কেমন জীবনসঙ্গী চাই
সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে মানুষের রুচি, পছন্দ, চাহিদা, মন এবং মানসিকতা। আজকের নারীর চাওয়া-পাওয়ায় পরিবর্তন ঘটবে, এটাই স্বাভাবিক। এগিয়ে যাবার পথে কেমন জীবনসঙ্গী চায় তারা, তারই খোঁজে এই আয়োজন। নানা পেশার, নানা প্রেক্ষাপটে নারীর পছন্দের মানুষের খোঁজ করেছেন— নাহিদ আনজুম সিদ্দিকী
‘জানতে পেলাম পোস্ত গিয়ে, তোমার নাকি মেয়ের বিয়ে?/ গঙ্গারামকে পাশে পেলে জানতে চাও সে কেমন ছেলে।’
আসলেই কেমন ছেলে চায় আজকালকার মেয়েরা? পাত্র হিসেবে কোন গুণাবলি একটি মেয়ের পছন্দ? আজকাল বেশিরভাগ মেয়ে প্রথম যে কথাটি বলেন তা হলো— কোয়ালিফাইড, আধুনিক মনমানসিকতার একটি ছেলে, যে তাকে বুঝবে।
সংসার দু’জনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। তাই একে সুন্দর করতে প্রয়োজন দু’জনেরই সহৃদয় ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। কর্মক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত অথবা ছাত্রী, প্রত্যেকেই প্রায় একই কথা বলেছেন তাদের অন্তরঙ্গ সাক্ষাত্কারে।
আমাকে বুঝবে, যত্নের সঙ্গে ভুলগুলো ধরিয়ে দেবে— শামীমা আক্তার ছাত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আমি তো মনে করি, সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে আমাদের বিয়ে করা উচিত। তবে পাত্র বাছাইয়ের দায়িত্বটি আমি আমার অভিভাবকের ওপর ছেড়ে দিতে চাই। এক্ষেত্রে আমার পছন্দ বা অপছন্দগুলো আমি আমার পরিবারকে জানিয়ে দেবো। একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ আমার পছন্দ—যে আমাকে বুঝবে, আমার ভুলগুলো খুব যত্নের সঙ্গে আমাকে শুধরে দেবে। আমার মতো করে আমাকে চিনতে পারবে। তাকে অবশ্যই উঁচু মনের অধিকারী হতে হবে। আমি অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল একজন পাত্রই পছন্দ করব, যে আমার স্বাভাবিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারবে। নিজেদের বোঝাপড়া না থাকলে সংসারে অশান্তি হয়। তাই আমি এমন একটি ছেলে চাইব, যে সংসার চালাতে আমার মতামতের গুরুত্ব দেবে। সাংসারিক কাজগুলোয় আমাকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করবে তা হয়তো আমি আশা করি না তবে সংসারের টুকটাক কাজগুলো করে দিলে তার স্ত্রীর সাহায্য হয়—এটা বুঝতে হবে। একজন মানুষের মধ্যে আদর্শ সব গুণাবলি হয়তো পাব না তবে কিছু তো অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। পাত্র হিসেবে আমি এমন কাউকেই চাই।
সম্মানবোধ, ভালোবাসা, সম্পর্কের প্রতি বিশ্বস্ত মানুষ চাই— নিশাত জাহান লোপা ছাত্রী, ডেফোডিল ইউনিভার্সিটি
এখনও আমাদের সমাজে ছেলেরা মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। তাই আমার মনে হয়, আমার মনের মতো ছেলে পাওয়া কঠিন। এখনও মেয়েদের চাকরি করাটাকেই সহজভাবে মেনে নিতে পারে না অনেক পরিবার। কোনো বিষয়ে তাদের মহামতের গুরুত্ব দিতে চায় না। আমি চাই যাকে বিয়ে করব, আমার প্রতি তার সম্মানবোধ, ভালোবাসা এবং সম্পর্কের যে কমিটমেন্ট তা থাকতে হবে। তাকে নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হতে হবে। আমি অনেককেই বলতে শুনেছি, মেয়েরা চাকরি করলে খারাপ হয়ে যায়। ছেলেদের এই মানসিকতা বদলানো প্রয়োজন। সবকিছু চাপিয়ে দিতে চায় এমন ছেলে আমার পছন্দ নয়। তারা সমঝোতা আর আলোচনার মাধ্যমেও সাংসারিক সমস্যা দূর করতে পারে। আমি যাকে পাত্র হিসেবে পছন্দ করব, তার সমঝোতার মানসিকতা থাকতে হবে। তাকে উদার মনের হতে হবে। তবে তার মানে এই নয় যে, সে বউ সম্পর্কে কোনো খোঁজখবরই রাখবে না। এ বিষয়গুলো আমার তো মনে হয় ঘর থেকে আসা উচিত। আজ আমার যে ভাই, কাল সে কারও স্বামী। ফলে সাহায্য করা, ছাড় দেয়া—এসব পরিবারের কাছ থেকে আসবে। একজন সহযোগিতাপূর্ণ স্বামী আমি পছন্দ করব।
