Amardesh
আজঃ ঢাকা, রোববার ২৭ ডিসেম্বর ২০০৯, ১৩ পৌষ ১৪১৬, ৭ মহররম ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

আইনের তোয়াক্কা না করে নির্যাতন

ফকরুল আলম কাঞ্চন
আইনের তোয়াক্কা না করে রিমান্ডের নামে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চলছেই। এক্ষেত্রে হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। জিজ্ঞাসাবাদের নামে রিমান্ডে নেয়া মানেই যেন আসামিকে বর্বর নির্যাতন করা। অথচ যাদের রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে তাদের সবাই অপরাধী নয়। এখন রিমান্ড ব্যবহার হচ্ছে রাজনৈতিক নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে। অতিসম্প্রতি গোয়েন্দা সংস্থা সিআইডির বিরুদ্ধে রিমান্ডে নিয়ে আসামিদের বর্বর নির্যাতন চালানোর গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। রিমান্ডে যাওয়া ভুক্তভোগীরা নির্যাতনের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। আদালতে রিমান্ডফেরত একাধিক ব্যক্তি স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য সিআইডি কর্মকর্তাদের নিষ্ঠুর নির্যাতনের কথা জানিয়েছেন। পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ মামলায় জড়িত কয়েক আসামি ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, রিমান্ডে নিয়ে তাদের স্পর্শকাতর স্থানে বৈদ্যুতিক শক দেয়া, বেধড়ক পিটিয়ে হাত-পায়ের হাড় ভেঙে দেয়া, গিরায় গিরায় হাতুড়ি দিয়ে পেটানো, অসুস্থ অবস্থায় রিমান্ডে নিয়ে আগের জখমে পুনরায় আঘাত করা, শরীর থেকে মোটা সিরিঞ্জ দিয়ে রক্ত বের করার মতো অমানুষিক ও বর্বর নির্যাতন চালানো হয়েছে। নির্যাতনের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, রিমান্ডে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে অনেক।
বিডিআর বিদ্রোহের পর প্রথম ৭ মাসে ৪৫ জওয়ানের মৃত্যু হয়েছে। বিডিআর কর্তৃপক্ষ বলেছে, হৃদরোগ, আত্মহত্যা, উচ্চ রক্তচাপ ও নানা অসুস্থতায় তাদের মৃত্যু হয়েছে। এসব অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ফরেনসিক বিভাগ লাশের ময়নাতদন্তের রিপোর্টে দুই জওয়ানের মৃত্যুকে ‘হত্যা’ বলে উল্লেখ করেছে। এরা হলেন হাবিলদার মহিউদ্দিন ও নায়েক মোবারক হোসেন।
নায়েক মোবারক হোসেন মারা যান ২২ মার্চ। তিনি কর্মরত ছিলেন কক্সবাজারে। বিডিআর সপ্তাহ উপলক্ষে গত ১৮ ফ্রেব্রুয়ারি পিলখানায় আসেন। বিদ্রোহের ঘটনার পর অন্য জওয়ানদের সঙ্গে তাকেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কব্জায় নেয়া হয়। মোবারকের সুরতহাল রিপোর্টে বলা হয়েছে, মৃত ব্যক্তির দেহের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। বিশেষ করে তার দুই হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলের নখের নিচে রক্তাক্ত জখম ছিল। বুকেও দাগ দেখা যায়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আঘাতজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। গত পহেলা জুন এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি নিউমার্কেট থানায় পাঠানো হয়েছে।
হাবিলদার মহিউদ্দিন মারা যান ৬ মে। তিনি চট্টগ্রামের হালিশহর ২৮ রাইফেল ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন। বিদ্রোহের সময় তিনি পিলখানায় ছিলেন না। গত ২২ মার্চ র্যাব সদস্যরা তাকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার করে ঢাকায় আনে। মহিউদ্দিনের সুরতহাল রিপোর্ট এবং ময়নাতদন্ত রিপোর্টেও তার শরীরে মারাত্মক জখমের চিহ্ন ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। এই দুই জওয়ানের মৃত্যুকে অস্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে চিহ্নিত করে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিউমার্কেট থানা পুলিশ এই হত্যা মামলা দুটি তদন্ত করছে।
সম্প্রতি সিআইডি বিডিআর পিলখানার মামলা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা, চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলাসহ বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ও স্পর্শকাতর মামলার তদন্ত করছে। এই মামলাগুলো তদন্ত করতে গিয়ে সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান, ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে রিমান্ডে নিয়েছে সিআইডি। অধিকাংশ ব্যক্তিকেই মামলার তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে রিমান্ডে নেয়া হয়। কিন্তু সিআইডি তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নানাভাবে নির্যাতন চালিয়েছে। তাদের নির্যাতন থেকে সাবেক সেনা কর্মকর্তা, সাবেক মন্ত্রী-এমপিরাও রেহাই পাননি।
