কবিতা
তাদের জন্য
আল মাহমুদ
মনের ভেতর খুঁতখুতানি, জ্বলছে কিছু
হাত রাখলাম বুকের উপর, চলছে কিছু
কেবল শুনি ভাঙার শব্দ, কার পা ভাঙে
ঘোলাপানির স্রোত বয়ে যায় ঐ যে গাঙে
চতুর্দিকে মাতন উঠে ভাঙছে রে সব
ভাঙছে বাড়ি গঞ্জ বাজার ঐ কলরব
এমন ভাঙার খেলায় বল মাতাল করা
মাতাল তো নয় মত্তপ্রেমিক পাগলপারা
তাদের জন্য সাজিয়ে রাখি আমার হৃদয়
সাজিয়ে রাখি বিছিয়ে রাখি জয় পরাজয়।
০৬ ডিসেম্বর, ২০০৯
পাথরজীবন
আবুবকর সিদ্দিক
পাথরের তলা খুঁড়ে
দেখো না এ শ্যাওলাজীবন;
প্রাগৈতিহাসিক প্রত্ন—
পরগাছা ফ্যাকাশে ফাঙাস।
বিদ্যুতের ফণা যদি
হত তবে হানত ছোবল,
ও যে দলিত মথিত
হাজার জুতোর হাইহিলে।
পাথর ... থানপাথর
নিরেট খনিজ ধুকধুকি,
কিছু প্রাণ কিছু স্মৃতি
এই নিয়ে ধুঁকছে পাতাল।
সুভালাভালি থাকতে
দাও ওকে নিজের মতন;
ঘণ্টা বাজে চলো ফিরি
ফটকে লটকে দেবে তালা।
দেখে যেও
মাকিদ হায়দার
বীর মুক্তিযোদ্ধা বেবী ইসলাম স্নেহভাজন
সময় পেলে দেখে যেও, সময় যদি
না পাও আমাকে শুধু একবার
নাম ধরে ডাকলেই
আমি নিজেই চলে আসবো
তোমার নিকটে
তবে তুমি আমাকে দেখে কাঁদলে
আমার খুবই খারাপ লাগবে
তুমি নিশ্চয়ই জানো,
আমার মতো অনেকেই গিয়ে ফিরে আসেনি
রণাঙ্গন থেকে
আমার মতো অনেকেই রণাঙ্গনে যেতে চেয়েও
পারেনি যেতে, তখন চারিদিক ছিলো
অমাময়।
যা হোক সময় পেলে দেখে যেও
ভুরুঙ্গামারীর সম্মুখযুদ্ধ থেকে আমরা যারা
ফিরে যেতে পারিনি তোমার
তোমাদের কাছে!
দেখে যেও
কোটি প্রাণের ঐকতানে
হাসান হাফিজ
আগুনে বারুদে ঝাঁঝে বিস্ফোরণে
অনন্য ভাস্বর হয়ে আছো তুমি
ধমনীর রক্তকণিকায়
মৃত্তিকা ও সবুজে শ্যামলে শস্যে
উদার নিঃসীম নভো নীলে
সর্বত্রই স্বাগত নন্দিত শুদ্ধ
তোমার উত্থান অস্তিত্ব তোমার
সাড়ে সাত কোটি প্রাণ
ঐকতানে বেজে উঠেছিল
বিজয়ের মহতী ঝঙ্কার
আত্মশক্তি উদ্বোধনে
মাটি ও মায়ের মুক্তি
এইভাবে রক্তদামে তারা
অর্জন করেছে শুদ্ধি
কখনও কিছুতে এই
অর্জনের লয় নেই
অহংয়ের ক্ষয় বলে কোনও কিছু নেই
অগ্নিগর্ভ দিন
মুজিবুল হক কবীর
অগ্নিগর্ভ দিন,
লঘু হাওয়ায় বারুদের গন্ধ
দুর্বাপাতার আড়াল থেকে
উঁকি মারছে তাজা গ্রেনেড,
ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সূর্য সৈনিকরা,
একটি মাছি এসে বসেছে নিথর সৈনিকের হাতে
যে-হাত একদা ছিলো মেশিনগানের মতো সক্রিয়
যে-হাত ছিলো তীব্র প্রতিবাদী;
রক্তাক্ত পিলখানায় স্বজনের ভিড়,
চোখে নীরব জলের ভাষা,
গাছের পাতায় শোকের ছায়া,
হাওয়া ও গাছ নীরব।
কোন্ সে ঘাতক
স্বদেশের দরোজায় এসে কড়া নাড়ে?