পছন্দ স্মার্ট, হ্যান্ডসাম ছেলে— শান্ত ইসলাম তৃষ্ণা
ছাত্রী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনেক বিষয় বিবেচনা করতে হবে। সামগ্রিকভাবে সবার মতামতের ভিত্তিতে বিয়ে করাকে বেশি প্রাধান্য দেবো। তবে যে ছেলেকে বিয়ে করব তাকে অবশ্যই স্মার্ট, হ্যান্ডসাম হতে হবে। আমি যেহেতু পড়াশোনা করছি, ক্যারিয়ার নিয়ে আমার কিছু নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা আছে। ফলে ছেলেটিকে অবশ্যই আমার চাকরির ব্যাপারে পজিটিভ থাকতে হবে। কারণ একেবারে ঘরে বসে থাকার জন্য পড়াশোনা করিনি, তা ছেলেটিকে বুঝতে হবে। আমার সব ভালো কাজে তার সাপোর্ট থাকতে হবে। আমাকে বোঝার মনমানসিকতা থাকতে হবে। তবে বিয়ের পর বন্ধুদের বেশি সময় দেয়ার চেয়ে বউকে সময় দিতে হবে।
যৌথ পরিবার পছন্দ আমার— নওশীন হুদা অন্তরা ফাইনাল ইয়ার, রংপুর মেডিকেল কলেজ
আমি যেহেতু ডাক্তারি পড়ছি, তাই পাত্র পছন্দের ক্ষেত্রে ডাক্তার ছেলেকেই অগ্রাধিকার দেব। তবে এক্ষেত্রে ছেলেটিকে আমার প্রফেশনের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি ছাড় দিতে হবে। কারণ একজন ডাক্তারের যে কোনো সময় হাসপাতালে ডাক পড়তে পারে। বেশি রাত করে ঘরে আসতে হতে পারে। অনেক সময় দেখা যাবে, সংসারে ঠিকমত সময় দিতে পারছি না। এ বিষয়গুলো পাত্রকে বিবেচনায় রাখতে হবে। পাত্রকে উদার, আধুনিক মনমানসিকতাসম্পন্ন হতে হবে। সংসার করার ক্ষেত্রে আমি যৌথ পরিবার বেশি পছন্দ করি। কাজের কারণে আমার সন্তান যাতে একা না হয়ে পড়ে, সেজন্য যৌথ পরিবারকে অগ্রাধিকার দেব আমি। স্বামীকে আমি সহযোগী হিসেবে পেতে চাই। সেটা সংসার এবং পেশা—দুই জীবনেই।
প্রাণচঞ্চল মিশুক মানুষ পছন্দ আমার—
সায়রা তাসনিম ইসলাম করপোরেট কাস্টমস অফিসার, ওয়ারিদ
আমি আসলে পাত্র হিসেবে যেমন ছেলে চাই, আজকাল আর তেমন ছেলে পাওয়া যাবে না। আমি চাই সত্ চরিত্রের, ভালো এবং বিশ্বস্ত একটি ছেলে। তাকে অবশ্যই স্মার্ট হতে হবে। সহজে সবার সঙ্গে মিশতে পারার ক্ষমতা থাকতে হবে। কথা বলার ধরন আকর্ষণীয় হতে হবে। পাত্র হিসেবে হাসি-খুশি, প্রাণচঞ্চল ছেলেই পছন্দ করি। সাধারণত অধিকাংশ মেয়ে বিয়ের ক্ষেত্রে যে বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়, তা হলো অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। আমি যেহেতু নিজেই স্বাবলম্বী, তাই ছেলের টাকা-পয়সা বা সম্পত্তির দিকটিকে বিশেষ প্রাধান্য দিই না। আমি কিছুটা বদরাগী স্বভাবের। আমি চাই, সে হবে ঠাণ্ডা মেজাজের। আমাকে বোঝার মানসিকতা তার মধ্যে থাকা জরুরি। সংসার দু’জনের। তাই সংসারের কাজগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়া গেলে একজনের ওপর তা বোঝা হয়ে দাঁড়ায় না। চাকরি করা বা না করার কারণটি যদি যৌক্তিকভাবে আমাকে বোঝাতে পারে, তাহলে হয়তো আমি তা মেনে নেব। তবে এসব বিষয় আসলে তখনকার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
