Amardesh
আজঃ ঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৭ ডিসেম্বর ২০০৯, ৩ পৌষ ১৪১৬, ২৯ জিলহজ ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 বিশেষ বিভাগ
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

তৌফিক এলাহী ও জয়ের বিরুদ্ধে ৫ মিলিয়ন ডলার ঘুষ নেয়ার অভিযোগ : শেভরনকে বিনা টেন্ডারে ৩৭০ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দিতে উেকাচ গ্রহণের বিষয় তদন্ত করছে মন্ত্রণালয়

এম. আবদুল্লাহ
জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই এলাহী চৌধুরীসহ জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তা ও প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে ৩৫ কোটি টাকার সমপরিমাণ ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঘুষ গ্রহণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মার্কিন তেল কোম্পানি শেভরনকে বিনা টেন্ডারে ৩৭০ কোটি টাকায় একটি কম্প্রেসার স্টেশন বসানোর কাজ দেয়ার বিনিময়ে এ উেকাচ গ্রহণ করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে তথ্য দেয়া হয়েছে। পেট্রোবাংলার প্যাডে প্রধানমন্ত্রী বরাবর এ অভিযোগপত্র পেশ করা হয়েছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় অভিযোগটি তদন্তের জন্য পেট্রোবাংলাকে দায়িত্ব দিলেও তারা ‘উচ্চ পর্যায়ের লোক জড়িত এবং স্পর্শকাতর বিষয়’ বলে তদন্ত করতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ অভিযোগ তদন্ত করবে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ মোহসিন। সচিব নিজেও অভিযুক্ত। তিনি বলেছেন, ‘অভিযোগের সত্যতা আছে বলে আমার মনে হয় না।’ এদিকে শেভরন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তদন্তের বিষয়ে তাদের জানা নেই।
আওয়ামী লীগের বিগত সরকারের আমলেও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সে সময় বিদ্যুত্ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালন করেছিলেন বর্তমান জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই এলাহী চৌধুরী। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা বহুল আলোচিত নাইকো দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন কারাবরণ করেন তৌফিক-ই এলাহী চৌধুরী। নাইকোর এক সময়ের বাংলাদেশ প্রধান কাশেম শরীফের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার বিষয়টিও মন্ত্রণালয়ে বহুল আলোচিত। নাইকো মামলায়ও প্রধান অভিযোগ ছিল বিনা টেন্ডারে নাইকোকে গ্যাসক্ষেত্র বরাদ্দ দেয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিপুল ক্ষতিসাধন।
অভিযোগে যা বলা হয় : পেট্রোবাংলার সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর পক্ষে আবু সিদ্দিকী স্বাক্ষরিত পেট্রোবাংলার প্যাডে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে পেশ করা অভিযোগে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণাধীন বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগে ব্যাপক দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। চিঠিতে অভিযুক্ত করা হয়েছে উপদেষ্টা এম তৌফিক-ই এলাহী চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এনামুল হক, সচিব মোহাম্মদ মোহসিন এবং পেট্রোবাংলার সাবেক চেয়ারম্যান মেজর (অব.) মোক্তাদির আলীকে। অভিযুক্তদের পারস্পরিক যোগসাজশে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি শেভরনকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রায় ৩৭০ কোটি টাকার সমান ৫২ দশমিক ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে মুচাইতে কম্প্রেসার স্টেশন স্থাপনের কাজ দেয়া হয়েছে। নতুন আবরণে পুরনো কম্প্রেসার বসানোর এই কাজ বিনা দরপত্রে একক প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নেয়া হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, বর্তমানে এ কম্প্রেসার স্থাপনের কোনো প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও অনৈতিকভাবে আর্থিক সুবিধা লাভের উদ্দেশ্যে জ্বালানি উপদেষ্টা মার্কিন কোম্পানি শেভরনকে কাজটি পাইয়ে দেন। এ কাজ পাইয়ে দিতে জ্বালানি উপদেষ্টা শেভরনের কাছ থেকে ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার উেকাচ গ্রহণ করে তার নেতৃত্বে ওই অর্থ ভাগবাটোয়ারা করেন। অভিযোগপত্রে প্রধানমন্ত্রীর নামে ২ মিলিয়ন ডলার গ্রহণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে জানানো হয়, ওই ২ মিলিয়ন ডলার ১৪ অক্টোবর ২০০৯ তারিখে টেক্সাসে স্বয়ং জ্বালানি উপদেষ্টা প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে হস্তান্তর করেন।
তদন্ত নিয়ে চিঠি চালাচালি : ১৮ নভেম্বর অভিযোগটি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে জমা হওয়ার পরদিন ১৯ নভেম্বর জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ থেকে চিঠি দিয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানকে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোঃ মিজানুর রহমান স্বাক্ষরিত পত্রের (নং জ্বাখসবি/উঃ-৩/বিঃ কোঃ/কম্প্রেসার স্থাপন-৩৩/২০০৯/৯০২) বিষয় ছিল : ‘জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বর্তমান কর্মকাণ্ডে ৩৬০ কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় অপচয়ের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাত্’। চার লাইনের ওই পত্রে বলা হয়, ‘উপর্যুক্ত বিষয়ে শেভরন কর্তৃক মুচাইতে কম্প্রেসার স্টেশন স্থাপনে ইউএস ডলার ৫ মিলিয়ন উেকাচ গ্রহণ করা হয়েছে মর্মে পেট্রোবাংলার পক্ষে আবু সিদ্দিকী একটি অভিযোগপত্র মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর দাখিল করেছেন। এমতাবস্থায় পত্রের বিষয়টি তদন্ত করে এ বিভাগকে অবহিত করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হলো।’
