Amardesh
আজঃ ঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৭ ডিসেম্বর ২০০৯, ৩ পৌষ ১৪১৬, ২৯ জিলহজ ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 বিশেষ বিভাগ
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

আমার বিজয়ের গান

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
‘বিজয়’ শব্দটিই গৌরবের। কিন্তু বিজয় যখন কোনো দেশের প্রতি প্রযোজ্য হয়, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ করে বিজয়, তখন তার তাত্পর্য হয়ে ওঠে বহুমুখী। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো বিজয়ের গৌরবকে সমুন্নত রাখা, যা কেবল আনন্দ প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এক্ষেত্রে বিজয় অর্জিত হয় স্বল্প বা দীর্ঘকালীন সংগ্রাম ও যুদ্ধে জয়লাভের মধ্য দিয়ে। আমাদের সংগ্রাম শুরু হয়েছিল ভাষা সংগ্রামের সূত্রপাত থেকে। শেষ হয়েছে ৯ মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধ দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে। কিন্তু এ শেষ নয়। এ বিজয় ভূখণ্ডকে শত্রুমুক্ত করা মাত্র। ভূখণ্ডই সব নয়। সেই ভূখণ্ড ঘিরে যে দেশ, সর্বোপরি যে জাতি, সেই দেশ ও জাতীয়তাবোধকে সদা জাগ্রত, সদা অগ্রসরমান রাখাই বিজয়কে গৌরবমণ্ডিত রাখা। ‘বিজয়ের গান’ তাই আমার কাছে কিছু পঙিক্ত, সুর ও বাদ্যযন্ত্র সংযোগে একক বা যৌথ কণ্ঠে উচ্চারণই নয়; বরং জাতির আত্মিক চেতনার উন্মেষ ও বহিঃপ্রকাশ ও বিজয়ের গান। যেমন মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা মার্চ।
স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা অনেক কঠিন, এ প্রাচীন সুবচনটি বহুকাল ধরে বহুশ্রুত। স্বাধীনতা বা বিজয়ের গৌরবকে জাতীয় জীবনে প্রতিটি মানুষের উপলব্ধিতে সঞ্চারিত করতে না পারলে অভ্যন্তরীণ বা বহিঃশক্তির শোষণ থেকে মুক্ত করতে না পারলে স্বাধীনতার অর্থ, বিজয়ের অর্থ শোষকের কাছে একরকম ও শোষিতের কাছে অন্যরকম হয়ে যায়। মাটির সঙ্গে কঠিন সংগ্রাম করে, ফসল উত্পাদন করে কৃষক যখন তা মাত্র এক টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হয়, আবার ভোক্তা যখন তা অন্যূন ২০/২৫ টাকায় কিনতে বাধ্য হয়, তখন বোঝা যায়, উত্পাদনকারীও স্বাধীন নয়, ভোক্তাও স্বাধীন নয়। রাষ্ট্রযন্ত্র পালিত এক শ্রেণীর পিশাচ এদের স্বাধীনতা বা বিজয়ের গৌরবকে হরণ করে ফেলেছে। একইভাবে শ্রমিকের রক্ত-ঘাম মিশ্রিত শ্রমকে নামমাত্র মূল্যে কিনে, অর্থাত্ শ্রমিককে বঞ্চিত করে উত্পাদিত পণ্য যখন ক্রেতার কাছে বহুগুণ বেশি (কোথাও কোথাও শতগুণ) মূল্যে বিক্রি করা হয়, তখন শ্রমিক এবং ক্রেতা দু’পক্ষই বঞ্চনার শিকার হয়। বঞ্চিতজনের কোনো বিজয়ের গান থাকে না। তারা তো প্রতি পদে পদেই পরাজিত হচ্ছেন।
