কৃষকের নবান্ন উত্সব এখন শুধুই স্মৃতি?
অমলেশ কুমার মালাকার
‘গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ’—এ হচ্ছে বাংলার প্রাচুর্যের নির্মল ও কাব্যিক অভিব্যক্তি। এক সময় এ দেশের গোলা ভরা ধান ছিল। ছিল সেই ধানের তৈরি চালের ভাতের সুঘ্রাণ-সুস্বাদ-পুষ্টিগুণ। আজ নেই সেই ধান, নেই সেই ঘ্রাণ-স্বাদ-পুষ্টিগুণ। আজ সেগুলো শুধুই ইতিহাস। আজ আর চোখে পড়ে না সেই লালরঙা চাল। যে চালের ভাত ছিল সুঘ্রাণ-সুস্বাদে ভরা। মনে পড়ে ছোট বেলায় সকালের খাবার হিসেবে শুধু এই লাল চালের ঘন আঁঠালো মারা-ভাত, লবণ ও ঘানিকরা সরিষার তেলে মেখে পরিপূর্ণ তৃপ্তি সহকারে খেয়ে বইয়ের বোঝা কাঁধে নিয়ে চলে যেতাম স্কুলে। সেই আঠালো মারা-ভাতের স্বাদের কথা এখনও মনে পড়ে। অথচ আজ এই ভেজালের যুগে সকালের খাবার হিসেবে ডিমে ভিজিয়ে পাউরুটি ভাজা কিংবা তেল-ঘি দিয়ে পরাটা ভাজা কোনোটাই এক-দু’টার বেশি মুখেই দিতে ইচ্ছে করে না। আর বর্তমানের নানা নামের চালের খটখটে ভাত খাওয়া তাও আবার দিনের শুরুতেই বিরক্তির উদ্রেগ ছাড়া আর কিছুই নয়।
ধানের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ধান জাতের বিবর্তন নিয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদ, ইতিহাসবিদ ও ধান বিজ্ঞানীদের মধ্যে যথেষ্ট মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সবাই স্বীকার করেন, আদি ধান জাতের আবির্ভাব ঘটে গণ্ডোওয়ানা নামক বিশাল মহাদেশে। কালক্রমে গণ্ডোওয়ানা ভেঙে যে অংশটা বর্তমানে ভারত উপমহাদেশ থেকেই আদি ধান জাতের ক্রমবিকাশ ঘটতে থাকে এবং উত্পাদনের দিক থেকেও এ অঞ্চল অনেক এগিয়ে রয়েছে। বর্তমানে এশিয়ার মধ্যে ধান উত্পাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ চতুর্থ স্থান দখল করে রয়েছে। এ দেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধান। মোট ফসলি জমির ৭৭.৪০ ভাগজুড়ে উত্পাদন হয় ধান এবং মোট চাষীর ৯২ ভাগ হলো ধানচাষী। আমাদের প্রধান খাদ্য ভাত, যা মোট খাদ্যের ৯২ ভাগ জোগান দেয়। ভাতের সঙ্গে রয়েছে আমাদের নাড়ির টান। ভাত ছাড়া শত খাবারেও আমাদের পেট-মন কোনোটাই ভরে না। তাই বলা হয়ে থাকে, আমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাতখেকো জাতি। অন্যান্য ভাতখেকো দেশের চেয়ে আমরা দ্বিগুণ পরিমাণ ভাত খেয়ে থাকি। সমীক্ষায় প্রদত্ত তথ্যে জানা যায়, ইন্দোনেশিয়ায় গড়ে একজন লোক বছরে ১১০ কেজি এবং চীনে ৯০ কেজি চালের ভাত খায়। সে তুলনায় আমরা খাই ১৮৩ কেজি চালের ভাত।
