স্যানিটেশন কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে : ২০১০ সালে সবার জন্য স্যানিটেশনের অঙ্গীকার পূরণ হচ্ছে না
কাদির গনি চৌধুরী
সারাদেশে স্যানিটেশন কার্যক্রম মুখথুবড়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে যে সাফল্য দেখা দিয়েছিল সরকারের উদাসীনতায় তা আর ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিগত সরকারের সময় যেসব এলাকায় শতভাগ স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন বা স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছিল, সেটিও ভেস্তে যেতে বসেছে মনিটরিং ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে। ফলে ২০১০ সালে সবার জন্য স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করার যে ঘোষণা বাংলাদেশ দিয়েছিল, সে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের কোনো সম্ভাবনাই দেখছে না এ কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও স্যানিটেশন টাস্কফোর্স মিডিয়া কমিটির সাবেক কনভেনর ড. মোঃ মুজিবুর রহমান স্যানিটেশন কার্যক্রম সম্পর্কে মূল্যায়ন করেন এভাবে : ‘এ কার্যক্রম এখন ঘুমুচ্ছে’।
বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখোমুখি হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় স্যানিটেশনের নিম্নহারকে। ২০০৩ সালে এক জরিপে দেখা যায়, দেশের মাত্র ৩৩ ভাগ মানুষ স্যানিটেশন সুবিধা পায়। বাকি ৭৭ ভাগ মানুষ হয় খোলা আকাশের নিচে, না হয় অস্বাস্থ্যকর পায়খানা ব্যবহার করে। ওই জরিপে দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলের ৭১ ভাগ এবং শহরাঞ্চলের ৪০ ভাগ মানুষ খোলা জায়গায় অথবা অস্বাস্থ্যকর পায়খানা ব্যবহার করে। ফলে জনগণ বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়। এসব রোগের মধ্যে ডায়রিয়ার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। শুধু ডায়রিয়ার কারণেই এদেশে প্রতি বছর পাঁচ বছরের কম বয়সী ১ লাখ ১০ হাজার শিশু মারা যায়। এটি মোট শিশুমৃত্যু হারের এক-চতুর্থাংশ। ওই গবেষণায় বলা হয়, নিরাপদ পানি ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি এবং সবার জন্য স্যানিটেশন কার্যক্রম চালু করা গেলে শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
এ জরিপের পর তত্কালীন বিএনপি সরকার স্যানিটেশন সুবিধা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার জন্য ব্যাপক কার্যক্রম শুরু করে। সরকারি এ উদ্যোগের সঙ্গে যোগ দেয় বিভিন্ন এনজিও, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন। বিশেষ করে স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিরা এ কর্মসূচি সফল করতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যার ফলে মাত্র তিন বছরের মাথায় ২০০৬ সালে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবহারকারী পরিবারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮১ দশমিক ৪৭ ভাগে। অথচ পরবর্তী ৩ বছরে স্যানিটেশন সুবিধা আর বাড়েনি; বরং সরকারি সহযোগিতায় দরিদ্র যেসব পরিবার স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করে আসছিল, পরবর্তীকালে সহযোগিতা না পাওয়ার কারণে তাদের আগের মতো অস্বাস্থ্যকর পায়খানা ব্যবহার করতে হচ্ছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০০৩ সালে স্যানিটেশন কার্যক্রম শুরু হলে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং কিছু কিছু এনজিও বিনামূল্যে রিং ও স্লাব দিয়ে সাহায্য করে দরিদ্র পরিবারগুলোকে। তবে এসব রিং ও স্লাব তেমন উন্নতমানের ছিল না। ফলে পাঁচ বছরের মাথায় অনেক ল্যাট্রিন নষ্ট হয়ে যায়। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বিরাজ করছে প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকা, বিশেষ করে আইলা, সিডর, সুনামির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে। এখানকার বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনও স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা তৈরি করতে পারেনি অর্থাভাবে। তাছাড়া যেসব এলাকায় স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং এনজিওগুলোর সহযোগিতায় স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা তৈরি করা হয়েছিল, পানির অভাবে সেসব টয়লেটের ‘সিল’ ভেঙে দেয়া হচ্ছে। সিল ভেঙে দেয়ার ফলে অল্প পানিতে মল সরাসরি ট্যাঙ্কিতে চলে যাচ্ছে। পানি খরচ কমাতে সিল ভেঙে দেয়ার ফলে ওই টয়লেট আর স্বাস্থ্যসম্মত থাকল না। কারণ, এর ফলে জীবাণু নিচে থেকে অনায়াসে ওপরে ওঠে আসতে পারছে। অথচ জাতীয় স্যানিটেশন কৌশল ২০০৫-এ স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানার যে তিনটি গুণের কথা বলা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে—১. মল আবদ্ধ রাখবে, পরিবেশে ছড়াতে দেবে না, ২. পায়খানায় বসার স্থান (ঝয়ঁধষ যড়ষব) এবং গর্তের (চরঃ) মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ থাকবে, যাতে মাছি বা পোকামাকড় যাতায়াত করতে না পারে। এর ফলে কীটপতঙ্গ দ্বারা রোগসংক্রমণচক্র বন্ধ হবে, ৩. পায়খানার গর্তে সৃষ্ট দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস যথাযথভাবে স্থাপিত একটি পাইপের মাধ্যমে বের করে দিতে হবে। কিন্তু পানি এবং সচেতনতার অভাবে গ্রামাঞ্চলের মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিনের অন্যতম উপাদান সিল ভেঙে দেয়ায় মাছি ও পোকামাকড় অনায়াসে যাতায়াত করতে পারছে। ফলে এসব ল্যাট্রিন আর স্বাস্থ্যসম্মত থাকছে না।
জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত বলে স্যানিটেশন বিষয়ে সারাবিশ্ব গুরুত্ব দিচ্ছে। জাতিসংঘ ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এক সাধারণ সভায় সর্বমোট আটটি সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অনুমোদন করে। এ ৮টি লক্ষ্যের মধ্যে দুটি সরাসরি স্যানিটেশন বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এগুলো হচ্ছে শিশুমৃত্যুর হার কমানো এবং পরিবেশের স্থায়িত্বশীলতা নিশ্চিতকরণ। দুই বছর পর ২০০২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন বিশ্ব সম্মেলনে (ডব্লিউএসএসডি) স্যানিটেশন বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের পক্ষে জোরালভাবে সমর্থন ব্যক্ত করা হয়। ডব্লিউএসএসডি’র বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় সব রাষ্ট্র একটি সুনির্দিষ্ট স্যানিটেশন লক্ষ্যমাত্রা স্থির করার পক্ষে একমত হয় এবং স্যানিটেশন সুবিধাবঞ্চিত ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন জনসংখ্যাকে ২০১৫ সালের মধ্যে অর্ধেকে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বাংলাদেশ সরকার ও এমডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্রেও এ বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে। বাংলাদেশ ২০১০ সালের মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা নিশ্চিত করার ঘোষণাও দেয় ২০০৩ সালে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যাপক কার্যক্রমও নেয় তত্কালীন সরকার। স্থানীয় সরকার বিভাগের উন্নয়ন বাজেটের ২০ ভাগ স্যানিটেশনের জন্য ব্যবহারেরও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যেসব ইউনিয়নে শতভাগ স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করা হবে, সেখানকার চেয়ারম্যানকে পুরস্কৃত করার ঘোষণা দেয়া হয়। ফলে সারাদেশে স্যানিটেশন কার্যক্রম সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়। মাত্র