Amardesh
আজঃ ঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৭ ডিসেম্বর ২০০৯, ৩ পৌষ ১৪১৬, ২৯ জিলহজ ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 বিশেষ বিভাগ
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

শহীদদের কথা ভোলেননি বিয়ানীবাজারবাসী

মিলাদ জয়নুল, বিয়ানীবাজার (সিলেট)
মুক্তিযুদ্ধেও রয়েছে বিয়ানীবাজারবাসীর গৌরবময় ভূমিকা। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর স্থানে স্থানে গড়ে উঠেছিল মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। যুবক-তরুণরা দলে দলে তাতে যোগ দিয়েছেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বশেষ যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে তাতে বিয়ানীবাজারের ৫৮০ মুক্তিযোদ্ধার নাম রয়েছে।
মরমী বাউল শিল্পী কমর উদ্দিন মুক্তির গান গেয়েই প্রাণ দিলেন। তিনি কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। কিন্তু হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন নিখাদ দেশপ্রেম। উপজেলার মাথিউরার সন্তান কমর উদ্দিন ৫ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ৪ ভাইয়ের ছোট।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার কাজে অবতীর্ণ হন তিনি। তার ভাতিজা মতিউর রহমান চলে যান সরাসরি যুদ্ধে। পাকিস্তানি সৈন্যরা বিয়ানীবাজার এসে হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে তিনিও আত্মগোপন করেন। কিন্তু রাজাকারদের তথ্যানুসারে পাকবাহিনী তাকে গোলাপগঞ্জের আমকোনা থেকে আটক করে ১৯ সেপ্টেম্বর পাঠিয়ে দেয় কাঁঠালতলার বধ্যভূমিতে। বধ্যভূমিতে কমর উদ্দিনকে দিয়েই তার নিজের কবর খুঁড়িয়ে নেয়া হয়। পাষণ্ডদের গুলিতে নিভে যায় কমর উদ্দিনের জীবন প্রদীপ। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর কাঁঠালতলা বধ্যভূমি থেকে কমর উদ্দিনের লাশ তোলা হয়। বিদেশি নাইলনের জাঙ্গিয়া ও অন্যান্য পোশাক দেখে এই বাউলশিল্পীর মরদেহটি শনাক্ত করা হয়। তারপর তাকে রাস্তার পাশে বাড়ির প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়। যেখানে এপিটাফ লেখা হয়েছে—‘পথিক, একটু দাঁড়াও...’।
উপজেলার কুড়ার বাজার ইউনিয়নের বৈরাগীবাজার-খশির গ্রামের পঁচিশ বছর বয়সী জামাল উদ্দিন ছিলেন কৃষিজীবী। তিনিও জড়িয়ে পড়েন স্বাধীনতা সংগ্রামে। আওয়ামী লীগ কর্মী হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের বার্তাবাহকের কাজ করতেন। বারপালের দীঘির পাড় থেকে তাকে আটক করে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী শান্তি কমিটির নেতা ফুরকান মাস্টার ও ঘুঙ্গাদিয়া গ্রামের এক চৌকিদার। প্রথমে দীঘিরপাড়ের মসজিদে তাকে বন্দি করে রাখা হয়। পরে তুলে দেয়া হয় পাকসেনাদের হাতে। ডাকবাংলোর কাঁঠাল গাছের সঙ্গে তাকে ঝুলিয়ে বেদম প্রহার শেষে ১৩ জুলাই কাঁঠালতলার বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার পর তার এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয় নাম রাখা হয় স্বাধীন সুন্দরী। স্ত্রী রওশন আরা বেগমের পরে বিয়ে হয় দেবরের সঙ্গে। স্বাধীনতার পর তার সহযোদ্ধারা শহীদ জামালের নামে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করেন। যা এখন বৈরাগীবাজারের ত্রিমুখীতে অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে আছে। বৈরাগীবাজার এলাকার একটি ফুটবল টিমের নামকরণও করা হয়েছিল শহীদ জামালের নামে।
