Amardesh
আজঃ ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৪ ডিসেম্বর ২০০৯, ১০ পৌষ ১৪১৬, ৬ মহররম ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

ক্লাস সেভেনের ফার্স্ট বয়

আরিফ হাসান
কাঁধে ব্যাগ। গলায় ঝুলানো টম অ্যান্ড জেরির ছবিঅলা পানির পট। চোখে মোটা ফ্রেমের কালো চশমা। গায়ে ব্লু শার্ট, পরনে সাদা হাফপ্যান্ট। দু’পায়ে কুচকুচে কালো লম্বা মোজা। একই রংয়ের পেগাসাস ক্যাডস।
স্কুলে আজই প্রথম পা রাখলো তমাল। মাঠ পেরিয়ে স্কুলের বারান্দায় উঠে এলো সে। হাঁটতে হাঁটতে মেয়েদের কমনরুম পেছনে ফেলে হেড স্যারের রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো। দরজার পাশে টুল পেতে বসে থাকা ডাকপিয়নের মতো পোশাক পরা এক লোককে দেখে বলল, ‘এক্সকিউজ মি স্যার। ক্লাস সেভেনের রুমটা কোন দিকে?’ ভোলাভালা চেহারার ছেলেটির মুখে স্যার ডাক শুনে বেশ লজ্জা পেল দফতরিটি। মুখ কাচুমাচু করে টুল ছেড়ে উঠতে উঠতে সে বলল, ‘আমি স্যার নাগো বাবু, দফতরি। বীরেন দফতরি। ক্লাস সেভেনের রুম তালাশ করছো তো? আরেকটু সামনে আগোয়ে যাও, পাইয়ে যাবা।’
‘মে আই কাম ইন, স্যার?’
‘ইয়েস, গেট ইন।’ বই থেকে মুখ না তুলেই জবাব দিলেন শওকত স্যার।
দুই সারির মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় কেউ একজন তমালকে টিটকারি মেরে বললো, ‘কিরে গাব্বু, আসার আগে দোদন খেয়ে এসেছিস তো?’ আরেকজন বললো, ‘তোর নাম কিরে গাবলু? হোঁদলকুত্কুত্ নাকি হাবলু মিয়া?’ কাউকে কিছুই বললো না তমাল। চুপচাপ পেছনের বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়লো।
কাকে কীভাবে সাইজ করতে হয় তমাল সেটা ভালো করেই জানে। সবাই যখন শওকত স্যারের লেকচার শোনায় ব্যস্ত, ঠিক তখনি একটা অদ্ভুত কাজ করলো সে। চোখের পলকে ভ্যানিশ হয়ে গেল। যে ছেলে দুটো ওকে গাব্বু আর হোঁদলকুত্কুত্ বলেছে, তাদের ব্যাগে ঢুকে হোম ওয়ার্ক করা অংকের খাতা গায়েব করে দিল।
রোল কল শেষ হতেই হোম ওয়ার্ক দেখতে চাইলেন স্যার। একে একে সবাই হোম ওয়ার্ক দেখালেও ওরা কেউ দেখাতে পারলো না। হোম ওয়ার্ক দেখাতে না পারায় কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে তো হলোই, আচ্ছামত ধোলাইও খেতে হলো ওদের। ওদের মানে টিঙ্কু আর সিফাতের কথা বলছি। তমালকে টিটকারি মেরেছে ওরাই।
সিফাত ক্লাসের ফার্স্ট বয়। তার দোস্তি হওয়ার কথা সেকেন্ড বা থার্ড বয়ের সঙ্গে। কিন্তু দোস্তিটা হয়েছে লাস্ট বয় টিঙ্কুর সঙ্গে। কারণ একটাই। দুষ্টুমিতে দু’জনই সমান সমান।
স্কুলের পাশেই একটা ছাতিমগাছ। টিফিনের সময় তমাল এই গাছটার নিচে এসে বসলো। ব্যাগ খুলে বিজ্ঞান বইটা নিয়ে পড়তে যাবে, এমন সময় টিঙ্কু ও সিফাত এসে বললো, ‘এই যে বিদ্যাসাগর, এখান থেকে ফোটো। এই গাছতলায় আমরা ছাড়া আর কেউ বসতে পারে না, বুঝলে?’ বলেই তমালের বইয়ের ব্যাগটা টান মেরে দূরে ফেলে দিলো।
