Amardesh
আজঃ ঢাকা, রোববার ২০ ডিসেম্বর ২০০৯, ৬ পৌষ ১৪১৬, ২ মহররম ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

হারিয়ে যাচ্ছে যশোরের ঐতিহ্যবাহী খেজুর রস-গুড়

‘যশোরের যশ খেজুরের রস’। কিন্তু সেই যশ আজ আর নেই বললেই চলে। অন্যান্য গাছের সঙ্গে ইটভাটায় পুড়ে হারিয়ে গেছে খেজুর গাছও। একসময় শত শত খেজুর গাছ ছাড়া যশোরের কোনো গ্রাম কল্পনাই করা যেত না। আর এখন খেজুর গাছ খুঁজে পেতে গলদঘর্ম হতে হয়। খোদ যশোরের সিংহভাগ মানুষ এখন শীতকালে খেজুর রস, গুড়, রসের পিঠার আস্বাদ পায় না। এসব নিয়ে আমাদের যশোর অফিসের স্টাফ রিপোর্টার আহসান কবীরের প্রতিবেদন
যশোরের মাটি ও আবহাওয়া খেজুর গাছের অত্যন্ত উপযোগী। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর যশোরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ জিএম আবদুল হাকিম বলেন, যশোরের মাটি অ্যালকালাইন শ্রেণীর। এই মাটিতে অ্যাসিডিটি ও স্যালাইনিটির পরিমাণ কম। সে কারণে এখানে সহজেই খেজুর গাছ জন্মায়। পরিচর্যা ছাড়াই এই মাটিতে খেজুর গাছ বেড়ে উঠতে পারে। এছাড়া যশোরে শীতকালে হাড়কাঁপানো শীত অনুভূত হয়। প্রচণ্ড শীতের কারণে এখানকার খেজুরের রস সুস্বাদু হয়। যশোরে এখনও যেসব খেজুর গাছ দেখা যায়, তার প্রায় সবই আপনাআপনি জন্মে বেড়ে উঠেছে। তবে সম্প্রতি পরিকল্পিতভাবে খেজুর বাগান গড়ে তোলার আগ্রহ দেখা দেখা যাচ্ছে মানুষের মধ্যে।
খেজুর গাছের সংখ্যা : যশোরের কত হেক্টর জমিতে কত খেজুর গাছ আছে তা জানে না কেউ। হিসাব নেই খেজুর গাছ থেকে এই জেলার মানুষ কত টাকা রোজগার করে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বা বন বিভাগের কাছে এর কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানিয়েছে, বহু গাছ কেটে ফেলা সত্ত্বেও যশোর ও এর আশপাশের এলাকায় এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক খেজুর গাছ রয়েছে। বন বিভাগও একই ধরনের তথ্য দিয়েছে।
যে কারণে অস্তিত্ব সঙ্কট : ইটভাটা মালিকদের কাছে খেজুর গাছের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। খেজুর গাছের আগুন ইট প্রস্তুতের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এ আগুনে পোড়ালে ইটের রঙ ভালো হয়। সে কারণে প্রতি মৌসুমে বিপুলসংখ্যক খেজুর গাছ ইটভাটায় ব্যবহৃত হচ্ছে জ্বালানি হিসেবে। যশোর ও এর আশপাশের কয়েকশ’ ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে প্রতি মৌসুমে বিপুলসংখ্যক খেজুর গাছ ব্যবহার করা হয়। এছাড়া গৃহস্থালি নানা কাজে মানুষ খেজুর গাছ কেটে ব্যবহার করে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা এ তথ্য স্বীকার করেছেন। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রফিকুল হাসান বলেন, খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার জন্য শুধু ইটভাটাই দায়ী নয়; রস-গুড় উত্পাদন করে মানুষ যদি লাভ করতে না পারে, তাহলে খেজুর গাছের সংখ্যা কমবেই। যশোর অঞ্চলের বহু খেজুর বাগান ধ্বংস করে সে জায়গায় বনজ এবং অন্যান্য ফলদ গাছের বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। যেসব গাছের কাঠ আসবাবপত্রে ব্যবহারের উপযোগী, তার দামও বেশি। সে কারণে মানুষ বনজ গাছের বাগান করতে উত্সাহী হয়ে উঠেছে। এছাড়া বাজারে যেসব ফলের দাম বেশি, কৃষকরা তা চাষ করতে উত্সাহী। যে কারণে যশোর অঞ্চলে প্রচুর কুল, আম প্রভৃতি ফলের বাগান গড়ে উঠেছে। এসব জায়গায় আগে খেজুর বাগান ছিল।
