কেমন আছে বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবার
দুঃখ-কষ্টে দিন কাটছে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের পরিবারের সদস্যদের
--জি. এম. বাবর আলী, বরিশাল
স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানের শিয়ালকোট থেকে পালিয়ে এসেছিলেন বীর সেনানী ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে গেছেন তিনি। পেয়েছেন বীরশ্রেষ্ঠ উপাধি। কিন্তু এ উপাধিতে পেট ভরেনি তার পরিবারের অবশিষ্ট সদস্যদের। অসহনীয় দরিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছেন দেশের শ্রেষ্ঠ এ সন্তানের ভাই ও অন্য স্বজনরা। বৃদ্ধা মাতা স্বাধীনতার তিন যুগ ধরে স্বপ্ন দেখেছেন এলাকার দুস্থ মানুষের সেবায় একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার। সব সরকারের কাছে ধরনা দিয়েও স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি তিনি। এ কষ্ট নিয়েই গত বছরের জুলাই মাসে চির বিদায় নিয়েছেন মাতা সাফিয়া খাতুন।
১৯৪৯ সালের ৮ মার্চ বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার আগরপুর ইউনিয়নের রহিমগঞ্জ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাকোরাম এলাকায় দায়িত্বরত ছিলেন ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর। ৩ জুলাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিয়ালকোট সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে আসেন তিনি। ৭ নং সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডার হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেন তিনি। বীর এ সেনানীর শেষ যুদ্ধ ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের বারভূঁইয়ায়। ১২ ডিসেম্বর শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে তিনি অবস্থান নেন মহানন্দা নদীর পাড় বারভূঁইয়ায়। পরদিন ৩/৪টি নৌকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে মহানন্দা পার হন। শুরু করেন সম্মুখযুদ্ধ। বিজয়ের শেষ মুহূর্তে ১৪ ডিসেম্বর পাক বাহিনীর ছোড়া একটি গুলি এসে বিদ্ধ হয় তার কপালে। শহীদ এ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে তার ইচ্ছা অনুযায়ী দাফন করা হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ আঙিনায়।
স্বাধীনতার পর থেকে সীমাহীন দৈন্য আর অসহায়ভাবে দিনাতিপাত করেছে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের পরিবারটি। বাবা বেঁচে থাকতে প্রতি মাসে ৮শ’ টাকা মাসিক পেনশন ভাতা দেয়া হতো এ পরিবারটিকে। তার মৃত্যুর পর এ টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৪শ’ টাকায়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ পরিবারকে নগদ ১ লাখ টাকা বীরশ্রেষ্ঠ সম্মানী দেয়া হয়। নদী ভাঙনে পৈতৃক সম্পত্তির অধিকাংশই হারিয়েছে এ পরিবারটি। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে নগরীর কাশিপুর এলাকায় নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে ছোট্ট একটি একতলা ভবন। সংস্কারের অভাবে যার অবস্থাও ভালো নয়। প্রতি বছর সশস্ত্র বাহিনী দিবসে দেয়া হতো নগদ টাকা। কিন্তু মা সাফিয়া খাতুন অনুদানের টাকা অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছেন এলাকার মানুষকে ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে।