আমাদের দেশে একটি কথা প্রচলিত আছে, ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিরা তো লাভ করার জন্যই পুঁজি খাটান। অবশ্যই লাভ করবেন। লাভ অর্জনের পূর্ণ স্বাধীনতা তাদের আছে। কিন্তু লাভ করার স্বাধীনতার অর্থ তো অন্যের ক্ষতি করা বা অন্যকে ঠকানোর স্বাধীনতা নয়। ঠকানোর প্রশ্ন উঠলেই তারা বলেন, শ্রমিক তো তার পারিশ্রমিকের পরিমাণ জেনেশুনেই শ্রম দিতে চুক্তিবদ্ধ হন। একই কথা মহাজনরাও বলে থাকেন যে, চাষী তো কী দিতে হবে তা লেখাপড়া করেই (চাষীর নিরক্ষরতার সুযোগ নেয়ার প্রসঙ্গটা বাদই দিলাম) টাকা নেন। তাহলে ঠকানোর প্রশ্নটা আসছে কেন? হায় স্বাধীনতা, হায়রে বিজয়! কৃষক, শ্রমিক, মজুরের এ অনন্যোপায় অবস্থা সৃষ্টি করা এবং সেই অবস্থায় ফেলে রাখার দায় তবে কার? তার শ্রমের ন্যায্যমূল্য, তার কর্ম, তার ইচ্ছা সবই যদি অন্যের দ্বারা নির্ধারিত হয়, অন্যের অধীন হয়, তবে কোন অর্থে সে স্বাধীন? কোন অর্থে সে বিজয়ী? এ অনুভব থেকে আশির দশকে একটি গান লিখেছিলাম।
স্বাধীনতা—/তোমার জন্যে যে পারে বইতে শত দুঃখের ভার/ তারই কাছে, শুধু তারই কাছে, রেখো সুখের অঙ্গীকার\/ তোমাকে বাঁচাতে যে কৃষক মাঠে হাল চষে/যে মাঝি ওড়ায় সাহসের পাল দরিয়ায়/তারা যেন বুকে আশা পায়।/যে কবি-শিল্পী তোমাকে পরায় গৌরব মণিহার/তারই কাছে, শুধু তারই কাছে রেখো সুখের অঙ্গীকার\/তোমাকে সাজাতে যে মজুর নিতি ঘাম ঝরায়/হাতুড়ি চালায় শ্রমিকের হাত সুকঠিন/তুমি থেকো তারই চিরদিন/যে বীর যোদ্ধা তোমাকে শোনায় সত্যের অধিকার/তারই কাছে, শুধু তারই কাছে রেখো সুখের অঙ্গীকার।
এমন এক, একাধিক বা অনেক গান লিখে কোনোই লাভ হয় না। এ পর্যন্ত এমন প্রচুর গান রচিত ও গীত হয়েছে, হয়ে চলেছে, ভবিষ্যতেও হবে। এগুলো ব্যক্তি পর্যায়ের সচেতনতার ব্যাপার। কিন্তু গণসচেতনতা বা রাষ্ট্রীয় চেতনায় ঘাটতি থাকলে বিজয় যেমন ব্যক্তির কাছে নিষম্ফল হয়ে যায়, তেমনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। মওলানা ভাসানীর লংমার্চ নিয়ে সেদিন যেমন রাষ্ট্র ভাবিত হয়নি, উদ্যোগী হয়নি, আজো হচ্ছে না। স্বাধীনতা, বিজয় এসব শব্দের সঙ্গে আর একটি শব্দ অঙ্গাঙ্গী জড়িত, তা হলো সার্বভৌম। আভ্যন্তরীণ শোষকের হাতে যেমন সাধারণ মানুষ অধিকার হারায়, তেমনি বহিঃশক্তির আধিপত্যে-শোষণে বিপর্যস্ত হয় রাষ্ট্র এবং সমগ্র জাতি। যে রাষ্ট্রের বুকের ওপর দিয়ে অন্য কোনো রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী অবাধ চলাচল করতে পারে, কোনো দুর্যোগে বা বিপাকে অনায়াসে বিনা অনুমতিতে ঢুকে পড়তে পারে সহায়তাদানের অজুহাতে, যে ভূখণ্ডের ভেতরে অন্য দেশের যে কোনো পর্যায়ের সশস্ত্র বাহিনী গুলি করে মানুষ মারতে পারে, সে দেশের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য। একইভাবে যে দেশের সরকার জনস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে, বড়-ছোট বহিঃশক্তির চাপে দেশের সম্পদ নিয়ে নানা অসম চুক্তিতে উপনীত হতে চায়, সে দেশের বিজয়ের গান হলো গণজাগরণ। কিন্তু গণজাগরণের উদ্যোগ নিতে কি কোনো রাজনৈতিক শক্তির উদ্যম পরিলক্ষিত? না হবার কারণ একটাই, শাসক বা হবু শাসক সবারই জনস্বার্থ সম্পর্কে উদাসীনতা।
