কাঙাল হরিনাথের স্মৃতি রক্ষার উদ্যোগ
সিরাজ প্রামাণিক, খোকসা (কুষ্টিয়া)
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ইতিহাসখ্যাত সংবাদপত্রসেবী কাঙাল হরিনাথের অবশেষে সঠিক মূল্যায়ন হতে চলেছে। এতদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে চরম অনাদর আর অবহেলায় পড়ে থাকা তার কুণ্ডুপাড়ার বাস্তুভিটায় সরকারি উদ্যোগে কাঙাল স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ৩০ লাখ টাকায় লাইব্রেরি নির্মাণ শেষ হয়েছে। যদিও মহান এই সাংবাদিকের ওই সময়ের ঘরবাড়ির কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া ভার। স্মৃতি বলতে অবশিষ্ট রয়েছে ঐতিহাসিক ছাপার যন্ত্র, এমএন প্রেস, হাত মেশিন, বাংলা টাইপ ও হরিনাথের কিছু পাণ্ডুলিপি।
কুষ্টিয়া শহর থেকে গড়াই সেতু পার হয়ে ১০ কিলোমিটার গেলে কুমারখালীর কুণ্ডুপাড়ায় কাঙাল হরিনাথের নিবাস। স্বশিক্ষিত হরিনাথ ১৮৬৩ সালে ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। কলকাতার গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্ন যন্ত্র থেকে ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ প্রথম মুদ্রিত হলেও ১৮৭৩ সালে কাঙাল হরিনাথ তার বাড়িতে প্রেস বসিয়ে বাংলার অন্যতম প্রাচীন ওই পত্রিকাটি সম্পাদনা করেন। এ প্রেসটি নিয়ে কিংবদন্তির অন্ত নেই। তাই এখনও কুমারখালীতে গেলে প্রেসটি একনজর দেখে আসার সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না দর্শনার্থীরা। প্রাচীন বাংলার মুদ্রণ জগতের প্রথম ছাপাখানা বিখ্যাত এমএন প্রেসের বিবর্ণ অবস্থা দেখে ভীষণ কষ্টের কথা ব্যক্ত করেছেন অনেক ঐতিহাসিকও।
গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকার ছাপা মেশিনটি আজও আছে কুমারখালীর কুণ্ডুপাড়ায় কাঙাল কুটিরে। জীর্ণশীর্ণ পরিবেশে দর্শনীয় ঐতিহাসিক এ ট্রেডল মেশিনটির ছাপা অক্ষর একসময় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কথা বললেও আজ হরিনাথ মজুমদারের উত্তরসূরিদের পারিবারিক জমি সংক্রান্ত কোন্দলের শিকারে অমূল্য এ নিদর্শনটি ভাঙা ঘরের একপাশে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে। কয়েকটি ভাঙা টিন আর পলিথিন পেপার দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে ছাপার মেশিনটি। উপরে কোনো ছাদ না থাকলেও প্রায় ধসেপড়া শত বছরের পুরনো ঘরের দরজায় বেশ বড় একটি তালা চোখে পড়ে। গত বছর বন্যায় ঘরটি ডুবে যাওয়ায় প্রেসটি প্রায় এক ফুট মাটির নিচে দেবে গেছে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এক বছর আগে কুমারখালীর একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মথুরানাথ কুণ্ডু ১৮৫৬ সালে নীলকুঠি কিনে একটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। পরে স্থানীয় জনগণ তার প্রতি কৃতজ্ঞতাবশত এ স্কুলটির নামকরণ করে মথুরানাথ বা এমএন হাইস্কুল। মথুরানাথের আর্থিক আনুকূল্যে কাঙাল হরিনাথ ছাপার যন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে এর নাম দেন এমএন প্রেস। মেশিনের মাঝখানে এ যন্ত্রটির উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও উত্পাদনের তারিখ লেখা রয়েছে। লন্ডনের ১০ ফিন্সবারি স্ট্রিটের ক্লাইমার ডিক্সন অ্যান্ড কোম্পানি থেকে কলম্বিয়ান প্রেস মডেলের ১৭০৬ নম্বরের এ মুদ্রণযন্ত্রটি তৈরি করা হয় ১৮৬৭ সালে। প্রয়াত এডওয়ার্ড বিভান এ যন্ত্রটি পেটেম্লট করেন।
স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে কাঙালের বংশধর অশোক মজুমদারের জমিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে মামলা একপর্যায়ে গড়িয়েছে হাইকোর্টে। সে কারণেই সরকারি-বেসরকারিভাবে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে আছে।
কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের কোনোদিন কোনো বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেখা হয়নি। পারিবারিক দৈন্যের কারণে বালক বয়সে কুমারখালী বাজারের এক কাপড়ের দোকানে তিনি কাজ নিতে বাধ্য হন দৈনিক দুই পয়সা বেতনে। এরপর ৫১টি কুঠির হেড অফিস কুমারখালীর নীলকুঠিতে শিক্ষানবিস হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু মানবদরদি ও সত্যনিষ্ঠ হরিনাথের পক্ষে সেখানেও বেশিদিন কাজ করা সম্ভব হয়নি। কাঙালের জীবনীকার অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরীর মতে, এই শোষণের প্রতিকারের চিন্তা থেকেই পরে হরিনাথ মজুমদার ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ সম্পাদনা করেন। গণসঙ্গীত শিল্পী কমরেড হেমাঙ্গ বিশ্বাস তার এক লেখায় উল্লেখ করেন, ‘রবীন্দ্রনাথের আগে ঠাকুর পরিবারের যেসব সদস্য জমিদার হিসেবে শিলাইদহে এসেছিলেন, তারা প্রজাবত্সল ছিলেন না। তাদের অত্যাচারের কথা হরিনাথ গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায় সাহসের সঙ্গে লিখতেন।’
কিন্তু উপার্জনের নির্দিষ্ট উত্স না থাকায় আর গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা প্রকাশের জন্য চরম ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ায় আক্ষরিক অর্থেই তিনি প্রায় কাঙাল হয়ে পড়েন। তারপরও কৃষক-প্রজা, রায়ত শ্রমজীবী মানুষ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বার্থের অনুকূলে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মাসিক, পাক্ষিক ও সাপ্তাহিক হিসেবে গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ২২ বছর চলেছিল। তখনও তিনি যেমন তার প্রাপ্য মর্যাদা পাননি, এখনও জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট বা সাংবাদিকতা বিভাগে রয়েছে— এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কোনো একটি প্রতিষ্ঠানে কাঙাল হরিনাথের এ প্রেসটি যথাযথভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয় না। স্থানীয় জনসাধারণসহ সবার অভিমত, কাঙাল হরিনাথের এ প্রেস একটি জাতীয় ঐতিহ্য। জমিসংক্রান্ত বিরোধের কারণে এ সম্পদটি ধ্বংস হতে দেয়া যায় না। সে কারণেই রাষ্ট্রীয়ভাবে এর সংরক্ষণ হওয়া উচিত।
কুষ্টিয়া শহর থেকে গড়াই সেতু পার হয়ে ১০ কিলোমিটার গেলে কুমারখালীর কুণ্ডুপাড়ায় কাঙাল হরিনাথের নিবাস। স্বশিক্ষিত হরিনাথ ১৮৬৩ সালে ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। কলকাতার গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্ন যন্ত্র থেকে ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ প্রথম মুদ্রিত হলেও ১৮৭৩ সালে কাঙাল হরিনাথ তার বাড়িতে প্রেস বসিয়ে বাংলার অন্যতম প্রাচীন ওই পত্রিকাটি সম্পাদনা করেন। এ প্রেসটি নিয়ে কিংবদন্তির অন্ত নেই। তাই এখনও কুমারখালীতে গেলে প্রেসটি একনজর দেখে আসার সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না দর্শনার্থীরা। প্রাচীন বাংলার মুদ্রণ জগতের প্রথম ছাপাখানা বিখ্যাত এমএন প্রেসের বিবর্ণ অবস্থা দেখে ভীষণ কষ্টের কথা ব্যক্ত করেছেন অনেক ঐতিহাসিকও।
গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকার ছাপা মেশিনটি আজও আছে কুমারখালীর কুণ্ডুপাড়ায় কাঙাল কুটিরে। জীর্ণশীর্ণ পরিবেশে দর্শনীয় ঐতিহাসিক এ ট্রেডল মেশিনটির ছাপা অক্ষর একসময় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কথা বললেও আজ হরিনাথ মজুমদারের উত্তরসূরিদের পারিবারিক জমি সংক্রান্ত কোন্দলের শিকারে অমূল্য এ নিদর্শনটি ভাঙা ঘরের একপাশে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে। কয়েকটি ভাঙা টিন আর পলিথিন পেপার দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে ছাপার মেশিনটি। উপরে কোনো ছাদ না থাকলেও