তমালের সঙ্গে দাদাগিরি ফলানো? ব্যাপারটা একেবারেই মানা যায় না। কী করা যায়! খুব বেশি সময় ভাবতে হলো না। চোখের পলকে হাওয়া হয়ে গেল সে। টিঙ্কু ও সিফাত আলাপ জমানোর ফাঁকেই এক ঝাঁক কাক হয়ে গেল। ছাতিমগাছটার ডালে বসে বেসুরো গলায় গান ধরল—কা কা... মাথার ওপর এতো কাকের এমন ডাক কাহাতক সহ্য হয়। ডান হাত নেড়ে ধেই ধেই করে উঠল সিফাত—হেই যা, যাহ...। সিফাতের কথায় কাকেরা কানই দিলো না। উল্টো বিচ্ছিরি এক কাজ করে বসলো। সিফাতের মাথা-ঘাড় পেঁচিয়ে একটুখানি রুপালি রংয়ের তরল ছেড়ে দিলো।
পরের দিনও ছাতিম তলায় এলো সিফাত ও টিঙ্কু। কিন্তু বসা হলো না। আজও এক ঝাঁক কাক বসে আছে গাছটায়। গায়ে ওপর থেকে তরল পড়ার ভয়ে ওরা অন্য দিকে চলে গেল। শিক্ষাটা তাহলে ভালোই হয়েছে। ওরা চলে যেতেই কাক থেকে আবার মানুষ হয়ে গেল তমাল। গাছতলায় বসে বই পড়তে লাগলো।
ব্যাকরণের পাতা স্যার ক্লাসে ঢুকলে সবাই কেমন চুপসে যায়। সিফাতের মতো ফার্স্ট বয়রাও গুটিপোকার মতো এক কোণায় লুকিয়ে থাকে। আজও লুকাতে চেয়েছিল। কিন্তু সেটা আর হলো না। তমাল হঠাত্ নাই হয়ে গেল। টিঙ্কুর বগলের নিচে ঢুকে কুট করে কাতুকুতু দিয়ে দিলো। পাশেই ছিল সিফাত। টিঙ্কু ভেবেছে কাজটা সিফাতই করেছে। কাতুকুতুর জবাবে সিফাতের মাথায় জোরসে একটা গাট্টা মেরে দিলো টিঙ্কু। আচানক গাট্টা খেয়ে মেজাজটা বিগড়ে গেল সিফাতের। টিঙ্কুর পেট সই করে একটা রাম গুঁতা মেরে বললো, তুই আমার মাথায় চাট্টি মারলি কেন? টিঙ্কু বললো—বারে, তুই যে আমার বগলে কাতুকুতু দিলি, তাতে বুঝি দোষ নেই। শুরু হয়ে গেলো ধুমচে হাতাহাতি আর হইচই।
খেলাটা জমে গেছে দেখে নিজের জায়গায় ফিরে এলো তমাল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মানুষের রূপ ধরে নিজের বেঞ্চে বসে পড়লো।
পেছনের বেঞ্চে হইচই শুনে রোল কলের খাতা থেকে মাথা তুললেন পাতা স্যার। সিফাত ও টিঙ্কুর হাতাহাতি দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো তার। দু’জনকে সামনে ডেকে এনে দারুণ এক শাস্তি দিলেন। ওরা একজন আরেকজনের কান ধরে সবার সামনে বিদ্যুতের খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে রইল।
প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় সবাইকে অবাক করে দিয়ে ফার্স্ট হলো সেই হাবাগোবা তমাল। ওর ফার্স্ট হওয়ার ব্যাপারটা আর সবাই মেনে নিলেও সিফাত মানতে পারলো না। টিঙ্কুর সঙ্গে মিলে একটা ঘোঁট পাকালো সে। বাড়ি ফেরার পথে হাবলু তমালকে সাইজ করার প্লান করলো।
তমাল রোজ বটগাছটার পাশ দিয়েই বাড়ি ফেরে। আজও ফিরছিল। কিন্তু বটগাছটার কাছে আসতেই একটা ভুতুড়ে কা ঘটলো। কোত্থেকে যেন দুটো ঢিল এসে সামনে পড়লো। ঢিল দেখে মেজাজটা বিগড়ে গেল ওর।
কী, ভূতের সঙ্গে মামদোগিরি? দেখাচ্ছি মজা। বলেই চোখের পলকে মানুষ থেকে বিশাল এক দৈত্য হয়ে গেল সে। মাঠের দুই পাশে দুই পা দিয়ে তালগাছের সমান লম্বা হয়ে দাঁড়িয়ে জোরসে এক হাঁক ছাড়লো। তার হাঁক শুনে মাটি এমনভাবে কেঁপে উঠলো, মনে হলো এখনি বটগাছটা উপড়ে পড়ে যাবে।
তমালের কা দেখে ওদের তো চক্ষু চড়কগাছ। এতো দিন একটা ভূতের ছেলে মানুষ সেজে ওদের সঙ্গে লেখাপড়া করেছে!
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?