Amardesh
আজঃ ঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৭ ডিসেম্বর ২০০৯, ৩ পৌষ ১৪১৬, ২৯ জিলহজ ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 বিশেষ বিভাগ
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

চট্টগ্রামে যেমন করে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো

মনজুর আহমদ
সেদিনও ঝকঝকে রোদ উঠেছিল চট্টগ্রামের আকাশে। বন্দর নগরীর কর্মব্যস্ততা শুরু হয়েছিল অন্যান্য দিনের মতো। কর্মব্যস্ততা ষোলশহর ক্যান্টনমেন্টেও।
আর এই কর্মব্যস্ততার সুযোগেই ওরা দু’জন আর সব সামরিক অফিসারদের দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে নিঃশব্দে উঠে এলেন অফিসের ছাদের ওপর। ওরা জানতেন ওদের প্রতি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি বড় সজাগ। তাই প্রকাশ্যে নয় ওরা গিয়ে দাঁড়ালেন ছাদের পেশাবখানার আড়ালে। ওরা একজন মেজর আর একজন ক্যাপ্টেন।
কথা শুরু করলেন মেজর। বললেন, মনে হচ্ছে এমন একটা দিন আসবে যখন আমাদের বিদ্রোহ করতে হতে পারে। পাকিস্তানিরা আমাদের অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়ার জন্য আসতে পারে। কিন্তু অস্ত্র আমরা দেব না। রুখে দাঁড়াব। তুমি রাজি?
মত নেয়ার দরকার ছিল না। ক্যাপ্টেন তার আগেই মনস্থির করে ফেলেছিলেন। মেজরের কথা শেষ না হতেই সব মন উজাড় করে দিয়ে তিনি বলে উঠলেন—হ্যাঁ, আমি রাজি, অস্ত্র দেব না। বিদ্রোহ করব। বিপুল আবেগে একান্ত আপনজনের মতো একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো আঁকড়ে ধরলেন দু’জন দু’জনের হাত। শপথ নিলেন তাদের একথা প্রকাশ হবে না। ওরা দু’জন ছিলেন মেজর জিয়া আর ক্যাপ্টেন অলি আহমদ।
দিনটি ছিল ৩ মার্চ, ১৯৭১ সাল। সময় সকাল সাড়ে ৯টা। এই প্রথম পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সশস্ত্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার ব্যাপারে প্রথম প্রকাশ্য আলোচনা। এদিকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছিল। সামরিক বাহিনীর অন্যান্য বাঙালি অফিসার অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। তাদের সবার মনেই একটি চিন্তাই পাক খেয়ে ফিরছিল। কী করা যায়? কী করব? বিভিন্ন খবরাখবর নিয়ে তারা বারবার ছুটে আসছিলেন মেজর জিয়ার কাছে। মেজর জিয়া তখন ছিলেন ৮ ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নের দ্বিতীয় প্রধান। ব্যাটালিয়নের বাঙালি অফিসারদের মধ্যে সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত।
এরপর এল ৭ মার্চ। আবার সেই সকাল। ওরা দু’জনে সবার অলক্ষ্যে আবার উঠে এলেন ছাদে।
মেজর (বর্তমান লে. কর্নেল) জিয়াউর রহমান আর ক্যাপ্টেন অলি আহমদ। বিদ্রোহ ঘোষণা সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে দু’জনে আলোচনা করলেন। ঠিক হলো বিদ্রোহ ঘোষণার জন্য উপযুক্ত মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু কখন আসবে সেই উপযুক্ত মুহূর্ত? কখন? কবে? ওরা জানতেন এই বিশেষ মুহূর্তটি আসবে তখনই, যখন তাদের বিদ্রোহের সমর্থনে পূর্ণ আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসবে জনসাধারণ। এ মুহূর্তটি আসবে তখনই যখন শত্রুর বর্বরতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট প্রমাণ সবার সামনে তুলে ধরা যাবে। এদিকে ইয়াহিয়া বসল মুজিবের সঙ্গে আলোচনায়। ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি অফিসাররা রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগলেন আলোচনার ফল কী হয়? বাংলাদেশের ভাগ্য কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? কিন্তু এ কেমনতরো আলোচনা? আলোচনার পাশাপাশি পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের আর এক তত্পরতায়। শিউরে উঠলেন তারা। তাদের সন্ধিগ্ধ মনে তখনই প্রশ্নের ঝড় উঠলো, এই অশুভ তত্পরতা কেন?
