মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট : কালো তালিকাভুক্ত কোম্পানির মাধ্যমে তৈরির অভিযোগ
অর্থনৈতিক রিপোর্টার
মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) তৈরির টেন্ডার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিয়মনীতি উপেক্ষা করে অদক্ষ, বিতর্কিত ও কালো তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে উন্নত প্রযুক্তির এই পাসপোর্ট প্রস্তুত ও সরবরাহের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকারের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল টেন্ডারে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কার্যাদেশ দেয়ার উদ্যোগে বিভিন্ন মহলে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, ১৬ সেপ্টেম্বর প্রতিবছর ২২ লাখ পাসপোর্ট সরবরাহে আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করা হয়। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ২৭টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র কিনলেও ৮টি কোম্পানি তাদের দরপত্র জমা দেয়। এদের মধ্যে প্রাথমিক বাছাইয়ের পর চারটি প্রতিষ্ঠানকে বিবেচনায় আনা হয়। প্রথমে টেন্ডার কমিটি এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে দুটিকে বাছাই করে। এগুলো হলো ফ্লোরা টেলিকম এবং আইআরআইএস (ইরিস) মালয়েশিয়া। কিন্তু কমিটি অন্য কোম্পানিগুলোকে কেন অযোগ্য ঘোষণা করা হলো বা কোন যোগ্যতায় এ দুটো কোম্পানিকে বাছাই করা হলো, তার কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। অভিযোগ পাওয়া গেছে, কমিটি আসলে কোনো কোম্পানির ফাইলই পর্যালোচনা করেনি বা তথ্যাদি খতিয়ে দেখেনি। কারণ ফ্লোরা টেলিকম এবং ইরিস মালয়েশিয়াকে কাজ দেয়া হবে বলে অনেকটা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। তবে এর মধ্যে ফ্লোরার পক্ষে সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের অনেকের তদবির ছিল বলে জানা যায়।
টেন্ডারে অংশ নেয়া প্রতিটি কোম্পানিই প্রায় ১০ কোটি টাকা সিকিউরিটি মানি জমা দিয়ে টেন্ডারে অংশ নিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছে। প্রশ্ন উঠেছে, কাউকে কোনো কিছু না জানিয়ে, কারও ফাইল না খুলেই যদি একটি কোম্পানিকে কাজ দেয়া হয় তা হলে টেন্ডার ডাকার দরকার ছিল কি? যেভাবে একটি কোম্পানিকে কাজ দেয়া হচ্ছে তাতে পিপিপি আইন ভঙ্গ করা হয় এবং বাকি কোম্পানিগুলো যদি বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করে দেয় তাহলে পুরো প্রকল্পই ঝুলে যাবে। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের জনশক্তি বাজারেও বিরূপ প্রভাব পড়বে।
এ ব্যাপারে এমআরপি’র প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেফায়েত উল্লাহ আমার দেশ’কে বলেন, আমরা সরকারি ক্রয় নীতিমালা অনুসরণ ও যথাযথ নিয়মনীতি সব কিছু যাচাই-বাছাই করেই এই দুই কোম্পানিকে নির্বাচন করেছি। তিনি অনিয়মের সব অভিযোগ নাকচ করে বলেন, টেন্ডারের শর্ত অর্জন করতে না পারায় এবং সুনির্দিষ্ট কারণেই অন্য কোম্পানিগুলোকে বাদ দেয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বাদ যাওয়া কোম্পানিগুলোর কেউ যদি আমাদের কাছে আসে, তাহলে আমরা তাদের বাদ দেয়ার কারণ জানিয়ে দেব।
এদিকে ফ্লোরা টেলিকম এবং ইরিস মালয়েশিয়ার অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। বিগত সময়ে বাংলাদেশে ফ্লোরা টেলিকম ব্যাংকিং খাতের বড় বড় কাজ নিয়ে কোনোটাই সম্পন্ন করতে পারেনি। এতে বাংলাদেশ ব্যাংক ফ্লোরা টেলিকমকে কালো তালিকাভুক্ত করে এবং রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার অভিযোগে কোম্পানিকে জরিমানা করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এ নিয়ে তখন বিশ্বখ্যাত মার্কিন টিভি চ্যানেল সিএনএনে ফলাও করে সংবাদ প্রচার হয়েছিল।