বীরশ্রেষ্ঠ এ মুক্তিযোদ্ধার বৃদ্ধ বাবা আবদুল মোতালেব হাওলাদার দরিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে ২০০৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ইন্তেকাল করেন। মা সাফিয়া খাতুন মৃত্যুবরণ করেন গত বছর জুলাই মাসে। মৃত্যুর আগে এ বীর মাতা তার এলাকায় অসহায় দুস্থ মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে এলাকায় একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার লড়াই করেছেন বহু বছর। এলাকার সব দলের নেতাদের ছাড়াও সরকারপ্রধানদের কাছে আবেদন-নিবেদন করেও বাস্তবায়িত হয়নি তার সে স্বপ্ন। বৃদ্ধা সাফিয়া খাতুনের মৃত্যুর পর এলাকাবাসী এখনও স্বপ্ন দেখছেন মহিউদ্দিনের নামে এখানে প্রতিষ্ঠিত হবে একটি সরকারি হাসপাতাল।
মেঝ ভাই মিজানুর রহমান ২৯ বছর আগে মৃত্যুবরণ করেন দুরারোগ্য ক্যান্সারে । ৪ বোনের মধ্যে ২ বোন এখনও বেঁচে আছেন। জীবিত বোন রাহানুর বেগমের বিয়ে হয় বাহেরচরে। স্বামী সেকান্দার আলী ফরাজী নৌবাহিনীতে ছিলেন। ১৯৮৯ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ছোট বোন খালেদা মুলাদীর একটি বেসরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। স্বামী কাজী নজরুল ইসলামও একটি কলেজের উপাধ্যক্ষ। তিন ভাইয়ের মধ্যে জীবিত একমাত্র ছোট ভাই মঞ্জুর রহমান বাচ্চু সেনানিবাসে ছোটখাটো ঠিকাদারি কাজ করে জীবন চালাচ্ছেন।
বাচ্চু বলেন, স্বাধীনতার ৩৬ বছর পর ২০০৭ সালে তাদের দান করা জমিতে তার ভাইয়ের নামে একটি জাদুঘর নির্মিত হয়েছে। কিন্তু এ জাদুঘর ও গ্রন্থাগারে দর্শনার্থীদের জন্য যা থাকা প্রয়োজন, তা নেই। তার এবং এলাকাবাসীর অনেক আশা ও স্বপ্ন ছিল বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের জন্মভূমি রহিমগঞ্জ দেশের একটি মডেল গ্রাম হিসেবে গড়ে উঠবে। যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা কোনো কিছুরই অভাব থাকবে না। কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি কিছুই।
:
রউফের স্মৃতি বৃদ্ধা মা মকিদুন্নেছাকে কাঁদায়
--আরিফ ইসলাম ফরিদপুর
স্বাধীনতা যুদ্ধে জীবন উত্সর্গকারী বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফের হাজারো স্মৃতি বুকে ধারণ করে এখনও বেঁচে আছেন ৯৮ বছর বয়সী তার বৃদ্ধা মাতা মকিদুন্নেছা। একমাত্র সন্তান আবদুর রউফকে হারিয়ে তিনি পেয়েছেন এ দেশের হাজারো সন্তানের স্নেহ-ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা। বর্তমানে পালকপুত্র আইয়ুবকে নিয়েই কেটে যাচ্ছে তার দিনগুলো। পালকপুত্র আইয়ুব মকিদুন্নেছাকে কখনও বুঝতে দেয়নি তার ছেলে হারানোর অভাব। স্বাধীনতা-পরবর্তী দীর্ঘকাল অভাব-অনটনের মধ্যে থাকার পর ২০০২ সালে সরকারের তরফ থেকে দেয়া হয় প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা, যা বর্তমানে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৭ হাজার ৫শ’ টাকা। সে টাকা দিয়েই এখনও সংসার চলছে মকিদুন্নেছার। বিডিআরের পক্ষ থেকে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কামারখালীতে তৈরি করে দেয়া হয়েছে একতলা একটি বাড়ি। বর্তমানে পালকপুত্র, পুত্রবধূ আর নাতি-নাতনিদের নিয়ে কেটে যাচ্ছে মকিদুন্নেছার সময়। বীরশ্রেষ্ঠ আবদুর রউফের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, রউফ ছোটবেলা থেকেই ছিল বেশ দুরন্ত ও সাহসী। যে কথা বলত, সেটাই করত। গোসল আর মাছ ধরা ছিল তার নেশা। সময় পেলেই খালি গায়ে গোসল করতে আর মাছ ধরতে ছুটে যেত পার্শ্ববর্তী গড়াই ও মধুমতি নদীতে।