এই ‘কেন’র জবাব না পেলেও তাদের বোবাদৃষ্টিতে সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়েছিল মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনার অন্তরালে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের এক জঘন্যতম চক্রান্ত। সে চক্রান্ত বাঙালিদের ওপর হামলার। সে চক্রান্ত বাংলাদেশের ওপর বর্বর অভিযানের। আলোচনা চলছিল। আর এদিকে আসছিল জাহাজ বোঝাই সৈন্য। বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ। জাহাজ বোঝাই যেসব সৈন্য আসছিল, তাদেরকেই দ্রুত বিভিন্ন স্থানে নিয়োগ করে পাঠানো হচ্ছিল। এমনি সময় ডাক এল লে. কর্নেল এমআর চৌধুরীর কাছ থেকে। ১৭ মার্চ রাত সাড়ে ৯টায় চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামে সামরিক আইন সদর দফতরে তার ডাকে প্রথম গুপ্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। সামরিক বাহিনীর বাঙালি অফিসারের মধ্যে চারজন হচ্ছেন লে. কর্নেল এমআর চৌধুরী, মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর আমিন চৌধুরী ও ক্যাপ্টেন অলি আহমদ।
কি মনে করছো? বৈঠকের শুরুতেই কর্নেল চৌধুরী পরিস্থিতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন মেজর জিয়াকে।
ওদের ভাবগতিক দেখে পরিষ্কার মনে হচ্ছে, ওরা হামলা চালাবে। কর্নেল চৌধুরী বললেন, তারও তাই ধারণা। কিন্তু কি করা যায়? কি করা যায়? সবারই মনে এই প্রশ্ন। একমাত্র বিদ্রোহ। কর্নেল চৌধুরী সুষ্পষ্টভাবে বললেন, সশস্ত্র অভ্যুত্থানই একমাত্র পথ। তিনিই প্রথম বাঙালি সামরিক অফিসার যিনি সশস্ত্র অভ্যুত্থানের আহ্বান জানালেন। সশস্ত্র অভ্যুত্থান। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ। ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম, সিপাহী বিদ্রোহের পর আর এক নতুন তরো সিপাহী বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ অবশ্যম্ভাবী। সশস্ত্র অভ্যুত্থান ছাড়া বিকল্প কিছু আর নেই। বঙ্গবন্ধুও তাই ডাক দিয়েছেন। ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল।’
ওরা চারজন বাঙালি অফিসার বসলেন বিদ্রোহের পরিকল্পনা প্রণয়নে। ঠিক হলো ক্যান্টনমেন্টের স্টেশন কমান্ডার একমাত্র বাঙালি ব্রিগেডিয়ার এমআর মজুমদারকে এ পরিকল্পনা থেকে বাইরে রাখতে হবে। ঠিক হলো লে. কর্নেল এমআর চৌধুরীর নেতৃত্বেই তারা বিদ্রোহের প্রস্তুতি চালিয়ে যাবেন।
এদিকে পাকিস্তানি সৈন্যদের হামলার প্রস্তুতি চলছিল পুরোদমে। বাঙালি অফিসারদের ওপর তাদের সজাগ দৃষ্টি হয়ে উঠেছিল আরো প্রখর। আর এরাও পাল্টা গোয়েন্দাবৃত্তি চালিয়ে সংগ্রহ করছিলেন পাক সেনাদের তত্পরতা সম্পর্কিত খবর।