বিজয় সুরক্ষিত করার প্রধান উপায় যেমন জাতীয় স্বাধীন সত্তায় যে কোনো বিজাতীয় হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, তেমনি জাতীয় সংষ্কৃতি গড়ে তোলা এবং তার মধ্যে বিজাতীয় এবং বিশেষ করে পশ্চিমা অপসংস্কৃতি রোধ করা। আমরা যে নব্বইয়ের গণআন্দোলনের পর দলে দলে হানাহানি ছাড়া আর কোনো গণজোয়ার দেখতে পেলাম না, তার কারণ কি? কারণ গণজাগরণ গণআন্দোলনের মূলে যে তারুণ্যের শক্তির প্রয়োজন, সেই তারুণ্যকে বিভ্রান্ত করার এক বিশাল চক্রান্ত চলছে। তারুণ্যকে দখলবাজ, টেন্ডারবাজ করে তুলছে আভ্যন্তরীণ কায়েমী স্বার্থবাদী শ্রেণী, আর অপসংস্কৃতিতে নিমজ্জমান বাইরের বাজার প্রতিষ্ঠাকারী রাষ্ট্রের অনুচরেরা। তাদের প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে বর্তমান প্রজন্মকে প্রলুব্ধ করে, আত্মবিস্মৃত করে, তাদের মাধ্যমে আগামী প্রজন্মকে আত্ম সংস্কৃতিহীন পরগাছায় পরিণত করা। সংস্কৃতি শব্দটাকে অনেকেই নাচ-গান-ফুর্তির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। শাসক সম্প্রদায়ের অনেকের কাছেই এর কোনো গুরুত্ব নেই। তাই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বাজেটও সবচেয়ে কম। সংস্কৃতির অভিভাবক শিল্পকলা একাডেমীও তার দায় সারেন কিছু নাটক, কিছু গান ও নৃত্যানুষ্ঠান এবং মাঝে মাঝে চারুকলা প্রদর্শনী করে।
এ কারণেই জাতীয় সংস্কৃতির কোনো পরিচ্ছন্ন ধারণা তৈরি হয় না। নানাভাবে গজিয়ে ওঠা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান-গোষ্ঠী-জোট, কেউ হাত পাতে পাশ্চাত্যের দিকে, কেউ শরণাপন্ন হয় ভারতের বোম্বাইয়া ধারায়, কেউবা ভোগে পশ্চিমবঙ্গীয় নস্টালজিয়ায়। নিজস্ব সংস্কৃতির চলমানতার পথ ভুলে গেলেই মাত্র এমনটি ঘটতে পারে। আমাদের সংস্কৃতি তার স্বাভাবিক ধারায় ক্রমেই স্বতন্ত্ররূপ লাভ করেছে। তা পাশ্চাত্যেও ছোটেনি, আবার কোনো এককেলে কলকেতে সংস্কৃতিতেও আটকে নেই। যারা পাশ্চাত্যাভিমুখী, তারা পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির খোঁজ পায়নি। পাশ্চাত্যের বর্তমান প্রজন্মের বখাটে অংশের অনুকারক হয়েছে মাত্র। এ এক ধরনের ব্যাধি, যা সংক্রমিত হচ্ছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে।
যারা ভারতের বোম্বেটে হতে চায়, তারা জানেই না বৃহত্ ভারতীয় সংস্কৃতির আত্মা ওর মধ্যে নেই, আছে শুধু অতিরঞ্জনের চটক, যা চোখ ধাঁধায়, মরমস্পর্শ করে না। যারা কলকেতে দাদাদের পরশধন্য হবার জন্য ছুটছে, তাদের মধ্যে আবার একটা বুদ্ধিজীবী বুদ্ধিজীবী ভাব আছে। অথচ কলকেতে সংস্কৃতি কখনোই বাঙালির সংস্কৃতি ছিল না। পূর্ববঙ্গের তো নয়ই। বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে তারা স্বাতন্ত্র্য বোধে প্রকট হয়ে ওঠে। আমাদের সম্পর্কে তাদের উক্তি ছিল ‘বাঙাল মনুষ্য নহে’।
