মন্তব্য প্রতিবেদন : সময় পাল্টালে নীতিও পাল্টায়
মাহমুদুর রহমান
বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে এক প্রখ্যাত সম্পাদককে নিগ্রহের ঘটনা বর্ণনা করেই আজ লেখা শুরু করছি। জনাব ইকবাল সোবহান চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকা সম্পাদনার পাশাপাশি বিশেষ মতাদর্শে বিশ্বাসী সাংবাদিক গোষ্ঠীর একজন প্রভাবশালী নেতা। সম্পাদক মহোদয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই সরাসরি যুক্ত। ২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বরের ডিজিটাল সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ফেনী-২ আসন থেকে প্রতিযোগিতা করে তিনি বিস্ময়করভাবে পরাজিত হন। পরাজয়ের পাশে বিশেষণটি এ কারণে যুক্ত করলাম যে, ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের যে কোনো আসনে পরাজয়ই বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের যৌথ সরকার, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নির্বাচন কমিশন এবং সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের সম্মিলিত তত্পরতায় তিনশ’ আসনেই মহাজোট প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করার সবরকম উদ্যোগই বিগত নির্বাচনে গ্রহণ করা হয়েছিল। দেশবাসীর স্মরণে থাকার কথা, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. শামসুল হুদা বিশেষ মহলের নির্দেশে কেবল যে বিএনপিকে বহুধাবিভক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন তাই নয়, তিনি ১৯৭০ সালের সমতুল্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগাম ঘোষণাও দিয়েছিলেন।
যাই হোক, চারদলীয় জোট সরকারের আমলের গল্পে ফিরে যাচ্ছি। কুষ্টিয়ায় সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে আয়োজিত এক বিক্ষোভ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকালে জনাব ইকবাল সোবহান চৌধুরী তত্কালীন সরকারদলীয় সংসদ সদস্যের গুণ্ডাবাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হয়ে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। সাংবাদিক নির্যাতন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে এই নিন্দনীয় আচরণে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ এবং মর্মাহত হয়েছিলাম। রাজনীতিবিদ না হওয়া সত্ত্বেও যেহেতু বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করছিলাম, সে কারণে অপরাধবোধ থেকে মনে করেছিলাম দল-মত নির্বিশেষে সাংবাদিকের ওপর আঘাতের প্রতিবাদ জানানো আমার একান্ত কর্তব্য। আমি জনাব চৌধুরীকে টেলিফোন করে তার কুশল জিজ্ঞাসা করে আমার পক্ষ থেকে ঘটনার জন্য নিন্দা এবং দুঃখ প্রকাশ করেছিলাম। জনাব ইকবাল সোবহান চৌধুরীর মতো দেশবরেণ্য ব্যক্তির আমার মতো একজন নগণ্য নাগরিকের সেই টেলিফোনের কথা স্মরণে না থাকাটাই স্বাভাবিক। নইলে আজ তার দলের সরকারের কর্তাব্যক্তিরা প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে একটি পত্রিকার বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্ট, বাকশালী কায়দায় সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া সত্ত্বেও তিনি সম্ভবত নিশ্চুপ থাকতে পারতেন না। তবে, তার ওপর আক্রমণের সময় আমার টেলিফোন করার বিষয়টি তুচ্ছ হলেও আমার দেশ পত্রিকার একজন পেশাদার সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় ইকবাল সোবহান চৌধুরীর মতো সাংবাদিক নেতাদের নীরবতা কেবল দুর্ভাগ্যজনকই নয়, সংবাদপত্র শিল্পের জন্য অশনি সঙ্কেতও। যে কোনো সংবাদকর্মী জেনে অধিকতর হতাশ হবেন যে, জনাব চৌধুরী সাংবাদিককে আক্রমণ এবং সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন মহলের হুমকির ঘটনার নিন্দা করা তো দূরের কথা, তিনি টেলিভিশন টকশো’তে অংশগ্রহণ করে সরকারের ফ্যাসিবাদী অবস্থানের পক্ষে নানারকম যুক্তি উপস্থাপনেরও চেষ্টা করছেন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, ভবিষ্যতে কখনও যেন জনাব ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগ কোনো দলেরই ক্যাডারদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে না হয়। যতদিন পর্যন্ত সাংবাদিকদের ওপর রাষ্ট্রযন্ত্র এবং ক্ষমতাসীন অথবা বিরোধী দলের ক্যাডারদের অতীব নিন্দনীয় হামলাকে আমরা দলীয় সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করার মন্দ সংস্কৃতি পরিহার না করব, ততদিন এদেশে নিশ্চিতভাবেই সাংবাদিকরা নির্যাতিত হতেই থাকবেন। তবে এই তমসাবৃত সময়েও জাতীয় প্রেসক্লাব তার লড়াকু ঐতিহ্য অনুযায়ী গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সপক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানটির গৌরব বৃদ্ধি করে চলেছে।
এবার আসি বাংলাদেশের অধিকাংশ মানবাধিকার সংগঠন এবং সুশীল (?) সমাজের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা প্রসঙ্গে। আমার দেশ পত্রিকাটি সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে একটি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করেছে। সত্ সাংবাদিকতার সব শর্ত পূরণ করেই সংবাদটিকে জনগুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে ছাপা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সচিব, পেট্রোবাংলা এবং মার্কিন কোম্পানি শেভরনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের মন্তব্য নেয়া হয়েছে এবং সেই মন্তব্য অবিকৃতভাবে সংবাদে উপস্থাপন করা হয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও চাঁপাইনবাবগঞ্জে দলীয় কাজে ব্যস্ত জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি তারই অনাগ্রহের কারণে। ড. তৌফিক এলাহী এবং প্রধানমন্ত্রীর ছেলে জয়ের সাক্ষাত্ পাওয়ার জন্য প্রতিবেদককে যথাক্রমে যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রেরণ করার মতো আর্থিক সঙ্গতি আমার দেশ কর্তৃপক্ষের যে নেই—এটা কবুল করায় কোনো অসম্মান দেখি না। মন্ত্রণালয় থেকে সংবাদটির প্রতিবাদ পাঠানো হলে সেটাও প্রথম পাতায় যথাযথ গুরুত্বসহকারে ছাপা হয়েছে। আবেগ বিবর্জিত এবং যুক্তিসঙ্গতভাবে বিবেচনা করা হলে সামপ্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত এই ঘুষের অভিযোগের সংবাদ সংগ্রহ এবং প্রকাশ প্রক্রিয়ায় কোনো বিচ্যুতি খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। অথচ চারদলীয় জোট সরকারের পাঁচ বছরে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সংবাদপত্রে রীতি-নীতির কোনো তোয়াক্কা না করেই অব্যাহতভাবে তত্কালীন সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হয়েছে। সেই প্রচারণায় এদেশের সুশীল (?) সমাজের অংশগ্রহণও চোখে পড়ার মতো ছিল। বিদ্যুত্ মন্ত্রণালয়ে কথিত বিশ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির গল্প স্বয়ং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীসহ তার দলের কর্তাব্যক্তিরা সুশীল সংবাদ মাধ্যমের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় দিনের পর দিন প্রচার করেছেন। সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদে ওই মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেটই যে ছিল কেবল সাড়ে তের হাজার কোটি টাকা, এ তথ্য জানানোর পরও বিশ হাজার কোটি টাকা পাচারের আষাঢ়ে গল্প প্রচারে কোনোরকম ভাটা পড়েনি। সেই সরকারের আমলে নিত্যপ্রয়োজনীয় যে কোনো পণ্যের দাম বাড়ার জন্য হাওয়া ভবন নিয়ন্ত্রিত কথিত সিন্ডিকেটের কল্পকাহিনী তথ্য-প্রমাণের বালাই ছাড়াই সংবাদপত্রের পাতায় নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। টেলিভিশনের লাইভ টকশো’তে ডেকে নিয়ে একজন মন্ত্রীকে মুখের সামনে দুর্নীতিবাজ বলতেও সাংবাদিকদের সঙ্কোচ করতে দেখিনি। কিন্তু আমার দেশ পত্রিকার আজকের মতো বৈরী পরিস্থিতি সে সময় একটি পত্রিকাকেও মোকাবিলা করতে হয়নি। যেসব স্বনামধন্য মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং বুদ্ধিজীবীকুল তখন কোনো প্রমাণ ছাড়াই দুর্নীতির লোমহর্ষক অভিযোগের তুবড়ি ছোটাতেন, তারাই এখন নির্বিকারভাবে জ্ঞান দিচ্ছেন যে, তদন্তাধীন কোনো অভিযোগের খবর কাগজপত্র থাকলেও প্রকাশ করা যাবে না। এতে নাকি সাংবাদিকতার মহান আদর্শ ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সংবাদপত্র আজ যখন ফ্যাসিবাদ দ্বারা আক্রান্ত, সে সময় সুশীল (?) সমাজের অবস্থান অনেকটা মহাত্মা গান্ধীর সেই তিন বিখ্যাত শাখামৃগের মতো, যারা অন্ধ, বধির এবং বোবা। ভবিষ্যতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন কোনো সরকার যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত হয় এবং সে সময় রাষ্ট্রযন্ত্র