এরই মধ্যে কুমিল্লা থেকে তৃতীয় বেঙ্গল সম্পর্কে বিস্তারিত খবর পাওয়া গেল। কমান্ডো ব্যাটালিয়নগুলোকে আনা হলো চট্টগ্রামে। তাদের রাখা হতে লাগল শহরের অবাঙালিদের বাড়ি বাড়ি। চট্টগ্রামের ২০তম বালুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরাও প্রতি রাতে সাদা পোশাকে অসামরিক ট্রাকে করে বেরিয়ে যেত শহরে। তাদের কাজ ছিল অবাঙালিদের সঙ্গে মিলে লুটপাট করা।
বাংলাদেশের ওপর বর্বর হামলার প্রস্তুতি দেখতে এলেন পাক সেনাবাহিনীর জেনারেল হামিদ খান। ২১ মার্চ চট্টগ্রাম ক্যান্টমেন্টে তাকে আপ্যায়িত করা হলো মধ্যাহ্ন ভোজে। এই মধ্যাহ্ন ভোজেই পশ্চিমা সামরিক অফিসারদের কানাঘুষা আর জেনারেল হামিদের একটি ছোট্ট উক্তিতে বাঙালি অফিসাররা স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, দিন ঘনিয়ে এসেছে। হামলা অত্যাসন্ন। মধ্যাহ্ন ভোজে জেনারেল হামিদ বাঙালি অফিসারদের যেন চিনতেই পারেননি। তার যত কানাঘুষা আর কথাবার্তা চলছিল পশ্চিমা অফিসারদের সঙ্গে।
কি এত কানাঘুষা? কিসের এত ফিসফাস? সন্ধিগ্ধ হয়ে উঠেছিল মেজর জিয়ার মন। কৌশলে অন্য একজনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে গিয়ে দাঁড়ালেন জেনারেল হামিদের ঠিক পেছনে। দাঁড়ালেন পেছন ফিরে। কথা বলতে লাগলেন সঙ্গীটির সঙ্গে, আর দু’কান সজাগ রাখলেন জেনারেল হামিদের কথার দিকে। জেনারেল হামিদ তখন কথা বলছিলেন ২০ বালুচ রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল ফাতেমীর সঙ্গে। অনেক কথার মধ্যে অনেকটা যেন সামরিক নির্দেশের মতোই কর্নেল ফাতেমীকে বলে উঠলেন জেনারেল হামিদ, দেখ ফাতেমী অভিযান (অ্যাকশন) খুব দ্রুত ও কম সময়ের মধ্যে হতে হবে। আমাদের পক্ষে কেউ যেন হতাহত না হয়।
আঁতকে উঠলেন মেজর জিয়া। এ কি? কি হতে যাচ্ছে? এ দিনই বিকালে তিনি সস্ত্রীক এক সৌজন্য সাক্ষাতে গেলেন ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের বাসায়। কথায় কথায় তিনি জানতে চাইলেন জেনারেল হামিদের সফরের উদ্দেশ্য। কিন্তু ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের সে তথ্য ছিল, অজানা। তিনি শুধু বললেন, ওরা আমাকে বিশ্বাস করে না। জেনারেল হামিদ যখন অপারেশন রুমে ছিল তখন তাকে সে ঘরে ঢুকতে দেয়া হয়নি।
কি বুঝলেন? জানতে চাইলেন মেজর জিয়া।
মনে হচ্ছে সাম থিং ফিসি। জিয়া বললেন, ফিসি নয়—বিরাট কিছু। বিরাট এক চক্রান্তে মেতেছে ওরা। ব্রিগেডিয়ার মজুমদার মেনে নিলেন সে কথা। পরদিন ২২ মার্চ। রাত ১১টায় চট্টগ্রাম ইপিআর সেক্টর সদর দফতরের অ্যাডজুটেম্লট ক্যাপ্টেন রফিক এসে দেখা করেন মেজর জিয়ার সঙ্গে। তিনি সরাসরিই বললেন, সময় খুব দ্রুত এগিয়ে আসছে। আমাদেরকে বিদ্রোহ ঘোষণা করতেই হবে। আপনার প্রতি আমাদের আস্থা আছে। আপনি বিদ্রোহ ঘোষণা করুন। ইপিআরদের সাহায্য পাবেন। মেজর জিয়া তাকে তাদের পরিকল্পনার কথা জানান এবং ইপিআরে সাহায্য সম্পর্কে আলোচনা করেন।