ভেতো বাঙালি হিসেবে পরিচিত এদেশে একসময় চাষ হতো আমাদের একান্ত নিজস্ব নানা জাতের ধান। গবেষণা তথ্যে জানা যায়, এদেশে একসময় বিভিন্ন মৌসুমে ১৮ হাজার জাতের ধান চাষ হতো। কালের বিবর্তনে আজ সেগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। স্থানভেদে নামের হেরফের হলেও যে ধানগুলো চাষ করা হতো তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—নাজিরশাইল, বিন্নি, শালি, নীল কমল, মইন্দাগিরি, ডুমরা, ধলকাজাই, থুগড়ি, গড়িয়া, সাটিয়া, ফুলবালাম, বেতো, দধশাইল, মালতি, কনকতারা, কালীগচ্ছা, লক্ষ্মীবিলাস, লক্ষ্মীদিঘা, হনুমানজটা, কালোমেঘী, হলুদগোটা, সূর্যমুখী, গেরুমুড়ি, গদালাকি, নোনাকুর্চি, খেজুররুপি, মধুশাইল, লেবুশাইল, জলকুমারী, বেনামুড়ি, সরিষাফুলি, বাঁশফুল, ফুলমালা, সরিষাঝুড়ি, বটেশ্বর, শিলিগুঁড়ি, চিংড়িঘুড়ি, ফুলমুক্তা, লালবিরুই, দাদখানি, তুলশিমালা, মাতাভোগ, কালোজিরা, জামাইসোহাগী, গান্ধিভোগ, কাটারিভোগ, রাধুনিপাগল, গবিন্দভোগ ইত্যাদি। এসব ধান চাষ করতে কোনো বীজ কিনতে হতো না। বীজের জন্য কিছু ধান আলাদা করে ঘরে তুলে রাখা হতো এবং তা দিয়ে করা হতো চাষ পরবর্তী বছরে। জমিতে দিতে হতো না কোনো রাসায়নিক সার কিংবা কীটনাশক। শুধু গোবর সারেই লক লক করে গজে উঠত ধানের শীষ। কৃষকরা শুধু তাদের কায়িক শ্রমের বিনিময়েই পেয়ে যেত তাদের কাঙ্ক্ষিত ধান। বিঘাপ্রতি ১০-১২ মণ ফলন পেলেও উত্পাদন খরচ না হওয়ার কারণে সে সময়েই কৃষকরা হতো বেশি লাভবান। খরা-বন্যায় ফসলের কিছুটা ক্ষতি হলেও তাদের তহবিলের কোনো ক্ষতি হতো না। আজ নানা রং-বৈচিত্র্যে ভরা সেসব ধান আর চোখে পড়ে না। ক্রমে ক্রমে সব হারিয়ে যাচ্ছে। আজ আর নেই সেই কাটারিভোগ, গোবিন্দভোগ—যার সঙ্গে সোনামুগের ডাল মিশিয়ে তৈরি করা হতো দেবতার ভোগ। আজ আর নেই সেই জামাই সোহাগী—যা রেধে মেয়ের জামাইকে ঘটা করে খাওয়ানো হতো পরম সোহাগে। নেই সেই কার্তিক অগ্রহায়ণের ধানকাটা উত্সব। নেই সেই অগ্রহায়ণের নবান্ন, নেই সেই পৌষ মাঘের পিঠা-পায়েশ উত্সব বাংলার ঘরে ঘরে। আজ যেমন আমাদের নিজস্ব জাতের ধান হারিয়ে যাচ্ছে তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সেই লোকজ উত্সব।
ধানের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ধান জাতের বিবর্তন নিয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদ, ইতিহাসবিদ ও ধান বিজ্ঞানীদের মধ্যে যথেষ্ট মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সবাই স্বীকার করেন, আদি ধান জাতের আবির্ভাব ঘটে গণ্ডোওয়ানা নামক বিশাল মহাদেশে। কালক্রমে গণ্ডোওয়ানা ভেঙে যে অংশটা বর্তমানে ভারত উপমহাদেশ থেকেই আদি ধান জাতের ক্রমবিকাশ ঘটতে থাকে এবং উত্পাদনের দিক থেকেও এ অঞ্চল অনেক এগিয়ে রয়েছে। বর্তমানে এশিয়ার মধ্যে ধান উত্পাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ চতুর্থ স্থান দখল করে রয়েছে। এ দেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধান। মোট ফসলি জমির ৭৭.