Amardesh
আজঃ ঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৭ ডিসেম্বর ২০০৯, ৩ পৌষ ১৪১৬, ২৯ জিলহজ ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 বিশেষ বিভাগ
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

পাকিস্তানি সৈন্যদের চোখে ধুলো দিয়ে

পালিয়েছিলেন ওসমানী
২৫ মার্চের সেই বিভীষিকাময় রাতে কর্নেল (পরে জেনারেল) ওসমানী কোথায় ছিলেন? কেমন কেটেছিল তার সেই ভয়ঙ্কর রাতটি?
বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ফাঁকা হয়ে যাওয়ার পরও জেনারেল ওসমানীকে সে রাতে সেখানে দেখা গিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য। কোথা থেকে যেন হঠাত্ করে ছুটে এসেছিলেন। কিছু আলাপ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। তারপরই আবার দ্রুত বেরিয়ে গিয়েছিলেন। সম্ভবত তিনিই ছিলেন নেতৃস্থানীয় সর্বশেষ ব্যক্তিত্ব, যিনি সবার পরে এ বাড়ি ছেড়েছিলেন।
কিন্তু তারপর? হায়েনাদের শ্যেনদৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে কোথায় গা ঢাকা দিয়েছিলেন তিনি? এত পরিচিত চেহারা নিয়ে কেমন করেই বা তাঁর পক্ষে সম্ভব হলো ঢাকা থেকে নিরাপদে পালিয়ে যাওয়া?
ঢাকা থেকে বেরুতে পারলেও পালানোর পুরো রাস্তাটি খুব একটা নির্বিঘ্ন হয়নি তাঁর জন্য। এ কাহিনীই তিনি আমাকে শোনান এক বিশেষ সাক্ষাত্কারে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওসমানীর এ সাক্ষাত্কারটি নিয়েছিলাম বাহাত্তরের ২৫ মার্চ, সেনাবাহিনী সদর দফতরে তাঁর অফিসে।
জেনারেল ওসমানী জানান, হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের চোখে ধুলো দিয়ে ঢাকা থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর বিখ্যাত গোঁফ জোড়া কামিয়ে ফেলেছিলেন। ঢাকা থেকে তিনি পালিয়েছিলেন ২৯ মার্চ। ২৫ মার্চ রাত থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত তিনি আত্মগোপন করেছিলেন নিউ ইস্কাটনের একটি ফাঁকা বাড়িতে।
এই বাড়িতে বসেই এ ক’দিন তিনি জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখেছেন সামনের রাস্তায় হানাদার সৈন্যদের উন্মত্ততা। দেখেছেন গাড়ি বোঝাই সৈন্যদের ক্ষিপ্ত আনাগোনা।
এ ক’দিনে খান সেনারা ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো খুঁজে ফিরেছে জেনারেল ওসমানীকে। তাঁর ধানমণ্ডির বাড়িতে চালিয়েছে উন্মত্ত হামলা। প্রতিটি ঘরেই ঢুকেছে দরজা ভেঙে। ফাঁকা ঘরগুলোতেই তারা চালিয়েছে বেপরোয়া মেশিনগানের গুলি।
অথচ ওরা ভাবতেও পারেনি তাদেরই নাকের ডগায় নিউ ইস্কাটনে বসেই তাদের এই একান্ত প্রার্থিত ব্যক্তি তাদের জঘন্যতম দুষ্কর্মের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকছেন।
এই ক’দিনে নিউ ইস্কাটনের অপরাপর কয়েকটি বাড়িতে হামলা চালালেও হানাদাররা সম্ভবত ফাঁকা বাড়ি ভেবেই জেনারেল ওসমানীর আশ্রয়স্থান এ বাড়িতে হানা দেয়নি। অবশ্য জেনারেল ওসমানী নিজে বলেন, পরম করুণাময়ের অশেষ অনুগ্রহ ছিল তাই। নইলে এমনভাবে ক’জন রক্ষা পায়?