২৫ মার্চ ব্যাপক রদবদল ঘটে গেল ক্যান্টনমেন্টের প্রশাসন ব্যবস্থায়। ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে উড়ে এলেন জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা, জেনারেল আনসারী, মেজর জেনারেল মিঠা খান, লে. জেনারেল খোদাদাদ খান প্রমুখ। ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে তারা জোর করে ধরে নিয়ে গেলেন ঢাকায়। সেই সঙ্গে নিয়ে গেলেন মেজর আমিন আহমদ চৌধুরীকেও। ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের স্থানে আনসারী নিযুক্ত হলেন স্টেশন কমান্ডার, কর্নেল শিগারী দায়িত্ব নেন ইপিআরের সেন্টার কমান্ডার হিসেবে। এই রদবদলে আশঙ্কিত হয়ে ওঠেন বাঙালি সৈনিক ও অফিসাররা। এই দিনই গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন লে. কর্নেল এমআর চৌধুরী।
এদিকে চট্টগ্রাম শহরে উত্তেজনা ক্রমেই বেড়ে চলছিল। অস্ত্র বোঝাই জাহাজ সোয়াতের বিরুদ্ধে গড়ে তোলা হচ্ছিল প্রবল প্রতিরোধ। অস্ত্র খালাস করে যাতে পশ্চিমা সৈন্যদের হাতে না পৌঁছাতে পারে, তার জন্য রাস্তায় রাস্তায় তৈরি করা হয়েছিল ব্যারিকেড। এই ব্যারিকেড সরিয়ে রাস্তা পরিষ্কারের কাজে লাগানো হলো বাঙালি সৈন্যদের। রাত ১০টা পর্যন্ত চলল এই ব্যারিকেড সরাবার কাজ। রাত ১১টায় অফিসার কমান্ডিং জানজুয়া আকস্মিকভাবে মেজর জিয়ার কাছে নির্দেশ পাঠালেন এক কোম্পানি সৈন্য নিয়ে বন্দরে যাওয়ার জন্য। এই আকস্মিক ও রহস্যজনক নির্দেশের অর্থ তার কাছে বোধগম্য হলো না। রাত প্রায় সাড়ে ১১টায় জানজুয়া নিজে এসে তাকে নৌবাহিনীর একটি ট্রাকে তুলে ষোলশহর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বন্দরের দিকে রওনা করিয়ে দেন। কিন্তু রাস্তার ব্যারিকেড সরিয়ে সরিয়ে যেতে তার দেরি হচ্ছিল। আগ্রাবাদে যখন একটা বড় ব্যারিকেডের সামনে বাধা পেয়ে তার ট্রাক দাঁড়িয়ে পড়ে, তখনই পেছন থেকে ছুটে আসে একটি ডজ গাড়ি ক্যাপ্টেন খালিকুজ্জামান। গাড়ি থেকে নেমেই তিনি দৌড়ে আসেন মেজর জিয়ার কাছে। হাত ধরে তাকে টানতে টানতে নিয়ে যান রাস্তার ধারে।
পশ্চিমারা গোলাগুলি শুরু করেছে। শহরের বহু লোক হতাহত হয়েছে। খালিকুজ্জামানের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর থেকে কথা কটি ঝরে পড়ে। কি করবেন জিয়া ভাই এখন? মাত্র আধামিনিট। গভীর চিন্তায় তলিয়ে যান মেজর জিয়া। তারপর বজ্রনির্ঘোষে বলে ওঠেন—উই রিভোল্ট। সঙ্গে সঙ্গে তিনি খালিকুজ্জামানকে ফিরে যেতে বলেন। বললেন, ব্যাটালিয়নকে তৈরি করার জন্য অলি আহমদকে নির্দেশ দিতে। আর সেই সঙ্গে নির্দেশ পাঠান ব্যাটালিয়নের সব পশ্চিমা অফিসারকে গ্রেফতারের।