নিজের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য যারা বোঝে না বা রক্ষা করতে পারে না, তারা জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে পারে না। তারা বুঝতে পারে না সাধারণ মানুষ কেন রেফারেন্ডাম করে পূর্ব পাকিস্তানি হয়, আবার কেন পাকিস্তানের কবল থেকে মুক্তিলাভের জন্যই মুক্তিযুদ্ধ করে। সেই মানুষের উচ্চারণ হলো—“একাত্তরের যুদ্ধের দিনে/তোমার মূল্য নিয়েছি মা চিনে,/প্রতিজ্ঞা ছিলো শিকল না ভেঙে ঘরে ফিরে কেউ আসবো না।/তোমার মুক্তি ছাড়াতো আমরা বাঁচতেও ভালোবাসবো না\/ প্রতিজ্ঞা হয়ে উড়ছে পতাকা মাগো/তুমি যেন চির বিজয়িনী বেশে সূর্য সাজিয়ে জাগো।/আমরা-তোমার স্বাধীন হাসির বদলে কোন সুখ চেয়ে হাসবো না\/ প্রতিজ্ঞা আজো করছি তোমাকে ছুঁয়ে/ এতটুকু কালি লাগে যদি মাগো রক্তে দেবো তা ধুয়ে/ আমরা তোমার বদন মলিন হলে মা নয়নের জলে ভাসবো না\”—এ গানটি লিখেছিলাম ২০০০ সালে। নিজের সংস্কৃতি বা নিজের স্বতন্ত্র উচ্চারণ না চিনলে যা হয়, তার প্রমাণ পেলাম দুটি বিশেষ দিবসে, টিভি চ্যানেলে চ্যানেলে প্রচারিত অনুষ্ঠানে। প্রথমটি বিগত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে। বিটিভি থেকে শুরু করে অন্য সব চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখে সংশয়ে পড়ে গিয়েছিলাম, ওগুলো কি আমাদের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান, নাকি রবীন্দ্র জন্ম বা মৃত্যুদিনের অনুষ্ঠান। নাটক এবং সিনেমা ছাড়া বাকি সময়ের সিংহভাগজুড়ে রবীন্দ্র সঙ্গীতের প্রচার। তার মধ্যে আবার এমন গানও আছে যে গানের বক্তব্যের সঙ্গে আমাদের জাতীয় চেতনার কোনো সম্পর্কই নেই। ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি...’ গানটির মধ্যে ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি থাকার কারণেই বোধ হয় প্রায় সব চ্যানেল ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এ গানটির উপরে। কোথাও একক কন্ঠে, কোথাও সমবেত কন্ঠে, কোথাও নৃত্যসহযোগে মহাসমারোহে ঢুকে পড়েছিল ‘সোনার মন্দিরে’। অথচ এ গানটি যে আদৌ দেশবন্দনা নয়, দেবী বন্দনা—তা সম্ভবত ভাবার মতো অবকাশ ছিল না কারও। সেই দেবী, যিনি ত্রিনয়নী, যার ‘দুই নয়নে স্নেহের হাসি, ললাটনেত্র আগুন বরণ’। আবার ‘ডান হাতে তোর খড়্গ জ্বলে, বাঁ হাত করে শঙ্কা হরণ,’। দিনটি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। যে কোনো জাতির জন্য স্বাধীনতা দিবস অহঙ্কারের, আনন্দের। কিন্তু রাতটা কি দুঃখের ছিল? গানের মধ্যে যে আছে, ‘আজি দুঃখের রাতে সুখের স্রোতে ভাসাও ধরণী’! কি জানি, এ বছরের ব্যাপার যখন, সরকার হয়তো ব্যাখ্যা দিতে পারবে, অথবা ব্যাখ্যা চাইতে পারবে চ্যানেলগুলোর কাছে। বরাবর দেখে এসেছি, স্বাধীনতা দিবসে প্রচুর দেশের গান প্রচারিত হতে। যে গান তৈরি হতো এদেশেরই গীতিকবি ও সুরস্রষ্টা সমন্বয়ে। কণ্ঠ দিতেন এদেশের প্রধান শিল্পীরা। অবশ্য রবীন্দ্র সংগীতের অনুষ্ঠানও থাকত, থাকত নজরুল সংগীতও। কিন্তু এবারের মতো কখনই দেখিনি।