বিয়ানীবাজারের কসবা গ্রামে কয়েকজন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তাদের একজন এমএ আজিজ। তারা তখন রণাঙ্গনে। পাকিস্তানি সেনারা বাড়ি ঘেরাও করে এমএ আজিজকে না পেয়ে মান্নানের পুরো পরিবারকে ধরে নিয়ে আসে। শত বাধা উপেক্ষা করে স্ত্রী ও সন্তানের জীবন রক্ষার্থে নিজেকেই মৃত্যুমুখে ঠেলে দেন রেফারি মান্নান। আনুমানিক চারটায় কয়েকটি গুলির শব্দ বাতাসে ভেসে এলো। জানা গেল আবদুল মান্নানের মৃত্যু সংবাদ। দেশ স্বাধীন হলে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা ফরিদ গাজীর উপস্থিতিতে পুলিশ বধ্যভূমির গণকবরগুলো খুঁড়ে লাশ উত্তোলন করে। হিন্দু হলেই দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেয়া হয়েছিল পাকসেনাদের। তারা হিন্দুপাড়াগুলোতে অভিযান চালিয়ে নির্বিচারে হত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করে।
ভারতের বিখ্যাত দেওবন্দ মাদ্রাসা থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী মাওলানা মকদ্দছ আলী ওরফে ময়না মিয়াকে পাকিস্তানি আর্মি হত্যা করে অন্য ৬ জনের সঙ্গে নয়াগ্রামের আব্দুন নূর জমাদারের পুকুর পাড়ে এক কবরে পুঁতে ফেলা হয় রাতের আঁধারে। তাদের সবাইকে ২৬ সেপ্টেম্বর গণকবর দেয়া হয় বলে জানা গেছে। স্বাধীনতার পর লাশগুলো কবর থেকে তুলে এনে যার যার পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হয়। এই ৭ জনের মধ্যে ছিলেন নয়াগ্রামের মাওলানা মকদ্দছ আলী ওরফে ময়না মিয়া, সারপারের ইর্শাদ আলী, ইনামপুরের দুই সহোদর আবদুর রউফ কুটি মিয়া ও আব্দুল মুহিত তফাদার কনাই মিয়া, বাড়ুদার আবদুস ছত্তার ও আব্দুল গফুর এবং পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন দুবাগ চাতল পারের আইয়ুব আলী।
এপ্রিল মাসে পূর্ব বালিঙ্গা পার থেকে ৩ জন ও চাতলপার থেকে দু’জনকে ধরে এনে একসঙ্গে মেওয়া এলাকার কুশিয়ারা নদীর তীরে হত্যা করে সবার লাশ নদীতে ফেলে দেয়া হয়। এরা হলেন পূর্ব সিলেটীপাড়ার রমান আলীর ছেলে বশির আলী লাই (৩৫), বাঙ্গালহুদার আশিদ আলীর ছেলে তজমান আলী (৪৮), একই গ্রামের রইছ আলীর ছেলে জমির আলী ওরফে বলাই মিয়া (৩৫), চাতল পারের মন্তাজ আলীর ছেলে ছিদেক আলী ওরফে ছিদই মিয়া (৪৫) ও বাঙ্গালহুদার নূর আলী (৪০)।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্বিচারে গণহত্যার অনেক নির্মম নজির স্থাপন করেছে বিয়ানীবাজার উপজেলার সুপাতলা ও পার্শ্ববর্তী নিদনপুর গ্রামে। আর্মি অফিসার ও শীর্ষ রাজাকাররা আনন্দ-ফুর্তির জন্য প্রমোদকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৩ জনকে হত্যা করতেও দ্বিধা করেনি। সেই পৈশাচিকতার শিকার হন হিন্দু পরিবারের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে দেড় বছরের শিশুটি।
ঘটনাটি ২০ জুলাইয়ের। মনোরঞ্জন ঘোষের ১০ সদস্যের পরিবারে তিন প্রজন্মের ৬ জনকেই হত্যা করা হয়েছিল সেদিন।
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?