ভারতের সঙ্গে বিদ্যুত্ বিনিময়ের সিদ্ধান্ত
স্টাফ রিপোর্টার
ভারতের সঙ্গে বিদ্যুত্ বিনিময় সংক্রান্ত প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। এ প্রস্তাবে ভারত থেকে সম্মত দামে বিদ্যুত্ আমদানি ও রফতানি এবং যৌথ অর্থায়নে বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফরের সময় এ সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হবে। চুক্তির স্মারকে আরও বলা হয়েছে, ত্রিপুরায় নির্মাণাধীন বিদ্যুেকন্দ্র থেকে ভারত সন্ধ্যায় বাংলাদেশকে বিদ্যুত্ দেবে। আর বাংলাদেশ ওই বিদ্যুত্ দিনের বেলায় ভারতকে দেবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এদিকে ভারতের সঙ্গে আসন্ন বিদ্যুত্ বিনিময় চুক্তির বিভিন্ন দিক ও ভারত কর্তৃক অতীতে সম্পাদিত বিভিন্ন চুক্তি লঙ্ঘনের উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাংলাদেশের ন্যাশনাল গ্রিডকে ভারত ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যেই এগোচ্ছে। কেননা ভারত ২০২০ সালের মধ্যে ত্রিপুরা, আসাম, মিজোরাম, মনিপুরসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ত্রিপুরায় ২০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের কাজ ভারত সরকার এরই মধ্যে শুরু করেছে। অতিরিক্ত বিদ্যুত্ বাংলাদেশের ন্যাশনাল গ্রিড ব্যবহার করে ভারতের কেন্দ্রসহ অন্যান্য রাজ্যে নেয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গতকাল মন্ত্রিপরিষদ সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্টান্ডিং বিটুইন গভর্নমেন্ট অব দ্য পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ অ্যান্ড গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অন কো-অপারেশন ইন পাওয়ার সেক্টর শিরোনামের প্রস্তাবটি অনুমোদন দেয়া হয়। মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ প্রস্তাব উত্থাপনের আগে আইন মন্ত্রণালয় থেকে এটি ভেটিং (যাচাই-বাছাই) করিয়ে নেয়া হয়। মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের জানান, দেশের বিদ্যুত্ সঙ্কট কাটাতে সরকার প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে বিদ্যুত্ আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে দেশে বিদ্যুতের গড় উত্পাদন প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুত্ ঘাটতি মেটানোই সরকারের মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্যকে সামনে নিয়েই বিদ্যুত্ বিনিময় সমঝোতা স্মারকের প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হয়েছে। এতে সম্মত মূল্যে ভারত থেকে বিদ্যুত্ কেনা যাবে।
ভারত থেকে বিদ্যুত্ আমদানির সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সাবেক বিদ্যুত্ সচিব আ.ন.হ আখতার হোসেন আমার দেশকে বলেন, ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের সমঝোতা চুক্তি হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভারতের সঙ্গে আমাদের অতীত চুক্তির রেকর্ডগুলো ভালো নয়। বিভিন্ন বিষয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যত চুক্তি হয়েছে তার সবই ভারত ভঙ্গ করেছে। বিদ্যুত খাত নিয়ে ভারতের সঙ্গে চুক্তি করার ব্যাপারে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। ভারতের সীমান্ত এলাকা বহরমপুর, জলপাইগুড়ি ও বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, জলপাইগুড়ি এলাকা নির্ধারণ করে ভারতের সঙ্গে চুক্তি হলে আমরা নেপাল ও ভুটান থেকেও বিদ্যুত্ আমদানির সুযোগ পাব। এজন্য বাংলাদেশকে চুক্তি করতে হলে ওই বিষয়টিও উল্লেখ করতে হবে। কিন্তু জলপাইগুড়ি বাদ দিয়ে ভারত বরাবরই বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকা দিয়ে বিদ্যুত্ রফতানির ব্যাপারে বেশি আগ্রহী। তিনি বলেন, ভারত আগামী ২০২০ সালের মধ্যে তাদের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে হাইড্রোলিক পাওয়ার প্লান্টসহ বিভিন্ন প্লান্টের মাধ্যমে কম খরচে ৫০ থেকে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। উত্পাদিত বিদ্যুতের ২০ ভাগও তাদের ওইসব অঞ্চলে চাহিদা নেই। ফলে অতিরিক্ত বিদ্যুত্ তারা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে তাদের পশ্চিমাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে নিতে আগ্রহী। বর্তমানে ভারতের সঙ্গে বিদ্যুত্ বিনিময় চুক্তির উদ্দেশ্য যদি এটাই হয় তাহলে ভারত বাংলাদেশকে বিদ্যুত্ ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করবে। এ থেকে বাংলাদেশ কোনো সুবিধা পাবে না।
বর্তমানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত একজন সাবেক বিদ্যুত্ সচিব আমার দেশকে বলেন, ভারতের সঙ্গে বিদ্যুত্ বিনিময় চুক্তি করে বাংলাদেশের লাভবান হওয়ার কিছুই দেখি না। এটি একটি আইওয়াশ ছাড়া কিছুই নয়। বরং ভারত বাংলাদেশের ন্যাশনাল গ্রিডকে তাদের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ পাবে। তিনি তার সময়ের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, আমি যখন বিদ্যুত্ সচিব ছিলাম তখনও ভারত জোর চেষ্টা করেছিল এ ধরনের একটি চুক্তি করার জন্য। আমরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এর কোনো সুফল খুঁজে পাইনি। আমরা দেখেছি, নয়াদিল্লিসহ ভারতের সবগুলো শহরেই বিদ্যুত্ ঘাটতি রয়েছে। অনেক শহর রয়েছে যেখানে নিয়মিত বিদ্যুত্ নেই। এর ওপর ভারতে শিল্পের দু্রত বিকাশ ঘটছে। ভারতে উত্পাদনের তুলনায় চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশের চেয়ে ভারতের পাওয়ার ট্যারিফ বেশি। এ অবস্থায় ভারত আমাদের দেশের মূল্যে কোন যুক্তিতে বিদ্যুত্ বিক্রি করবে আমার বুঝে আসছে না। মূলত ভারত তাদের বিদ্যুত্ চাহিদা মেটানোর জন্য বাংলাদেশের পূর্বে অবস্থিত রাজ্যগুলোতে জলবিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। ওই বিদ্যুত্ তারা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে সংক্ষিপ্ত রুট ধরে তাদের মূল শহরগুলোতে নিতে চায়। বাংলাদেশের বিদ্যুত্ ঘাটতির জন্য ভারত বিদ্যুত্ দেবে, এটা কোনো পাগলে বিশ্বাস করলেও আমি করতে পারি না। কেননা আমি বিদ্যুত্ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এসেছি। তিনি বলেন, আপনারা নিশ্চয় দেখেছেন, ছিটমহল বিনিময় চুক্তি ও গঙ্গার পানিচুক্তিসহ অতীতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার যত চুক্তি করেছে, তার সবগুলো থেকেই বাংলাদেশ চুক্তি মোতাবেক ন্যায্য পাওনা অদ্যাবধি পায়নি।
এদিকে বিদ্যুত্ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মেমোরেন্ডামের কিছু অংশ উল্লেখ করে আমার দেশকে জানান, মূলত ভারতের সঙ্গে বিদ্যুত্ বিনিময়ের বিষয়ে একটি দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা শুরু করতে যাচ্ছি আমরা। এর মধ্যে দু’দেশের মধ্যে এ ব্যাপারে সচিব পর্যায়ের প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। একটি যৌথ কারিগরি বিশেষজ্ঞ দলও গঠন করা হয়েছে। এই বিশেষজ্ঞ দল দু’দেশের অবস্থান বিবেচনা করে কোন পথে সঞ্চালন লাইন স্থাপন করা যায় তা নির্ধারণ করবে। সহযোগিতার অংশ হিসেবে ভারতের বাড়তি বিদ্যুত্ বাংলাদেশে আনা হবে। আবার প্রয়োজনে বাংলাদেশের বিদ্যুত্ ভারতে রফতানি করা হবে। সন্ধ্যায় ভারতের ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুত্ নিয়ে আসবে। আবার দিনের বেলায় বা শীতের সময় যখন বাড়তি বিদ্যুত্ থাকবে তখন বাংলাদেশ তা ভারতে রফতানি করবে। বাংলাদেশ ভারতের ত্রিপুরায় একটি বিদ্যুত্ কেন্দ্রে বিনিয়োগ করার প্রস্তাব দেবে। এর মধ্যেই ভারতের ওই কেন্দ্রের ২৩ ভাগ বাংলাদেশ বিনিয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ত্রিপুরায় ৭৫০ মেগাওয়াট উত্পাদন ক্ষমতার বিদ্যুত্ কেন্দ্রে স্থাপন করা হচ্ছে। এই কেন্দ্র স্থাপনের যে যন্ত্রাংশ তা ভারত বাংলাদেশের আশুগঞ্জ দিয়ে নিয়ে যেতে