Amardesh
আজঃ ঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৭ ডিসেম্বর ২০০৯, ৩ পৌষ ১৪১৬, ২৯ জিলহজ ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 বিশেষ বিভাগ
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

আলোকিত হওয়ার উেস জলদস্যু!

ফাতিমা তামান্না
এক সময়ে যারা জলদস্যু হিসেবে বিশ্বের সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ করেছে তারাই ‘এনলাইটেন্ড’ হয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে নিজেদের অবাধ বাণিজ্য ও কর্তৃত্ব নিরাপদ রাখতে নৌবাহিনীর মাধ্যমে সমুদ্র দখল করে রেখেছে। যারা এক সময় জলদস্যুতার মাধ্যমে সম্পদ আহরণ করেছে, মানুষ হত্যা করেছে, তারাই এখন সমুদ্রে জলদস্যু খুঁজে বেড়ায়। তারাই সম্প্রতি সোমালীয়দের জলদস্যুতার অভিযোগে ধরে নিয়ে যায়। বিখ্যাত নিউইয়র্কার ম্যাগাজিনের এক নিবন্ধে এই চমকপ্রদ বিবরণ তুলে ধরা হয়।
আমরা এ যাবত এনলাইটেন্ড বলতে আলোকিত অর্থাত্ শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক পরিশীলিত রুচিবোধকে বুঝেছি। অনেক পণ্ডিত ও গবেষকদের কাছে এর তাত্পর্য এর মধ্যেই সাম্রাজ্যবাদের সুশীল মুখোশ হিসেবে ধরা দিয়েছে। কারণ ওই এনলাইটেন্ড হলো সাম্রাজ্য বিস্তারকারী ক্ষমতাবানদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির বাহক। তবে লেখক ও অর্থনীতিবিদ পিটার টি লিসন তার ‘দ্য ইনভিজিবল হুক’ বইয়ে জানিয়েছেন, এই এনলাইটেন্ডের উত্স হলো প্রাচীন সেইসব জলদস্যু (পাইরেটস), যারা চর্তুদশ শতক থেকে সপ্তদশ শতকের মধ্যে দস্যুতার মাধ্যমে সম্পদ লুণ্ঠন করে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রশক্তির উত্থান ঘটিয়েছে। ওই জলদস্যুরা প্রথমে রোমান, ব্রিটিশ ও স্প্যানিশ শক্তি হিসেবে বিশ্বের গোটা সমুদ্রপথে আধিপত্য বিস্তার করে। সমুদ্রে তাদের জাহাজে দস্যুতার বিশেষ পতাকা চালু করে এবং সমুদ্রপথে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে অর্থ (শুল্ক) আদায় করে।
পিটার টি লেসন ওই বইয়ে লিখেছেন, ঘৃণিত জলদস্যুদের কার্যক্রমের ভেতর থেকেই ‘এনলাইটেন্ডে’র বিকাশ শুরু।
বিখ্যাত ‘নিউইয়র্কার’ ম্যাগাজিনের সেপ্টেম্বর ২০০৯ সংখ্যায় পাইরেটসদের ওপর গবেষণা গ্রন্থের আলোচনায় ক্যালিব ক্রেইন ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে জলদস্যুদের নৃশংসতা ও পাইরেটস সংস্কৃতির এসব বিবরণ জানান।
ক্যালিব ক্রেইন জানান, জলদস্যুরা কীভাবে হিরো হয়ে উঠেছে, তা নিয়ে চমকে উঠেছেন মার্কসিস্ট ইতিহাসবিদ ক্রিস্টেফার হিল। তিনি জলদস্যুদের জীবনধারা, তাদের বিশ্বাস ও সমাজ কীভাবে একটি উন্নত বিশ্ব নির্মাণ করছে, তা অনুসন্ধানে ১৯৮০ সালে ইতিহাসবিদ মার্কোস রিডিকসকে পরামর্শ দেন। ক্যালিব ক্রেইন ওই নিবন্ধে জানান, ওই দস্যুদের মূল উদ্দেশ্য ছিল সম্পদ আহরণ, যা ‘ক্যাপিটালিজম’ ধারণা প্রতিষ্ঠিত করে। ওই দস্যুরাই গে লিবারেশন ও ফেমিনিজমের ধারণা তৈরি করে (পাইরেটস সদস্য ও প্রধান হিসেবে নারীরাও ছিল)। ওই দস্যুরাই বার, পানশালা, স্বাস্থ্যবীমা চালু করে এবং নিউ ইংল্যান্ডে পিউরিটান চার্চ নির্মাণ করে। ক্যালিব কেইন জানান, সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে ক্যারিবীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন সমুদ্র এলাকায় পাইরেটদের বিভিন্ন দলের (ব্রিটিশ ও স্প্যানিশ) সংঘাতে অর্থ সঙ্কট দেখা দেয়ায় তাদের জাহাজগুলো ভারত মহাসাগরের পথে এগিয়ে আসে। এ সময় (১৬৯৪ থেকে ১৬৯৮ সালের মধ্যে) তারা ভারত উপমহাদেশের দুটি জাহাজ লুণ্ঠন করে। জাহাজ দুটোতে ছিল বিপুল সম্পদ। একটি জাহাজ এক মুসলিম ধনাঢ্য বণিকের এবং অপরটির মালিকানা ভারতের মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের। এই জাহাজ দুটি লুট করে জলদস্যুদের প্রত্যেক সদস্য এক হাজার পাউন্ড করে ভাগ পায়। যা মার্চেন্টশিপে ২১ বছর চাকরির বেতনের সমান।