প্রায় ধসেপড়া শত বছরের পুরনো ঘরের দরজায় বেশ বড় একটি তালা চোখে পড়ে। গত বছর বন্যায় ঘরটি ডুবে যাওয়ায় প্রেসটি প্রায় এক ফুট মাটির নিচে দেবে গেছে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এক বছর আগে কুমারখালীর একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মথুরানাথ কুণ্ডু ১৮৫৬ সালে নীলকুঠি কিনে একটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। পরে স্থানীয় জনগণ তার প্রতি কৃতজ্ঞতাবশত এ স্কুলটির নামকরণ করে মথুরানাথ বা এমএন হাইস্কুল। মথুরানাথের আর্থিক আনুকূল্যে কাঙাল হরিনাথ ছাপার যন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে এর নাম দেন এমএন প্রেস। মেশিনের মাঝখানে এ যন্ত্রটির উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও উত্পাদনের তারিখ লেখা রয়েছে। লন্ডনের ১০ ফিন্সবারি স্ট্রিটের ক্লাইমার ডিক্সন অ্যান্ড কোম্পানি থেকে কলম্বিয়ান প্রেস মডেলের ১৭০৬ নম্বরের এ মুদ্রণযন্ত্রটি তৈরি করা হয় ১৮৬৭ সালে। প্রয়াত এডওয়ার্ড বিভান এ যন্ত্রটি পেটেম্লট করেন।
স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে কাঙালের বংশধর অশোক মজুমদারের জমিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে মামলা একপর্যায়ে গড়িয়েছে হাইকোর্টে। সে কারণেই সরকারি-বেসরকারিভাবে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে আছে।
কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের কোনোদিন কোনো বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেখা হয়নি। পারিবারিক দৈন্যের কারণে বালক বয়সে কুমারখালী বাজারের এক কাপড়ের দোকানে তিনি কাজ নিতে বাধ্য হন দৈনিক দুই পয়সা বেতনে। এরপর ৫১টি কুঠির হেড অফিস কুমারখালীর নীলকুঠিতে শিক্ষানবিস হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু মানবদরদি ও সত্যনিষ্ঠ হরিনাথের পক্ষে সেখানেও বেশিদিন কাজ করা সম্ভব হয়নি। কাঙালের জীবনীকার অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরীর মতে, এই শোষণের প্রতিকারের চিন্তা থেকেই পরে হরিনাথ মজুমদার ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ সম্পাদনা করেন। গণসঙ্গীত শিল্পী কমরেড হেমাঙ্গ বিশ্বাস তার এক লেখায় উল্লেখ করেন, ‘রবীন্দ্রনাথের আগে ঠাকুর পরিবারের যেসব সদস্য জমিদার হিসেবে শিলাইদহে এসেছিলেন, তারা প্রজাবত্সল ছিলেন না। তাদের অত্যাচারের কথা হরিনাথ গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায় সাহসের সঙ্গে লিখতেন।’
কিন্তু উপার্জনের নির্দিষ্ট উত্স না থাকায় আর গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা প্রকাশের জন্য চরম ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ায় আক্ষরিক অর্থেই তিনি প্রায় কাঙাল হয়ে পড়েন। তারপরও কৃষক-প্রজা, রায়ত শ্রমজীবী মানুষ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বার্থের অনুকূলে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মাসিক, পাক্ষিক ও সাপ্তাহিক হিসেবে গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ২২ বছর চলেছিল। তখনও তিনি যেমন তার প্রাপ্য মর্যাদা পাননি, এখনও জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট বা সাংবাদিকতা বিভাগে রয়েছে— এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কোনো একটি প্রতিষ্ঠানে কাঙাল হরিনাথের এ প্রেসটি যথাযথভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয় না। স্থানীয় জনসাধারণসহ সবার অভিমত, কাঙাল হরিনাথের এ প্রেস একটি জাতীয় ঐতিহ্য। জমিসংক্রান্ত বিরোধের কারণে এ সম্পদটি ধ্বংস হতে দেয়া যায় না। সে কারণেই রাষ্ট্রীয়ভাবে এর সংরক্ষণ হওয়া উচিত।
-
শেষের পাতা


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