বর্তমানের মতো তার চণ্ডাল রূপ নিয়ে সংবাদ মাধ্যমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে একই সুশীল (?) সমাজের ভিন্নরূপ যে আমরা দেখতে পাব—সে বিষয়ে দেশবাসী নিশ্চিত থাকতে পারেন। ক’দিন আগেই সরকারি দলের মুখপত্র রূপে পরিচিত এক সংবাদপত্রে নির্দ্বিধায় তারেক রহমানকে ২১ আগস্ট বোমা হামলার ‘খুনি’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সব কাগজপত্র প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে এবং পত্রিকাটি নিজ থেকে উেকাচ গ্রহণের অভিযোগ উত্থাপন না করে মন্ত্রণালয়ে তদন্তাধীন অভিযোগের সংবাদটি ছেপেছে মাত্র। অপরদিকে অন্য পত্রিকাটির প্রতিবেদক, কলামিস্ট প্রমাণের কোনো তোয়াক্কা না করে নিজ দায়িত্বে মানুষ হত্যার গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। বিবেকবান পাঠক, দুটি ভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের একটিকে সত্ ও পেশাদার সাংবাদিকতা এবং অন্যটিকে অপসাংবাদিকতা হিসেবেই বিবেচনা করবেন বলে আশা রাখি।
সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর কূটনীতিকদের ব্যবহারেও পরিবর্তন ঘটেছে। বেগম খালেদা জিয়ার প্রথমবার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় এদেশে সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরিতে তসলিমা নাসরিন বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। এই মহিলা তার বক্তব্য এবং লেখায় ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে নানারকম কুত্সা রটনা করে স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশে-বিদেশে সবিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ধূমপানরত অবস্থায় অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তার পবিত্র কোরআনের পাতা ওল্টানোর উস্কানিমূলক ছবি সে সময় বিবিসিসহ বিদেশি ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে দেখানো হয়েছিল। এরকম উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সম্ভবত সিলেটের এক মাওলানা তাকে মুরতাদ ঘোষণা করে হত্যার হুমকি দেন। আর যায় কোথায়! বাংলাদেশ যে ক্রমেই ইসলামী মৌলবাদের চারণভূমি হয়ে পড়ছে, সেই দুশ্চিন্তায় বিদেশি কূটনীতিকরা প্রায় আহার-নিদ্রা ত্যাগ করেছিলেন। সরকারের উচ্চমহলে যোগাযোগ করে সার্বিক পরিস্থিতিতে তাদের অসন্তোষের বিষয়টি সরাসরি জানাতেও কোনোরকম দ্বিধাবোধ করেননি। তাদের বিবেচনায় তসলিমা নাসরিন তার মতপ্রকাশ করেছেন মাত্র এবং সরকারের দায়িত্ব দেশে এমন পরিবেশ বজায় রাখা যাতে কারও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন না হয়। বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নেরই এক দূতাবাসে সাময়িক আশ্রয় গ্রহণ শেষে বিদেশে পাড়ি জমান এবং সেই থেকে প্রবাসই তার ঠিকানা। ঘটনার প্রাথমিক পর্যায়ে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব তার সমর্থনে এমন হৈ চৈ বাধিয়ে দিয়েছিল যে, তসলিমা নাসরিনের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির গুজবও তখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। পশ্চিমা বিশ্বে তাত্ক্ষণিক খ্যাতি অর্জনের অব্যর্থ পথ যে ইসলাম ধর্ম নিয়ে বিষোদ্গার করা, এটা তসলিমা নাসরিন ভালোই বুঝেছিলেন। যাই হোক, কার্যোদ্ধার হয়ে যাওয়ার পর অবশ্য পশ্চিমাদের উত্সাহে এখন ভাটা পড়েছে এবং চরম সামপ্রদায়িক সেই লেখিকাকে শেষ পর্যন্ত ভারতেই ঘাঁটি গাড়তে হয়েছে। মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সেসব দূতাবাস এখনও বাংলাদেশেই রয়েছে। কূটনীতিকদের সামনেই ব্যক্তি তো তুচ্ছ, সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যমের ওপরই চরম ফ্যাসিবাদী আক্রমণ চলছে। ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ার কণ্ঠরোধ করার সব আয়োজনই ক্ষমতাসীনরা প্রায় সম্পন্ন করে এনেছে। বিগত এক বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংবাদকর্মীদের ওপর যত আঘাত এসেছে, তার তুলনা কেবল ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সময়কালের পরিস্থিতির সঙ্গেই হতে পারে। অথচ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ তাবত্ বিষয়ে জ্ঞানদান করতে সদাপ্রস্তুত সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী শুধু যে নীরব থাকতেই পছন্দ করছে তাই নয়, এক অর্থে সরকারের সব অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডকে অকাতরে সমর্থন দিয়ে চলেছে। তাদের এই দ্বিমুখী আচরণে আমি অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে যারপরনাই আনন্দিত। বাংলাদেশের জনগণকে অনুধাবন করতে হবে যে, পরমুখাপেক্ষী হয়ে স্বাধীনতা কিংবা সম্মান কোনোটাই রক্ষা করা সম্ভব নয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ বন্ধুরাষ্ট্রের সহায়তার গল্প এদেশে ৩৮ বছর ধরে এমনভাবে চালানো হয়েছে যাতে দেশের ১৫ কোটি নাগরিক সর্বক্ষণ কৃতজ্ঞতার ভারে নুয়ে থাকে। নয় মাসের সেই সহায়তার ঋণ শোধ করার জন্য কত প্রজন্মকে বিদেশি শক্তির তাঁবেদারি সইতে হবে, সে প্রশ্নের জবাব মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র চেতনাধারীরাই ভালো জানেন। প্রসঙ্গক্রমে ভিয়েতনামের উদাহরণ টানা যেতে পারে। সেদেশের লড়াকু জনগণ দীর্ঘ দু’দশক ধরে প্রথমে ফরাসি এবং পরবর্তীতে ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করেছে। সমাজতন্ত্রী চীন তার পার্শ্ববর্তী দেশটির জনগণের মহান মুক্তিসংগ্রামে সাধ্যমত সহায়তা দিয়ে গেছে। দু’দশকব্যাপী প্রদত্ত সেই উপকারের বদলা নেয়ার জন্য চীন যেমন কখনও উতলা হয়নি, অপরদিকে ভিয়েতনামিরাও আপন স্বার্থ ত্যাগ করে চীনের প্রতি নতজানু মনোভাব প্রদর্শন করেনি। জনগণ স্বাধীনচেতা বলেই আজ ভিয়েতনাম প্রায় সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অতিক্রম করেছে।
সংবাদপত্রের ওপর আঘাত প্রসঙ্গে বিচার বিভাগ সম্পর্কে দু’চারটি কথা না লিখলে আজকের প্রতিবেদনটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে বলেই আমার ধারণা। সংবাদপত্রের পাঠকদের অধিকাংশ বিখ্যাত মাজদার হোসেন মামলা সম্পর্কে খানিকটা অবহিত। মামলার বিশদ বিবরণে না গিয়ে শুধু এটুকু বলাই যথেষ্ট হবে—জনমনে একটি ধারণা রয়েছে যে, মাজদার হোসেন মামলার রায়ের ফলে বাংলাদেশে বিচার বিভাগ প্রকৃতই স্বাধীন হয়ে গেছে। ওই রায় প্রদানের পর দেশবাসী আশা করেছিল নিম্ন আদালতের বিচারকদের রায় দেয়ার জন্য এখন আর আগের মতো স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয় কিংবা সরকারি দলের ক্ষমতাবানদের ইঙ্গিতের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। আমাদের স্মরণে আছে, সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকার ঘটা করে স্বাধীন বিচার বিভাগের ঘোষণা দেয়ার পর সুশীল (?) সমাজ সাধু-সাধু রবে চতুর্দিক প্রকম্পিত করে তুলেছিল। সে সময় বিচার বিভাগকে কথিত স্বাধীনতা দেয়ায় অভিনন্দনের বন্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আদালতে বিশেষ সংস্থার লোকজনের উপস্থিতিতে ও ইশারা-ইঙ্গিতে চলেছে রায় লেখার প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার বর্তমান বাস্তবতা বোঝার জন্য গত দু’সপ্তাহের আমার দেশ পত্রিকার অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট। এ মুহূর্তে আমি যখন লিখছি, সে পর্যন্ত জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির অভিযোগ সংবলিত সংবাদটি প্রকাশের অপরাধে আমার ও আমার সহকর্মীদের বিরুদ্ধে ২২টি মানহানি মামলা হয়েছে। একুশটি মামলায় সমন জারি হলেও একটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা পর্যন্ত জারি করা হয়েছে। কুড়িটি জেলায় দায়েরকৃত মামলার প্রতিটিতে বাদীরা হলেন সেই জেলার আওয়ামী লীগ অথবা অঙ্গসংগঠনের প্রভাবশালী নেতারা। একটি অভিযোগে এতগুলো মামলা দায়ের করা যায় কিনা এবং মামলা হলেও সেগুলো আদালত আমলে নিতে পারেন কিনা, এর জবাব আইন বিশেষজ্ঞদেরই ভালো জানার কথা। যাই হোক, এ দু’সপ্তাহের মধ্যেই বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মানহানিকর উক্তি করার জন্য ছাত্রলীগ সভাপতিসহ অন্যান্য নেতার বিরুদ্ধে বিএনপি নেতাকর্মীরা একাধিক মানহানি মামলা করলেও কোথাও ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয় সেই মামলা আমলে নেননি। সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে বাগেরহাটে। সেখানে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে যুদ্ধাপরাধী সম্বোধন করার অভিযোগে জনৈক ব্যক্তি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মানহানি মামলা দায়ের করেছিলেন। নিম্ন আদালতের মাননীয় বিচারক