নতুন উদ্যোগে খেজুর বাগান সৃজন : খেজুর বাগান ব্যাপকভাবে উজাড় হওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রস-গুড়ের দাম যথেষ্ট বেড়েছে। এখন যশোর অঞ্চলে মৌসুমে প্রতি কেজি সাধারণ মানের গুড় ৫০ থেকে ৭০ টাকা দরে বিক্রি হয়। ফলে খেজুর বাগানের মালিকদের এখন আর লোকসান গুনতে হয় না। ফলে অনেক কৃষক এখন নতুন করে খেজুর বাগান করতে আগ্রহী হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারিভাবে খেজুর বাগান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সামাজিক বন বিভাগ বৃহত্তর যশোরের চার জেলা ও সাতক্ষীরায় ২১ লাখ খেজুর চারা লাগাচ্ছে। এর মধ্যে অন্তত ৭০ শতাংশ গাছ বাঁচবে বলে তাদের আশা। এছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গ্রামাঞ্চল ঘুরে কৃষকদের খেজুর গাছ লাগানোর ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করছেন। চলতি বছর এ জেলায় নতুন করে হাজার দশেক খেজুর চারা রোপণ করা হয়েছে বলে দাবি করলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর যশোরের উপ-পরিচালক জিএম আবদুল হাকিম। কৃষি বিভাগের এই তত্পরতা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।
খেজুর রস আহরণ : বর্ষা শেষে প্রকৃতিতে যখন শীতের আগমনবার্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, গাছিরা তখন খেজুর গাছ কাটা শুরু করে। গাছের মাথা থেকে ১০/১২ ইঞ্চি নিচে কিছুটা জায়গা (গাছের পরিধির অর্ধাংশ) ধারালো দা দিয়ে কেটে পরিষ্কার করা হয়। পরিষ্কার করা জায়গার মাঝখানে কৌণিক আকারে দুটি গভীর দাগ কাটা হয়। দাগ দুটির সঙ্গমস্থলে বাঁশের ৭/৮ ইঞ্চি লম্বা একটি নল পুঁতে দেয়া হয়। নলের মাথায় একটি মাটির পাত্র গাছের সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে দেয়া হয়, যাতে গাছ থেকে নিঃসৃত রস নল বেয়ে পাত্রে পড়তে পারে। গাছের কাটা অংশ দু’তিনদিন পরপর নতুন করে চেঁছে গোটা শীত মৌসুমে গাছ থেকে রস আহরণ করা হয়। গাছির দক্ষতা ও নিপুণতার ওপর নির্ভর করে রসের মান ও পরিমাণ। বিকেলে গাছ কেটে মাটির পাত্র (ভাড় বা ঠিলে) ঝুলিয়ে ভোরে তা গাছ থেকে নামানো হয়। একটি সুস্থ-সবল গাছ প্রতি রাতে এক ঠিলে রস দিতে সক্ষম। গাছ কাটার পর প্রথম রাতে যে রস পাওয়া যায়, গুণে-মানে তা উত্কৃষ্ট। স্থানীয়ভাবে একে ‘জিরেন রস’ বলে। গাছ কাটার দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনও ক্রমাগত রস ঝরতে থাকে। সময় যত যায়, রসের মান ততই নামতে থাকে।
গুড়-পাটালি তৈরি : গাছ থেকে রস নামিয়ে বাড়িতে এনে বড় চুল্লিতে জ্বাল দেয়া হয়। প্রায় ৩/৪ ঘণ্টা ক্রমাগত জ্বাল দেয়ার পর রস শুকিয়ে ঘন হয়ে যায়। একপর্যায়ে তা গুড়ে পরিণত হয়। প্রথম কাটের রস উত্কৃষ্ট হওয়ায় এ থেকে ভালো মানের গুড় ও পাটালি পাওয়া যায়। আর দোকাট (দ্বিতীয় দিনের রস) ও তেকাট (তৃতীয় দিনের রস) নিম্নমানের হওয়ায় এ থেকে ঝোলা গুড় পাওয়া সম্ভব। গুড়েরই আরেক রূপ পাটালি। রসের রঙ যখন সর্ষে ফুলের মতো হয়ে ওঠে , তখন খানিকটা গুড় পাত্রের পাশে নিয়ে ক্রমাগত ঘষে ঘষে (বীজ মারা) আবার পাত্রের গুড়ের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়। এর ফলে পাত্রের সব গুড়ই দানা বেঁধে পাটালি হয়ে যায়। শুধু দক্ষ কারিগররাই এই পদ্ধতিতে উত্কৃষ্ট মানের পাটালি তৈরি করতে পারেন।