আজ আমাদের হৃদয়জুড়ে ওড়ে
শোকের পতাকা।
দুর্যোগ থেকে দুর্যোগে রাখি পা
রেজাউদ্দিন স্টালিন
দুর্যোগ থেকে দুর্যোগে রাখি পা,
ঝন্ঝায় কাঁপে স্বপ্নের ছায়া পথ।
মহামারী আসে ঈগলের ঔরসে
খরা ও বন্যা খুঁজে নেয় দ্বৈরথ।
দুঃস্বপ্নের দীর্ঘ দাঁতের দাঁড়—
ভাঙে আনন্দ আগামীর জলরাশি,
যেখানেই যাই দেখি করোটি ও হাড়
শুয়ে আছে মূঢ় মৃত্যুর পাশাপাশি।
নগরের নীল বহুতল ঘরবাড়ি
দাঁড়িয়ে রয়েছে পাথরের পম্পেই;
কত আগুনের কত কান্নার তলে
মানুষ হাঁটছে পরিসংখ্যান নেই।
আমি কি একাই দুর্যোগে দাহ হবো,
পার হবো চিতা বহ্নির মহাখরা?
আর কেউ নেই দাঁড়াবার মুখোমুখি,
ভিড় করে আসে ভূমিহীন প্রশ্নরা।
দুর্যোগ থেকে দুর্যোগে রাখি পা,
পথ ভেঙে যায় ঠিকানাবিহীন পথে।
বহু বিরোধিতা কুয়াশার কোলাহল,
পার হয়ে যাবো অনন্ত দ্বৈরথে।
জলভোগ
মারুফ রায়হান
জলগৃহ থেকে তোমাকে গ্রেফতার করে
নিয়ে আসা হলো ফাঁসিমঞ্চে—উন্মুক্ত ডাঙায়
রূপালিসুন্দর তুমি নিঃশব্দ নৃত্যপটিয়সী
তোমার যন্ত্রণাদগ্ধ করুণ প্রস্থান
আমরা উপেক্ষা করে যাই নিত্যদিন
কোথাও কি এর প্রতিবাদ ঘটে?
একটি জটিল ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের মতো?
জলযান থেকে খোয়া যায় শিশু
নদী খুনি নয় কখনোই
কেবল রচিত হয় তার প্রেক্ষাপটে হত্যাদৃশ্য
জলবাস শেখে নাই মানবসন্তান আহা
মাছেদের চোখে তাই করুণ বিস্ময়!
জোছনাবধির
মুহম্মদ নূরুল হুদা
কুয়াশা চাঁদের কীট। শ্যাওলা বা সরোবর। আকাশকে খায় চিরে চিরে।
দাঁড়ায় অরণ্যগুহা। গিরিচূড়া। ঝাউবীথি। ছায়ার শরীর।
বালিতে শুয়েছে সুখ। ঢেউফণা। লাল গর্ত। কাঁকড়া যায় ফিরে।
জোছনা কফিন হাসে। মরণবরণ। নিশিথিনী। কামান্ধ, অধীর।
অনন্তযৌবন নেই। গিলগামেশ ডুকরে কাঁদে। জোছনাবধির।
দুর্ঘটনা
আতাহার খান
ফুটপাতে মুখোমুখি ধাক্কা খাওয়ার পর
ভদ্রমহিলা হঠাত্ দাঁড়িয়ে আমার দিকে
চোখ বড় করে তাকালেন, দেখে
মনে হলো যেন আস্ত গিলে খাবেন আমাকে!
কিছুটা বিব্রত হয়ে সরে দাঁড়ানোর পর
তিনি বললেন : চোখে দেখেন না?
তারপর হাইহিলে শব্দ তুলে
দ্রুত চলে গেলেন ভিড়ের মধ্যে, চোখের আড়ালে দূরে!
ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটে গেল যে বুঝিয়ে তাকে
কিছু বলা সম্ভব হলো না,
আসলে রাস্তায় হাঁটার সময় আমি
কোনোকিছু না দেখে একা আনমনে হাঁটি,
নিঃশব্দ ছায়ার মধ্যে নীরব সময় নিয়ে শুধু
খেলা করি, আর মাকড়সার জালে
বুনে চলি অর্থহীন জীবনের নির্ভুল হিসাব!
