Amardesh
আজঃ ঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৭ ডিসেম্বর ২০০৯, ৩ পৌষ ১৪১৬, ২৯ জিলহজ ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 বিশেষ বিভাগ
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

একজন শব্দহীন মানুষ

আমজাদ হোসেন
ঈদের ছুটি। শহর থেকে হৈ চৈ করে দল বেঁধে সপরিবারে সবাই দেশের বাড়ি যাচ্ছে। রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট। সবখানেই উপচে পড়ছে মানুষ। হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে সুমনও দাঁড়িয়ে আছে একা। এই ঈদের ছুটিতে দীর্ঘদিন পর সেও বাড়ি যাবে বলে কোচের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে সেই সকাল থেকে।
কোচটা ছাড়ার কথা ছিল সকাল ন’টায়। এখন দুপুর বারোটা। যে কোচটায় সুমন যাবে, সেই কোচটা এখনও বাসস্ট্যান্ডে আসেনি। কখন আসবে, কখন যাবে, এই নিয়ে কেউ কিছু বলতে পারছে না। ভয়ঙ্কর অনিশ্চিত যাত্রা। রাজধানীর সবকটা রাস্তাতেই জটিল যানজট। পনেরো মিনিটের রাস্তা পার হতে হয় দেড়-দু’ঘন্টায়। ঘন ঘন হর্ন বাজিয়েও জরুরি অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালে পৌঁছতে পারে না। রাস্তাতেই রোগী মারা যায়। রাজধানীর এই জটিল যানজটের কথা সবাই জানে বলে এ নিয়ে কেউ কোনো কথা বলছে না। চা-বিস্কুট খাচ্ছে। ছেলেমেয়েকে চকলেট, চানাচুর কিনে দিচ্ছে। কিন্তু ধৈর্যের তো একটা সীমা আছে। আর কতক্ষণ অপেক্ষা করবে? বাড়ি যাওয়া উত্ফুল্ল মানুষের মন আস্তে আস্তে বিষণ্ন হয়ে যায়। এমন অনিশ্চিত যাত্রায় মন আর অপেক্ষা করতে চায় না। তবু যেতে হবে। বাবা-মা বেঁচে আছেন বলেই যেতে হয়। কিন্তু সুমনের তো বাবা-মা নেই। সুমন যাচ্ছে মাটির টানে। সুমন এই হাজার মানুষের ভিড়েও চোখে-মুখে বিষণ্নতা নিয়ে ভাবছে, বাবা-মা না থাকলে আস্তে আস্তে দেশের প্রতি টান কমে যায়। কথাটা দারুণ সত্যি কথা। প্রায় পাঁচ বছর পর সুমন বাড়ি যাচ্ছে। বাবা-মা বেঁচে থাকলে ছুটি-ছাটায় বাড়ি যাওয়ার আনন্দই ছিল আলাদা। এখন তো যেতে হবে শূন্য বাড়িতে। দাদা-দাদী, বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। খালা-ফুপুরাও দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। বাড়িতে থাকে শুধু সুমনের ছোট ভাই। তার সঙ্গেও আগের মতো সম্পর্ক নেই। স্ত্রীর বুদ্ধিতে চলাফেরা করে বলে সুমনের সঙ্গে পারিবারিক জটিলতা বেড়েছে। যে ভাইকে ছেলের মতো আদর-যত্নে বড় করেছে সুমন, সেই ভাইও সুমনের কাছ থেকে দূরে সরে গেছে। দেশের কথা মনে হলে তবু অই ভাইয়ের কাছেই যেতে হয়।
