Amardesh
আজঃ ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৪ ডিসেম্বর ২০০৯, ১০ পৌষ ১৪১৬, ৬ মহররম ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --

অন্য এক জীবনের গল্প

মাহফুজার রহমান
ছোট ছিপছিপে শ্যামলা মেয়েটির নাম রুপালি (ছদ্ম নাম)। ঈদের দিন ফুটপাতে বেশ শুকনো মুখে বসে আছে। তারই মতো আরও কয়েকজন পলিথিন ব্যাগ, চটের ব্যাগ নিয়ে কোরবানির গোশত সংগ্রহে নেমে পড়বে। কুড়িগ্রামের কোনো এক গ্রামে তার জন্ম। জমি-জমা না থাকায় অভাবের সংসারে তাকেসহ মাকে বাবা তালাক দেয়। মা তাকে নিয়ে ঢাকায় আসে। ফার্মগেটের কোনো এক বাসায় ঝিয়ের কাজ নেয়। তখন তার বয়স ৪/৫ বছর। একদিন দুপুরে একা বিস্কুট কিনতে রাস্তায় নেমে বাসায় ফেরার পথ হারিয়ে ফেলে। তারপর থেকে পথে পথে হাত পেতে খাওয়া আর রাতে ফুটপাতে ঘুমানো। এভাবেই অনিরাপদভাবে বেড়ে উঠছে, এখন তার বয়স ১৪/১৫। এখনও সব বাড়িতে কোরবানির কাটাকাটি শেষ হয়নি। মায়াকাড়া চেহারার মেয়েটিকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম কোথায় থাকে, বাসাবাড়িতে কাজ করবে কিনা এসব। কিন্তু পরক্ষণেই সে যা জানাল, তাতে আমার বিস্ময়ের শেষ থাকল না।
এই মেয়েটির মিথ্যে বলার ভঙ্গিমা দেখে দেশের প্রতিষ্ঠিত কোনো অভিনেত্রীও বিস্মিত হবেন। গরগর করে নাটকের মুখস্থ স্কিপ্ট থেকে গরিব মা-বাবার মেয়ের ঢাকায় কাজের সন্ধানে আসা এবং বাড়ি ভুলে পথশিশু হওয়ার সে গল্প আমিও বিশ্বাস করে নিয়েছিলাম। একগাল হাসি দিয়ে রুপালি আমাকে আবার কাছে ডেকে নিয়ে আমার আগ্রহের কারণ জেনে নেয়। বলে আসল পরিচয় আর নিজের বিবরণ যে মিথ্যা দিয়েছে সে কথা। কেন এমন করলে জানতে চাইলে বলে আরও মজার কিছু কথা। ঢাকায় পথেঘাটে মতলবের লোকের অভাব নেই। তাদের কাছে সবাই নাকি লোকদেখানো মায়া দেখাতে আসে। আছে লম্পট-লোভী আর পাচারকারী ছদ্মবেশী মানুষ। তবে তাদের হাত থেকে বাঁচতে এমন গল্প নয়। বরং যারা ঢাকায় গরিব লোকের দুঃখ পর্যটনের অংশ মনে করে, তাদের কাছে সাহায্য আর সুযোগ পেতেই এই সজ্জা। অদূরে মা ভিক্ষে করছে। বাবা চায়ের ফ্লাক্স হাতে চা বিক্রেতা নজর রাখছে। তার কাছেই জানলাম ফুটপাতের ঘুমন্ত মানুষগুলোর প্রায় সবাই তার পরিচিত। তবে এরা কেউ সবজি ট্রাকের সবজি চোর, কেউ ছিনতাইকারী, কেউ দেহব্যবসায়ী অথবা ফেরিওয়ালা। তবে কি আসলেই ফুটপাতে অসহায় দুস্থ কেউ নেই?
রুপালির সাহায্যে অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে সন্ধ্যায় কথা বলতে রাজি করানো গেল সত্যিকার দুস্থ এক মহিলাকে, নাম ঝুমকা (ছদ্মনাম)। কোলে আড়াই মাসের একটি ছেলে। সিরাজগঞ্জের এই অষ্টাদশী সন্তানসম্ভবা অবস্থায় স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে পথে নেমেছিল। অবিশ্বাস্য হলেও এই ফুটপাতের পকেটমার আর নিষিদ্ধ নারীদের সাহায্যে একটি ভালো ক্লিনিকে সন্তানের জন্ম দিয়েছে। এখন ভাবছে, ছেলেটি একটু বড় হলেই নিজেও এদের যে কোনো একটি পেশা বেছে নেবে। অনেক সাংবাদিক আর ‘ভালো মানুষ’ তার নির্যাতন আর অসহায়ত্বের কথা শুনেছে। কিন্তু কেউ কিছুই করেনি। থানার পুলিশও তার কাছে টাকা চেয়ে পায়নি বলে গায়ে হাত দিয়েছে। অর্থলোলুপ স্বামীর বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারেনি। শুধু শিশুটির জন্য রাতে দুধ-চিনির ব্যবস্থা হবে বলেই আমার সঙ্গে কথা বলছে। অশ্রাব্য গালিগালাজ মিশ্রিত ঝুমকার কথাগুলোর সত্যতা খুঁজতে কষ্ট পেতে হলো না। আমরা এই মানুষগুলোর অসহায়ত্ব নিয়ে কত শত কথা বলি, বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করি। আদতে সেগুলো কতটা বাস্তব এবং স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ তা নিয়েই এখন ভাবতে হবে। দু’তিনটি কাপড় বিলিয়ে পত্রিকায় ছবি ছাপানোর মানসিকতা সত্যি লজ্জাজনক। আর যারা ক্ষুদ্রঋণ কিংবা সেবার নামে ভণ্ডামির দোকান খুলে বসেন, তারাই এখন এদের কাছে প্রকৃত মনুষ্যত্বের দীক্ষা নিতে পারে। কারও প্রকৃত মঙ্গলের জন্য ব্যানার বা সাইনবোর্ড প্রয়োজন পড়ে না। প্রয়োজন মঙ্গল চিন্তা, প্রকত মানুষের নির্লোভ সাহায্যের হাত।
খোলস বদলে আসল রূপে আসাটাই এখন বেশি দরকার। যখন উষ্ণতা ছড়ায় বন্ধুর হাত সে হাতে ভর করে মানবতার দূত।
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?