আড়াই বছরে স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন ব্যবহারকারী পরিবারের সংখ্যা ৩৩ ভাগ থেকে বেড়ে ৮১ ভাগে উন্নীত হয়। বাংলাদেশের এমন সাফল্য গোটা বিশ্বে প্রশংসিত হয়। উন্নয়নশীল অনেক দেশ বাংলাদেশের এ কার্যক্রম তাদের দেশে ছড়িয়ে দেয়ারও সিদ্ধান্ত নেয়। তত্কালীন চারদলীয় ঐক্যজোট সরকার বিরোধী আন্দোলনের কারণে ২০০৬ সাল থেকে স্যানিটেশন কার্যক্রমে ভাটা পড়ে। কেয়ারটেকার সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর এ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ২০১৩ সালে সবার জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও গত এক বছরে এ কার্যক্রমে কোনো গতি আনা হয়নি।
স্যানিটেশন টাস্কফোর্সের মিডিয়া কমিটির কনভেনর প্রফেসর ড. মুজিবুর রহমান আমার দেশকে বলেন, ২০০৩ সালে যে গতি নিয়ে স্যানিটেশন কার্যক্রম শুরু হয়েছিল তা ধরে রাখা গেলে এতদিনে আমরা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারতাম। ২০০৬ সালের শেষদিক থেকে স্যানিটেশন কার্যক্রম শ্লথ হয়ে আসে। গত ৩ বছরেও সেটি আর গতি পেল না। এ কার্যক্রম পুরোদমে চালিয়ে যাওয়া দরকার ছিল।
ড. মুজিবুর রহমান বলেন, স্যানিটেশন এমন এক কার্যক্রম, যার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা জরুরি। এটি এমন কার্যক্রম নয় যে, এক/দুইবার করলাম তারপর বন্ধ করে দিলাম। এটার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা না গেলে পুরোপুরি সাফল্য আসবে না। কারণ, আমাদের দেশের ৪০ ভাগ মানুষ দরিদ্র এবং ২০ ভাগ হতদরিদ্র।
তিনি বলেন, দরিদ্র জনগণের প্রধান সম্পদ হচ্ছে শারীরিক সক্ষমতা। রোগের কারণে আয় ও উত্পাদন থেকে বঞ্চিত হলে তাদের আরও বেশি ক্ষতি হয়। উন্নত স্বাস্থ্য অভ্যাসসহ নিরাপদ পানির ব্যবহার এবং স্যানিটেশন সুবিধা দারিদ্র্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা ব্যবহার করে মহিলা ও কিশোরীরা অর্থ উপার্জন, স্কুলে যাওয়া এবং অবসরের সময় ও সুযোগ পায়। এছাড়া চিকিত্সা বাবদ ব্যয় কমে ও সঞ্চয় বাড়ে। একটি গবেষণার প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানি ব্যবহার করার ফলে ৯৯% ডায়রিয়া, ৯০% আমাশয় এবং ৫১% অন্যান্য পেটের পীড়া কমে যায়। এর ফলে গ্রামাঞ্চলে ৫৫% এবং শহরাঞ্চলে ২৬% চিকিত্সা ব্যয় কমে।
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও স্যানিটেশন টাস্কফোর্স মিডিয়া কমিটির সাবেক কনভেনর ড. মোঃ মুজিবুর রহমান স্যানিটেশন কার্যক্রম সম্পর্কে মূল্যায়ন করেন এভাবে : ‘এ কার্যক্রম এখন ঘুমুচ্ছে’।
বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখোমুখি হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় স্যানিটেশনের নিম্নহারকে। ২০০৩ সালে এক জরিপে দেখা যায়, দেশের মাত্র ৩৩ ভাগ মানুষ স্যানিটেশন সুবিধা পায়। বাকি ৭৭ ভাগ মানুষ হয় খোলা আকাশের নিচে, না হয় অস্বাস্থ্যকর পায়খানা ব্যবহার করে। ওই জরিপে দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলের ৭১ ভাগ এবং শহরাঞ্চলের ৪০ ভাগ মানুষ খোলা জায়গায় অথবা অস্বাস্থ্যকর পায়খানা ব্যবহার করে। ফলে জনগণ বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়। এসব রোগের মধ্যে ডায়রিয়ার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। শুধু ডায়রিয়ার কারণেই এদেশে প্রতি বছর পাঁচ বছরের কম বয়সী ১ লাখ ১০ হাজার শিশু মারা যায়। এটি মোট শিশুমৃত্যু হারের এক-চতুর্থাংশ। ওই গবেষণায় বলা হয়, নিরাপদ পানি ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি এবং সবার জন্য স্যানিটেশন কার্যক্রম চালু করা গেলে শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