বাদীকে সংক্ষুব্ধ বিবেচনা না করে সেই মামলা আইনসঙ্গতভাবেই আমলে না নিয়ে যে খারিজ করে দিয়েছেন, সেটা প্রত্যাশিত হওয়ায় উল্লেখ করার মতো কোনো সংবাদ নয়। সংবাদ হচ্ছে পরবর্তী আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যেই বাগেরহাটের করিত্কর্মা পুলিশ বাদীর পিতাকে গ্রেফতার করে ৫৪ ধারায় কারাগারে নিক্ষেপ করেছে। আমার দেশ তো সরকারের বিবেচনায় ভয়ঙ্কর শত্রুপক্ষ। এই পত্রিকায় তো নাকি কেবল মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যমূলক সংবাদ পরিবেশন করা হয়। সরকারবান্ধব প্রথম আলো থেকে সংশ্লিষ্ট সংবাদটি উদ্ধৃত করছি। ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী গ্রেফতার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স
যাই হোক, চারদলীয় জোট সরকারের আমলের গল্পে ফিরে যাচ্ছি। কুষ্টিয়ায় সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে আয়োজিত এক বিক্ষোভ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকালে জনাব ইকবাল সোবহান চৌধুরী তত্কালীন সরকারদলীয় সংসদ সদস্যের গুণ্ডাবাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হয়ে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। সাংবাদিক নির্যাতন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে এই নিন্দনীয় আচরণে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ এবং মর্মাহত হয়েছিলাম। রাজনীতিবিদ না হওয়া সত্ত্বেও যেহেতু বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করছিলাম, সে কারণে অপরাধবোধ থেকে মনে করেছিলাম দল-মত নির্বিশেষে সাংবাদিকের ওপর আঘাতের প্রতিবাদ জানানো আমার একান্ত কর্তব্য। আমি জনাব চৌধুরীকে টেলিফোন করে তার কুশল জিজ্ঞাসা করে আমার পক্ষ থেকে ঘটনার জন্য নিন্দা এবং দুঃখ প্রকাশ করেছিলাম। জনাব ইকবাল সোবহান চৌধুরীর মতো দেশবরেণ্য ব্যক্তির আমার মতো একজন নগণ্য নাগরিকের সেই টেলিফোনের কথা স্মরণে না থাকাটাই স্বাভাবিক। নইলে আজ তার দলের সরকারের কর্তাব্যক্তিরা প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে একটি পত্রিকার বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্ট, বাকশালী কায়দায় সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া সত্ত্বেও তিনি সম্ভবত নিশ্চুপ থাকতে পারতেন না। তবে, তার ওপর আক্রমণের সময় আমার টেলিফোন করার বিষয়টি তুচ্ছ হলেও আমার দেশ পত্রিকার একজন পেশাদার সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় ইকবাল সোবহান চৌধুরীর মতো সাংবাদিক নেতাদের নীরবতা কেবল দুর্ভাগ্যজনকই নয়, সংবাদপত্র শিল্পের জন্য অশনি সঙ্কেতও। যে কোনো সংবাদকর্মী জেনে অধিকতর হতাশ হবেন যে, জনাব চৌধুরী সাংবাদিককে আক্রমণ এবং সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন মহলের হুমকির ঘটনার নিন্দা করা তো দূরের কথা, তিনি টেলিভিশন টকশো’তে অংশগ্রহণ করে সরকারের ফ্যাসিবাদী অবস্থানের পক্ষে নানারকম যুক্তি উপস্থাপনেরও চেষ্টা করছেন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, ভবিষ্যতে কখনও যেন জনাব ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগ কোনো দলেরই ক্যাডারদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে না হয়। যতদিন পর্যন্ত সাংবাদিকদের ওপর রাষ্ট্রযন্ত্র এবং ক্ষমতাসীন অথবা বিরোধী দলের ক্যাডারদের অতীব নিন্দনীয় হামলাকে আমরা দলীয় সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করার মন্দ সংস্কৃতি পরিহার না করব, ততদিন এদেশে নিশ্চিতভাবেই সাংবাদিকরা নির্যাতিত হতেই থাকবেন। তবে এই তমসাবৃত সময়েও জাতীয় প্রেসক্লাব তার লড়াকু ঐতিহ্য অনুযায়ী গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সপক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানটির গৌরব বৃদ্ধি করে চলেছে।