বিডিআর বিদ্রোহ মামলার তদন্তের জন্য সিআইডি পিলখানার ভেতরে একটি অস্থায়ী ক্যাম্প করে। জওয়ানদের রিমান্ডে নিয়ে বর্বর নির্যাতন চালানো হয়। সিআইডির পাশাপাশি একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থারও ক্যাম্প করা হয় পিলখানায়। নির্যাতনের মাত্রা এতই ভয়াবহ ছিল যে, বিডিআর জওয়ানদের আর্তচিত্কার ও আহাজারি শুনে কয়েকশ’ গজ দূরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কুয়েত মৈত্রী হলের ছাত্রীদের রাতের ঘুম ভেঙেছে। এ ব্যাপারে ছাত্রীরা কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করে বলেছে, তারা রাতে ঘুমাতে পারেনি।
নির্যাতনের মাত্রা কতটা ভয়াবহ ছিল তা রিমান্ডফেরত কয়েক জওয়ানের স্বীকারোক্তি থেকেই জানা যায়। এছাড়াও ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দি প্রত্যাহারের সময়ও তারা আদালতে উল্লেখ করেছেন, টিএফআই সেলে কীভাবে নির্যাতন করে তাদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়। আসামি পক্ষে বিডিআর মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোঃ সুলতান মাহমুদ জানান, বিডিআর জওয়ানরা রিমান্ডে বিভীষিকাময় যে বর্বর নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সুস্থ-সবল জওয়ানদের রিমান্ড শেষে হাত-পা ভাঙা অবস্থায় আদালতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও জানান, কারাতে খেলায় সাফ চ্যাম্পিয়ন, অলিম্পিকে অংশ নেয়া ও বিডিআরের স্বর্ণপদক জয়ী জওয়ান মাহমুদুল হাসানকে উপর্যুপরি রিমান্ডে রেখে বর্বর নির্যাতন চালানো হয়েছে। তার শরীর থেকে সিরিঞ্জ দিয়ে রক্ত বের করে নেয়ার কথাও বলেছেন মাহমুদ। স্লাইড রেঞ্জ ও স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে তার নখ তোলা হয়। পুরো শরীরে গরম পানি ঢালা হয়। উলঙ্গ করে হাত-পা বেঁধে লটকে রাখা হয়। তার লজ্জাস্থানে বার বার আঘাত করা হয়, শরীরের প্রত্যেক হাড়ের জোড়ায় হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে মারাত্মক জখম করা হয়। আইনজীবী আদালতে আরও বলেছেন, ওইসব নির্যাতন গুয়েন্তেনামো বে কারাগারের নির্যাতনকেও হার মানায়।
১৯৭২ সালে বিডিআরে যোগ দেয়া কয়েক বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈনিককেও বর্বর নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের কারণে তাদের শরীরের প্রতিটি অস্থিসন্ধি নীল হয়ে গেছে। বিডিআরের জওয়ান, পাচক, ঝাড়ুদার, সাধারণ সদস্য, যারা ছুটিতে ছিলেন কাউকেই নির্যাতন থেকে রেহাই দেয়া হয়নি। কোনো সুস্থ জওয়ান ৪-৫ দিন রিমান্ডে থেকে ফেরত এলেই তিনি আর দাঁড়াতেও পারেননি। হাড়গোড় ভাঙা অবস্থায় তাদের আদালতে হাজির করা হয়।
রিমান্ডে নিয়ে বিডিআর জওয়ানদের নির্যাতন করে ও ভয়ভীতির মাধ্যমে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি আদায় করা হয়। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রেমে শতাধিক বিডিআর জওয়ান ওই জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেন। তারা আদালতে রিমান্ডের বর্বর নির্যাতনের কথা উল্লেখ করেন। যা আদালত মামলার নথিভুক্ত করে রাখেন।
শুধু বিডিআরের মামলাই নয়, অন্যান্য আটক উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদেরও রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালানো হয়। গত ৮ অক্টোবর হাইকোর্টে সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর জামিন আবেদনের শুনানির কথা ছিল। ওই দিন রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সময় চাওয়া হলে শুনানি মুলতবি করা হয়। ওই সময় নির্দেশনা উপেক্ষা করে রিমান্ডে নেয়ায় হাইকোর্ট অ্যাটর্নি জেনারেল ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলকে তিরস্কার করেন।