এ জরিপের পর তত্কালীন বিএনপি সরকার স্যানিটেশন সুবিধা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার জন্য ব্যাপক কার্যক্রম শুরু করে। সরকারি এ উদ্যোগের সঙ্গে যোগ দেয় বিভিন্ন এনজিও, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন। বিশেষ করে স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিরা এ কর্মসূচি সফল করতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যার ফলে মাত্র তিন বছরের মাথায় ২০০৬ সালে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবহারকারী পরিবারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮১ দশমিক ৪৭ ভাগে। অথচ পরবর্তী ৩ বছরে স্যানিটেশন সুবিধা আর বাড়েনি; বরং সরকারি সহযোগিতায় দরিদ্র যেসব পরিবার স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করে আসছিল, পরবর্তীকালে সহযোগিতা না পাওয়ার কারণে তাদের আগের মতো অস্বাস্থ্যকর পায়খানা ব্যবহার করতে হচ্ছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০০৩ সালে স্যানিটেশন কার্যক্রম শুরু হলে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং কিছু কিছু এনজিও বিনামূল্যে রিং ও স্লাব দিয়ে সাহায্য করে দরিদ্র পরিবারগুলোকে। তবে এসব রিং ও স্লাব তেমন উন্নতমানের ছিল না। ফলে পাঁচ বছরের মাথায় অনেক ল্যাট্রিন নষ্ট হয়ে যায়। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বিরাজ করছে প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকা, বিশেষ করে আইলা, সিডর, সুনামির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে। এখানকার বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনও স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা তৈরি করতে পারেনি অর্থাভাবে। তাছাড়া যেসব এলাকায় স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং এনজিওগুলোর সহযোগিতায় স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা তৈরি করা হয়েছিল, পানির অভাবে সেসব টয়লেটের ‘সিল’ ভেঙে দেয়া হচ্ছে। সিল ভেঙে দেয়ার ফলে অল্প পানিতে মল সরাসরি ট্যাঙ্কিতে চলে যাচ্ছে। পানি খরচ কমাতে সিল ভেঙে দেয়ার ফলে ওই টয়লেট আর স্বাস্থ্যসম্মত থাকল না। কারণ, এর ফলে জীবাণু নিচে থেকে অনায়াসে ওপরে ওঠে আসতে পারছে। অথচ জাতীয় স্যানিটেশন কৌশল ২০০৫-এ স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানার যে তিনটি গুণের কথা বলা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে—১. মল আবদ্ধ রাখবে, পরিবেশে ছড়াতে দেবে না, ২. পায়খানায় বসার স্থান (ঝয়ঁধষ যড়ষব) এবং গর্তের (চরঃ) মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ থাকবে, যাতে মাছি বা পোকামাকড় যাতায়াত করতে না পারে। এর ফলে কীটপতঙ্গ দ্বারা রোগসংক্রমণচক্র বন্ধ হবে, ৩. পায়খানার গর্তে সৃষ্ট দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস যথাযথভাবে স্থাপিত একটি পাইপের মাধ্যমে বের করে দিতে হবে। কিন্তু পানি এবং সচেতনতার অভাবে গ্রামাঞ্চলের মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিনের অন্যতম উপাদান সিল ভেঙে দেয়ায় মাছি ও পোকামাকড় অনায়াসে যাতায়াত করতে পারছে। ফলে এসব ল্যাট্রিন আর স্বাস্থ্যসম্মত থাকছে না।
জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত বলে স্যানিটেশন বিষয়ে সারাবিশ্ব গুরুত্ব দিচ্ছে। জাতিসংঘ ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এক সাধারণ সভায় সর্বমোট আটটি সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অনুমোদন করে। এ ৮টি লক্ষ্যের মধ্যে দুটি সরাসরি স্যানিটেশন বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এগুলো হচ্ছে শিশুমৃত্যুর হার কমানো এবং পরিবেশের স্থায়িত্বশীলতা নিশ্চিতকরণ। দুই বছর পর ২০০২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন বিশ্ব সম্মেলনে (ডব্লিউএসএসডি) স্যানিটেশন বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের পক্ষে জোরালভাবে সমর্থন ব্যক্ত করা হয়। ডব্লিউএসএসডি’র বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় সব রাষ্ট্র একটি সুনির্দিষ্ট স্যানিটেশন লক্ষ্যমাত্রা স্থির করার পক্ষে একমত হয় এবং স্যানিটেশন সুবিধাবঞ্চিত ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন জনসংখ্যাকে ২০১৫ সালের মধ্যে অর্ধেকে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বাংলাদেশ সরকার ও এমডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্রেও এ বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে। বাংলাদেশ ২০১০ সালের মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা নিশ্চিত করার ঘোষণাও দেয় ২০০৩ সালে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যাপক কার্যক্রমও নেয় তত্কালীন সরকার। স্থানীয় সরকার বিভাগের উন্নয়ন বাজেটের ২০ ভাগ স্যানিটেশনের জন্য ব্যবহারেরও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যেসব ইউনিয়নে শতভাগ স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করা হবে, সেখানকার চেয়ারম্যানকে পুরস্কৃত করার ঘোষণা দেয়া হয়। ফলে সারাদেশে স্যানিটেশন কার্যক্রম সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়। মাত্র আড়াই বছরে স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন ব্যবহারকারী পরিবারের সংখ্যা ৩৩ ভাগ থেকে বেড়ে ৮১ ভাগে উন্নীত হয়। বাংলাদেশের এমন সাফল্য গোটা বিশ্বে প্রশংসিত হয়। উন্নয়নশীল অনেক দেশ বাংলাদেশের এ কার্যক্রম তাদের দেশে ছড়িয়ে দেয়ারও সিদ্ধান্ত নেয়। তত্কালীন চারদলীয় ঐক্যজোট সরকার বিরোধী আন্দোলনের কারণে ২০০৬ সাল থেকে স্যানিটেশন কার্যক্রমে ভাটা পড়ে। কেয়ারটেকার সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর এ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ২০১৩ সালে সবার জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও গত এক বছরে এ কার্যক্রমে কোনো গতি আনা হয়নি।
স্যানিটেশন টাস্কফোর্সের মিডিয়া কমিটির কনভেনর প্রফেসর ড. মুজিবুর রহমান আমার দেশকে বলেন, ২০০৩ সালে যে গতি নিয়ে স্যানিটেশন কার্যক্রম শুরু হয়েছিল তা ধরে রাখা গেলে এতদিনে আমরা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারতাম। ২০০৬ সালের শেষদিক থেকে স্যানিটেশন কার্যক্রম শ্লথ হয়ে আসে। গত ৩ বছরেও সেটি আর গতি পেল না। এ কার্যক্রম পুরোদমে চালিয়ে যাওয়া দরকার ছিল।
ড. মুজিবুর রহমান বলেন, স্যানিটেশন এমন এক কার্যক্রম, যার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা জরুরি। এটি এমন কার্যক্রম নয় যে, এক/দুইবার করলাম তারপর বন্ধ করে দিলাম। এটার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা না গেলে পুরোপুরি সাফল্য আসবে না। কারণ, আমাদের দেশের ৪০ ভাগ মানুষ দরিদ্র এবং ২০ ভাগ হতদরিদ্র।
তিনি বলেন, দরিদ্র জনগণের প্রধান সম্পদ হচ্ছে শারীরিক সক্ষমতা। রোগের কারণে আয় ও উত্পাদন থেকে বঞ্চিত হলে তাদের আরও বেশি ক্ষতি হয়। উন্নত স্বাস্থ্য অভ্যাসসহ নিরাপদ পানির ব্যবহার এবং স্যানিটেশন সুবিধা দারিদ্র্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা ব্যবহার করে মহিলা ও কিশোরীরা অর্থ উপার্জন, স্কুলে যাওয়া এবং অবসরের সময় ও সুযোগ পায়। এছাড়া চিকিত্সা বাবদ ব্যয় কমে ও সঞ্চয় বাড়ে। একটি গবেষণার প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানি ব্যবহার করার ফলে ৯৯% ডায়রিয়া, ৯০% আমাশয় এবং ৫১% অন্যান্য পেটের পীড়া কমে যায়। এর ফলে গ্রামাঞ্চলে ৫৫% এবং শহরাঞ্চলে ২৬% চিকিত্সা ব্যয় কমে।
-
শেষের পাতা


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া