আমার মনমানসিকতা, আকাঙ্ক্ষা বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে— তারজিনা সিদ্দিকী
অ্যাকাউন্ট্যান্ট, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান
আমি যাকে পাত্র হিসেবে চাইব, তাকে অবশ্যই শিক্ষিত, স্মার্ট ও আধুনিক মনমানসিকতাসম্পন্ন হতে হবে। একটি মেয়ের মনমানসিকতা, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, চিন্তা-ভাবনা তাকে বুঝতে হবে। চিন্তা-ভাবনার সামঞ্জস্যতা থাকলে ভালো। আমি যেহেতু কর্মজীবী, তাই আমার চাকরির ক্ষেত্রে তাকে ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। বিয়ের পর চাকরি ছেড়ে দিতে হবে—এমনটা আমি চাইব না। সংসারের সব সিদ্ধান্ত দু’জনের আলোচনার মাধ্যমে নিতে হবে। তার ভেতর সন্দেহপ্রবণতা থাকলে চলবে না। সংসারে বিশ্বাস, ভালোবাসা, সমঝোতা সবকিছুরই প্রয়োজন। পাত্রকে অবশ্যই স্ত্রীর ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। পাত্র হিসেবে উদার মনের অধিকারীকে আমি বেশি প্রাধান্য দেবো। পাত্র হিসেবে একটু সংসারী ছেলেই আমার পছন্দ, যে সংসারের প্রয়োজনগুলো বুঝবে। সবক্ষেত্রে সহযোগিতাপূর্ণ একটি ছেলে আমার পছন্দ।
কোয়ালিফাইড, ভালো মনের মানুষ চাই—
দুর্গা রানী সাহা অফিসার, ব্র্যাক ব্যাংক
পাত্র হিসেবে আমি অবশ্যই একজন কোয়ালিফাইড, ভালো মানুষ চাইব, যে আমাকে বুঝবে। নির্দিষ্ট কোনো পেশা নয়; বরং সত্, যোগ্য, সমঝোতার মানসিকতা সম্পন্ন ছেলে আমার পছন্দ। আসলে ছেলেটির ফ্যামিলি এবং ছেলে নিজে যদি কেয়ারিং হয়, তাহলে সেখানে ধনী-গরিব কোনো বিষয় না। তবে ছেলেটিকে, যার সঙ্গে আমি সারা জীবন থাকব, সে যদি আমাকে না-ই বোঝে তাহলে তার সঙ্গে জীবন পার করব কেমন করে? বিয়ের পর চাকরি করব কিনা, তা আসলে তখনকার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। যদি এমন হয় যে, আমি সংসারে সময় দিতে পারছি না এবং চাকরি করা আমার জন্য জরুরি নয়, সেক্ষেত্রে তখন সেটা সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে। তবে বিয়ের বিষয়টি আমি সম্পূর্ণভাবে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছি।
সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকলে অনেক জটিলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে হয়
শুচিতা শরমিন
সহকারী অধ্যাপক, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় ছেলে বা মেয়ে প্রত্যেকেরই জীবনসঙ্গী বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। আজকাল ছেলে-মেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবনে অনেক সময় ক্ষণস্থায়ী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। কিন্তু জীবনসঙ্গী বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে আমার মনে হয়, তারা সেই সব সম্পর্ক নয় নির্ভর করার মত কাউকে বেছে নিতেই বেশি পছন্দ করে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জাপান, ভারতে মেয়েরা বিয়ে করার ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। কারণ ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ অনেক বেশি সুবিধা পায়। তাছাড়া ইন্টারনেট, মোবাইলের কারণে যোগাযোগ বেড়ে যাওয়ায় কাজের ক্ষেত্র যেমন আরো প্রসারিত হয়েছে তেমনি ছেলে-মেয়ে উভয়ের মধ্যেই ক্ষণস্থায়ী সম্পর্ক তৈরির প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। তারা ভোগবাদী সমাজের সকল সুবিধাই অথবা অধিকাংশটুকুই ভোগ করতে চায়। ফলে মেয়েদের যখন জীবনসঙ্গী বেছে নেয়ার সময় হয় তারা যোগ্য, প্রতিষ্ঠিত ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ছেলেদের বেশি প্রাধান্য দেয়।
