প্রত্যাশা ও একজন বাবার গল্প
মাহমুদুর রহমান
বিয়ের তিন বছর পূর্ণ হওয়ার পরই সন্তান নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় আরিফ-সুমী দম্পতি। গ্র্যাজুয়েশন করার পর একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে বিয়ে করে আরিফ। চাকরিতে যা মাইনে পায় তা দিয়ে নতুন সংসারের সব খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়লে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা শুরু করে সে। বছরখানেক চেষ্টা করে যুক্তরাজ্যের একটি ভিসা পেয়ে যায় এবং যাওয়ার নির্দিষ্ট তারিখও ঠিক হয়ে যায়। স্ত্রী সুমীর গর্ভে সন্তানের বয়স পাঁচ মাসের মাথায় যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে পাড়ি জমায় সে। তবে যাওয়ার সময় সুমীকে একটি ছোট প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বলে যায় কেবল সন্তান জন্মাবার পরেই যেন প্যাকেটটি খোলে। আর বলে যায়, বাবু জন্মানোর পরে এটি কাজে লাগতে পারে আবার নাও লাগতে পারে। সুমিও তার স্বামীর কথামত প্যাকেটটি আর খুলল না। সময়মতো সুমীর কোলজুড়ে এলো একটি ফুটফুটে কন্যাশিশু। আরিফের কথামত খোলা হলো তার রেখে যাওয়া প্যাকেটটি। না প্যাকেটটি বৃথা যায়নি, পুরোপুরিই কাজে লেগেছিল, কারণ প্যাকেটের ভেতর আরিফ রেখে গিয়েছিল তার প্রত্যাশিত একটি নবজাত কন্যাশিশুর কয়েক সেট পোশাক। বহু প্রত্যাশিত ছিল বলেই শিশুটির নাম রাখা হয়েছিল ‘প্রত্যাশা’। কন্যাশিশুর জন্য একজন বাবার এত আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টিকর্তাও না রেখে পারেননি। আমি জানি না, বাবা-মায়ের এত বেশি আকাঙ্ক্ষার পাত্রী হয়ে প্রথম সন্তান হিসেবে সচরাচর কোনো কন্যাশিশুর জন্ম হয় কিনা। কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ার অপরাধে স্ত্রীকে মারধর, তালাক ও অসহনীয় নির্যাতন এবং জন্ম নেয়া কন্যাশিশুকে ফেলে যাওয়ার মতো ঘটনা অনেক শুনেছি। একটা সময় ছিল যখন কন্যাশিশু জন্ম নেয়াকে অভিশাপ মনে করা হতো। খুব বেশি আগের কথা নয়, কয়েক বছর আগেও আমাদের দেশে কন্যাশিশু জন্মদানের কারণে অনেক হতভাগিনীকে স্বামীর সংসার ছাড়তে হয়েছে, সহ্য করতে হয়েছে নানা রকম নির্যাতন। আবার শুধু কন্যাশিশু জন্ম দেয়ার কারণে এখনও অনেক স্ত্রীকে স্বামীর সংসারে চক্ষুশূল হয়ে থাকতে হচ্ছে। সহ্য করতে হচ্ছে শ্বশুর-শাশুড়ির কটু কথা। আশার কথা হলো পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যেখানে বছরে এক কোটিরও বেশি কন্যাশিশুর ভ্রূণ নষ্ট করা হয়, সেখানে আমাদের দেশে প্রথম সন্তান হিসেবে কন্যা শিশুর প্রতি একজন বাবার এত আগ্রহ আমাদের আশান্বিত করে। আমরা ভাবার সাহস পাই যে, আমরা অনেক দেরিতে হলেও জন্মগত বৈষম্য থেকে মুক্ত হতে চলেছি। গাজীপুরের স্কুল শিক্ষক সেলিম ভূইয়া। পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ের সংসার। তিনি জানালেন মেয়েটি সবার ছোট। মেয়ের অপেক্ষাতেই নাকি পাঁচটি ছেলের মুখ দেখতে হয়েছে তাকে। আজকাল অনেক নবদম্পতিকেই দেখি প্রথম সন্তান মেয়ে হওয়ার ব্যাপারে উত্সাহী। আমরাও চাই সব কন্যাশিশুর জন্মই যেন প্রত্যাশিত হয়। সব কন্যাশিশু জন্ম নিক মা-বাবার প্রত্যাশা হয়ে।


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