সুমনের কেবলি মনে হয়, বাবা-মা নেই বলে বাড়ি-ঘর স্তব্ধ হয়ে আছে। সব কিছুই যেন বিষণ্নতায় ঢাকা। পাখি ডাকলেও আগের মতো প্রাণবন্ত লাগে না। গাছগাছালিতে বিকালের মৃদুমন্দ হাওয়া নেচে উঠলেও সুমনের মনে হয় গাছগুলো তাকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছে। দীর্ঘদিন পর বাড়িতে এলে সব কিছুই ছন্দহীন নিশ্চুপ লাগে তার কাছে।
বাবা-মা যখন বেঁচে ছিল, তখন যেন সারা বাড়িতে ঝকঝকে একটা আলো ছিল। অন্ধকারেও সেই আলোর আভা টের পাওয়া যেত। উজ্জ্বল রোদের দিনেও সেই আলোর উচ্ছলতা উপচে পড়তো। সবাই সে আলো অনুভব করতে পারে না। কেউ কেউ পারে। এ আলোর উত্স থাকে মনে। চিন্তা-চেতনায়। সুমন বাড়ি এলেই সেই আলো খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু বাবা-মার মৃত্যুর সময় সেই আলোটাও নিভে যায়। সারা জীবন খোঁজাখুঁজি করলেও সেই আলোর দীপ্তি আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সেই জন্যই এই বাড়ির সবখানেই এখন মলিন বিষণ্নতা। চৈত্রের দুপুরেও এই বাড়ি সুমনের কাছে মেঘলা মেঘলা লাগে। দারুণ শোকাচ্ছন্ন মনে হয় বাড়িটাকে।
সুমন যখন উটের গ্রীবার মতো এক স্তব্ধতায় বাবা-মার কথা ভাবছে, তখনি এই মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে ভয়ঙ্কর এক হৈ চৈ শুরু হয়। একজন সবল মানুষ নিরীহ এক ভিক্ষুককে বেপরোয়াভাবে কিল-ঘুষি মারছে। কিন্তু কী আশ্চর্য, যে লোকটা মারছে, সেই লোকটার চোখেও পানি। সে কাঁদতে কাঁদতে ভিক্ষুকটাকে মারছে। ভিক্ষুকটা কিছুক্ষণ আগেই সুমনের সামনে দিয়ে হেঁটে গেছে। সে কথা বলতে পারে না। তার মুখে কোনো শব্দ নেই। চোখ দিয়ে শুধু জল পড়ে। এই অবস্থাতেই ভিক্ষা চায়। কিছুক্ষণ আগে সুমন তাকে দশ টাকা দিয়েছে। সবল মানুষটা এভাবে ভিক্ষুকটাকে মারছে কেন? সবার মনে একই প্রশ্ন। কিন্তু মারতে মারতে লোকটা কাঁদছে বলে কেউ আর কিছু বলতে পারছে না। সবাই থ হয়ে আছে।
অবশেষে ভিক্ষুকটাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে হু হু করে কাঁদতে লাগলো সবল মানুষটা। এই দৃশ্য দেখে আরও অবাক হয়ে গেল মহাখালী বাসস্ট্যান্ডের সব লোক। পান-বিড়ি-চা ওয়ালারাও বেচাকেনা বন্ধ করে এ দৃশ্য দেখছে। সচরাচর এমন দৃশ্য চোখে পড়ে না বলেই আরও নিবিড়ভাবে লোকজন দৃশ্যটাকে দেখছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। হৈ চৈ করা বাসস্ট্যান্ডটা এখন নিশ্চুপ। ভিক্ষুক মানুষটার কোনো শব্দ নেই। সবল মানুষটাই কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে গেল। আবেগে কাঁপতে কাঁপতে একটা সিগারেট ধরালো। ধোঁয়া ছেড়ে বুঝতে পারলো বাসস্ট্যান্ডের সব মানুষ তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাত্ এক যুবক প্রশ্ন করলো,
—ওকে এইভাবে মারলেন কেন?