অপর কোম্পানি ইরিস মালয়েশিয়া সম্পর্কেও চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ সম্পাদন করতে না পারা এবং পাসপোর্টে ডিজিটাল ছবি সংযোজন করতে না পারায় তুর্কি সরকার এই কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে। জানা যায়, কোম্পানি সেখানে দু’বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছিল।
ইরিসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান পিডব্লিউপিডব্লিউ ২০০৮ থেকে পাসপোর্ট তৈরি করে আসছে। কোম্পানিটি লিথুনিয়ায় পাসপোর্ট তৈরির দায়িত্ব পেলেও তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরবরাহ করতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। টেন্ডারের শর্তানুযায়ী ২৫ মিলিয়ন পাসপোর্ট সরবরাহ করার কথা থাকলেও তারা মাত্র ০.৫ মিলিয়ন পাসপোর্ট সরবরাহ করেছে। দরপত্রের শর্তানুযায়ী তারা ৫টি দেশে তাদের ডিভাইস বা প্রিন্টার সরবরাহ করেছে দাবি করলেও তার প্রমাণ দিতে পারেনি।
এদিকে দরপত্রে ইরিস যেসব অনিয়ম করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেগুলো হলো টেন্ডারের জন্য নির্ধারিত ফরমে কোম্পানিটি পাসপোর্ট বুকলেট দামের উল্লেখ করেনি। অথচ আরএফপিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, প্রাইস শিডিউলে দামের কথা উল্লেখ না থাকলে ধরে নিতে হবে তা টেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। পাসপোর্ট ছাপাতে টেন্ডারে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংক্রিয় প্রিন্টার মেশিনের কথা উল্লেখ থাকলেও ইরিস পৃথকভাবে হাইলাম নামের একটি লেমিনেটরের কথা উল্লেখ করেছে। আবার হাইলাম লেমিনেটিং মেশিনের স্পিড অনেক কম। শুধু তাই নয়, আলাদা মেশিনে লেমিনেশন করতে গেলে ছাপানো হয়ে যাবে হাউব্রিড বা সঙ্কর প্রজাতির, যা আরএফপির চাহিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। টেন্ডারে ইউভি প্রিন্টিং ক্যাপাসিটির কথা উল্লেখ থাকলেও ইরিস এমন একটি মেশিনের নাম উল্লেখ করেছে, যাতে ইউভি প্রিন্টিং ক্যাপাসিটি নেই। টেন্ডারে যে কোরের সুইসের কথা বলা হয়েছে, ইরিস সেই মানের কোরের সুইস কোট করেনি। টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটি এ বিচ্যুতি ঠিকই শনাক্ত করেছে। তবে শর্ত ভঙ্গের স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি ইরিস। টেন্ডারের শর্ত মোতাবেক আড়াই কোটি পাসপোর্ট সরবরাহ করেছে, এমন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চারে কাজ করার কথা উল্লেখ থাকলেও ইরিসের জয়েন্ট ভেঞ্চার প্রতিষ্ঠানের পূর্বরেকর্ড নেই। আবার আরএফপি মতে, তারা পাসপোর্টের নমুনাও সরবরাহ করতে পারেনি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, অবশ্যই এই টেন্ডার পর্যালোচনা করে সব সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যাসহ প্রকাশ করা হলে অনেক কিছুই বের হয়ে আসবে। তা না হলে এই প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে, দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। কালো তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই কাজ দেয়া হলে বিদেশিরা কাজ করতে আসবে না।