রউফ ছিল বেশ সাহসী। কোথাও ঝগড়া-বিবাদ দেখলে ছুটে যেত তা ঠেকানোর জন্য। দেশের জন্য একমাত্র পুত্র রউফ জীবন দেয়ায় তার মনে কোনো দুঃখ নেই, এদেশের প্রতিটি ছেলেকেই তার হারানো রউফ বলে মনে করেন তিনি। মুন্সী আবদুর রউফ যুদ্ধে যাওয়ার সময় ছোটবোন হাজেরা খাতুনকে কথা দিয়েছিল লাল শাড়ি কিনে দেবে, আর এ লাল শাড়ি পরেই শ্বশুরবাড়ি যাবে ছোটবোন হাজেরা। তার আশা পূরণ হয়নি। দেশের জন্য জীবন দেয়ার কারণে ভাইয়ের লাল শাড়ি পরা হয়নি ছোটবোন হাজেরার।
সরেজমিন রউফনগর (সালামতপুর) গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বিডিআর কর্তৃক নির্মিত একতলা বিল্ডিং ঘরটি জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। সেখানে কথা হয় মুন্সী আবদুর রউফের বোন জোহরা বেগমের সঙ্গে। সে তার পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করছে এখানে। তারা বর্তমানে অসহায় জীবন যাপন করছে। জোহরার বক্তব্য—ঘরটি মেরামতের দায়িত্ব সরকার নিলে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফের জন্মস্থান এই ভিটেমাটির স্মৃতিটুকু রক্ষা পেত।
ফরিদপুরবাসী তথা সারা দেশবাসীর এক বিশাল অহঙ্কার বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ। তিনি ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজেলার কামারখালী ইউনিয়নের মধুমতি নদীর তীরে অবস্থিত বর্তমান রউফনগরে (সালামতপুর) এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৩ সালে। বাবা মরহুম মুন্সী মেহেদী হোসেন, মা মকিদুন্নেছা। বাবা-মা’র একমাত্র পুত্রসন্তান ছিলেন তিনি। বাবা মুন্সী মেহেদী হোসেন ছিলেন স্থানীয় এক মসজিদের ইমাম। তার স্বল্প আয়েই চলত তাদের সংসার। অভাব-অনটন আর বাল্যকালে বাবা মারা যাওয়ায় উচ্চ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন তিনি। ফলে ১৯৬৩ সালের ৮ মে তত্কালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসে ভর্তি হন। ১৯৭১ সালে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় চট্টগ্রামে ১১ নং উইংয়ে চাকরিরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি গ্রামে ছুটে আসেন। মায়ের দোয়া নিয়ে ছোটবোনদের সঙ্গে দেখা করে চাকরিতে ফিরে যান এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানীতে যোগদান করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। পাক বাহিনীর বর্বরতা ও চরম নির্মমতার প্রতিশোধ নিতে রউফ সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ঝাঁপিয়ে পড়েন শত্রুসেনাদের ওপর। যুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ২০ এপ্রিল পাক হানাদারদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে যুদ্ধরত অবস্থায় বর্তমানে রাঙামাটি জেলার নানিয়ারচর থানার বুড়িঘাটে চিংড়িখাল নামক স্থানে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ শহীদ হন।
:
হামিদুরের তিন ভাই কষ্টে আছেন
--আহসান কবীর যশোর
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের মা কায়দাছুন্নেসা মারা গেছেন কয়েক বছর হলো। এখন বেঁচে আছেন তার তিন ভাই ও তাদের স্ত্রী-সন্তানরা। এই তিনটি পরিবারের সম্বল মাত্র পাঁচ বিঘা চাষযোগ্য জমি আর নিম্নপদের একটি সরকারি চাকরি। বড় ভাই হামজুর রহমান সরকারের মত্স্য বিভাগে গার্ডের চাকরি করেন। অন্য দু’ভাই শুকুর আলী ও ফজলুর রহমানের আয়ের সুনির্দিষ্ট উত্স নেই। পারিতোষিক হিসেবে প্রাপ্য সাড়ে ১৪ হাজার টাকা ভাগাভাগি করে নেন তিন ভাই। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুরের ভাই ফজলুর রহমান দুঃখের সঙ্গে বললেন, এত কম টাকায় কীভাবে জীবনযাপন করতে পারে তিনটি পরিবার?