এভাবে সময় কাটে প্রতিদিন;
অতএব পথে ধাক্কা খাই, কখনো আহত হই,
কারোর কটূক্তি শুনে নীরবে হজম করি।
এতসব কাণ্ডের পরও চোখ তুলে কোনোকিছু
দেখতে ইচ্ছে হয় না মোটেও,
চারদিকে নানা অনিয়ম,
প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অদ্ভুত খেলা আর
অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা ক্ষমতার কারুকাজ
দেখতে গেলে রক্তে অসম্ভব চাপ বাড়ে,
ঘাড়ে ব্যথা অনুভূত হয়, অবশেষে
ত্বক ফেটে বেরোয় অস্থির ঘাম।
তাই এ বয়সে বাড়তি কোনো চাপ নিতে এখন সাহস হয় না আমার।
করতলে শীর্ণ পাণি
জাহাঙ্গীর ফিরোজ
তুমি ছিলে তুমি আছ
তুমি নদী, চঞ্চল ঝর্নার জল
তুমি ফুল—ফুলের সৌরভ।
তোমার স্পর্শে আজ কামনার দোর খুলে গেল
ভালোবাসা জলপ্রপাতের মতো নেমে এল।
আমি নিম্নগামী হ’তে হ’তে বাষ্প হয়ে উঠি
যদিও জলের স্বভাব অধোগামী
প্রেম সে-তো জলের বাষ্প হয়ে মেঘে মেঘে আর্দ্র জলরাশি;
তুমি স্বপ্নলোকে, উজ্জয়িনী দশদিকে শুধু তুমি
তুমি অরণ্যলোকের ফুল লোকারণ্যে
তোমার শীর্ণপাণি—হাতখানি
করতলে নিয়ে এল ঢেউ।
সাগরে জোয়ার এল চাঁদ হয়ে এলে তুমি সেই নারী।
তোমাকে এভাবে আমি কোনোদিন স্পর্শ করিনি;
তোমার ছোঁয়ায় ছিল প্রেম—ঊর্ধ্বজলরাশি
তবুও তোমাকে আমি বৃষ্টির মতো প্রার্থনা করি চিরদিন।
যদি বলি ক্ষমা চাই, ধৃষ্টতা হবে
মুজতাহিদ ফারুকী
এখন রাতের মতো অন্ধকার, চারদিকে হায়েনার
অট্টহাসি। বুক হিম করা মহাত্রাসের উল্লাস
ছড়িয়ে পড়ছে সব নিরিবিলি গ্রাম জনপদে
ঘরের দুয়ার এঁটে পড়ে থাকা অসহায় নারী,
শিশু, যুবক, প্রবীণ দাঁতে দাঁত চেপে নিরুপায়
নিঃশব্দে ফেলছে গিলে মর্মছেঁড়া রুদ্ধ আর্তনাদ।
ভয়ে আছি, খুব ভয়ে। স্বভাবের পুরো বিপরীতে
রুদ্ধবাক, স্বেচ্ছাবন্দি যেন এই প্রিয় ঘর, স্মৃতির শহর
হয়ে গেছে কখন অচেনা। আশৈশব চেনাজানা
স্বজনেরা যেন পর হয়ে গেছে। তাদের বিবেক
কী আশ্চর্য! বিদেহী আত্মার মতো নিরালম্ব, ধরাছোঁয়াহীন।
এমন করেই বুঝি দিন যায় দিনের পেছনে
মুক্তির নায়ক যারা ঝুলে যায় ফাঁসির দড়িতে
আমার পায়ের নিচে মাটি কাঁপে থরথর জ্বরে
আমার স্মৃতির ঘরে সিঁদ কাটে ঘাতক সময়
আমার সকল তৃষ্ণা জ্বলে যায় বিষাক্ত নিঃশ্বাসে
আমার অস্তিত্ব টলে নেতাদের অসহ্য ঔদাস্যে।
অন্ধকার রাত, আমি একা করজোড়ে দাঁড়িয়েছি,
উচ্চারণ করি যদি ‘ক্ষমা চাই’, হয়তো ধৃষ্টতা
হবে। তবু, একা অমি দণ্ডবত্, অন্ধকারে,
করজোড়ে নতশির, অশ্রুভেজা চোখ; নিঃশব্দ
নীরবে শুধু বলি, ক্ষমা কোরো, ক্ষমা কোরো...