দ্বিতীয় বিশেষ দিনটি হলো এবারের কোরবানির ঈদ। এটা আবার এক দিনের উত্সব নয়। চ্যানেলভেদে সাত থেকে দশ দিনের। প্রচারিত অনুষ্ঠানের নিরানব্বই ভাগ কোরবানির শিক্ষার বিপরীত। আমরা ধর্মগ্রন্থে বা ধর্মীয় কাহিনী নিয়ে রচিত বিভিন্ন গ্রন্থে পড়েছি, আল্লাহ হজরত ইব্রাহিমকে (আ:) স্বপ্নে নির্দেশ দেন, তার সবচেয়ে যা প্রিয়, তা আল্লাহর রাহে কোরবানি দিতে। তিনি তার পালিত প্রিয় পশু একাধিকবার কোরবানি দেয়ার পরও যখন স্বপ্নে একই নির্দেশ পেলেন, তখন তার খেয়াল হলো তার সবচেয়ে প্রিয় তো তার পুত্র। তিনি পুত্রকেই কোরবানি দেবেন বলে স্থির করলেন এবং কোরবানি দিলেন। কিন্তু অলৌকিক মহিমায় পুত্রের বদলে একটি দুম্বা কোরবানি হয়ে যায়। পুত্র অক্ষত থাকেন। তিনি দৈববাণী শুনতে পান, আল্লাহ তার ঈমানের শক্তিতে সন্তুষ্ট হয়েছেন। সেই থেকে কোরবানির প্রথা চালু হয়েছে। আমরা জানি না, এবারের কোরবানির ঈদে আমাদের কোনো কোনো টিভি চ্যানেলের পরিকল্পক প্রযোজক বা নির্মাতারা তেমন কোন স্বপ্নাদেশ প্রাপ্ত হয়েছিলেন কিনা। যে কারণে তারা একদল আনাড়ি কসাই দিয়ে, তাদের মনোদৈহিক ভোঁতা ছুরির সাহায্যে জবাই করার চেষ্টা চালিয়ে গেলেন আমাদের অতি গৌরবের আপন সংস্কৃতিকে! যাদের কাছে তারা স্বপ্নাদেশ পেতে পারেন, তাদের লৌকিক বা আর্থিক ক্ষমতা অঢেল থাকলেও অলৌকিক ক্ষমতা নেই। তাই সংস্কৃতি জবাই না হলেও ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। জবাই হয়নি জবাইকারীদের অক্ষমতার কারণে। স্বপ্নাদেশদাতাদের ইচ্ছা অবশ্যই ছিল সংস্কৃতিকে হত্যা করা, পরীক্ষা নেয়া নয়। আমি সেসব বহুজাতিক কোম্পানির কথা বলছি, যারা আমাদের পকেট মারার জন্য আমাদেরকে অচেতন করে রাখতে চায়। তারা অজ্ঞান পার্টির কর্মী হিসেবে বেছে নেয়, আক্কেল ফোটেনি এমন একদল তরুণ-তরুণীকে। দ্রুত বাড়ি-গাড়ির মালিক হওয়ার লোভে তারা আত্মবিক্রি করে দেয় কুণ্ঠাহীনভাবে। এ চেতনাহীনতার পেছনে কাজ করে বহু ক্ষেত্রেই সংস্কৃতি বোধহীন পারিবারিক পরিবেশ অথবা অসত্ সংসর্গ। এদেরকেই আমি বলেছি আনাড়ি কসাই।
সব অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্র এটা নয়। তবে আমাদের ভাষা এবং সংস্কৃতির পরিপন্থী কিছু অনুষ্ঠানের কথা বলব, যা জাতিসত্তার ঘাতকের দন্ত বিকশিত গান। একটি চ্যানেলের ‘ঈদের বাজনা বাজেরে’ অনুষ্ঠানে এমন একটি নৃত্যগীত প্রচারিত হলো, যার অশ্লীলতা, যাত্রাশিল্প হত্যাকারী তথাকথিত প্রিন্সেসদেরও বহু পেছনে ফেলে দিয়েছে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের এমন নোংরা ঝাঁকাঝাঁকিকে কি নাম দেব? আর যিনি এই কর্মটি করলেন তাকে মহিলা বললে