তবে সব ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মানসিকভাবে মেয়েরা যতটা আবেগপ্রবণ হয় ছেলেরা ততটা হয় না। সাধারণত ছেলেদের মধ্যে চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা কাজ করে। সময় যতই বদলাক না কেন, একজন স্ত্রী স্বামীর কাছে বিশেষ মনোযোগ প্রত্যাশা করে। এমন পুরুষকে জীবনসঙ্গী হিসাবে চায় যে তাকে বুঝবে, সবক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে।
একজন মা শিশুর সাথে শৈশবে যে আচরণ করে, সন্তানকে বড় করে তোলার সময় যে জীবন আচরনে অভ্যস্ত করে তোলে সেখান থেকেই শুরু হয় মানুষের জীবন দর্শন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু বিশেষ করে ছেলেশিশু তার মায়ের কাছ থেকে যে আচরন পায় বা যে আচরণ করে, বড় হয়ে তার জীবনসঙ্গীর সাথেও প্রায় একই আচরণ করে থাকে।
আজকের মেয়েরা অনেকক্ষেত্রে যৌথ পরিবার প্রাধান্য দিচ্ছে। কর্মজীবী মহিলাদের জন্য এটা আসলে সময়ের প্রয়োজন। তাদের সন্তান ও পরিবারকে নিরাপদ রাখার প্রয়োজনে তারা যৌথ পরিবারের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠছে। আজকাল মেয়েদের কাজের ক্ষেত্র যেমন প্রসারিত হচ্ছে। ফলে তারা নিজের স্বাভাবিক প্রত্যাশাগুলোর পাশাপাশি একজন নির্ভরযোগ্য মানুষের খোঁজ করছে। তবে সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকলে অনেক জটিলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে হয়।
‘জানতে পেলাম পোস্ত গিয়ে, তোমার নাকি মেয়ের বিয়ে?/ গঙ্গারামকে পাশে পেলে জানতে চাও সে কেমন ছেলে।’
আসলেই কেমন ছেলে চায় আজকালকার মেয়েরা? পাত্র হিসেবে কোন গুণাবলি একটি মেয়ের পছন্দ? আজকাল বেশিরভাগ মেয়ে প্রথম যে কথাটি বলেন তা হলো— কোয়ালিফাইড, আধুনিক মনমানসিকতার একটি ছেলে, যে তাকে বুঝবে।
সংসার দু’জনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। তাই একে সুন্দর করতে প্রয়োজন দু’জনেরই সহৃদয় ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। কর্মক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত অথবা ছাত্রী, প্রত্যেকেই প্রায় একই কথা বলেছেন তাদের অন্তরঙ্গ সাক্ষাত্কারে।
আমাকে বুঝবে, যত্নের সঙ্গে ভুলগুলো ধরিয়ে দেবে— শামীমা আক্তার ছাত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আমি তো মনে করি, সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে আমাদের বিয়ে করা উচিত। তবে পাত্র বাছাইয়ের দায়িত্বটি আমি আমার অভিভাবকের ওপর ছেড়ে দিতে চাই। এক্ষেত্রে আমার পছন্দ বা অপছন্দগুলো আমি আমার পরিবারকে জানিয়ে দেবো। একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ আমার পছন্দ—যে আমাকে বুঝবে, আমার ভুলগুলো খুব যত্নের সঙ্গে আমাকে শুধরে দেবে। আমার মতো করে আমাকে চিনতে পারবে। তাকে অবশ্যই উঁচু মনের অধিকারী হতে হবে। আমি অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল একজন পাত্রই পছন্দ করব, যে আমার