ক্ষমা...
প্রার্থনা
ওয়াহিদ রেজা
হে আল্লাহ্, তুমি ওকে অসুখ দাও, ভীষণ অসুখ
তখন আমি ওকে শুশ্রূষা করবো
ওর বেদনার্ত করুণ দৃষ্টি, ফ্যাকাশে ঠোঁট
কেঁপে কেঁপে উঠবে আমাকে দেখে,
নতুন করে উদ্বেল হবে সরু কোমর, স্তনদ্বয়,
চারিদিকে নামবে তখন মায়াময় নিস্তব্ধতা
তখন অপসৃয়মাণ হতে থাকবে মনুষ্যলোক
সবুজ দ্বীপের ভেতর নড়ে উঠবে সবুজ জিভ
লালা ও নীলফণা; শুরু হবে
কামনার ফিসফাস—অস্পষ্ট প্রতিভাস,
তখন ক্লিন্টন-মনিকা, এরশাদ-বিদিশা...
ওহ্ খোদা! কি রঙ! কি রক্তজবা! পুষ্পে পুষ্পে আমার পুষ্পিতা...
ইশ, ভাবতে পারি না।
হে আল্লাহ, তুমি ওর অসুখ করে দাও, ভীষণ অসুখ
তা না হলে কীভাবে জানাবো
আমি ওকে কতো ভালোবাসি!
শীতমগ্ন ভৈরবী আলাপ
শান্তা মারিয়া
বাতাসে শীতের গন্ধ ধনে পাতার সুঘ্রাণ
প্রাচীন প্রেতাত্মা সব শিশিরের শব্দ শোনে
ঘুম শেষে আড়মোড়া ভাঙে
কোনোদিন মাটির গভীরে শিকড়ের নিভৃত প্রদেশে
অন্তলীন হয়ে ছিল ধূলার প্রাসাদ
সেই প্রাসাদের চূড়া অকস্মাত্ দেখা দেয় আজ।
প্রাচীন আকাশে ওড়ে প্রেমিকের রূপালি ফানুস।
শীতের মিছিলে নিবিড় ভৈরবী সুরে
রসসিক্ত অশ্রুত আলাপ
আবার এসেছে শীত সরিষার হলুদ প্রান্তরে
মাঘের উত্সব হিমেল সুদীর্ঘ রাত
ভাতের মৌতাতে কার ভিজে ওঠে মন।
পৌষ পরবের কৈবর্ত সৌরভে
হাতছানি দেয় ফসলের উদাসী জমিন
বকের শীতার্ত পাখা
ছেনে নেয় রোদের সুঘ্রাণ
নকশি কাঁথার নিবিড় বুননে
উচ্চারিত উষ্ণতার ইমন কল্যাণ।
আবার এসেছে শীত আমাদের ছোট্ট আঙ্গিনায়
বল্লাল সেনের ঘর, ধীমনের চোখ
ফুল্লরার মেধাবী করোটি
বড় আশা নিয়ে জেগে ওঠে আজ।
বিজয়
জাকির আবু জাফর
অন্ধকার এক অবাক খেলার গূঢ় অভিধান
আমি তাকে পাঠ করি পান করি সশব্দে নিঃশব্দে
আশ্চর্য আনন্দে মাখি অনুভূতির সুতীব্র চেতনায়
মুছে ফেলি তাপদগ্ধ ক্ষত অবসণ্ন ক্লান্তির রেখা
রাত্রির দরোজা খুলে দেখি নিঝুম নিভাঁজ চরাচর
পৃথিবীর সব প্রাণ সব প্রেম সকল আরম্ভ
সমস্ত সমাপ্তি আর যত মধ্যবর্তী আয়োজন
এক অলৌকিক অন্ধকার থেকে অস্তিত্ববান
শেষতক আমি আঁধার থেকেই কুড়িয়েছি পৃথিবীর মুখ
রাতের বোতাম খুলে চিরে দেখি জমাট আঁধার
খুলি তার যত কোষবদ্ধ অভিসার গোপন
অন্ধকারের শরীরে দেখি লেখা ধরণীর তাবত্ খেলার নাম
অন্ধকার প্রকাশ্য করে আলোর বিধান।
আল মাহমুদ
মনের ভেতর খুঁতখুতানি, জ্বলছে কিছু
হাত রাখলাম বুকের উপর, চলছে কিছু
কেবল শুনি ভাঙার শব্দ, কার পা ভাঙে
