যু দ্ধ স্মৃ তি : সূর্যবালার বিজয় কথন
খন্দকার মর্জিনা সাঈদ
বরিশালের গুঠিয়া ইউনিয়নের পূর্ব নারায়ণপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ায় যখন পা রাখলাম তখন সূর্য ঠিক মাঝ আকাশে। পরিচ্ছন্ন, নির্জন, অসীম দরিদ্রতার ছাপ স্পষ্ট এই হিন্দুপাড়ার। পুরুষ সদস্যরা সেই সময় নিত্যদিনের মতো যে যার কাজে বেরিয়ে পড়েছে। আমার গন্তব্য ৬৫ বছর উত্তীর্ণ সূর্যবালার বাড়ি। সদা সংগ্রামী, নিজ জীবন-সংসার, দেশের বিজয় ছিনিয়ে আনতে লড়ে যাওয়া এক নারী সূর্যবালা। কথা বলে সময় অপচয় করতে চান না। চান না বলেই তিনি আপন মনে হোগলা পাটি বুনতে বুনতেই বয়ান করছিলেন যুদ্ধদিনের কথা। ৭০ উত্তীর্ণ পেশায় মিস্ত্রি তারান হাওলাদারের স্ত্রী সূর্যবালা জানান, যুদ্ধের সময় বয়স ছিল ২৬/২৭ বছর। হয়েছিলেন সন্তানের মা। তিনি বলেন, রেডিও’র মাধ্যমে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রথম জানতে পারলাম পাকিস্তানি হানাদারদের তাড়াতে, দেশের বিজয় ছিনিয়ে আনতে ঘরে ঘরে যুদ্ধ শুরু হয়েছে এবং সেই যুদ্ধের রেশ গ্রাম-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। মায়েরা তাদের যুবক ছেলেদের পাশাপাশি মেয়ে সন্তানদেরও মুক্তির সংগ্রামে নাম লেখাচ্ছে। গ্রামের স্কুল-মাদ্রাসায় ট্রাক, ট্যাঙ্কযোগে পাকিস্তানি সৈন্যরা এসে জড়ো হচ্ছে এবং তাদের এদেশীয় সহচরদের মাধ্যমে প্রত্যন্ত গ্রামে নৃশংসভাবে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। তখন আর স্থির থাকতে পারলাম না। জীবন বাঁচানোর তাগিদে ভিটেমাটি সব ফেলে, হাতের শাঁখা খুলে, কপালের সিঁদুর মুছে স্বামীকে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরিয়ে খেয়ে না খেয়ে গ্রামের পর গ্রাম পাড়ি জমান। পাকিস্তানি সৈন্যদের মুখোমুখি হতেই মিশে গেছেন মুসলমান পরিবারগুলোর সঙ্গে। সূর্যবালা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, তখন যদি এদের আন্তরিক সহযোগিতা ও আশ্রয় না পেতাম, তাহলে বেঁচে থাকা কষ্টকর হয়ে যেত।
তিনি বলেন, যুদ্ধের সময় আমরা যে শুধু নিজের প্রাণ বাঁচানোকেই বড় ভেবেছি, তা নয়। আমার বিশ্বাস, দেশবাসী যে যেভাবে পেরেছে দেশের বিজয় ছিনিয়ে আনতে সাহায্য করেছে। কেউই অলস-অর্থহীন সময় ব্যয় করেনি। সে সময় বেশিরভাগ মানুষেরই ছিল আতঙ্কগ্রস্ত যাযাবর জীবন। যখন যে মুহূর্তে যেখানে আস্তানা গেড়েছি, সেখানেই দায়িত্বমাফিক কাজ মাথায় তুলে নিয়েছি। সেই কাজের মধ্যে ছিল তথ্য সরবরাহ, আহত মুক্তিযোদ্ধা ও শিশু-বৃদ্ধদের সেবা, রান্নাবান্নার কাজ, পুড়ে যাওয়া ঘর মেরামত, শীতের কাপড় সংগ্রহ, বিলি-বণ্টন। আতঙ্ক থাকলেও ছিল ঐক্য। আর এই ঐকতানকে পুঁজি করেই আমরা সব ধর্মাম্বলীরা কোনো রকমে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ না নিয়েই হাতের কাছে দা, বঁটি, ধান কাটার কাঁচি যা পেয়েছি সম্মিলিতভাবে হানাদারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছি। এক মুহূর্তের জন্যও দেশ থেকে পালিয়ে বাঁচার চিন্তা করিনি।