প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ আগামী এপ্রিল মাসের মধ্যে সব দেশে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট ও ভিসা প্রচলনের জন্য সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। এমনিতেই সরকার একেবারে শেষ সময়ে এসে এই প্রকল্পের কাজ হাতে নিয়েছে, তার ওপর অদক্ষ এবং বিতর্কিত কোম্পানির হাতে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হলে বহির্বিশ্বে জনশক্তি বাজারেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এপ্রিল মাসের পর সময়সীমা না বাড়ালে বাংলাদেশের বর্তমান পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশ যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত একনেকের বৈঠকে ২৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ কোটি ৭৪ লাখ সাধারণ ও ১০ লাখ জরুরি পাসপোর্ট ছাপানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২০১৪ সালের জুন মাসের মধ্যে এ প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
জানা যায়, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মাধ্যমে পাঠযোগ্য পাসপোর্ট ও ভিসা তৈরির কাজের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির প্রস্তাব এখন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেলেই তা ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হবে।
জানা যায়, সাত সদস্যের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠান ইরিসের অংশীদার পোলিশ সিকিউরিটি কোম্পানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের জেমাল্টোর অংশীদার ফ্লোরা টেলিকমকে বিবেচনার প্রস্তাব দেয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই দুটি প্রতিষ্ঠান ১০ লাখ পাসপোর্ট তৈরি করতে দরপত্র জমা দেয়। এতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ ইশি কর্পোরেশন ২৬৭ কোটি ২৯ লাখ এবং ফ্লোরা টেলিকম ৩৪৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকায় দর চূড়ান্ত করে। এতে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিটি পাসপোর্টের দাম ৭শ’ থেকে ৮শ’ টাকার মধ্যে পড়বে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে পাসপোর্ট বইয়ের সংখ্যা পরে বাড়বে বলে জানা যায়। দরপত্রে প্রতিবছর ২২ লাখ করে তিন বছরে ৬৬ লাখ পাসপোর্ট বই সরবরাহের উল্লেখ রয়েছে। পাসপোর্ট বই ছাড়া প্রকল্পের অধীনে ঢাকার মতো যশোরে একটি বিকল্প তথ্য ব্যাংক গড়ে তোলা হবে। যে কোনো দুর্যোগে ঢাকার তথ্য বিনষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে বিকল্প হিসেবে যশোর স্টেশনের তথ্য ব্যাংক ব্যবহার করা যাবে। এছাড়া ৩৪টি পাসপোর্ট প্রদানকারী কার্যালয় ও ৩২টি ইমিগ্রেশন বন্দর এটার সঙ্গে যুক্ত থাকবে। পাশাপাশি ৭০টি পুলিশ ভেরিফিকেশন কেন্দ্র ও ৬৫টি দূতাবাস এই নেটওয়ার্কে সংযুক্ত থাকবে। এ প্রকল্পের মধ্যে ভিসার জন্য বিশেষ ধরনের সঙ্কেতযুক্ত স্টিকার সরবরাহ ও সংযুক্ত রয়েছে।
এদিকে জানা গেছে, কোরিয়া সরকারের একটি প্রস্তাবও বাংলাদেশ বিবেচনা করছে। দেশটি নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষের নিশ্চয়তা দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছে একটি প্রস্তাব দিয়েছে। কোরিয়া সরকারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘কোরিয়া প্রিন্টিং, সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড আইডি কার্ড অপারেটিং কর্পোরেশন’ (কমপ্রেকো) স্বল্পব্যয়ে প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করার কথা বলেছে। এখন বাংলাদেশ সরকার রাজি হলে এ চুক্তি এক সপ্তাহের মধ্যে করা সম্ভব বলে জানিয়েছে কোরিয়া সরকার। জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক উপদেষ্টার বিরোধিতার কারণে কোরিয়া সরকারের এ প্রস্তাব থমকে আছে।