স্বাভাবিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারবে। নিজেদের বোঝাপড়া না থাকলে সংসারে অশান্তি হয়। তাই আমি এমন একটি ছেলে চাইব, যে সংসার চালাতে আমার মতামতের গুরুত্ব দেবে। সাংসারিক কাজগুলোয় আমাকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করবে তা হয়তো আমি আশা করি না তবে সংসারের টুকটাক কাজগুলো করে দিলে তার স্ত্রীর সাহায্য হয়—এটা বুঝতে হবে। একজন মানুষের মধ্যে আদর্শ সব গুণাবলি হয়তো পাব না তবে কিছু তো অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। পাত্র হিসেবে আমি এমন কাউকেই চাই।
সম্মানবোধ, ভালোবাসা, সম্পর্কের প্রতি বিশ্বস্ত মানুষ চাই— নিশাত জাহান লোপা ছাত্রী, ডেফোডিল ইউনিভার্সিটি
এখনও আমাদের সমাজে ছেলেরা মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। তাই আমার মনে হয়, আমার মনের মতো ছেলে পাওয়া কঠিন। এখনও মেয়েদের চাকরি করাটাকেই সহজভাবে মেনে নিতে পারে না অনেক পরিবার। কোনো বিষয়ে তাদের মহামতের গুরুত্ব দিতে চায় না। আমি চাই যাকে বিয়ে করব, আমার প্রতি তার সম্মানবোধ, ভালোবাসা এবং সম্পর্কের যে কমিটমেন্ট তা থাকতে হবে। তাকে নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হতে হবে। আমি অনেককেই বলতে শুনেছি, মেয়েরা চাকরি করলে খারাপ হয়ে যায়। ছেলেদের এই মানসিকতা বদলানো প্রয়োজন। সবকিছু চাপিয়ে দিতে চায় এমন ছেলে আমার পছন্দ নয়। তারা সমঝোতা আর আলোচনার মাধ্যমেও সাংসারিক সমস্যা দূর করতে পারে। আমি যাকে পাত্র হিসেবে পছন্দ করব, তার সমঝোতার মানসিকতা থাকতে হবে। তাকে উদার মনের হতে হবে। তবে তার মানে এই নয় যে, সে বউ সম্পর্কে কোনো খোঁজখবরই রাখবে না। এ বিষয়গুলো আমার তো মনে হয় ঘর থেকে আসা উচিত। আজ আমার যে ভাই, কাল সে কারও স্বামী। ফলে সাহায্য করা, ছাড় দেয়া—এসব পরিবারের কাছ থেকে আসবে। একজন সহযোগিতাপূর্ণ স্বামী আমি পছন্দ করব।
পছন্দ স্মার্ট, হ্যান্ডসাম ছেলে— শান্ত ইসলাম তৃষ্ণা
ছাত্রী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনেক বিষয় বিবেচনা করতে হবে। সামগ্রিকভাবে সবার মতামতের ভিত্তিতে বিয়ে করাকে বেশি প্রাধান্য দেবো। তবে যে ছেলেকে বিয়ে করব তাকে অবশ্যই স্মার্ট, হ্যান্ডসাম হতে হবে। আমি যেহেতু পড়াশোনা করছি, ক্যারিয়ার নিয়ে আমার কিছু নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা আছে। ফলে ছেলেটিকে অবশ্যই আমার চাকরির ব্যাপারে পজিটিভ থাকতে হবে। কারণ একেবারে ঘরে বসে থাকার জন্য পড়াশোনা করিনি, তা ছেলেটিকে বুঝতে হবে। আমার সব ভালো কাজে তার সাপোর্ট থাকতে হবে। আমাকে বোঝার মনমানসিকতা থাকতে হবে। তবে বিয়ের পর বন্ধুদের বেশি সময় দেয়ার চেয়ে বউকে সময় দিতে হবে।
যৌথ পরিবার পছন্দ আমার— নওশীন হুদা অন্তরা ফাইনাল ইয়ার, রংপুর মেডিকেল কলেজ
আমি যেহেতু ডাক্তারি পড়ছি, তাই পাত্র পছন্দের ক্ষেত্রে ডাক্তার ছেলেকেই অগ্রাধিকার দেব। তবে এক্ষেত্রে ছেলেটিকে আমার প্রফেশনের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি ছাড় দিতে হবে। কারণ একজন ডাক্তারের যে কোনো সময় হাসপাতালে ডাক পড়তে পারে। বেশি রাত করে ঘরে আসতে হতে পারে। অনেক সময় দেখা যাবে, সংসারে ঠিকমত সময় দিতে পারছি না। এ বিষয়গুলো পাত্রকে বিবেচনায় রাখতে হবে। পাত্রকে উদার, আধুনিক মনমানসিকতাসম্পন্ন হতে হবে। সংসার করার ক্ষেত্রে আমি যৌথ পরিবার বেশি পছন্দ করি। কাজের কারণে আমার সন্তান যাতে একা না হয়ে পড়ে, সেজন্য যৌথ পরিবারকে অগ্রাধিকার দেব আমি। স্বামীকে আমি সহযোগী হিসেবে পেতে চাই। সেটা সংসার এবং পেশা—দুই জীবনেই।