নয় মাস যুদ্ধ শেষে বিজয় আসে। অন্য সব পরিবারের মতো নিজ ভিটায় ফিরে আসেন সূর্যবালা। বিধ্বস্ত ঘর দেখে নতুন করে সংসার সাজান। ৩ ছেলে ৩ মেয়েকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত করে জমি বিক্রির টাকায় এদের বিয়ের ব্যবস্থা করেন। ছেলেরা তাদের বাবার ব্যবসায়ই বহাল আছে। সূর্যবালা কিছুটা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, দেশে বিজয় অর্জিত হয়েছে ৩৮ বছর পার হয়ে গেল। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করে যাচ্ছি, তবু অভাব ঘোচাতে পারছি না। বার বার দারিদ্র্যের কাছে পরাজিত হচ্ছি। মুখ ফুটে কারও কাছে সাহায্য চাইনি। কেউ কখনও কোনোদিন এসে জানতেও চায়নি বাংলার বিজয়গাথা ছিনিয়ে আনার পেছনে আমাদের ঐক্যবদ্ধ অবদানের কথা। হতাশার সুরে সূর্যবালা বললেন, আমাদের স্বামী-স্ত্রী দু’জনকে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা না হোক সামান্য প্রবীণ ভাতা দিলেও কৃতজ্ঞ থাকতাম। যাতে হোগলা পাটি বুনে বা গরুপালনের মতো শ্রমনির্ভর কাজ করে প্রতি মুহূর্ত অন্নকষ্টের দুশ্চিন্তায় থাকতে না হয়। অসুস্থ অবস্থায় অন্তত একবেলা শুধু কাঁচালঙ্কা-নুন দিয়ে ভাত তো খেতে পারতাম, এক-আধখানা ব্যথানাশক ওষুধ তো পেতাম!
তিনি বলেন, যুদ্ধের সময় আমরা যে শুধু নিজের প্রাণ বাঁচানোকেই বড় ভেবেছি, তা নয়। আমার বিশ্বাস, দেশবাসী যে যেভাবে পেরেছে দেশের বিজয় ছিনিয়ে আনতে সাহায্য করেছে। কেউই অলস-অর্থহীন সময় ব্যয় করেনি। সে সময় বেশিরভাগ মানুষেরই ছিল আতঙ্কগ্রস্ত যাযাবর জীবন। যখন যে মুহূর্তে যেখানে আস্তানা গেড়েছি, সেখানেই দায়িত্বমাফিক কাজ মাথায় তুলে নিয়েছি। সেই কাজের মধ্যে ছিল তথ্য সরবরাহ, আহত মুক্তিযোদ্ধা ও শিশু-বৃদ্ধদের সেবা, রান্নাবান্নার কাজ, পুড়ে যাওয়া ঘর মেরামত, শীতের কাপড় সংগ্রহ, বিলি-বণ্টন। আতঙ্ক থাকলেও ছিল ঐক্য। আর এই ঐকতানকে পুঁজি করেই আমরা সব ধর্মাম্বলীরা কোনো রকমে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ না নিয়েই হাতের কাছে দা, বঁটি, ধান কাটার কাঁচি যা পেয়েছি সম্মিলিতভাবে হানাদারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছি। এক মুহূর্তের জন্যও দেশ থেকে পালিয়ে বাঁচার চিন্তা করিনি।
নয় মাস যুদ্ধ শেষে বিজয় আসে। অন্য সব পরিবারের মতো নিজ ভিটায় ফিরে আসেন সূর্যবালা। বিধ্বস্ত ঘর দেখে নতুন করে সংসার সাজান। ৩ ছেলে ৩ মেয়েকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত করে জমি বিক্রির টাকায় এদের বিয়ের ব্যবস্থা করেন। ছেলেরা তাদের বাবার ব্যবসায়ই বহাল আছে। সূর্যবালা কিছুটা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, দেশে বিজয় অর্জিত হয়েছে ৩৮ বছর পার হয়ে গেল। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করে যাচ্ছি, তবু অভাব ঘোচাতে পারছি না। বার বার দারিদ্র্যের কাছে পরাজিত হচ্ছি। মুখ ফুটে কারও কাছে সাহায্য চাইনি। কেউ কখনও কোনোদিন এসে জানতেও চায়নি বাংলার বিজয়গাথা ছিনিয়ে আনার পেছনে আমাদের ঐক্যবদ্ধ অবদানের কথা। হতাশার সুরে সূর্যবালা বললেন, আমাদের স্বামী-স্ত্রী দু’জনকে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা না হোক সামান্য প্রবীণ ভাতা দিলেও কৃতজ্ঞ থাকতাম। যাতে হোগলা পাটি বুনে বা গরুপালনের মতো শ্রমনির্ভর কাজ করে প্রতি মুহূর্ত অন্নকষ্টের দুশ্চিন্তায় থাকতে না হয়। অসুস্থ অবস্থায় অন্তত একবেলা শুধু কাঁচালঙ্কা-নুন দিয়ে ভাত তো খেতে পারতাম, এক-আধখানা ব্যথানাশক ওষুধ তো পেতাম!


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