মন্ত্রণালয়ের এ নির্দেশ পাওয়ার পর পেট্রোবাংলা ২৬ নভেম্বর জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব বরাবর জবাবিপত্র লেখে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোঃ হোসেন মনসুর স্বাক্ষরিত পত্রে (নং-২১,৩৭,৫১/৬৬১) একই বিষয় উল্লেখ করে বলা হয়, ‘উক্ত পত্রে বর্ণিত শেভরন কর্তৃক মুচাইতে কম্প্রেসার স্টেশন স্থাপনে ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার উেকাচ গ্রহণের বিষয়ে জনৈক আবু সিদ্দিকীর অভিযোগপত্রে উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ সংশ্লিষ্ট এবং অভিযোগের বিষয়টি স্পর্শকাতর। এ প্রেক্ষাপটে আলোচ্য অভিযোগসমূহ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের মাধ্যমে তদন্ত করার সুপারিশ করা হলো। তদন্তকার্যে পেট্রোবাংলা সহযোগিতা প্রদান করবে।’
জ্বালানি সচিব ও শেভরনের বক্তব্য : ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ ও তদন্তের ব্যাপারে জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ মোহসিনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তদন্তের বিষয়টি একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এখনই এ সম্পর্কে কিছু বলা যাবে না। ব্যক্তিগত অভিমত হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার মনে হয় না অভিযোগের কোনো সত্যতা আছে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের দ্বারা তদন্ত করা যেতে পারে বলেও তিনি মতপ্রকাশ করেন।
অভিযুক্ত জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই এলাহী চৌধুরী জ্বালানি খাতের জন্য বিনিয়োগ সংগ্রহ করতে লন্ডনে আয়োজিত রোড শো’তে রয়েছেন বিধায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এদিকে মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এনামুল হকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি। তিনি বিজয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গত তিনদিন নিজ এলাকা চাঁপাইনবাবগঞ্জে রয়েছেন। তার সেলফোনে কল করা হলে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা বিপ্লব রিসিভ করে জানান, মন্ত্রী ফোনে কথা বলবেন না।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হোসেন মনসুরও লন্ডন সফরে রয়েছেন। পেট্রোবাংলার একাধিক পরিচালকের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বললে তারা অভিযোগ ও তদন্ত প্রক্রিয়ার কথা স্বীকার করলেও নিজের নাম উল্লেখ করে কোনো কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
মার্কিন কোম্পানি শেভরন বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কোম্পানির প্রেসিডেন্ট স্টিভ উইলসন বিদেশে আছেন বলে জানানো হয়। কোম্পানির পরিচালক (এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্স) ও মুখপাত্র নাসের আহমেদ জানান, তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ ভিত্তিহীন। শেভরন সারা বিশ্বে সর্বোচ্চ নৈতিকতা বজায় রেখে ব্যবসা পরিচালনা করে বলে তিনি দাবি করেন। অভিযোগের ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের তদন্তের উদ্যোগ সম্পর্কে শেভরন কিছু জানে না বলে জানান তিনি। অভিযোগের কারণে শেভরনের সুনামের কোনো ক্ষতি হবে কিনা জানতে চাইলে শেভরন পরিচালক বলেন, এটি দেশে-বিদেশে অর্জিত আমাদের সুনামের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না বলে আমরা আস্থাশীল।
বিতর্কিত কম্প্রেসার প্রকল্প : গ্যাসের চাপ বাড়াতে মুচাই, আশুগঞ্জ ও এলেঙ্গায় তিনটি কম্প্রেসার স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয় অনেক আগে। বিবিয়ানা ও জালালাবাদ ক্ষেত্র থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলে মার্কিন তেল কোম্পানি শেভরন ৫২ দশমিক ৭০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা) ব্যয়ে কম্প্রেসার বসানোর প্রস্তাব দেয় কয়েক মাস আগে। ২৫ আগস্ট মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়। ৬ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রস্তাব অনুমোদন করে ফাইলে স্বাক্ষর করেন।
পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিবিয়ানা ও জালালাবাদ ক্ষেত্রের মজুত অনুযায়ী আগামী ১০ বছরে মুচাইতে গ্যাসের চাপ কমবে না। তাই এ মুহূর্তে সেখানে কম্প্রেসার বসালে তা পুরোপুরি অপচয় হবে। সূত্র জানায়, আগে মুচাইতে গ্যাসের চাপ ছিল ৯৩৭ পিএসআই। বিবিয়ানা ও জালালাবাদ থেকে উত্পাদন বাড়ানোর পর এ চাপ বেড়ে হয়েছে ১০৫০ পিএসআই, যা আশুগঞ্জ লাইনের জন্যও যথেষ্ট বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানান।
মুচাইর কম্প্রেসার স্থাপন প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পরও পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এর জোর বিরোধিতা করেন। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে এ নিয়ে শেভরনের সঙ্গে পেট্রোবাংলার জেএমসির (যৌথ ব্যবস্থাপনা কমিটি) বৈঠক হয়। সে বৈঠকে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা মুচাইতে কম্প্রেসার স্থাপনের পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। পেট্রোবাংলার তত্কালীন চেয়ারম্যান মেজর (অব.) মোক্তাদির আলী শেভরনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিরোধিতাকারীদের সঙ্গে তুমুল বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন।
বিনা টেন্ডারে শেভরনকে দেয়া সেই মুচাই প্রকল্প এখন সরকারের জন্য শুধু বিব্রতকরই প্রমাণিত হচ্ছে না, সেই সঙ্গে মাত্র এক বছরের মধ্যে নীতিনির্ধারকদের নৈতিক অবস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে বলেই মনে করেন জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্টরা। ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত কতখানি নিরপেক্ষ হবে, তা নিয়েও সন্দেহ পোষণ করছেন অনেকে।
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?