নারীবাচক সব শব্দই লজ্জা পাবে। আর একটি চ্যানেলের ‘ঝালমুড়ি’ নামের অনুষ্ঠানটি সম্পর্কে না বললেই নয়। ধরা যাক, কোনো বাড়ির ড্রইংরুমে বিভিন্ন বয়সী কিছু ভদ্রজন বসে আছেন, আর বাড়ির যুবতী মেয়েটি উরু পর্যন্ত এক উদ্ভট জুতো পরে ঠ্যাংয়ের ওপর ঠ্যাং তুলে পা নাচাতে নাচাতে অভব্য দেহভঙ্গিতে কথা বলছে, কি প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত উপস্থিত ভদ্রজনদের? সেই গৃহকর্তা যদি ভদ্র হন তবে তার তো উচিত, মেয়ের গালে একটা থাপ্পড় দিয়ে সেখান থেকে বের করে দেয়া এবং ভদ্রতা না শেখা পর্যন্ত আর ভদ্রজন সমক্ষে বেরোতে না দেয়া। টিভি তো ড্রইংরুম মিডিয়াই। টিভি ক্যামেরার সামনের ওই আচরণ তো সরাসরি ভদ্র দর্শকদের নাকের ডগায় অভব্যতা। এ অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে এক নাট্য প্রতিভাও(!) ছিলেন। চীনামাটির পাত্রের দোকানে ষাঁড় ঢোকার মতো শিং বাঁকিয়ে যিনি ঢুকে পড়েছেন আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষার বহুযত্নে গড়ে তোলা প্রমিত উচ্চারণের ভুবনে। তার সব নাটকের চরিত্রগুলো এমন উচ্চারণে কথা বলে যা বাংলা বর্ণমালার সাহায্যে লেখা যায় না। তবে দু’জনে মিলে তাদের নিজেদের গানের সুরে মহাজনদের গান গাওয়ার নামে যা করলেন, তাকে বলে যৌথ কুকর্মের ক্লেদ। সেই ক্লেদ তারা মাখিয়ে দিলেন মহাত্মা লালন ফকির, বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ এবং আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আত্মায়। আমাদের ভাষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে এমন যখন চলছে তখন কেমন করে ভাষা সংগ্রাম, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ আর বিজয়ের গৌরব গান শোনাব?
তবুও আমি আশাবাদী এবং জানি অর্বাচীনদের সাধ্য নেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের বিপক্ষে টিকে থাকার। কারণ “বিজয় মানে তো জনতার কাছে আসা/বিজয় মানে তো স্বদেশকে ভালোবাসা/ বিজয় মানে তো প্রিয় কবিতার ছন্দমুখর ভাষা\/ বিজয় মানে তো আগামীর সুর শেখা/বিজয় মানে তো মানুষের গান লেখা/ বিজয় মানে তো আলোয় রাঙানো অনাবিল পূর্বাশা\/ বিজয় মানে তো নবীনের প্রার্থনা/বিজয় মানে তো জীবনের বীজ বোনা/ বিজয় মানে তো স্বাধীন জমিনে ফসলের প্রত্যাশা\” ২০০৫ সালের শেষে লিখেছিলাম এ গান। তারপর তো কত দাপট কত পাশব কাণ্ড দেখলাম। তারপরও আমার বিশ্বাস, এদেশের আপামর জনগণ সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে সত্যিকারের বিজয়ের গান গাইবেই। দেশি-বিদেশি শোষণ-বঞ্চনা, সাম্রাজ্যবাদী-আধিপত্যবাদী চক্রান্ত, আমাদের নদীর ওপর, বন্দরের ওপর, সমুদ্র সীমার ওপর প্রসারিত কালো হাত গুঁড়িয়ে দিয়ে, সার্বভৌমত্বের পূর্ণতার গৌরব নিয়ে সমগ্র বাংলাদেশী জাতিসত্তা যখন জেগে উঠবে, সেই
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?