সবল মানুষটার চোখ দুটো আবার ভিজে গেলো কান্নায়। হাতের সিগারেটটা ফেলে দিয়ে বললো,
—ও আমার ভাই, সেই জন্যে ওরে মারছি। আমি চাই না আমার ভাই দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করুক! বলেই সবল মানুষটা আবার কেঁদে ফেললো। তারপর কান্নাজড়িত কণ্ঠে যেন চিত্কার করে সবল মানুষটা সারা বাংলাদেশের মানুষকে বলছে,
—আপনেরা জানেন না ভাই জানেন না, ও একজন মুক্তিযোদ্ধা, কপালদোষে এখন মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতাছে—
সবল মানুষটা আর কথা বলতে পারে না। কান্না আর চিত্কারে তার গলা ভেঙে যায়। অস্পষ্ট হয়ে যায় সব কথা।
ভিক্ষুকটা মুক্তিযোদ্ধা? এখানকার সব মানুষই যেন কথা হারিয়ে ফেলেছে। ভয়ঙ্কর এক স্তব্ধতা জমাট বেঁধে আছে বাসস্ট্যান্ডে। কোচ-বাসেরও কোনো শব্দ হচ্ছে না। যান্ত্রিক মানুষ কোচ-বাসের ড্রাইভাররাও স্তব্ধ। মানুষ যেন তাদের বাড়ি যাওয়ার কথা ভুলে গেছে। জল টলটলে চোখে সবাই দেখছে ভিক্ষার থালা হাতে মুক্তিযোদ্ধাকে।
সবল মানুষটার নাম মুকুল চৌধুরী। আর ওই ছেঁড়া কাপড় পরিহিত রুগ্ণ মানুষটার নাম জিল্লুর। দু’জনেই মুক্তিযোদ্ধা। একই সঙ্গে যুদ্ধ করেছে দু’জন। ওরা দু’জনেই মানিকগঞ্জের মানুষ। ডিসেম্বর মাসের তিন-চার তারিখ। পাটুরিয়া ফেরি ঘাটের নামায়, হাসকান্দা গ্রামের দক্ষিণ দিকে, পদ্মার পাড়ে ওরা কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা বসেছিল দুপুর বেলায়। সারা রাত তো অন্ধকার অন্ধকারে, ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হয়। ঘুমুতে পারেনি কয়েকদিন। সন্ধ্যা হলেই কুয়াশায় ডুবে যায় গ্রামগঞ্জ। শীতও পড়েছে খুব। তার সঙ্গে কনকনে উত্তুরে হাওয়া। দুপুরের এই আরামদায়ক রোদে ওরা বসে আছে। কেউ ঝিমোচ্ছে। টুকটাক কথাবার্তা হচ্ছে। গোলাগুলির শব্দে পাখিরা উড়ে গেছে অন্যদেশে। এ দেশে আর কোনো পাখি নেই। পাখি যদি থাকতো, এমন নিশ্চুপ দুপুরে নিশ্চয়ই দু-একটা ঘুঘু পাখি দূর থেকে ডাকাডাকি করতো। পদ্মা নদীর ছলাত্ ছলাত্ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই চতুর্দিকে। লোকজন মিলিটারিদের ভয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে দূরে—অন্য কোনো গ্রামে। দু’চার ঘরে, দু’চারজন থাকলেও তারা কোনো শব্দ করে না। বেড়াল—পায়ে হাঁটে। নিঃশব্দে খাবার খায়। সন্ধ্যা হলেই ঘরে আর বাতি জ্বালায় না। যেন দম বন্ধ করে অন্ধকারে পড়ে থাকে সারারাত।
পাকিস্তান মিলিটারিদের মনে ভয় ঢুকেছে।
তারা সুনিশ্চিত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আর পারবে না। আস্তে আস্তে তারা দক্ষিণ এবং উত্তর বাংলা থেকে ঢাকায় চলে আসছে প্রতিদিন। এই পদ্মা নদী পাড়ি দিয়েই তাদেরকে ঢাকায় আসতে হয়। সেই জন্যই নদীর পাড়ে বসে আছে এরা। এটা তাদের ডিউটি। অস্ত্রশস্ত্র নিয়েই তারা ডিউটিতে আছে। সুযোগমত পেলেই আক্রমণ করবে হানাদার বাহিনীকে। শীতকালের দুপুরের রোদে একটু আরাম করলেও প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে চোখে।
