Amardesh
আজঃ ঢাকা, শনিবার ১৯ ডিসেম্বর ২০০৯, ৫ পৌষ ১৪১৬, ১ মহররম ১৪৩১     আপডেট সময়ঃ সময় : রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 জব সার্চ
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 বিশেষ বিভাগ
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

রংপুরে কর্মসৃজন কর্মসূচির ৩০ কোটি টাকা লুটপাট : তীব্র অসন্তোষ

রোকন উদ্দিন খান, রংপুর
বৃহত্তর রংপুরে সরকার গৃহীত ৪০ দিনের বিশেষ কর্মসৃজন কর্মসূচির ৭৫ কোটি টাকার মধ্যে ৩০ কোটি টাকাই লুটপাট হয়েছে। ইউপি মেম্বার থেকে শুরু করে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই বিপুল পরিমাণ টাকা ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। এ নিয়ে সব মহলে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। গত ১৫ অক্টোবর থেকে বৃহত্তর রংপুরের পাঁচ জেলায় ৪০ দিনের বিশেষ কর্মসৃজন কর্মসূচি গ্রহণ করে সরকার। এ কর্মসূচির আওতায় রাস্তা-ঘাট ও ব্রিজ-কালভার্ট সংস্কার, গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণসহ নানা কাজে দৈনিক একশ’ টাকা মজুরির বিনিময়ে ১ লাখ ৯৯ হাজার ২১২ শ্রমিকের বিপরীতে মোট ৭৫ কোটি ৬০ লাখ ৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে লালমনিরহাট জেলায় ৭ হাজার ২৬৬ শ্রমিকের বিপরীতে ২ কোটি ৯০ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, গাইবান্ধায় ১৬ হাজার ৭০৩ জনের বিপরীতে ৬ কোটি ৬৮ লাখ ১২ হাজার টাকা, কুড়িগ্রামে ৬৪ হাজার ৪৫৩ জনের বিপরীতে ২১ কোটি ৭৯ লাখ ৩২ হাজার টাকা, রংপুরে ৫৯ হাজার ৭৬৬ শ্রমিকের বিপরীতে ২৩ কোটি ৯০ লাখ ৬৪ হাজার টাকা এবং নীলফামারীতে ৫১ হাজার ২৪ জনের বিপরীতে ২০ কোটি ৪০ লাখ ৯৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। গত ১৫ ডিসেম্বর কর্মসূচি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে এখনও এই প্রকল্পের প্রথম কাজ শেষ হয়নি।
অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রকল্প এলাকার ইউপি মেম্বার, সরকার দলীয় ক্যাডার, ইউপি সচিব ও চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান এবং জেলা প্রশাসনের কতিপয় দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা পারস্পরিক যোগসাজশে এই প্রকল্পের ৪০ ভাগ টাকাই আত্মসাত্ করেছেন। কাগজ-কলমে শ্রমিক সংখ্যা ঠিক রেখে ৪০ ভাগ শ্রমিক মাঠে না লাগিয়ে, সরকার দলীয় ক্যাডারদের শ্রমিক হিসেবে দেখিয়ে, নিজের পুত্র-কন্যা-কাজের মেয়ে-আত্মীয়স্বজনের নাম দিয়ে, শ্রমিকদের মজুরি কম দিয়ে, একই নাম বার বার ব্যবহার করে, ভুয়া নাম-ঠিকানা দিয়ে, দলীয় কাজে ব্যবহার করে, নিজের ব্যক্তিগত ও গৃহস্থালির কাজ করিয়ে নিয়ে এই টাকা আত্মসাত্ করা হয়েছে।