ঘোলাপানির স্রোত বয়ে যায় ঐ যে গাঙে
চতুর্দিকে মাতন উঠে ভাঙছে রে সব
ভাঙছে বাড়ি গঞ্জ বাজার ঐ কলরব
এমন ভাঙার খেলায় বল মাতাল করা
মাতাল তো নয় মত্তপ্রেমিক পাগলপারা
তাদের জন্য সাজিয়ে রাখি আমার হৃদয়
সাজিয়ে রাখি বিছিয়ে রাখি জয় পরাজয়।
০৬ ডিসেম্বর, ২০০৯
পাথরজীবন
আবুবকর সিদ্দিক
পাথরের তলা খুঁড়ে
দেখো না এ শ্যাওলাজীবন;
প্রাগৈতিহাসিক প্রত্ন—
পরগাছা ফ্যাকাশে ফাঙাস।
বিদ্যুতের ফণা যদি
হত তবে হানত ছোবল,
ও যে দলিত মথিত
হাজার জুতোর হাইহিলে।
পাথর ... থানপাথর
নিরেট খনিজ ধুকধুকি,
কিছু প্রাণ কিছু স্মৃতি
এই নিয়ে ধুঁকছে পাতাল।
সুভালাভালি থাকতে
দাও ওকে নিজের মতন;
ঘণ্টা বাজে চলো ফিরি
ফটকে লটকে দেবে তালা।
দেখে যেও
মাকিদ হায়দার
বীর মুক্তিযোদ্ধা বেবী ইসলাম স্নেহভাজন
সময় পেলে দেখে যেও, সময় যদি
না পাও আমাকে শুধু একবার
নাম ধরে ডাকলেই
আমি নিজেই চলে আসবো
তোমার নিকটে
তবে তুমি আমাকে দেখে কাঁদলে
আমার খুবই খারাপ লাগবে
তুমি নিশ্চয়ই জানো,
আমার মতো অনেকেই গিয়ে ফিরে আসেনি
রণাঙ্গন থেকে
আমার মতো অনেকেই রণাঙ্গনে যেতে চেয়েও
পারেনি যেতে, তখন চারিদিক ছিলো
অমাময়।
যা হোক সময় পেলে দেখে যেও
ভুরুঙ্গামারীর সম্মুখযুদ্ধ থেকে আমরা যারা
ফিরে যেতে পারিনি তোমার
তোমাদের কাছে!
দেখে যেও
কোটি প্রাণের ঐকতানে
হাসান হাফিজ
আগুনে বারুদে ঝাঁঝে বিস্ফোরণে
অনন্য ভাস্বর হয়ে আছো তুমি
ধমনীর রক্তকণিকায়
মৃত্তিকা ও সবুজে শ্যামলে শস্যে
উদার নিঃসীম নভো নীলে
সর্বত্রই স্বাগত নন্দিত শুদ্ধ
তোমার উত্থান অস্তিত্ব তোমার
সাড়ে সাত কোটি প্রাণ
ঐকতানে বেজে উঠেছিল
বিজয়ের মহতী ঝঙ্কার
আত্মশক্তি উদ্বোধনে
মাটি ও মায়ের মুক্তি
এইভাবে রক্তদামে তারা
অর্জন করেছে শুদ্ধি
কখনও কিছুতে এই
অর্জনের লয় নেই
অহংয়ের ক্ষয় বলে কোনও কিছু নেই
অগ্নিগর্ভ দিন
মুজিবুল হক কবীর
অগ্নিগর্ভ দিন,
লঘু হাওয়ায় বারুদের গন্ধ
দুর্বাপাতার আড়াল থেকে
উঁকি মারছে তাজা গ্রেনেড,
ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সূর্য সৈনিকরা,
একটি মাছি এসে বসেছে নিথর সৈনিকের হাতে
যে-হাত একদা ছিলো মেশিনগানের মতো সক্রিয়
যে-হাত ছিলো তীব্র প্রতিবাদী;
রক্তাক্ত পিলখানায় স্বজনের ভিড়,
চোখে নীরব জলের ভাষা,
গাছের পাতায় শোকের ছায়া,
হাওয়া ও গাছ নীরব।
কোন্ সে ঘাতক
স্বদেশের দরোজায় এসে কড়া নাড়ে?
