা ব্যারাজের সামান্য উজান থেকে শুরু করে গঙ্গার উত্সমুখ পর্যন্ত ত্রিশটির মতো ব্যারাজ নির্মাণ করেছে। এছাড়াও তারা প্রায় তিনশ’ ক্যানেলের মাধ্যমে জলাধার খনন করে তাদের মরু এলাকায় পানি নিয়ে যাচ্ছে। এখন তারা বাংলাদেশকে যতটুকু পানি ইচ্ছা, ততটুকুই দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক নদী আইন বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, ফারাক্কা চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের পানি প্রাপ্যতা নিশ্চিত হয়নি। বরং বাংলাদেশকে পানি না দেয়ার ব্যাপারে ভারতের অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। পৃথিবীর যেখানেই দু’দেশের মধ্যে কোনো চুক্তি হয়, সেখানে চুক্তির শর্ত মেনে চলার ব্যাপারে একটি গ্যারান্টি ক্লজ থাকে। ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশ ও ভারতের ফারাক্কা চুক্তি। এখানে বাংলাদেশের পানি প্রাপ্যতা ভারতের মর্জির ওপর নির্ভর করছে। ফারাক্কার উজানে গঙ্গা নদীর অন্য কোথাও ভারত আর কোনো ব্যারাজ কিংবা বাঁধ নির্মাণ করতে পারবে না—এমন কোনো শর্ত চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে ভারত চুক্তির এ দুর্বল দিকটি কাজে লাগিয়ে ফারাক্কার উজানে অসংখ্য ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে গঙ্গার পানি একতরফাভাবে সরিয়ে নিয়ে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ ও বিহারসহ অন্যান্য প্রদেশের মরু এলাকায় নিয়ে সেচ কাজ চালাচ্ছে এবং নদীর নাব্য রক্ষা করছে।
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?