চায়। বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র থেকে ছোট ছোট জাহাজে করে আশুগঞ্জ দিয়ে নদীপথে ত্রিপুরায় যন্ত্রাংশ নিতে চায় ভারত। ত্রিপুরার বিদ্যুত্ বাংলাদেশে গড়ে আড়াই রুপিতে বিক্রি করতে চায় ভারত। তবে দামের বিষয়ে এখনও কোনো কিছু ঠিক হয়নি। আরও পরে আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে চূড়ান্ত হবে। ত্রিপুরা থেকে ১৭ কিলোমিটার ট্রান্সমিশন লাইন হলেই বাংলাদেশ-ভারত বিদ্যুত্ বিনিময় করা যাবে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিদ্যুত্ আনতে গেলে বাহরামপুর থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার বিদ্যুত্ ট্রান্সমিশন লাইন করতে হবে। তিনি বলেন, এর আগে ২০০৭ সালেও ভারতের সঙ্গে বিদ্যুত্ বিনিময় করার একটি আলোচনা সরকার শুরু করেছিল।
গতকালের মন্ত্রিসভায় উপরোক্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াও বিদ্যুত্ খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণ বৃদ্ধির নীতিমালা-২০০৮ সংশোধনের প্রস্তাব এবং স্মল এন্টারপ্রাইজ ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টকে (এসইডিপি) অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি অগ্রণী এসএমই ফাইন্যান্সিং কোম্পানি লিমিটেড গঠনের বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়।
সূত্র জানায়, বৈঠকে ভারতীয় হাইকমিশনের নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে একাধিক মন্ত্রী বিষয়টি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, প্রত্যেক দেশেই বিদেশের মিশন থাকে এবং ওই মিশনভুক্ত এলাকা সে দেশের সার্বভৌমের মধ্যে পড়ে। এ হিসাবে সেখানে যে কোনো দেশই তাদের নিরাপত্তার জন্য নিজস্ব বাহিনী রাখতে পারে। ঢাকায় মার্কিন অ্যাম্বেসিসহ অন্যান্য দেশের মিশনেও এরূপ ব্যবস্থা রয়েছে। ভারতের হাইকমিশন বলেই কিছু পত্রিকা এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করছে। প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের আগে পত্রিকাগুলো এসব খবর প্রচার করে একটি প্রপাগান্ডা ছড়াতে চাচ্ছে। আর আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই বিষয়টি সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এদিকে ভারতের সঙ্গে আসন্ন বিদ্যুত্ বিনিময় চুক্তির বিভিন্ন দিক ও ভারত কর্তৃক অতীতে সম্পাদিত বিভিন্ন চুক্তি লঙ্ঘনের উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাংলাদেশের ন্যাশনাল গ্রিডকে ভারত ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যেই এগোচ্ছে। কেননা ভারত ২০২০ সালের মধ্যে ত্রিপুরা, আসাম, মিজোরাম, মনিপুরসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ত্রিপুরায় ২০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের কাজ ভারত সরকার এরই মধ্যে শুরু করেছে। অতিরিক্ত বিদ্যুত্ বাংলাদেশের ন্যাশনাল গ্রিড ব্যবহার করে ভারতের কেন্দ্রসহ অন্যান্য রাজ্যে নেয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গতকাল মন্ত্রিপরিষদ সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্টান্ডিং বিটুইন গভর্নমেন্ট অব দ্য পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ অ্যান্ড গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অন কো-অপারেশন ইন পাওয়ার সেক্টর শিরোনামের প্রস্তাবটি অনুমোদন দেয়া হয়। মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ প্রস্তাব উত্থাপনের আগে আইন মন্ত্রণালয় থেকে এটি ভেটিং (যাচাই-বাছাই) করিয়ে নেয়া হয়। মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের জানান, দেশের বিদ্যুত্ সঙ্কট কাটাতে সরকার প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে বিদ্যুত্ আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে দেশে বিদ্যুতের গড় উত্পাদন প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুত্ ঘাটতি মেটানোই সরকারের মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্যকে সামনে নিয়েই বিদ্যুত্ বিনিময় সমঝোতা স্মারকের প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হয়েছে। এতে সম্মত মূল্যে ভারত থেকে বিদ্যুত্ কেনা যাবে।