এবার আসি বাংলাদেশের অধিকাংশ মানবাধিকার সংগঠন এবং সুশীল (?) সমাজের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা প্রসঙ্গে। আমার দেশ পত্রিকাটি সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে একটি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করেছে। সত্ সাংবাদিকতার সব শর্ত পূরণ করেই সংবাদটিকে জনগুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে ছাপা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সচিব, পেট্রোবাংলা এবং মার্কিন কোম্পানি শেভরনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের মন্তব্য নেয়া হয়েছে এবং সেই মন্তব্য অবিকৃতভাবে সংবাদে উপস্থাপন করা হয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও চাঁপাইনবাবগঞ্জে দলীয় কাজে ব্যস্ত জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি তারই অনাগ্রহের কারণে। ড. তৌফিক এলাহী এবং প্রধানমন্ত্রীর ছেলে জয়ের সাক্ষাত্ পাওয়ার জন্য প্রতিবেদককে যথাক্রমে যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রেরণ করার মতো আর্থিক সঙ্গতি আমার দেশ কর্তৃপক্ষের যে নেই—এটা কবুল করায় কোনো অসম্মান দেখি না। মন্ত্রণালয় থেকে সংবাদটির প্রতিবাদ পাঠানো হলে সেটাও প্রথম পাতায় যথাযথ গুরুত্বসহকারে ছাপা হয়েছে। আবেগ বিবর্জিত এবং যুক্তিসঙ্গতভাবে বিবেচনা করা হলে সামপ্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত এই ঘুষের অভিযোগের সংবাদ সংগ্রহ এবং প্রকাশ প্রক্রিয়ায় কোনো বিচ্যুতি খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। অথচ চারদলীয় জোট সরকারের পাঁচ বছরে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সংবাদপত্রে রীতি-নীতির কোনো তোয়াক্কা না করেই অব্যাহতভাবে তত্কালীন সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হয়েছে। সেই প্রচারণায় এদেশের সুশীল (?) সমাজের অংশগ্রহণও চোখে পড়ার মতো ছিল। বিদ্যুত্ মন্ত্রণালয়ে কথিত বিশ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির গল্প স্বয়ং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীসহ তার দলের কর্তাব্যক্তিরা সুশীল সংবাদ মাধ্যমের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় দিনের পর দিন প্রচার করেছেন। সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদে ওই মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেটই যে ছিল কেবল সাড়ে তের হাজার কোটি টাকা, এ তথ্য জানানোর পরও বিশ হাজার কোটি টাকা পাচারের আষাঢ়ে গল্প প্রচারে কোনোরকম ভাটা পড়েনি। সেই সরকারের আমলে নিত্যপ্রয়োজনীয় যে কোনো পণ্যের দাম বাড়ার জন্য হাওয়া ভবন নিয়ন্ত্রিত কথিত সিন্ডিকেটের কল্পকাহিনী তথ্য-প্রমাণের বালাই ছাড়াই সংবাদপত্রের পাতায় নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। টেলিভিশনের লাইভ টকশো’তে ডেকে নিয়ে একজন মন্ত্রীকে মুখের সামনে দুর্নীতিবাজ বলতেও সাংবাদিকদের সঙ্কোচ করতে দেখিনি। কিন্তু আমার দেশ পত্রিকার আজকের মতো বৈরী পরিস্থিতি সে সময় একটি পত্রিকাকেও মোকাবিলা করতে হয়নি। যেসব স্বনামধন্য মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং বুদ্ধিজীবীকুল তখন কোনো প্রমাণ ছাড়াই দুর্নীতির লোমহর্ষক অভিযোগের তুবড়ি ছোটাতেন, তারাই এখন নির্বিকারভাবে জ্ঞান দিচ্ছেন যে, তদন্তাধীন কোনো অভিযোগের খবর কাগজপত্র থাকলেও প্রকাশ করা যাবে না। এতে নাকি সাংবাদিকতার মহান আদর্শ ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সংবাদপত্র আজ যখন ফ্যাসিবাদ দ্বারা আক্রান্ত, সে সময় সুশীল (?) সমাজের অবস্থান অনেকটা মহাত্মা গান্ধীর সেই তিন বিখ্যাত শাখামৃগের মতো, যারা অন্ধ, বধির এবং বোবা। ভবিষ্যতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন কোনো সরকার যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত হয় এবং সে সময় রাষ্ট্রযন্ত্র বর্তমানের মতো তার চণ্ডাল রূপ নিয়ে সংবাদ মাধ্যমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে একই সুশীল (?) সমাজের ভিন্নরূপ যে আমরা দেখতে পাব—সে বিষয়ে দেশবাসী নিশ্চিত থাকতে পারেন। ক’দিন আগেই সরকারি দলের মুখপত্র রূপে পরিচিত এক সংবাদপত্রে নির্দ্বিধায় তারেক রহমানকে ২১ আগস্ট বোমা হামলার ‘খুনি’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সব কাগজপত্র প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে এবং পত্রিকাটি নিজ থেকে উেকাচ গ্রহণের অভিযোগ উত্থাপন না করে মন্ত্রণালয়ে তদন্তাধীন অভিযোগের সংবাদটি ছেপেছে মাত্র। অপরদিকে অন্য পত্রিকাটির প্রতিবেদক, কলামিস্ট প্রমাণের কোনো তোয়াক্কা না করে নিজ দায়িত্বে মানুষ হত্যার গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। বিবেকবান পাঠক, দুটি ভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের একটিকে সত্ ও পেশাদার সাংবাদিকতা এবং অন্যটিকে অপসাংবাদিকতা হিসেবেই বিবেচনা করবেন বলে আশা রাখি।
সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর কূটনীতিকদের ব্যবহারেও পরিবর্তন ঘটেছে। বেগম খালেদা জিয়ার প্রথমবার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় এদেশে সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরিতে তসলিমা নাসরিন বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। এই মহিলা তার বক্তব্য এবং লেখায় ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে নানারকম কুত্সা রটনা করে স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশে-বিদেশে সবিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ধূমপানরত অবস্থায় অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তার পবিত্র কোরআনের পাতা ওল্টানোর উস্কানিমূলক ছবি সে সময় বিবিসিসহ বিদেশি ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে দেখানো হয়েছিল। এরকম উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সম্ভবত সিলেটের এক মাওলানা তাকে মুরতাদ ঘোষণা করে হত্যার হুমকি দেন। আর যায় কোথায়! বাংলাদেশ যে ক্রমেই ইসলামী মৌলবাদের চারণভূমি হয়ে পড়ছে, সেই দুশ্চিন্তায় বিদেশি কূটনীতিকরা প্রায় আহার-নিদ্রা ত্যাগ করেছিলেন। সরকারের উচ্চমহলে যোগাযোগ করে সার্বিক পরিস্থিতিতে তাদের অসন্তোষের বিষয়টি সরাসরি জানাতেও কোনোরকম দ্বিধাবোধ করেননি। তাদের বিবেচনায় তসলিমা নাসরিন তার মতপ্রকাশ করেছেন মাত্র এবং সরকারের দায়িত্ব দেশে এমন পরিবেশ বজায় রাখা যাতে কারও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন না হয়। বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নেরই এক দূতাবাসে সাময়িক আশ্রয় গ্রহণ শেষে বিদেশে পাড়ি জমান এবং সেই থেকে প্রবাসই তার ঠিকানা। ঘটনার প্রাথমিক পর্যায়ে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব তার সমর্থনে এমন হৈ চৈ বাধিয়ে দিয়েছিল যে, তসলিমা নাসরিনের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির গুজবও তখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। পশ্চিমা বিশ্বে তাত্ক্ষণিক খ্যাতি অর্জনের অব্যর্থ পথ যে ইসলাম ধর্ম নিয়ে বিষোদ্গার করা, এটা তসলিমা নাসরিন ভালোই বুঝেছিলেন। যাই হোক, কার্যোদ্ধার হয়ে যাওয়ার পর অবশ্য পশ্চিমাদের উত্সাহে এখন ভাটা পড়েছে এবং চরম সামপ্রদায়িক সেই লেখিকাকে শেষ পর্যন্ত ভারতেই ঘাঁটি গাড়তে হয়েছে। মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সেসব দূতাবাস এখনও বাংলাদেশেই রয়েছে। কূটনীতিকদের সামনেই ব্যক্তি তো তুচ্ছ, সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যমের ওপরই চরম ফ্যাসিবাদী আক্রমণ চলছে। ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ার কণ্ঠরোধ করার সব আয়োজনই ক্ষমতাসীনরা প্রায় সম্পন্ন করে এনেছে। বিগত এক বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংবাদকর্মীদের ওপর যত আঘাত এসেছে, তার তুলনা কেবল ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সময়কালের পরিস্থিতির সঙ্গেই হতে পারে। অথচ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ তাবত্ বিষয়ে জ্ঞানদান করতে সদাপ্রস্তুত সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী শুধু যে নীরব থাকতেই পছন্দ করছে তাই নয়, এক অর্থে সরকারের সব অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডকে অকাতরে সমর্থন দিয়ে চলেছে। তাদের এই দ্বিমুখী আচরণে আমি অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে যারপরনাই আনন্দিত। বাংলাদেশের জনগণকে অনুধাবন করতে হবে যে, পরমুখাপেক্ষী হয়ে স্বাধীনতা কিংবা সম্মান কোনোটাই রক্ষা করা সম্ভব নয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ বন্ধুরাষ্ট্রের সহায়তার গল্প এদেশে ৩৮ বছর ধরে এমনভাবে চালানো হয়েছে যাতে দেশের ১৫ কোটি নাগরিক সর্বক্ষণ কৃতজ্ঞতার ভারে নুয়ে থাকে। নয় মাসের সেই সহায়তার ঋণ শোধ করার জন্য কত প্রজন্মকে বিদেশি শক্তির তাঁবেদারি সইতে হবে, সে প্রশ্নের জবাব মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র চেতনাধারীরাই ভালো জানেন। প্রসঙ্গক্রমে ভিয়েতনামের উদাহরণ টানা যেতে পারে। সেদেশের লড়াকু জনগণ দীর্ঘ দু’দশক ধরে প্রথমে ফরাসি এবং পরবর্তীতে ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করেছে। সমাজতন্ত্রী চীন তার পার্শ্ববর্তী দেশটির জনগণের মহান মুক্তিসংগ্রামে সাধ্যমত সহায়তা দিয়ে গেছে। দু’দশকব্যাপী প্রদত্ত সেই উপকারের বদলা নেয়ার জন্য চীন যেমন কখনও উতলা হয়নি, অপরদিকে ভিয়েতনামিরাও আপন স্বার্থ ত্যাগ করে চীনের প্রতি নতজানু মনোভাব প্রদর্শন করেনি। জনগণ স্বাধীনচেতা বলেই আজ ভিয়েতনাম প্রায় সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অতিক্রম করেছে।