জানা গেছে, সরকার উন্নত প্রযুক্তির এই প্রকল্পটি দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছে সেনাবাহিনীকে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেফায়েত উল্লাহকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তবে পরবর্তীতে টেন্ডার বিজয়ী কোম্পানিকে দু’বছরের জন্য প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হবে।
জানা গেছে, ১৬ সেপ্টেম্বর প্রতিবছর ২২ লাখ পাসপোর্ট সরবরাহে আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করা হয়। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ২৭টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র কিনলেও ৮টি কোম্পানি তাদের দরপত্র জমা দেয়। এদের মধ্যে প্রাথমিক বাছাইয়ের পর চারটি প্রতিষ্ঠানকে বিবেচনায় আনা হয়। প্রথমে টেন্ডার কমিটি এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে দুটিকে বাছাই করে। এগুলো হলো ফ্লোরা টেলিকম এবং আইআরআইএস (ইরিস) মালয়েশিয়া। কিন্তু কমিটি অন্য কোম্পানিগুলোকে কেন অযোগ্য ঘোষণা করা হলো বা কোন যোগ্যতায় এ দুটো কোম্পানিকে বাছাই করা হলো, তার কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। অভিযোগ পাওয়া গেছে, কমিটি আসলে কোনো কোম্পানির ফাইলই পর্যালোচনা করেনি বা তথ্যাদি খতিয়ে দেখেনি। কারণ ফ্লোরা টেলিকম এবং ইরিস মালয়েশিয়াকে কাজ দেয়া হবে বলে অনেকটা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। তবে এর মধ্যে ফ্লোরার পক্ষে সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের অনেকের তদবির ছিল বলে জানা যায়।
টেন্ডারে অংশ নেয়া প্রতিটি কোম্পানিই প্রায় ১০ কোটি টাকা সিকিউরিটি মানি জমা দিয়ে টেন্ডারে অংশ নিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছে। প্রশ্ন উঠেছে, কাউকে কোনো কিছু না জানিয়ে, কারও ফাইল না খুলেই যদি একটি কোম্পানিকে কাজ দেয়া হয় তা হলে টেন্ডার ডাকার দরকার ছিল কি? যেভাবে একটি কোম্পানিকে কাজ দেয়া হচ্ছে তাতে পিপিপি আইন ভঙ্গ করা হয় এবং বাকি কোম্পানিগুলো যদি বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করে দেয় তাহলে পুরো প্রকল্পই ঝুলে যাবে। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের জনশক্তি বাজারেও বিরূপ প্রভাব পড়বে।
এ ব্যাপারে এমআরপি’র প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেফায়েত উল্লাহ আমার দেশ’কে বলেন, আমরা সরকারি ক্রয় নীতিমালা অনুসরণ ও যথাযথ নিয়মনীতি সব কিছু যাচাই-বাছাই করেই এই দুই কোম্পানিকে নির্বাচন করেছি। তিনি অনিয়মের সব অভিযোগ নাকচ করে বলেন, টেন্ডারের শর্ত অর্জন করতে না পারায় এবং সুনির্দিষ্ট কারণেই অন্য কোম্পানিগুলোকে বাদ দেয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বাদ যাওয়া কোম্পানিগুলোর কেউ যদি আমাদের কাছে আসে, তাহলে আমরা তাদের বাদ দেয়ার কারণ জানিয়ে দেব।
এদিকে ফ্লোরা টেলিকম এবং ইরিস মালয়েশিয়ার অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। বিগত সময়ে বাংলাদেশে ফ্লোরা টেলিকম ব্যাংকিং খাতের বড় বড় কাজ নিয়ে কোনোটাই সম্পন্ন করতে পারেনি। এতে বাংলাদেশ ব্যাংক ফ্লোরা টেলিকমকে কালো তালিকাভুক্ত করে এবং রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার অভিযোগে কোম্পানিকে জরিমানা করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এ নিয়ে তখন বিশ্বখ্যাত মার্কিন টিভি চ্যানেল সিএনএনে ফলাও করে সংবাদ প্রচার হয়েছিল।
অপর কোম্পানি ইরিস মালয়েশিয়া সম্পর্কেও চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ সম্পাদন করতে না পারা এবং পাসপোর্টে ডিজিটাল ছবি সংযোজন করতে না পারায় তুর্কি সরকার এই কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে। জানা যায়, কোম্পানি সেখানে দু’বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছিল।
ইরিসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান পিডব্লিউপিডব্লিউ ২০০৮ থেকে পাসপোর্ট তৈরি করে আসছে। কোম্পানিটি লিথুনিয়ায় পাসপোর্ট তৈরির দায়িত্ব পেলেও তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরবরাহ করতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। টেন্ডারের শর্তানুযায়ী ২৫ মিলিয়ন পাসপোর্ট সরবরাহ করার কথা থাকলেও তারা মাত্র ০.৫ মিলিয়ন পাসপোর্ট সরবরাহ করেছে। দরপত্রের শর্তানুযায়ী তারা ৫টি দেশে তাদের ডিভাইস বা প্রিন্টার সরবরাহ করেছে দাবি করলেও তার প্রমাণ দিতে পারেনি।
এদিকে দরপত্রে ইরিস যেসব অনিয়ম করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেগুলো হলো টেন্ডারের জন্য নির্ধারিত ফরমে কোম্পানিটি পাসপোর্ট বুকলেট দামের উল্লেখ করেনি। অথচ আরএফপিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, প্রাইস শিডিউলে দামের কথা উল্লেখ না থাকলে ধরে নিতে হবে তা টেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। পাসপোর্ট ছাপাতে টেন্ডারে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংক্রিয় প্রিন্টার মেশিনের কথা উল্লেখ থাকলেও ইরিস পৃথকভাবে হাইলাম নামের একটি লেমিনেটরের কথা উল্লেখ করেছে। আবার হাইলাম লেমিনেটিং মেশিনের স্পিড অনেক কম। শুধু তাই নয়, আলাদা মেশিনে লেমিনেশন করতে গেলে ছাপানো হয়ে যাবে হাউব্রিড বা সঙ্কর প্রজাতির, যা আরএফপির চাহিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। টেন্ডারে ইউভি প্রিন্টিং ক্যাপাসিটির কথা উল্লেখ থাকলেও ইরিস এমন একটি মেশিনের নাম উল্লেখ করেছে, যাতে ইউভি প্রিন্টিং ক্যাপাসিটি নেই। টেন্ডারে যে কোরের সুইসের কথা বলা হয়েছে, ইরিস সেই মানের কোরের সুইস কোট করেনি। টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটি এ বিচ্যুতি ঠিকই শনাক্ত করেছে। তবে শর্ত ভঙ্গের স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি ইরিস। টেন্ডারের শর্ত মোতাবেক আড়াই কোটি পাসপোর্ট সরবরাহ করেছে, এমন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চারে কাজ করার কথা উল্লেখ থাকলেও ইরিসের জয়েন্ট ভেঞ্চার প্রতিষ্ঠানের পূর্বরেকর্ড নেই। আবার আরএফপি মতে, তারা পাসপোর্টের নমুনাও সরবরাহ করতে পারেনি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, অবশ্যই এই টেন্ডার পর্যালোচনা করে সব সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যাসহ প্রকাশ করা হলে অনেক কিছুই বের হয়ে আসবে। তা না হলে এই প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে, দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। কালো তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই কাজ দেয়া হলে বিদেশিরা কাজ করতে আসবে না।
প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ আগামী এপ্রিল মাসের মধ্যে সব দেশে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট ও ভিসা প্রচলনের জন্য সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। এমনিতেই সরকার একেবারে শেষ সময়ে এসে এই প্রকল্পের কাজ হাতে নিয়েছে, তার ওপর অদক্ষ এবং বিতর্কিত কোম্পানির হাতে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হলে বহির্বিশ্বে জনশক্তি বাজারেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এপ্রিল মাসের পর সময়সীমা না বাড়ালে বাংলাদেশের বর্তমান পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশ যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত একনেকের বৈঠকে ২৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ কোটি ৭৪ লাখ সাধারণ ও ১০ লাখ জরুরি পাসপোর্ট ছাপানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২০১৪ সালের জুন মাসের মধ্যে এ প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