ভারত থেকে বিদ্যুত্ আমদানির সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সাবেক বিদ্যুত্ সচিব আ.ন.হ আখতার হোসেন আমার দেশকে বলেন, ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের সমঝোতা চুক্তি হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভারতের সঙ্গে আমাদের অতীত চুক্তির রেকর্ডগুলো ভালো নয়। বিভিন্ন বিষয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যত চুক্তি হয়েছে তার সবই ভারত ভঙ্গ করেছে। বিদ্যুত খাত নিয়ে ভারতের সঙ্গে চুক্তি করার ব্যাপারে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। ভারতের সীমান্ত এলাকা বহরমপুর, জলপাইগুড়ি ও বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, জলপাইগুড়ি এলাকা নির্ধারণ করে ভারতের সঙ্গে চুক্তি হলে আমরা নেপাল ও ভুটান থেকেও বিদ্যুত্ আমদানির সুযোগ পাব। এজন্য বাংলাদেশকে চুক্তি করতে হলে ওই বিষয়টিও উল্লেখ করতে হবে। কিন্তু জলপাইগুড়ি বাদ দিয়ে ভারত বরাবরই বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকা দিয়ে বিদ্যুত্ রফতানির ব্যাপারে বেশি আগ্রহী। তিনি বলেন, ভারত আগামী ২০২০ সালের মধ্যে তাদের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে হাইড্রোলিক পাওয়ার প্লান্টসহ বিভিন্ন প্লান্টের মাধ্যমে কম খরচে ৫০ থেকে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। উত্পাদিত বিদ্যুতের ২০ ভাগও তাদের ওইসব অঞ্চলে চাহিদা নেই। ফলে অতিরিক্ত বিদ্যুত্ তারা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে তাদের পশ্চিমাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে নিতে আগ্রহী। বর্তমানে ভারতের সঙ্গে বিদ্যুত্ বিনিময় চুক্তির উদ্দেশ্য যদি এটাই হয় তাহলে ভারত বাংলাদেশকে বিদ্যুত্ ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করবে। এ থেকে বাংলাদেশ কোনো সুবিধা পাবে না।
বর্তমানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত একজন সাবেক বিদ্যুত্ সচিব আমার দেশকে বলেন, ভারতের সঙ্গে বিদ্যুত্ বিনিময় চুক্তি করে বাংলাদেশের লাভবান হওয়ার কিছুই দেখি না। এটি একটি আইওয়াশ ছাড়া কিছুই নয়। বরং ভারত বাংলাদেশের ন্যাশনাল গ্রিডকে তাদের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ পাবে। তিনি তার সময়ের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, আমি যখন বিদ্যুত্ সচিব ছিলাম তখনও ভারত জোর চেষ্টা করেছিল এ ধরনের একটি চুক্তি করার জন্য। আমরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এর কোনো সুফল খুঁজে পাইনি। আমরা দেখেছি, নয়াদিল্লিসহ ভারতের সবগুলো শহরেই বিদ্যুত্ ঘাটতি রয়েছে। অনেক শহর রয়েছে যেখানে নিয়মিত বিদ্যুত্ নেই। এর ওপর ভারতে শিল্পের দু্রত বিকাশ ঘটছে। ভারতে উত্পাদনের তুলনায় চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশের চেয়ে ভারতের পাওয়ার ট্যারিফ বেশি। এ অবস্থায় ভারত আমাদের দেশের মূল্যে কোন যুক্তিতে বিদ্যুত্ বিক্রি করবে আমার বুঝে আসছে না। মূলত ভারত তাদের বিদ্যুত্ চাহিদা মেটানোর জন্য বাংলাদেশের পূর্বে অবস্থিত রাজ্যগুলোতে জলবিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। ওই বিদ্যুত্ তারা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে সংক্ষিপ্ত রুট ধরে তাদের মূল শহরগুলোতে নিতে চায়। বাংলাদেশের বিদ্যুত্ ঘাটতির জন্য ভারত বিদ্যুত্ দেবে, এটা কোনো পাগলে বিশ্বাস করলেও আমি করতে পারি না। কেননা আমি বিদ্যুত্ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এসেছি। তিনি বলেন, আপনারা নিশ্চয় দেখেছেন, ছিটমহল বিনিময় চুক্তি ও গঙ্গার পানিচুক্তিসহ অতীতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার যত চুক্তি করেছে, তার সবগুলো থেকেই বাংলাদেশ চুক্তি মোতাবেক ন্যায্য পাওনা অদ্যাবধি পায়নি।
