ডাকাতিয়ায় বিশাল বালুচর : ইরি-বোরো চাষ ব্যাহত
এমএসআই জসিম, লাকসাম থেকে
কুমিল্লা দক্ষিণাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের দুঃখ একমাত্র ডাকাতিয়া নদী। বর্তমানে ডাকাতিয়া নদীটি পুনঃখনন বা সংস্কারের অভাবে কুমিল্লা ও চাঁদপুর জেলার বিপুল সংখ্যক দরিদ্র কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নে প্রধান অন্তরায়। সংস্কারের অভাবে নাব্য হ্রাস পাওয়ায় নদীবক্ষে মাইলের পর মাইলজুড়ে বালুচর জেগে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নদীতে পানির অভাবে সেচযন্ত্র অচল। মাঝি-মাল্লারা বেকার। ইরি বোরো চাষ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার দক্ষিণাঞ্চল লাকসামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ডাকাতিয়া নদী দু’কূলের বিপুল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি জরিপে জানা যায়, অত্র অঞ্চলের বেশিরভাগ এলাকায় প্রায় ৪০ হাজার একর জমির ফসল এখনও প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে এ অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষকে প্রকৃতির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। নদীটি সংস্কার ও পুনঃখননের অভাবে প্রতিবছর বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ডাকাতিয়া নদীতে পলিমাটি জমে ভরাট, মাইলের পর মাইল চর পড়ে আছে। বৃহত্তর লাকসাম উপজেলার উত্তরাঞ্চল বাগমারা বাজার থেকে দক্ষিণাঞ্চলের চিতোষীর শান্তিরবাজার খেয়াঘাট পর্যন্ত ৭০/৭৫ কিলোমিটার পর্যন্ত শুকনো মৌসুমে প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ে। ফলে পৌষ ও মাঘ মাসে যাতায়াত ও মালামাল পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে প্রয়োজনীয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ না থাকায় বর্ষা মৌসুমে একটু বৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢলে ডাকাতিয়ার দু’কূলের হাজার হাজার একর জমির ফসল প্লাবিত হয়ে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ডাকাতিয়ার মাধ্যমে লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, ভোলা, হাতিয়া, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেটসহ দেশের বড় বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, বার্মার যুগ যুগ ধরে নৌ-যোগাযোগ ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রীয় পটপরিবর্তনে বিভিন্ন প্রতিকূলতার শিকার হয়ে বৈদেশিক নৌচলাচল বন্ধ হলেও দেশের বড় বড় বাণিজ্য বন্দরের সঙ্গে নৌ চলাচল অব্যাহত ছিল। বিগত ১৫/১৬ বছর যাবত ডাকাতিয়া নদীটি ঐতিহ্য হারালে সেসব বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে লাকসামের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তাছাড়া এ নদীতে পানি না থাকায় কয়েক হাজার মত্স্যজীবী ও মাঝি-মাল্লা বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। লাকসাম একটি জনবহুল এলাকা। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ ডাকাতিয়া নদীতে মাছ ধরে এবং মজুরি খেটে তাদের জীবিকা নির্বাহ করত। প্রয়োজনীয় পানি না থাকার কারণে আবাদকৃত ফসলের উত্পাদন শেষ পর্যন্ত ৬০/৭০ ভাগ হ্রাস পায়। এছাড়া জেলার দক্ষিণাঞ্চলের জনসংখ্যা অনুযায়ী উত্পাদনযোগ্য ফসলি জমিতে ১২ মাসের মধ্যে মাত্র ৭/৮ মাসের ফসল উত্পাদন সম্ভব। কিন্তু ডাকাতিয়া নদীর বর্তমান পরিস্থিতিতে মাত্র ২/৩ মাসের ফসল ঘরে তোলাও সম্ভব হবে না। বরং প্রতিবছর ৬০/৬৫ ভাগ খাদ্য অন্য এলাকা থেকে আমদানি করতে হয়। সর্বনাশা ডাকাতিয়ার করাল গ্রাস থেকে ফসল রক্ষা পেলে অত্র অঞ্চলের খাদ্য ঘাটতি পূরণ করে প্রতি বছর লাখ লাখ টাকার বিভিন্ন ফসল অন্য স্থানে রফতানি করা মোটেই কঠিন হতো না। অধিক ফসল উত্পাদনের স্বার্থে ডাকাতিয়া নদী সংস্কার, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ কাম রেগুলেটর ও স্লুইসগেট নির্মাণের দাবিতে বহু যুগ ধরে আন্দোলন চলছে। ডাকাতিয়া নদী সংস্কার, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ কাম রেগুলেটর ও স্লুইসগেট নির্মাণ করা হলে কুমিল্লার দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় ৪০ হাজার একর জমিতে ফসল উত্পাদন সম্ভব হবে।
-
জাতীয়


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