আজ আমাদের হৃদয়জুড়ে ওড়ে
শোকের পতাকা।
দুর্যোগ থেকে দুর্যোগে রাখি পা
রেজাউদ্দিন স্টালিন
দুর্যোগ থেকে দুর্যোগে রাখি পা,
ঝন্ঝায় কাঁপে স্বপ্নের ছায়া পথ।
মহামারী আসে ঈগলের ঔরসে
খরা ও বন্যা খুঁজে নেয় দ্বৈরথ।
দুঃস্বপ্নের দীর্ঘ দাঁতের দাঁড়—
ভাঙে আনন্দ আগামীর জলরাশি,
যেখানেই যাই দেখি করোটি ও হাড়
শুয়ে আছে মূঢ় মৃত্যুর পাশাপাশি।
নগরের নীল বহুতল ঘরবাড়ি
দাঁড়িয়ে রয়েছে পাথরের পম্পেই;
কত আগুনের কত কান্নার তলে
মানুষ হাঁটছে পরিসংখ্যান নেই।
আমি কি একাই দুর্যোগে দাহ হবো,
পার হবো চিতা বহ্নির মহাখরা?
আর কেউ নেই দাঁড়াবার মুখোমুখি,
ভিড় করে আসে ভূমিহীন প্রশ্নরা।
দুর্যোগ থেকে দুর্যোগে রাখি পা,
পথ ভেঙে যায় ঠিকানাবিহীন পথে।
বহু বিরোধিতা কুয়াশার কোলাহল,
পার হয়ে যাবো অনন্ত দ্বৈরথে।
জলভোগ
মারুফ রায়হান
জলগৃহ থেকে তোমাকে গ্রেফতার করে
নিয়ে আসা হলো ফাঁসিমঞ্চে—উন্মুক্ত ডাঙায়
রূপালিসুন্দর তুমি নিঃশব্দ নৃত্যপটিয়সী
তোমার যন্ত্রণাদগ্ধ করুণ প্রস্থান
আমরা উপেক্ষা করে যাই নিত্যদিন
কোথাও কি এর প্রতিবাদ ঘটে?
একটি জটিল ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের মতো?
জলযান থেকে খোয়া যায় শিশু
নদী খুনি নয় কখনোই
কেবল রচিত হয় তার প্রেক্ষাপটে হত্যাদৃশ্য
জলবাস শেখে নাই মানবসন্তান আহা
মাছেদের চোখে তাই করুণ বিস্ময়!
জোছনাবধির
মুহম্মদ নূরুল হুদা
কুয়াশা চাঁদের কীট। শ্যাওলা বা সরোবর। আকাশকে খায় চিরে চিরে।
দাঁড়ায় অরণ্যগুহা। গিরিচূড়া। ঝাউবীথি। ছায়ার শরীর।
বালিতে শুয়েছে সুখ। ঢেউফণা। লাল গর্ত। কাঁকড়া যায় ফিরে।
জোছনা কফিন হাসে। মরণবরণ। নিশিথিনী। কামান্ধ, অধীর।
অনন্তযৌবন নেই। গিলগামেশ ডুকরে কাঁদে। জোছনাবধির।
দুর্ঘটনা
আতাহার খান
ফুটপাতে মুখোমুখি ধাক্কা খাওয়ার পর
ভদ্রমহিলা হঠাত্ দাঁড়িয়ে আমার দিকে
চোখ বড় করে তাকালেন, দেখে
মনে হলো যেন আস্ত গিলে খাবেন আমাকে!
কিছুটা বিব্রত হয়ে সরে দাঁড়ানোর পর
তিনি বললেন : চোখে দেখেন না?
তারপর হাইহিলে শব্দ তুলে
দ্রুত চলে গেলেন ভিড়ের মধ্যে, চোখের আড়ালে দূরে!
ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটে গেল যে বুঝিয়ে তাকে
কিছু বলা সম্ভব হলো না,
আসলে রাস্তায় হাঁটার সময় আমি
কোনোকিছু না দেখে একা আনমনে হাঁটি,
নিঃশব্দ ছায়ার মধ্যে নীরব সময় নিয়ে শুধু
খেলা করি, আর মাকড়সার জালে
বুনে চলি অর্থহীন জীবনের নির্ভুল হিসাব!