সংবাদপত্রের ওপর আঘাত প্রসঙ্গে বিচার বিভাগ সম্পর্কে দু’চারটি কথা না লিখলে আজকের প্রতিবেদনটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে বলেই আমার ধারণা। সংবাদপত্রের পাঠকদের অধিকাংশ বিখ্যাত মাজদার হোসেন মামলা সম্পর্কে খানিকটা অবহিত। মামলার বিশদ বিবরণে না গিয়ে শুধু এটুকু বলাই যথেষ্ট হবে—জনমনে একটি ধারণা রয়েছে যে, মাজদার হোসেন মামলার রায়ের ফলে বাংলাদেশে বিচার বিভাগ প্রকৃতই স্বাধীন হয়ে গেছে। ওই রায় প্রদানের পর দেশবাসী আশা করেছিল নিম্ন আদালতের বিচারকদের রায় দেয়ার জন্য এখন আর আগের মতো স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয় কিংবা সরকারি দলের ক্ষমতাবানদের ইঙ্গিতের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। আমাদের স্মরণে আছে, সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকার ঘটা করে স্বাধীন বিচার বিভাগের ঘোষণা দেয়ার পর সুশীল (?) সমাজ সাধু-সাধু রবে চতুর্দিক প্রকম্পিত করে তুলেছিল। সে সময় বিচার বিভাগকে কথিত স্বাধীনতা দেয়ায় অভিনন্দনের বন্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আদালতে বিশেষ সংস্থার লোকজনের উপস্থিতিতে ও ইশারা-ইঙ্গিতে চলেছে রায় লেখার প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার বর্তমান বাস্তবতা বোঝার জন্য গত দু’সপ্তাহের আমার দেশ পত্রিকার অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট। এ মুহূর্তে আমি যখন লিখছি, সে পর্যন্ত জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির অভিযোগ সংবলিত সংবাদটি প্রকাশের অপরাধে আমার ও আমার সহকর্মীদের বিরুদ্ধে ২২টি মানহানি মামলা হয়েছে। একুশটি মামলায় সমন জারি হলেও একটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা পর্যন্ত জারি করা হয়েছে। কুড়িটি জেলায় দায়েরকৃত মামলার প্রতিটিতে বাদীরা হলেন সেই জেলার আওয়ামী লীগ অথবা অঙ্গসংগঠনের প্রভাবশালী নেতারা। একটি অভিযোগে এতগুলো মামলা দায়ের করা যায় কিনা এবং মামলা হলেও সেগুলো আদালত আমলে নিতে পারেন কিনা, এর জবাব আইন বিশেষজ্ঞদেরই ভালো জানার কথা। যাই হোক, এ দু’সপ্তাহের মধ্যেই বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মানহানিকর উক্তি করার জন্য ছাত্রলীগ সভাপতিসহ অন্যান্য নেতার বিরুদ্ধে বিএনপি নেতাকর্মীরা একাধিক মানহানি মামলা করলেও কোথাও ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয় সেই মামলা আমলে নেননি। সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে বাগেরহাটে। সেখানে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে যুদ্ধাপরাধী সম্বোধন করার অভিযোগে জনৈক ব্যক্তি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মানহানি মামলা দায়ের করেছিলেন। নিম্ন আদালতের মাননীয় বিচারক বাদীকে সংক্ষুব্ধ বিবেচনা না করে সেই মামলা আইনসঙ্গতভাবেই আমলে না নিয়ে যে খারিজ করে দিয়েছেন, সেটা প্রত্যাশিত হওয়ায় উল্লেখ করার মতো কোনো সংবাদ নয়। সংবাদ হচ্ছে পরবর্তী আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যেই বাগেরহাটের করিত্কর্মা পুলিশ বাদীর পিতাকে গ্রেফতার করে ৫৪ ধারায় কারাগারে নিক্ষেপ করেছে। আমার দেশ তো সরকারের বিবেচনায় ভয়ঙ্কর শত্রুপক্ষ। এই পত্রিকায় তো নাকি কেবল মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যমূলক সংবাদ পরিবেশন করা হয়। সরকারবান্ধব প্রথম আলো থেকে সংশ্লিষ্ট সংবাদটি উদ্ধৃত করছি। ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী গ্রেফতার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স
-
প্রথম পাতা


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