এই প্রকল্পের বিভিন্ন জায়গায় সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, সরকারি দলের সমর্থক, নিজের পুত্র-কন্যা-কাজের মেয়ে-আত্মীয়-স্বজনের নাম তালিকাভুক্ত করে টাকা উত্তোলন করেছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য ও চেয়ারম্যানরা। কোথাও শ্রমিকদের মজুরি কম দেয়া হয়েছে, কোথাও একই নাম বার বার ব্যবহার করে বা ভুয়া নাম-ঠিকানা দিয়ে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাগজ-কলমে শ্রমিক সংখ্যা ঠিক রেখে শ্রমিকদের মাঠে না লাগিয়ে ব্যক্তিগত পুকুর খনন, আমন ধান কাটা, আলু লাগানো, বাঁশঝাড়ে মাটি দেয়াসহ বিভিন্ন গৃহস্থালির কাজে শ্রমিকদের খাটানো হয়েছে। সরেজমিনে রংপুর সদর উপজেলার সাতগড়া ইউনিয়নের ৮নং বড়বাড়ি ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র। ইউপি সদস্য রবিন চন্দ্র ৪ জায়গায় কাজ করাচ্ছেন। সেখানে শ্রমিক সংখ্যা গুণে দেখা গেছে ১০৮ জন; অথচ কর্মরত শ্রমিকদের নাম দেখানো হচ্ছে ১৬৩ জন। ওই ওয়ার্ডে প্রকল্পের সুপারভাইজার সহিদার রহমান জানান, ‘প্রতিদিনই ১৬৩ জন করে শ্রমিকের টাকা উত্তোলন করা হলেও গড়ে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১১০ শ্রমিক কাজ করেছে। আমরা এর প্রতিবাদ করলে আমাদের মেম্বার রবিন ও তার ক্যাডাররা মামলায় জড়ানোসহ কাজে না নেয়ার হুমকি দিয়েছেন। সহিদার রহমান বলেন, ‘লোক কম করে কাজে লাগানোর যুক্তি হিসেবে মেম্বার আমাদের বলেছেন, চেয়ারম্যান, তহসিলদার, পিআইওসহ উপরে টাকা দিতে হয়। সে জন্য শ্রমিক কম থাকলেও পুরোটা দেখিয়েই টাকা তুলতে হচ্ছে।’ আর এক সুপারভাইজার সুধীর চন্দ্র রায় জানান, রবিন মেম্বার এই প্রকল্পের শ্রমিক নিপেন, ভরত, জগো, মিংলুসহ কয়েকজনকে দিয়ে নিজের জমির আলু লাগানোর কাজ ও আমন ধান কাটা ও মাড়াই এবং বাজার সদাই’র করিয়ে নিচ্ছেন। ষাটোর্ধ্ব শ্রমিক বড়বাড়ি এলাকার মৃত আকবর আলীর ছেলে মনসুর আলী জানান, ‘আমাকেও রবিন মেম্বার তার বাড়ির কাজ করতে যাওয়ার জন্য বলেছিল। কিন্তু আমি না যাওয়ায় ঈদের আগে আমাকে টাকা দেয়নি।’
বড়বাড়ি ব্র্যাক স্কুলের শিক্ষিকা ও কর্মসৃজন কর্মসূচি প্রকল্পের সদস্য রুনা বেগম জানান, ‘ইউপি চেয়ারম্যান আজহার আলী নিজেই প্রকল্পের ২০ শ্রমিক দিয়ে ২০-২২ দিন নিজের বাড়ির বিভিন্ন ধরনের কাজ করে নিয়েছেন। প্রকল্পটি পুরোটাই হযবরল অবস্থায় থাকলেও আমরা কিছুই করতে পারছি না।’ মহিলা শ্রমিক বড়বাড়ি গ্রামের নূর আলমের স্ত্রী লাভলী বেগম, মৃত আজহার আলীর স্ত্রী জোসনা বেগম, মৃত নওয়াব আলীর স্ত্রী রাহেলা বেগম জানান, ‘প্রতিদিন এখানে ১৬৩ শ্রমিকের নামে টাকা উত্তোলন করা হলেও কাজ করেছে কোনো দিন ৯০, কোনো দিন ৮০ জন। আমরা এসব বললে কাজে না নেয়ার হুমকি দেয়ায় আমরা আর বলিনি।’
এই চিত্র বৃহত্তর রংপুরের ৫ জেলার সব প্রকল্প এলাকাতেই। রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট ও নীলফামারীর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তারা জানান, ‘এই প্রকল্পের কাজ অনেক জায়গায় ৩০ থেকে ৩৩ দিন হয়েছে।’ এই প্রকল্প শেষ করার জন্য আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। রংপুর জেলা প্রশাসক বিএম এনামুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ‘অভিযোগ প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?