এভাবে সময় কাটে প্রতিদিন;
অতএব পথে ধাক্কা খাই, কখনো আহত হই,
কারোর কটূক্তি শুনে নীরবে হজম করি।
এতসব কাণ্ডের পরও চোখ তুলে কোনোকিছু
দেখতে ইচ্ছে হয় না মোটেও,
চারদিকে নানা অনিয়ম,
প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অদ্ভুত খেলা আর
অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা ক্ষমতার কারুকাজ
দেখতে গেলে রক্তে অসম্ভব চাপ বাড়ে,
ঘাড়ে ব্যথা অনুভূত হয়, অবশেষে
ত্বক ফেটে বেরোয় অস্থির ঘাম।
তাই এ বয়সে বাড়তি কোনো চাপ নিতে এখন সাহস হয় না আমার।
করতলে শীর্ণ পাণি
জাহাঙ্গীর ফিরোজ
তুমি ছিলে তুমি আছ
তুমি নদী, চঞ্চল ঝর্নার জল
তুমি ফুল—ফুলের সৌরভ।
তোমার স্পর্শে আজ কামনার দোর খুলে গেল
ভালোবাসা জলপ্রপাতের মতো নেমে এল।
আমি নিম্নগামী হ’তে হ’তে বাষ্প হয়ে উঠি
যদিও জলের স্বভাব অধোগামী
প্রেম সে-তো জলের বাষ্প হয়ে মেঘে মেঘে আর্দ্র জলরাশি;
তুমি স্বপ্নলোকে, উজ্জয়িনী দশদিকে শুধু তুমি
তুমি অরণ্যলোকের ফুল লোকারণ্যে
তোমার শীর্ণপাণি—হাতখানি
করতলে নিয়ে এল ঢেউ।
সাগরে জোয়ার এল চাঁদ হয়ে এলে তুমি সেই নারী।
তোমাকে এভাবে আমি কোনোদিন স্পর্শ করিনি;
তোমার ছোঁয়ায় ছিল প্রেম—ঊর্ধ্বজলরাশি
তবুও তোমাকে আমি বৃষ্টির মতো প্রার্থনা করি চিরদিন।
যদি বলি ক্ষমা চাই, ধৃষ্টতা হবে
মুজতাহিদ ফারুকী
এখন রাতের মতো অন্ধকার, চারদিকে হায়েনার
অট্টহাসি। বুক হিম করা মহাত্রাসের উল্লাস
ছড়িয়ে পড়ছে সব নিরিবিলি গ্রাম জনপদে
ঘরের দুয়ার এঁটে পড়ে থাকা অসহায় নারী,
শিশু, যুবক, প্রবীণ দাঁতে দাঁত চেপে নিরুপায়
নিঃশব্দে ফেলছে গিলে মর্মছেঁড়া রুদ্ধ আর্তনাদ।
ভয়ে আছি, খুব ভয়ে। স্বভাবের পুরো বিপরীতে
রুদ্ধবাক, স্বেচ্ছাবন্দি যেন এই প্রিয় ঘর, স্মৃতির শহর
হয়ে গেছে কখন অচেনা। আশৈশব চেনাজানা
স্বজনেরা যেন পর হয়ে গেছে। তাদের বিবেক
কী আশ্চর্য! বিদেহী আত্মার মতো নিরালম্ব, ধরাছোঁয়াহীন।
এমন করেই বুঝি দিন যায় দিনের পেছনে
মুক্তির নায়ক যারা ঝুলে যায় ফাঁসির দড়িতে
আমার পায়ের নিচে মাটি কাঁপে থরথর জ্বরে
আমার স্মৃতির ঘরে সিঁদ কাটে ঘাতক সময়
আমার সকল তৃষ্ণা জ্বলে যায় বিষাক্ত নিঃশ্বাসে
আমার অস্তিত্ব টলে নেতাদের অসহ্য ঔদাস্যে।
অন্ধকার রাত, আমি একা করজোড়ে দাঁড়িয়েছি,
উচ্চারণ করি যদি ‘ক্ষমা চাই’, হয়তো ধৃষ্টতা
হবে। তবু, একা অমি দণ্ডবত্, অন্ধকারে,
করজোড়ে নতশির, অশ্রুভেজা চোখ; নিঃশব্দ
নীরবে শুধু বলি, ক্ষমা কোরো, ক্ষমা কোরো...