হাইকোর্ট বিচারপতি অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘আপনারা শুনানিতে সময় নেবেন, আবার রিমান্ডে নিয়ে টর্চার করবেন—এটা কোন ধরনের আচরণ? মানুষকে লিবার্টি দেয়ার জন্য আমরা এখানে বসেছি। আপনি আজ রাষ্ট্রপক্ষে আছেন। কাল অন্যপক্ষেও থাকতে পারেন। আপনাকেও টর্চার করা হতে পারে। এটা ভালো নয়। আপনাদের ক্ষমতা আছে। আমাদেরও পেটান। এভাবে চালাতে চাইলে হাইকোর্ট উঠিয়ে দিন।’
এদিকে বিডিআর বিদ্রোহ মামলা, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল কাহহার আকন্দের কাছে রিমান্ডে নির্যাতনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি নির্যাতনের কথা অস্বীকার করে বলেন, আইন অনুযায়ী সব করা হচ্ছে। আদালতে জবানবন্দি দিয়ে বিডিআর জওয়ানরা নির্যাতনের কথা বলে স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করার আবেদন করছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, কর্নেল (অব.) ফারুকও স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করেছেন। এ জন্য তার ফাঁসির আদেশ থেমে থাকেনি।
এদিকে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের কঠোর সমালোচনা করেছেন দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক। তিনি বলেন, রিমান্ডে নিয়ে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের অর্থ হচ্ছে ঘটনার সত্যতা ও ঘটনার সঙ্গে অভিযুক্তের সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া। কিন্তু বর্তমানে রিমান্ডে নিয়ে আসামিদের যেভাবে নির্যাতন করা হয়, তাতে জনগণের মনে একটি ধারণা নিশ্চিত হয়ে গেছে যে, রিমান্ডে নেয়ার অর্থই হচ্ছে দমন, পীড়ন ও নির্যাতন করা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, একজন লোককে দিনের পর দিন রিমান্ডে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে। অথচ পরবর্তীতে দেখা গেল আদালত থেকেই ওই ব্যক্তি সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে বের হয়ে এলো। অথবা রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর জানা গেল, ঘটনার সঙ্গে ওই ব্যক্তির বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততাও নেই।
আদালতের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে ড. মালিক বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের নামে রিমান্ডে নিয়ে যাতে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে নির্যাতনের সুযোগ সরকার না পায়, সে কারণেই হাইকোর্টে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। ওই মামলার শুনানি শেষে আদালত বেশকিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। ওই নির্দেশনার আলোকে কোনো আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হলে জিজ্ঞাসাবাদের সময় অবশ্যই তার একজন আইনজীবী ও একজন আত্মীয়কে সঙ্গে রাখতে হবে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কোনো ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা যাবে না। কারাগারে একটি পৃথক কক্ষে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। ২০০৩ সালে আদালত এ নির্দেশনা দিলেও কোনো সরকারই তা অনুসরণ করেনি। তিনি আরও বলেন, একজন আসামির ব্যাপারে প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হলেই কেবল পুলিশ তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চাইতে পারে। এছাড়া কোনো অবস্থায়ই পুলিশ রিমান্ড চেয়ে আসামিকে আদালতে সোপর্দ করতে পারে না। এটা সংবিধানে সংরক্ষিত মানবাধিকারের লংঘন। একই সঙ্গে জাতিসংঘ মানবাধিকার সনদসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর গৃহীত সনদেরও পরিপন্থী।
অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম : সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, রিমান্ডকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে সরকার। আর এ সুযোগে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও রিমান্ডকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করছে। নিরীহ ও নিরপরাধ ব্যক্তিদের আটক করে রিমান্ডের নামে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে দিনের পর দিন আটক রেখে সীমাহীন নির্যাতন চালাচ্ছে। বর্তমানে আমাদের দেশে রিমান্ডের যে অপব্যবহার হচ্ছে, তা কোনো সভ্য সমাজে চলতে পারে না। এটা মানবাধিকারের চরম লংঘন।
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?