২৯ মার্চ তিনি এ বাড়ি ছেড়ে বের হন। বেরুনোর আগে তিনি তার আদল পাল্টে ফেলেন। আর এ চেহারা বদলানোর জন্য প্রথমেই তাকে কামিয়ে ফেলতে হয় তাঁর সুবিখ্যাত গোঁফ জোড়া।
গোঁফজোড়া কামিয়ে ফেলে হানাদারদের হাত থেকে বাঁচলেও তাঁকে কিন্তু পড়তে হয়েছিল আরেক বিপদে।
ঢাকা থেকে বেরিয়ে জিঞ্জিরা পৌঁছেই তিনি নদীপথে রওনা হয়ে যান দাউদকান্দি। এখানে তিনি পড়েন সংগ্রামী বাঙালি তরুণদের কবলে। তারা তাঁকে পশ্চিমা ভেবে আটক করে ফেলে। এ সময় তাঁর পক্ষে নিজের সঠিক পরিচয় দেয়াও ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক।
কিছু পরেই এখানে এসে পড়েন এই এলাকা থেকে নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্যের এক ভাই। তার পরিচয় পেয়ে জেনারেল ওসমানী তাকে নিভৃতে ডেকে নিয়ে আত্মপরিচয় দেন। তার পরিচয় পেয়ে এই ভদ্রলোকই তাকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।
সাক্ষাত্কারে জেনারেল ওসমানী বলেন, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল।—বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের এই ঐতিহাসিক ভাষণের অন্তরালে ছিল একটি সুচিন্তিত রণকৌশল। বঙ্গবন্ধুর এ আহ্বান সামরিক বাহিনীর বাঙালি সৈনিকদের কাছে ছিল বিরাট তাত্পর্যময়। বস্তুত এই আহ্বানকে তারা অস্ত্র তুলে নেয়ার ইঙ্গিত বলেই মনে করে।
তিনি বলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন আর দুর্দশার শিকার হয়ে থাকতে হতো। তাদের মনে বিশেষ করে পাঞ্জাবিদের সম্পর্কে সব সময় একটা তিক্ততা বিরাজ করত। তাই তারা উদগ্রীব হয়ে ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে। ১৯৫৪ সালে আমার এ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিল যে, পাকিস্তানের কবল থেকে পুরোপুরি মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত বাঙালিরা কিছুতেই শান্ত হবে না।
জেনারেল ওসমানী বলেন, এ সময় থেকেই আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের কথা চিন্তা করতে থাকি এবং এ কারণেই বাঙালিদের দলে দলে সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে থাকি। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে সামরিক ট্রেনিং লাভের সঙ্গে সঙ্গে তাদের যথেষ্ট অভিজ্ঞতাও অর্জিত হবে এবং বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানিদের বিশেষ করে পাঞ্জাবিদের মনোভাব সম্পর্কে তাদের চোখও খুলবে বলে আমার ধারণা ছিল।
বাংলাদেশের যুদ্ধে পাকিস্তানের বিপর্যয়ের কারণ সম্পর্কে জেনারেল ওসমানী বলেন, ওরা একটা অন্যায় যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। ওরা চালাচ্ছিল ব্যাপক হারে গণহত্যা, নারী নির্যাতন। পক্ষান্তরে বাঙালিরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল একটি ন্যায়যুদ্ধে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জয় অবশ্যম্ভাবী।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পাকিস্তানে সব সময়ই গণতন্ত্রকে অস্বীকার করা হয়েছে এবং জনগণকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্য প্রথম থেকেই একটা চক্রান্ত চলেছে। এ চক্রান্তেরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশের ১৯৫৪ সালের নির্বাচনী ফলকে নস্যাত্ করা হয়েছে, ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারি করা হয়েছে এবং সবশেষে বাংলাদেশের নিরীহ জনসাধারণের ওপর নৃশংস হামলা চালানো হয়েছে।
জেনারেল ওসমানী বলেন, পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের ধারণা ছিল সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে কোনো দলই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। আওয়ামী লীগ শতকরা ৪০ থেকে ৫০টি আসন পাবে বলেই তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। তাই তারা ইয়াহিয়া খানকে সাধারণ নির্বাচন দেয়ার ঝুঁকি নিতে দিয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের বিরাট সাফল্য তাদের বিপর্যস্ত করে দেয়। আর এরই কারণে তারা ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করতে থাকে। এ ব্যাপারে ভুট্টোকে তারা তাদের ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহার করে এবং শেষ পর্যন্ত তারা বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
জেনারেল ওসমানী বলেন, তিনি একজন নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্য এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসার। এখন তিনি দেশের স্বার্থে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী গঠনের দায়িত্ব নিয়ে সর্বাধিনায়কের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এ দায়িত্ব শেষ হলেই তিনি রাজনৈতিক জীবনে ফিরে যাবেন।
— মনজুর আহমদ
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?