শীতের পদ্মা নদীতে ঢেউয়ের কলরব কম। প্রচণ্ড স্রোত আছে ভেতরে, কিন্তু পাড় থেকে তা বোঝা যায় না। মনে হয় বর্ষার পানি কমে গেছে বলে ঝিম ধরে আছে পদ্মা। পদ্মা নদীর এসব অভিনয়। পদ্মা পদ্মাই। অকূল পদ্মায় পড়লে এই শীতকালেও মানুষ বাঁচতে পারে না। সাঁতরাতে গেলে ঠাণ্ডা পানিতে হাত-পা অবশ হয়ে যায়। ফুরিয়ে যায় শরীরের শক্তি। আস্তে আস্তে ডুবে যেতে হয় পদ্মার গভীরে।
ধু ধু পদ্মায় দূরে একটা নৌকো দেখে জিল্লুরই প্রথম অস্ত্র নিয়ে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে বাকি মুক্তিযোদ্ধারাও প্রস্তুত হয়। মুকুল চৌধুরী তাদের লিডার। মুকুলের অর্ডারের অপেক্ষায় থাকে সবাই। ঈগল-চোখে নৌকোটাকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে মুকুল। এক সময় মুকুল সুনিশ্চিত হয়, নৌকোটায় সাত-আটজন পাকিস্তানি মিলিটারি। তাদের হাতেও অস্ত্র। মুকুলের ইশারায় নদীর পাড়েই সবাই শুয়ে পড়ে অস্ত্র নিয়ে। একটু ক্রলিং করে যে যার জায়গা ঠিক ঠাক করে নেয়। আয়ত্তের ভেতরে এলেই মুকুল অর্ডার দেবে গুলি করার। নৌকোটা এদিকেই আসছে। সবার লক্ষ্য নৌকোটার দিকে। নৌকোটা আসছে। রেঞ্জের ভেতরে পড়তেই মুকুলের ইশারায় গোলাগুলি শুরু হলো। পাকিস্তানি মিলিটারিরা শুয়ে পড়লো নৌকোর ভেতরেই। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ দেখে নৌকোর মাঝি ঝাঁপ দিলো পদ্মায়। আরেকজন পাকিস্তানি মিলিটারি সাদা কাপড় নিয়ে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালো, আত্মসমর্পণ করার ইঙ্গিত পেয়ে গোলাগুলি বন্ধ করার অর্ডার দিল মুকুল। পাকিস্তান মিলিটারিরা নৌকোতে অস্ত্র রেখে সবাই দু’হাত তুলে উঠে দাঁড়ালো। কিন্তু নৌকোর মাঝি নেই বলে স্রোতের টানে নৌকোটা অন্যদিকে যাচ্ছে। নৌকোটা ধরে আনবে বলে জিল্লুরই প্রথম ঝাঁপ দিলো নদীতে।
কী ভয়ানক হিংস্র পাকিস্তানি মিলিটারিরা। সারেন্ডারের ইঙ্গিত দিয়েও তারা আবার অস্ত্র হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। গুলি করলো জিল্লুরকে। গুলিবিদ্ধ জিল্লুর অথৈ পানির সঙ্গে যুদ্ধ করছে বেঁচে থাকার জন্য—জিল্লুর রক্তে পদ্মার ঘোলাটে পানি লাল হয়ে যাচ্ছে। মুকুলের অর্ডারে পাগলের মতো গুলি করছে মুক্তিযোদ্ধারা। সম্মুখযুদ্ধে হেরে গেল পাকিস্তানি মিলিটারিরা। কারোর লাশ পড়লো পদ্মায়। আবার কেউ পড়ে রইলো নৌকোতেই। স্রোতের টানে টানে নৌকোটা চলে যাচ্ছে অন্যদিকে। যেখানেই যাক, ওই নৌকো আর কেউ আটকাবে না। মুক্তিযোদ্ধাদের সবাই এখন পদ্মার পানিতে। সাঁতরাচ্ছে। জিল্লুরকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। দুপুর গড়িয়ে গেল আহত জিল্লুরকে নিয়ে পাড়ে আসতে। জিল্লুর এখনও বেঁচে আছে। কিন্তু কোনো কথা বলতে পারছে না। জবাই করা গরুর মতো শুধু গোঙরাচ্ছে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। একটা গুলি জিল্লু গলা ফুটো করে ওপাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। ওরা কী করে বাঁচাবে জিল্লুরকে? তখনও মুক্তিযোদ্ধারা প্রকাশ্যে বেরোতে পারে না। জিল্লুরকে নিয়ে আরও মুশকিল হলো, ও কথা বলতে পারে না ঠিকই, কিন্তু যেভাবে গোঙরাচ্ছে, এই শব্দ শুনেই মানুষ চমকে উঠবে। রাজাকার আল বদররা পাকিস্তানি আর্মিকে খবর দেবে।