ক্ষমা...
প্রার্থনা
ওয়াহিদ রেজা
হে আল্লাহ্, তুমি ওকে অসুখ দাও, ভীষণ অসুখ
তখন আমি ওকে শুশ্রূষা করবো
ওর বেদনার্ত করুণ দৃষ্টি, ফ্যাকাশে ঠোঁট
কেঁপে কেঁপে উঠবে আমাকে দেখে,
নতুন করে উদ্বেল হবে সরু কোমর, স্তনদ্বয়,
চারিদিকে নামবে তখন মায়াময় নিস্তব্ধতা
তখন অপসৃয়মাণ হতে থাকবে মনুষ্যলোক
সবুজ দ্বীপের ভেতর নড়ে উঠবে সবুজ জিভ
লালা ও নীলফণা; শুরু হবে
কামনার ফিসফাস—অস্পষ্ট প্রতিভাস,
তখন ক্লিন্টন-মনিকা, এরশাদ-বিদিশা...
ওহ্ খোদা! কি রঙ! কি রক্তজবা! পুষ্পে পুষ্পে আমার পুষ্পিতা...
ইশ, ভাবতে পারি না।
হে আল্লাহ, তুমি ওর অসুখ করে দাও, ভীষণ অসুখ
তা না হলে কীভাবে জানাবো
আমি ওকে কতো ভালোবাসি!
শীতমগ্ন ভৈরবী আলাপ
শান্তা মারিয়া
বাতাসে শীতের গন্ধ ধনে পাতার সুঘ্রাণ
প্রাচীন প্রেতাত্মা সব শিশিরের শব্দ শোনে
ঘুম শেষে আড়মোড়া ভাঙে
কোনোদিন মাটির গভীরে শিকড়ের নিভৃত প্রদেশে
অন্তলীন হয়ে ছিল ধূলার প্রাসাদ
সেই প্রাসাদের চূড়া অকস্মাত্ দেখা দেয় আজ।
প্রাচীন আকাশে ওড়ে প্রেমিকের রূপালি ফানুস।
শীতের মিছিলে নিবিড় ভৈরবী সুরে
রসসিক্ত অশ্রুত আলাপ
আবার এসেছে শীত সরিষার হলুদ প্রান্তরে
মাঘের উত্সব হিমেল সুদীর্ঘ রাত
ভাতের মৌতাতে কার ভিজে ওঠে মন।
পৌষ পরবের কৈবর্ত সৌরভে
হাতছানি দেয় ফসলের উদাসী জমিন
বকের শীতার্ত পাখা
ছেনে নেয় রোদের সুঘ্রাণ
নকশি কাঁথার নিবিড় বুননে
উচ্চারিত উষ্ণতার ইমন কল্যাণ।
আবার এসেছে শীত আমাদের ছোট্ট আঙ্গিনায়
বল্লাল সেনের ঘর, ধীমনের চোখ
ফুল্লরার মেধাবী করোটি
বড় আশা নিয়ে জেগে ওঠে আজ।
বিজয়
জাকির আবু জাফর
অন্ধকার এক অবাক খেলার গূঢ় অভিধান
আমি তাকে পাঠ করি পান করি সশব্দে নিঃশব্দে
আশ্চর্য আনন্দে মাখি অনুভূতির সুতীব্র চেতনায়
মুছে ফেলি তাপদগ্ধ ক্ষত অবসণ্ন ক্লান্তির রেখা
রাত্রির দরোজা খুলে দেখি নিঝুম নিভাঁজ চরাচর
পৃথিবীর সব প্রাণ সব প্রেম সকল আরম্ভ
সমস্ত সমাপ্তি আর যত মধ্যবর্তী আয়োজন
এক অলৌকিক অন্ধকার থেকে অস্তিত্ববান
শেষতক আমি আঁধার থেকেই কুড়িয়েছি পৃথিবীর মুখ
রাতের বোতাম খুলে চিরে দেখি জমাট আঁধার
খুলি তার যত কোষবদ্ধ অভিসার গোপন
অন্ধকারের শরীরে দেখি লেখা ধরণীর তাবত্ খেলার নাম
অন্ধকার প্রকাশ্য করে আলোর বিধান।
-
মহান বিজয় দিবস


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