প্রাণচঞ্চল মিশুক মানুষ পছন্দ আমার—
সায়রা তাসনিম ইসলাম করপোরেট কাস্টমস অফিসার, ওয়ারিদ
আমি আসলে পাত্র হিসেবে যেমন ছেলে চাই, আজকাল আর তেমন ছেলে পাওয়া যাবে না। আমি চাই সত্ চরিত্রের, ভালো এবং বিশ্বস্ত একটি ছেলে। তাকে অবশ্যই স্মার্ট হতে হবে। সহজে সবার সঙ্গে মিশতে পারার ক্ষমতা থাকতে হবে। কথা বলার ধরন আকর্ষণীয় হতে হবে। পাত্র হিসেবে হাসি-খুশি, প্রাণচঞ্চল ছেলেই পছন্দ করি। সাধারণত অধিকাংশ মেয়ে বিয়ের ক্ষেত্রে যে বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়, তা হলো অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। আমি যেহেতু নিজেই স্বাবলম্বী, তাই ছেলের টাকা-পয়সা বা সম্পত্তির দিকটিকে বিশেষ প্রাধান্য দিই না। আমি কিছুটা বদরাগী স্বভাবের। আমি চাই, সে হবে ঠাণ্ডা মেজাজের। আমাকে বোঝার মানসিকতা তার মধ্যে থাকা জরুরি। সংসার দু’জনের। তাই সংসারের কাজগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়া গেলে একজনের ওপর তা বোঝা হয়ে দাঁড়ায় না। চাকরি করা বা না করার কারণটি যদি যৌক্তিকভাবে আমাকে বোঝাতে পারে, তাহলে হয়তো আমি তা মেনে নেব। তবে এসব বিষয় আসলে তখনকার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
আমার মনমানসিকতা, আকাঙ্ক্ষা বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে— তারজিনা সিদ্দিকী
অ্যাকাউন্ট্যান্ট, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান
আমি যাকে পাত্র হিসেবে চাইব, তাকে অবশ্যই শিক্ষিত, স্মার্ট ও আধুনিক মনমানসিকতাসম্পন্ন হতে হবে। একটি মেয়ের মনমানসিকতা, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, চিন্তা-ভাবনা তাকে বুঝতে হবে। চিন্তা-ভাবনার সামঞ্জস্যতা থাকলে ভালো। আমি যেহেতু কর্মজীবী, তাই আমার চাকরির ক্ষেত্রে তাকে ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। বিয়ের পর চাকরি ছেড়ে দিতে হবে—এমনটা আমি চাইব না। সংসারের সব সিদ্ধান্ত দু’জনের আলোচনার মাধ্যমে নিতে হবে। তার ভেতর সন্দেহপ্রবণতা থাকলে চলবে না। সংসারে বিশ্বাস, ভালোবাসা, সমঝোতা সবকিছুরই প্রয়োজন। পাত্রকে অবশ্যই স্ত্রীর ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। পাত্র হিসেবে উদার মনের অধিকারীকে আমি বেশি প্রাধান্য দেবো। পাত্র হিসেবে একটু সংসারী ছেলেই আমার পছন্দ, যে সংসারের প্রয়োজনগুলো বুঝবে। সবক্ষেত্রে সহযোগিতাপূর্ণ একটি ছেলে আমার পছন্দ।
কোয়ালিফাইড, ভালো মনের মানুষ চাই—
দুর্গা রানী সাহা অফিসার, ব্র্যাক ব্যাংক
পাত্র হিসেবে আমি অবশ্যই একজন কোয়ালিফাইড, ভালো মানুষ চাইব, যে আমাকে বুঝবে। নির্দিষ্ট কোনো পেশা নয়; বরং সত্, যোগ্য, সমঝোতার মানসিকতা সম্পন্ন ছেলে আমার পছন্দ। আসলে ছেলেটির ফ্যামিলি এবং ছেলে নিজে যদি কেয়ারিং হয়, তাহলে সেখানে ধনী-গরিব কোনো বিষয় না। তবে ছেলেটিকে, যার সঙ্গে আমি সারা জীবন থাকব, সে যদি আমাকে না-ই বোঝে তাহলে তার সঙ্গে জীবন পার করব কেমন করে? বিয়ের পর চাকরি করব কিনা, তা আসলে তখনকার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। যদি এমন হয় যে, আমি সংসারে সময় দিতে পারছি না এবং চাকরি করা আমার জন্য জরুরি নয়, সেক্ষেত্রে তখন সেটা সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে। তবে বিয়ের বিষয়টি আমি সম্পূর্ণভাবে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছি।
সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকলে অনেক জটিলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে হয়
শুচিতা শরমিন
সহকারী অধ্যাপক, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় ছেলে বা মেয়ে প্রত্যেকেরই জীবনসঙ্গী বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। আজকাল ছেলে-মেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবনে অনেক সময় ক্ষণস্থায়ী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। কিন্তু জীবনসঙ্গী বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে আমার মনে হয়, তারা সেই সব সম্পর্ক নয় নির্ভর করার মত কাউকে বেছে নিতেই বেশি পছন্দ করে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জাপান, ভারতে মেয়েরা বিয়ে করার ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। কারণ ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ অনেক বেশি সুবিধা পায়। তাছাড়া ইন্টারনেট, মোবাইলের কারণে যোগাযোগ বেড়ে যাওয়ায় কাজের ক্ষেত্র যেমন আরো প্রসারিত হয়েছে তেমনি ছেলে-মেয়ে উভয়ের মধ্যেই ক্ষণস্থায়ী সম্পর্ক তৈরির প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। তারা ভোগবাদী সমাজের সকল সুবিধাই অথবা অধিকাংশটুকুই ভোগ করতে চায়। ফলে মেয়েদের যখন জীবনসঙ্গী বেছে নেয়ার সময় হয় তারা যোগ্য, প্রতিষ্ঠিত ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ছেলেদের বেশি প্রাধান্য দেয়।
তবে সব ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মানসিকভাবে মেয়েরা যতটা আবেগপ্রবণ হয় ছেলেরা ততটা হয় না। সাধারণত ছেলেদের মধ্যে চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা কাজ করে। সময় যতই বদলাক না কেন, একজন স্ত্রী স্বামীর কাছে বিশেষ মনোযোগ প্রত্যাশা করে। এমন পুরুষকে জীবনসঙ্গী হিসাবে চায় যে তাকে বুঝবে, সবক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে।
একজন মা শিশুর সাথে শৈশবে যে আচরণ করে, সন্তানকে বড় করে তোলার সময় যে জীবন আচরনে অভ্যস্ত করে তোলে সেখান থেকেই শুরু হয় মানুষের জীবন দর্শন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু বিশেষ করে ছেলেশিশু তার মায়ের কাছ থেকে যে আচরন পায় বা যে আচরণ করে, বড় হয়ে তার জীবনসঙ্গীর সাথেও প্রায় একই আচরণ করে থাকে।
আজকের মেয়েরা অনেকক্ষেত্রে যৌথ পরিবার প্রাধান্য দিচ্ছে। কর্মজীবী মহিলাদের জন্য এটা আসলে সময়ের প্রয়োজন। তাদের সন্তান ও পরিবারকে নিরাপদ রাখার প্রয়োজনে তারা যৌথ পরিবারের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠছে। আজকাল মেয়েদের কাজের ক্ষেত্র যেমন প্রসারিত হচ্ছে। ফলে তারা নিজের স্বাভাবিক প্রত্যাশাগুলোর পাশাপাশি একজন নির্ভরযোগ্য মানুষের খোঁজ করছে। তবে সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকলে অনেক জটিলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে হয়।


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