রস-গুড়ের নানা ব্যবহার : শীত মৌসুমই বাঙালির পিঠা-পায়েশ তৈরির প্রধান সময়। আর শীতের পিঠা-পায়েশ মানেই রস-গুড়ের ব্যবহার। মূলত শীতকালে যেসব পিঠা-পায়েশ তৈরি হয়, অবধারিতভাবেই তাতে রস-গুড়ের ব্যবহার হয়। খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়া, নগরকেন্দ্রিক ফাস্ট ফুড কালচারের বিকাশ এবং গ্রামমুখিতা হ্রাস পাওয়ায় ইদানীং অনেকে পিঠা-পায়েশের স্বাদ ভুলেই গেছেন। তবু যশোর অঞ্চলে হেমন্তে আমন ধান কাটার পর গ্রামাঞ্চলে পিঠা-পায়েশের ধুম পড়ে যায়। এ সময় গ্রামের ঘরে ঘরে পাকান, চন্দ্রপুলি, কুলি, ভাপা প্রভৃতি পিঠা তৈরি হয়। আর রসে ভেজানো পিঠার কথা উঠলেই তো ভোজনরসিকদের জিহ্বায় পানি আসে। কাঁচিপোড়া নামে এক ধরনের সুস্বাদু পিঠা তৈরি হয় চালের গুঁড়া দিয়ে। পরে তা গুড় দিয়ে পরিবেশন করা হয়। এছাড়া খেজুর রস দিয়ে তৈরি নানা ধরনের পায়েশ ও ক্ষীরের স্বাদ অমৃতসম। যশোরের গুড়ের সন্দেশও দেশবিখ্যাত। শহরের বেশ কয়েকটি দোকানে বিশেষত শীতকালে গুড়ের সন্দেশ বিক্রি হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নানা কাজে যশোরে আসা মানুষ এখান থেকে বিখ্যাত গুড়ের সন্দেশ নিতে ভোলেন না।
সংস্কৃতিতে প্রভাব : হাজার বছর ধরে যশোর অঞ্চলের মানুষের জীবনধারায় মিশে আছে খেজুরের রস, গুড়-পাটালি। খেজুর গাছ কাটার মৌসুমে কিষাণ বাড়িতে দেখা যায় সাজসাজ রব। গাছ কাটার আগে সরঞ্জাম প্রস্তুতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন পুরুষরা। আর নারীরা ব্যস্ত সময় কাটান রস জ্বালানোর জন্য চুল্লি (বাইন) তৈরি, জ্বালানি সংগ্রহ ও শুকানোর কাজে। সূর্য ওঠার আগেই কর্মব্যস্ত হয়ে ওঠেন নারী-পুরুষ। ভোরে বাড়িতে রস এনেই মুড়িসহযোগে পান করেন সবাই। পরে জ্বালানোর আয়োজন। বাড়ির শিশুরা লোভাতুর দৃষ্টিতে ঘোরাফেরা করে চুলার পাশে—কখন রস থেকে গুড় তৈরি হবে। গুড় তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একদঙ্গল শিশু হুমড়ি খেয়ে পড়ে গুড়ের পাত্রে। গরম গরম এই গুড়ের স্বাদ অতুলনীয়।
খেজুরের রস ও গুড় নিয়ে যশোর অঞ্চলের কবি-সাহিত্যিকরা বেঁধেছেন অসংখ্য গান। রচনা করেছেন কবিতা। এর মধ্যে অনিল হাজারিকার লেখা ‘ঠিলে ধুয়ে দে বউ গাছ কাটতি যাব / খাজুর গাছে চোমর বারুইছে / তোরে আইনে দেব / সন্ধের নস ঝাড়ে আইনে জাউ নান্দে খাব ...’ গানটি তো দেশব্যাপী তুমুল জনপ্রিয়। এছাড়া ‘কনে গেলি বাড়িয়ালি / ধক করে তুই আয় / গাছ কাটতি যাব আমি / বেলা চলে যায়...’ (সংগ্রহ : কবি কাসেদুজ্জামান সেলিম)। অথবা ‘...পুষ মাসে জাড়ে আমারে ঠাসে ধরতেছে / ঠকাস ঠকাস করে জাড়ে বাড়ি মাইরতেছে / নস পিঠে আর খই নিয়ে আয় / আগুনের কাছে বসে খাবানে’ (সংগ্রহ : গীতিকার শেখ ফারুক) প্রভৃতি গীতিকবিতাও একসময় যশোর অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে ফিরতো। কালের পরিক্রমায় এগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। স্থানীয় কবিদের এসব রচনায় আঞ্চলিক শব্দের বিপুল প্রয়োগ লক্ষণীয়। যশোরের মানুষ মনে করেন, খেজুর গাছ আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য তথা জীবনধারায় মিশে আছে। এই ঐতিহ্যকে যে কোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। এর জন্য সরকার ও সচেতন মানুষদেরই এগিয়ে আসতে হবে। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট লেখক, গবেষক বেনজীন খান বলেন, বিশেষ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে যশোরে এত বিপুলসংখ্যায় খেজুর গাছ জন্মে। এই গাছ বিনাশের মাধ্যমে আমদানি করা গাছের বাগান সৃজন করে আমরা প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছি। তিনি বলেন, রস-গুড়ের সঙ্গে যশোর অঞ্চলের মানুষের সামাজিক সম্পর্ক, প্রেম-ভালোবাসা জড়িত। শীতকালে প্রতিটি বাড়িতেই একসময় পিঠা-পায়েশ দিয়ে মেয়ে-জামাইকে আপ্যায়নের ব্যবস্থা হতো। এখন আর তা চোখে পড়ে না। ফলে নিকটাত্মীয়দের মধ্যে দূরত্বও বাড়ছে। প্রেম-সম্পর্ক উধাও হলে মানুষের মধ্যে জেগে ওঠে পশুবৃত্তি, যা গোটা সমাজের জন্যই ক্ষতিকর।
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?