এদিকে বিদ্যুত্ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মেমোরেন্ডামের কিছু অংশ উল্লেখ করে আমার দেশকে জানান, মূলত ভারতের সঙ্গে বিদ্যুত্ বিনিময়ের বিষয়ে একটি দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা শুরু করতে যাচ্ছি আমরা। এর মধ্যে দু’দেশের মধ্যে এ ব্যাপারে সচিব পর্যায়ের প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। একটি যৌথ কারিগরি বিশেষজ্ঞ দলও গঠন করা হয়েছে। এই বিশেষজ্ঞ দল দু’দেশের অবস্থান বিবেচনা করে কোন পথে সঞ্চালন লাইন স্থাপন করা যায় তা নির্ধারণ করবে। সহযোগিতার অংশ হিসেবে ভারতের বাড়তি বিদ্যুত্ বাংলাদেশে আনা হবে। আবার প্রয়োজনে বাংলাদেশের বিদ্যুত্ ভারতে রফতানি করা হবে। সন্ধ্যায় ভারতের ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুত্ নিয়ে আসবে। আবার দিনের বেলায় বা শীতের সময় যখন বাড়তি বিদ্যুত্ থাকবে তখন বাংলাদেশ তা ভারতে রফতানি করবে। বাংলাদেশ ভারতের ত্রিপুরায় একটি বিদ্যুত্ কেন্দ্রে বিনিয়োগ করার প্রস্তাব দেবে। এর মধ্যেই ভারতের ওই কেন্দ্রের ২৩ ভাগ বাংলাদেশ বিনিয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ত্রিপুরায় ৭৫০ মেগাওয়াট উত্পাদন ক্ষমতার বিদ্যুত্ কেন্দ্রে স্থাপন করা হচ্ছে। এই কেন্দ্র স্থাপনের যে যন্ত্রাংশ তা ভারত বাংলাদেশের আশুগঞ্জ দিয়ে নিয়ে যেতে চায়। বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র থেকে ছোট ছোট জাহাজে করে আশুগঞ্জ দিয়ে নদীপথে ত্রিপুরায় যন্ত্রাংশ নিতে চায় ভারত। ত্রিপুরার বিদ্যুত্ বাংলাদেশে গড়ে আড়াই রুপিতে বিক্রি করতে চায় ভারত। তবে দামের বিষয়ে এখনও কোনো কিছু ঠিক হয়নি। আরও পরে আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে চূড়ান্ত হবে। ত্রিপুরা থেকে ১৭ কিলোমিটার ট্রান্সমিশন লাইন হলেই বাংলাদেশ-ভারত বিদ্যুত্ বিনিময় করা যাবে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিদ্যুত্ আনতে গেলে বাহরামপুর থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার বিদ্যুত্ ট্রান্সমিশন লাইন করতে হবে। তিনি বলেন, এর আগে ২০০৭ সালেও ভারতের সঙ্গে বিদ্যুত্ বিনিময় করার একটি আলোচনা সরকার শুরু করেছিল।
গতকালের মন্ত্রিসভায় উপরোক্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াও বিদ্যুত্ খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণ বৃদ্ধির নীতিমালা-২০০৮ সংশোধনের প্রস্তাব এবং স্মল এন্টারপ্রাইজ ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টকে (এসইডিপি) অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি অগ্রণী এসএমই ফাইন্যান্সিং কোম্পানি লিমিটেড গঠনের বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়।
সূত্র জানায়, বৈঠকে ভারতীয় হাইকমিশনের নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে একাধিক মন্ত্রী বিষয়টি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, প্রত্যেক দেশেই বিদেশের মিশন থাকে এবং ওই মিশনভুক্ত এলাকা সে দেশের সার্বভৌমের মধ্যে পড়ে। এ হিসাবে সেখানে যে কোনো দেশই তাদের নিরাপত্তার জন্য নিজস্ব বাহিনী রাখতে পারে। ঢাকায় মার্কিন অ্যাম্বেসিসহ অন্যান্য দেশের মিশনেও এরূপ ব্যবস্থা রয়েছে। ভারতের হাইকমিশন বলেই কিছু পত্রিকা এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করছে। প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের আগে পত্রিকাগুলো এসব খবর প্রচার করে একটি প্রপাগান্ডা ছড়াতে চাচ্ছে। আর আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই বিষয়টি সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
-
প্রথম পাতা


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া