ক্যালিব ক্রেইন কলিন উডওয়ার্ডের ‘দ্য রিপাবলিক অব পাইরেটস’ বইয়ের বরাত দিয়ে জানান, মোগলরা যখন ইংরেজ শাসকদের কড়া ভাষায় সতর্ক করে দেয়, তখন ইংরেজ শাসকরা পাইরেটস তত্পরতা কমিয়ে সাধারণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের পথ অবলম্বন করে। এ সময় পাইরেটদের নীতি ছিল, এক জনের ক্ষেত্রে যা আইনসিদ্ধ অন্যদের ক্ষেত্রে তা আইনসিদ্ধ নয়।
ক্যালিব ক্রেইন জানান, আজও ওই পাইরেট তত্পরতা ভিন্ন আদলে সক্রিয় রয়েছে, এর মূল নিহিত রয়েছে গ্রেট ইউরোপিয়ান ক্ষমতার লড়াইয়ে। যেমন রোনাল্ড রামসফেল্ড মনে করেন, সম্পদ ও শক্তির জন্য সামরিক অগ্রবর্তী অবস্থান অত্যবশ্যক। পাইরেট সংস্কৃতির মতোই এখনও সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও বল প্রয়োগের শক্তি-সামর্থ্যই বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করছে। এখনও ওই শক্তিধরদের অবাধ বাণিজ্য নিশ্চিত ও নিরাপদ করতে বিশ্বের সমুদ্র পথগুলোতে সামরিক ঘাঁটি ও জাহাজ রয়েছে। পাইরেট ’এনলাইটেন্ড’ হয়ে এখন সামরিক-অর্থনৈতিক শক্তিধর রাষ্ট্র হয়েছে। বিষয়টি এমন যে, ডাকাত এখন জমিদার হয়ে উঠেছে। যাদের অতীত পাইরেট সংস্কৃতির, তারাই এখন বিশ্বের পুলিশি দায়িত্ব নিয়ে পাইরেট খুঁজে বেড়াচ্ছে, সন্ত্রাসী খুঁজে বেড়াচ্ছে।
সোমালিয়া উপকূলে জলদস্যুতার সাম্প্রতিক কাহিনী বেশ আলোড়ন তুলেছিল। ওই জলদস্যুদের দমনে সারা বিশ্বের নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিগুলো তত্পর হয়ে ওঠে। যদিও মাত্র তিনশ’ বছর আগেও ক্যারিবীয় অঞ্চলসহ গোটা আফ্রিকা উপকূল ও ভারত মহাসাগরে বর্তমানের এনলাইটেন্ডদের পূর্বপুরুষরা পাইরেট সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল। আধুনিককালে ব্যবসা ও সামরিক কর্তৃত্বের সুযোগ নিশ্চিত করতে সুয়েজ খাল দিয়ে যেসব জাহাজ চলে সমুদ্র তাদের জন্য অবাধ ও স্বাধীন। কিন্তু সোমালীয়দের ক্ষেত্রে তা নয়। সোমালীয় জলদস্যুদের আটকের পর তারা ‘টাইমস’কে বলেছে ‘আমরা জলদস্যুদের হাতে সমুদ্র বেদখল হওয়া মেনে নিতে পারি না। আমরা মনে করি, জলদস্যু তারাই, যারা অবৈধভাবে আমাদের সমুদ্রের মাছ ধরে এবং আমাদের সমুদ্র এলাকায় দূষিত বর্জ্য ফেলে যায়।’ সম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ জাতি সম্পর্কে বার্ট্রান্ড রাসেলের মূল্যায়নে ওই পাইরেট সংস্কৃতি ও বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে সম্প্রসারণ ও দ্বৈতনীতির কপট চরিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাসেল বলেছেন, ‘ব্রিটেনে আমরা বিখ্যাত জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ উত্সর্গ করেছি নেলসন ও ওয়েলিংটনের সম্মানার্থে, যারা বিদেশিদের হত্যা করার ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য পারদর্শিতা প্রদর্শন করেছিলেন।’
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?