খালিকুজ্জামান দ্রুত ফিরে গেলেন ষোলশহরের দিকে। আর মেজর জিয়া ফিরে এলেন ট্রাকে। যে পশ্চিমা সামরিক অফিসারকে তার সঙ্গে দেয়া হয়েছিল, তাকে বললেন, হুকুম বদলে গেছে। বন্দরে যেতে হবে না। আমাদের এখন ফিরে যেতে হবে। ক্যান্টনমেন্টে। বাঙালি সৈন্য যারা তার সঙ্গে যাচ্ছিলেন, তাদেরকে ইশারায় বললেন, রাইফেল লোড করে রাখতে। প্রয়োজন হতে পারে।
তারা ফিরে আসেন ব্যাটালিয়নে। এসেই তিনি সঙ্গের পশ্চিমা অফিসারকে অস্ত্র সমর্পণের নির্দেশ দিয়ে বললেন, তুমি এখন আমাদের হাতে বন্দি। অফিসারটি আত্মসমর্পণ করলে তিনি ট্রাক থেকে নেমে ট্রাকের পশ্চিমা সৈন্যদের দিকে রাইফেল তাক করে তাদেরও অস্ত্র ছেড়ে আত্মসমর্পণ করতে বললেন। হতচকিত পশ্চিমা সেনারা সবাই আত্মসমর্পণ করে।
এরপর তিনি একাই একটি গাড়ি নিয়ে ছুটে যান অফিসার কমান্ডিং জানজুয়ার বাড়ি। কলিংবেল টিপতেই ঘুম থেকে উঠে আসেন জানজুয়া। আর সামনেই মেজর জিয়াকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে ওঠেন। তার ধারণা ছিল, পরিকল্পনা অনুযায়ী মেজর জিয়া বন্দরে বন্দি হয়ে রয়েছে। জানজুয়াকে গ্রেফতার করে নিয়ে ষোলশহরে ফিরে আসেন মেজর জিয়া। পথে অফিসার্স মেসে মেজর শওকতকে তিনি সব কথা বলতেই মেজর শওকত উত্ফুল্ল হয়ে ওঠেন এবং বিদ্রোহে তার যোগ দেয়ার কথা ঘোষণা করে দ্রুত ব্যাটালিয়নে চলে আসেন।
এরপরই মেজর জিয়া টেলিফোনে স্থানীয় জননেতা ও বেসামরিক অফিসারদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু কাউকেই পাননি। তখন টেলিফোন এক্সচেঞ্জের অপারেটরকে তিনি অনুরোধ জানান সবাইকে টেলিফোন করে ৮ ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নের বিদ্রোহ ঘোষণার কথা জানাতে। অপারেটর সানন্দে তার সে নির্দেশ জানাতে রাজি হন। তিনি লে. কর্নেল এমআর চৌধুরীকেও টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু তাকেও পাননি। পরে শুনেছিলেন ওই রাতেই পাকিস্তানি সৈন্যরা গুরুতর অসুস্থ এমআর চৌধুরীকে হত্যা করেছিল।
শুরু হয়ে গেল বিদ্রোহ। রাত তখন দুটো। ব্যাটালিয়নের আড়াইশ’র মতো বাঙালি সৈন্যকে একত্রিত করে তাদের সব কথা বললেন মেজর জিয়া। সবাই একবাক্যে এই বিদ্রোহের প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থনের কথা ঘোষণা করেন। তারা জানান, দেশের স্বাধীনতার জন্য জান দিতে প্রস্তুত। কিছু সৈন্য ষোলশহরে রেখে বাকি সবাইকে নিয়ে মেজর জিয়া বেরিয়ে পড়েন কালুরঘাটের পথে। এদিকে ইপিআরের জওয়ানরাও লড়াই শুরু করেছিলেন। কালুরঘাটে পরদিন তাদের সঙ্গে বেশ কিছু পুলিশ যোগ দেন।