বিপদ তো চতুর্দিকেই। তার ভেতরেও জিল্লুরকে বাঁচাতে হবে। সোজা পথে না গিয়ে ওরা তেপান্তরের মাঠের ভেতর দিয়ে জিল্লুরকে নিয়ে রওয়ানা হলো। সন্ধ্যার আগে আগেই ঘন কুয়াশায় ডুবে গেছে চতুর্দিক। প্রচণ্ড শীত। সেই সঙ্গে কনকনে উত্তরে হাওয়া। পায়ে হাঁটা মাঠের ঘাস শিশিরে ভেজা। এসব কিছুই টের পাচ্ছে না মুক্তিযোদ্ধারা। শীত-ফিত তাদের গায়ে লাগছে না। তারা সবাই খুব অস্থির এই মুহূর্তে। দারুণ এক টেনশনে ভুগছে সবাই। প্রত্যেকের মুখে শুধু একটাই কথা, যে করেই হোক, যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব, জিল্লুরকে এখন অন্তত মানিকগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। রক্ত পড়াটা বন্ধ না হলে জিল্লুর বাঁচবে না। ওকে কাঁধে নিয়ে সবাই যেন দৌড়াদৌড়ি করে যাচ্ছে তেপান্তরের মাঠ দিয়ে। মানুষ আর বসতবাড়ির কোনো চিহ্ন নেই। শুধু মাঠ আর মাঠ। আর সেই মাঠ বোঝাই ঘন কুয়াশা। দশদিক ধূসর। এই অন্ধকার দিকচিহ্নহীন ধূসর মাঠ ভেঙেই মুক্তিযোদ্ধারা দৌড়াদৌড়ি করে যাচ্ছে মানিকগঞ্জ শহরের দিকে।
মানিকগঞ্জ দৈনিক বাজারের দক্ষিণে যে ব্রিজ, ওই ব্রিজের পাশের এক বাড়িতেই জিল্লুরকে রাখা হলো। মুকুলের পরিচিত বাড়ি। সরাসরি হাসপাতালে গেলে হয়তো বিপদে পড়তে পারে। ওই ভয়েই জিল্লুরকে এখানে রেখে মুকুল একাই হাসপাতালের দিকে গেল।
মিলিটারির ভয়ে দোকানপাট এমনিতেই বন্ধ থাকে এখন। সকালের দিকে কিছু দোকানপাট খোলে। দুপুর গড়াতে না গড়াতেই সেসব দোকান আবার বন্ধ হয়ে যায়। বিকাল থেকেই জনমানবশূন্য হয়ে যায় এই ছোট্ট শহর। আজ রাতে ভীষণ শীত। ঘন কুয়াশা। তার মধ্যে কনকনে উত্তরে হাওয়া। দোকানপাট তো বন্ধই, বাড়ি-ঘরেও কোনো আলো জ্বলছে না। ঘন কুয়াশায় মনেই হচ্ছে না এটা একটা শহর। নিজেই নিজের পায়ের শব্দ শুনে কয়েকবার চমকে উঠলো মুকুল। নীরব নির্জনে হাঁটলে এভাবেই মানুষ ভয় পায়। চমকে ওঠে। মুকুলের তো আর ভূতের ভয় নেই। তার ভয় পাকিস্তানি মিলিটারির। রাজাকার আল বদরের।
হাসপাতালের ডাক্তার-নার্স সবাই মুকুল চৌধুরীকে চেনে। বিগত ন’মাস অনেক আহত মুক্তিযোদ্ধাকে গোপনে চিকিত্সা করানো হয়েছে এই হাসপাতালে। দু’তিনটি রোগী আর একজন সিনিয়র নার্স ছাড়া কেউ নেই হাসপাতালে আজ। ভীষণ শূন্য শূন্য লাগছে হাসপাতালটাকে। মনে হয় হাসপাতালের আলোও কমে গেছে। ঘন কুয়াশায় ডুবে আছে হাসপাতালটা। চাদরে নাক-কান ঢেকে জবুথবু হয়ে বসে আছে সিনিয়র নার্সটা। মুকুলকে দেখেই যেন চমকে উঠলো নার্স। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেল এক মুহূর্তেই। মুকুলের প্রশ্ন,
—ডাক্তার সাহেব কোথায়?
কাঠ গলায় নার্সের উত্তর,
—বাড়িতে।
—এই শহরে কোনো গণ্ডগোল হয়েছে?