জানা যায়, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মাধ্যমে পাঠযোগ্য পাসপোর্ট ও ভিসা তৈরির কাজের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির প্রস্তাব এখন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেলেই তা ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হবে।
জানা যায়, সাত সদস্যের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠান ইরিসের অংশীদার পোলিশ সিকিউরিটি কোম্পানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের জেমাল্টোর অংশীদার ফ্লোরা টেলিকমকে বিবেচনার প্রস্তাব দেয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই দুটি প্রতিষ্ঠান ১০ লাখ পাসপোর্ট তৈরি করতে দরপত্র জমা দেয়। এতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ ইশি কর্পোরেশন ২৬৭ কোটি ২৯ লাখ এবং ফ্লোরা টেলিকম ৩৪৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকায় দর চূড়ান্ত করে। এতে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিটি পাসপোর্টের দাম ৭শ’ থেকে ৮শ’ টাকার মধ্যে পড়বে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে পাসপোর্ট বইয়ের সংখ্যা পরে বাড়বে বলে জানা যায়। দরপত্রে প্রতিবছর ২২ লাখ করে তিন বছরে ৬৬ লাখ পাসপোর্ট বই সরবরাহের উল্লেখ রয়েছে। পাসপোর্ট বই ছাড়া প্রকল্পের অধীনে ঢাকার মতো যশোরে একটি বিকল্প তথ্য ব্যাংক গড়ে তোলা হবে। যে কোনো দুর্যোগে ঢাকার তথ্য বিনষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে বিকল্প হিসেবে যশোর স্টেশনের তথ্য ব্যাংক ব্যবহার করা যাবে। এছাড়া ৩৪টি পাসপোর্ট প্রদানকারী কার্যালয় ও ৩২টি ইমিগ্রেশন বন্দর এটার সঙ্গে যুক্ত থাকবে। পাশাপাশি ৭০টি পুলিশ ভেরিফিকেশন কেন্দ্র ও ৬৫টি দূতাবাস এই নেটওয়ার্কে সংযুক্ত থাকবে। এ প্রকল্পের মধ্যে ভিসার জন্য বিশেষ ধরনের সঙ্কেতযুক্ত স্টিকার সরবরাহ ও সংযুক্ত রয়েছে।
এদিকে জানা গেছে, কোরিয়া সরকারের একটি প্রস্তাবও বাংলাদেশ বিবেচনা করছে। দেশটি নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষের নিশ্চয়তা দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছে একটি প্রস্তাব দিয়েছে। কোরিয়া সরকারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘কোরিয়া প্রিন্টিং, সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড আইডি কার্ড অপারেটিং কর্পোরেশন’ (কমপ্রেকো) স্বল্পব্যয়ে প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করার কথা বলেছে। এখন বাংলাদেশ সরকার রাজি হলে এ চুক্তি এক সপ্তাহের মধ্যে করা সম্ভব বলে জানিয়েছে কোরিয়া সরকার। জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক উপদেষ্টার বিরোধিতার কারণে কোরিয়া সরকারের এ প্রস্তাব থমকে আছে।
জানা গেছে, সরকার উন্নত প্রযুক্তির এই প্রকল্পটি দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছে সেনাবাহিনীকে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেফায়েত উল্লাহকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তবে পরবর্তীতে টেন্ডার বিজয়ী কোম্পানিকে দু’বছরের জন্য প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হবে।
-
প্রথম পাতা


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