২৬ মার্চ সকাল। আগের রাতে ঢাকা শহরে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে রাজধানীর পূর্ণ কর্তৃত্ব স্থাপন করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী। আর সেই আনন্দে সকাল হতেই পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সদর দফতরে চলছিল মিষ্টি বিতরণ আর অভিনন্দন বিনিময়ের পালা। কিন্তু মূহূর্ত কয়েকের মধ্যেই তাদের মুখের হাসি ম্লান হয়ে যায়। মিষ্টি হয়ে যায় বিস্বাদ। চট্টগ্রামের যুদ্ধের খবর যখন তাদের কাছে পৌঁছলো, তখন এক দারুণ সন্ত্রাসে আঁতকে উঠলেন তারা।
চট্টগ্রাম। পাকিস্তানিদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ালো চট্টগ্রাম। ২৭ মার্চ সকালেই বিমান বোঝাই হয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এসে গেল পুরো দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়ন। চট্টগ্রাম যুদ্ধের পরিকল্পনা তৈরির জন্য মিঠ খানকে হেলিকপ্টারে পাঠানো হয় চট্টগ্রামে। বাঙালি সৈন্যরা গুলি করে সে হেলিকপ্টারটি ফুটো করে দেয়। একই সঙ্গে বিমানে করে নামানো হতে লাগল দ্বিতীয় কমান্ডে ব্যাটালিয়নকে। নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ বাবরকে নিয়ে আসা হয় বন্দরে। এতে ছিল দুই ব্যাটালিয়ন সৈন্য। ডেস্ট্রয়ার, এক স্কোয়াড্রন ট্যাংকও লাগানো হয় এই যুদ্ধে। জাহাজের গান থেকেও গোলা নিক্ষেপ হতে থাকে শহরের দিকে।
এই বিরাট শক্তির মোকাবিলায় বেশিক্ষণ টিকে থাকা সম্ভব হবে না, একথা বাঙালি সৈন্যরা বুঝেছিলেন। তাই শহর ছেড়ে যাওয়ার আগেই বিশ্ববাসীর কাছে কথা জানিয়ে যাওয়ার জন্য মেজর জিয়া ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে যান। বেতার কেন্দ্রের কর্মীরা মেজর জিয়াকে পেয়ে উত্ফুল্ল হয়ে ওঠেন।
কিন্তু কি বলবেন তিনি? একটি করে বিবৃতি লেখেন, আবার তা ছিঁড়ে ফেলেন। কি জানাবেন তিনি বিশ্ববাসী এবং দেশবাসীকে বেতার মারফত? এদিকে বেতার কর্মীরা বারবার ঘোষণা করছিলেন আর পনেরো মিনিটের মধ্যে মেজর জিয়া ভাষণ দেবেন। কিন্তু পনেরো মিনিট পার হয়ে গেল। মেজর জিয়া মাত্র তিন লাইন লিখতে পেরেছেন, তখন তার মানসিক অবস্থা বুঝাবার নয়। বিবৃতি লেখার ঝুঁকিও ছিল অনেক। ভাবতে হচ্ছিল শব্দচয়ন, বক্তব্য পেশ প্রভৃতি নিয়ে।
প্রায় দেড় ঘণ্টা মুসাবিদার পর তিনি তৈরি করেন তার সেই ঐতিহাসিক ঘোষণাটি। নিজেই সেটা বাংলা এবং ইংরেজিতে পাঠ করেন।
১১ এপ্রিল পর্যন্ত কালুরঘাট থেকে তারা চট্টগ্রামে যুদ্ধ চালিয়ে যান। তাদের সঙ্গে যুদ্ধে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল ২০ বালুচ রেজিমেন্ট, কুমিল্লা থেকে নিয়ে যাওয়া ৫৩ ব্রিগেড। আর নিশ্চিহ্ন হয়েছিল কমান্ডো, যারা অবাঙালিদের ঘরে ঘরে ঘাঁটি গেড়েছিল। এদের ছাড়াও চট্টগ্রামের এ যুদ্ধে বাঙালিদের বিরুদ্ধে লাগানো হয়েছি
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?