—না, আট-দশ দিনের মধ্যে কোনো গণ্ডগোল হয়নি।
—আপনি একটা রিকশা নিয়ে ডাক্তার সাহেবের বাড়িতে যান।
—এখন এখানে কোনো রিকশা চলে না। গণ্ডগোলের পর থেকেই রিকশা বন্ধ হয়ে গেছে।
—ডাক্তার সাহেবের বাড়ি কতো দূরে?
—এই তো কাছেই
—আপনি বাড়িতে যান। গিয়ে আমার কথা বলেন। খুব সিরিয়াস একটা রোগী আছে। এখনি তাকে অপারেশন করতে হবে। আমি রোগী আনতে গেলাম।
নার্স গেল কি গেল না, তা লক্ষ্য করার মতো হাতে সময় নেই মুকুলের। মুকুল বোধহয় সুনিশ্চিত নার্স তার কথা শুনবেই। খুব দ্রুত চলে গেলো মুকুল।
রাত এক-দেড়টার দিকে জিল্লুরের অপারেশন শেষ হলো। মুকুলরা চেয়েছিল জিল্লুরকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাবে এখনি কিন্তু ডাক্তার তা করতে দিল না। তার কাছে হাসপাতালেই রাখলো জিল্লুরকে। ডাক্তার মুকুলকে বললো,
—মিলিটারিদের আগের সেই দাপট নেই। ভীষণ একটা ভয় ঢুকেছে ওদের ভেতর। চাচা আপন পরাণ বাঁচা বলে দৌড়াদৌড়ি করছে সব সময়। হারামির জাত তো মুখে কিছু বলে না। আমি ডাক্তার, ওদের দৌড়াদৌড়ি দেখেই টের পাই—ওদের মনের ভেতরে এখন কী হচ্ছে।
খুব ভালো ডাক্তার। গোপনে গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করে। অনেক সময় রোগীর ওষুধ-পথ্যের টাকাও দিয়ে দেয় নিজের পকেট থেকে। মুকুলকে আশ্বাস দিয়ে দৃঢ়কণ্ঠে বলেছে, মিলিটারি যদি চেক করতে আসে, তাহলে জিল্লুরকে বলবো ডিপথেরিয়ার রোগী। শেষ মুহূর্তে এসেছে বলে গলা কাটতে হয়েছে। ওরা তো আর মুক্তিযোদ্ধা বলে চেনে না জিল্লুরকে।
ডাক্তারের হাত দুটি ধরে কেঁদে ফেলেছিলো মুকুল। ভেজা গলায় বলেছিল,
—জিল্লুরকে আপনার কাছে রেখে গেলাম। ও আমার একজন দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধা। ডাক্তার সাহেব, এই বাংলাদেশ যেদিন স্বাধীন হবে, জিল্লুরের নাম সেদিন সোনার অক্ষরে লেখা হবে ইতিহাসে। ভালোমন্দ ওষুধ-পথ্য—সব...
মুকুলকে আর কিছু বলতে দেয়নি ডাক্তার। আবেগে থর থর করে কাঁপতে কাঁপতো ডাক্তার বলেছিল,
—ওর সব দায়িত্ব আমার। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করবো ওকে সুস্থ করে তোলার। উপরে আল্লাহ আছেন, আর এই হাসপাতালে আমি। ভরসা রেখো আমার ওপরে।
আর কিছু বলতে পারেনি মুকুল। সব মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে দ্রুত এখান থেকে চলে গেছে।
মানুষ কোনোদিনই এক জায়গায় থাকতে পারে না। সময়ের প্রয়োজনে, ব্যবসা-বাণিজ্য-চাকরির কারণে, ভিন্ন জায়গায় চলে যেতে হয়। হারিয়ে যায় সব পুরনো বন্ধু-বান্ধব। নতুন জায়গায় নতুন বন্ধু-বান্ধব পেয়ে যায়। এভাবেই মানুষ বাঁচে। এভাবেই মানব জীবনের রদবদল হয়।
ডাক্তার কথা রেখেছিল ঠিকই, জিল্লুরকে সুস্থ করে তুলেছে। কিন্তু সুস্থ হওয়ার পর থেকেই জিল্লুর আর কথা বলতে পারে না। ঢাকাতেও বড় বড় ডাক্তার দেখেছে জিল্লুরক
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?