৪০ ভাগজুড়ে উত্পাদন হয় ধান এবং মোট চাষীর ৯২ ভাগ হলো ধানচাষী। আমাদের প্রধান খাদ্য ভাত, যা মোট খাদ্যের ৯২ ভাগ জোগান দেয়। ভাতের সঙ্গে রয়েছে আমাদের নাড়ির টান। ভাত ছাড়া শত খাবারেও আমাদের পেট-মন কোনোটাই ভরে না। তাই বলা হয়ে থাকে, আমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাতখেকো জাতি। অন্যান্য ভাতখেকো দেশের চেয়ে আমরা দ্বিগুণ পরিমাণ ভাত খেয়ে থাকি। সমীক্ষায় প্রদত্ত তথ্যে জানা যায়, ইন্দোনেশিয়ায় গড়ে একজন লোক বছরে ১১০ কেজি এবং চীনে ৯০ কেজি চালের ভাত খায়। সে তুলনায় আমরা খাই ১৮৩ কেজি চালের ভাত।
ভেতো বাঙালি হিসেবে পরিচিত এদেশে একসময় চাষ হতো আমাদের একান্ত নিজস্ব নানা জাতের ধান। গবেষণা তথ্যে জানা যায়, এদেশে একসময় বিভিন্ন মৌসুমে ১৮ হাজার জাতের ধান চাষ হতো। কালের বিবর্তনে আজ সেগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। স্থানভেদে নামের হেরফের হলেও যে ধানগুলো চাষ করা হতো তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—নাজিরশাইল, বিন্নি, শালি, নীল কমল, মইন্দাগিরি, ডুমরা, ধলকাজাই, থুগড়ি, গড়িয়া, সাটিয়া, ফুলবালাম, বেতো, দধশাইল, মালতি, কনকতারা, কালীগচ্ছা, লক্ষ্মীবিলাস, লক্ষ্মীদিঘা, হনুমানজটা, কালোমেঘী, হলুদগোটা, সূর্যমুখী, গেরুমুড়ি, গদালাকি, নোনাকুর্চি, খেজুররুপি, মধুশাইল, লেবুশাইল, জলকুমারী, বেনামুড়ি, সরিষাফুলি, বাঁশফুল, ফুলমালা, সরিষাঝুড়ি, বটেশ্বর, শিলিগুঁড়ি, চিংড়িঘুড়ি, ফুলমুক্তা, লালবিরুই, দাদখানি, তুলশিমালা, মাতাভোগ, কালোজিরা, জামাইসোহাগী, গান্ধিভোগ, কাটারিভোগ, রাধুনিপাগল, গবিন্দভোগ ইত্যাদি। এসব ধান চাষ করতে কোনো বীজ কিনতে হতো না। বীজের জন্য কিছু ধান আলাদা করে ঘরে তুলে রাখা হতো এবং তা দিয়ে করা হতো চাষ পরবর্তী বছরে। জমিতে দিতে হতো না কোনো রাসায়নিক সার কিংবা কীটনাশক। শুধু গোবর সারেই লক লক করে গজে উঠত ধানের শীষ। কৃষকরা শুধু তাদের কায়িক শ্রমের বিনিময়েই পেয়ে যেত তাদের কাঙ্ক্ষিত ধান। বিঘাপ্রতি ১০-১২ মণ ফলন পেলেও উত্পাদন খরচ না হওয়ার কারণে সে সময়েই কৃষকরা হতো বেশি লাভবান। খরা-বন্যায় ফসলের কিছুটা ক্ষতি হলেও তাদের তহবিলের কোনো ক্ষতি হতো না। আজ নানা রং-বৈচিত্র্যে ভরা সেসব ধান আর চোখে পড়ে না। ক্রমে ক্রমে সব হারিয়ে যাচ্ছে। আজ আর নেই সেই কাটারিভোগ, গোবিন্দভোগ—যার সঙ্গে সোনামুগের ডাল মিশিয়ে তৈরি করা হতো দেবতার ভোগ। আজ আর নেই সেই জামাই সোহাগী—যা রেধে মেয়ের জামাইকে ঘটা করে খাওয়ানো হতো পরম সোহাগে। নেই সেই কার্তিক অগ্রহায়ণের ধানকাটা উত্সব। নেই সেই অগ্রহায়ণের নবান্ন, নেই সেই পৌষ মাঘের পিঠা-পায়েশ উত্সব বাংলার ঘরে ঘরে। আজ যেমন আমাদের নিজস্ব জাতের ধান হারিয়ে যাচ্ছে তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সেই লোকজ উত্সব।


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