ফজলুর রহমান জানান, ১৯৮১ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার তাদের বসতবাড়ি তৈরি করে দেয়। ঠিকাদার বাড়িটির নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম করে। ফলে অল্পদিনেই বাড়িটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। নির্মাণের পর গত ২৮ বছরে সরকারিভাবে একবার এবং তারা নিজেরা দু’বার বাড়িটি সংস্কার করেছেন। তবু বাড়িটি বসবাসের উপযোগী হচ্ছে না। তিনি জানান, রাজধানীতে প্লট দিল না কোনো সরকার। বীরশ্রেষ্ঠের গ্রামটি নামেই হামিদনগর, খাতাকলমে এখনও খোর্দখালিশপুর। গ্রামটির রাস্তাঘাটের জীর্ণদশা। বহু তদবির সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এদিকে নজর দেয়নি। অথচ বীরশ্রেষ্ঠের গ্রাম হওয়ায় বহু ভিআইপির আগমন ঘটে গ্রামটিতে।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুরের নামে ঝিনাইদহে একটি স্টেডিয়াম রয়েছে। গ্রামে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে রয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। খালিশপুর বাজারের কাছেই গ্রামবাসীরা একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন বীরশ্রেষ্ঠের নামে। এ কলেজটিকে টিকিয়ে রাখতে বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে। কিন্তু এখনও কলেজটির সব শিক্ষকের বেতন হয়নি। এ কলেজেই সরকারিভাবে গড়ে তোলা হয়েছে গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুরের পোষ্যদের দাবি, সাতজন বীরশ্রেষ্ঠর শাহাদতবার্ষিকী রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হোক। বীরশ্রেষ্ঠদের জন্মস্থানে ধর্মীয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাকা রাস্তা নির্মাণ ও বিদ্যুত্ সংযোগ দেয়া হোক।
:
দৈন্য আর চিকিত্সার অভাবে ধুঁকছেন মোস্তফা কামালের মা মালেকা বেগম
--জি. এম. বাবর আলী/হুমায়ুন কবির, বরিশাল
সীমাহীন দৈন্য আর মাথা গোঁজার উপযুক্ত ঘরের অভাব এবং আর্থিক সঙ্কটে সুচিকিত্সা থেকে বঞ্চিত হয়ে বেঁচে আছেন দেশের সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন মোস্তফা কামালের মা মালেকা বেগম। স্বাধীনতা যুদ্ধে সন্তানকে হারানোর পর ৩৮ বছর ধরে নির্ধারিত কয়েকটি দিন সরকার আর স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ তাদের খোঁজ নিলেও অবসান হয়নি মানবেতর জীবনযাপনের। ছেলের মৃত্যুর পর তার পরিবারের কেউ সরকারি চাকরি পাবে এমন আশ্বাস শুনে আসছেন ৩৮ বছর ধরে। কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি তা। এ ক্ষোভ নিয়েই হয়তো বিদায় নিতে হবে তাকে।
দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান মোস্তফা কামাল ১৯৪৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভোলার দৌলতখান উপজেলার হাজিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা সেনাবাহিনীর হাবিলদার হাবিবুর রহমান চাকরিতে থাকা অবস্থায় ছেলেকেও উদ্বুদ্ধ করেন সেনাসদস্য হতে। বাবার উত্সাহ আর অনুপ্রেরণায় মাত্র ২০ বছর বয়সে ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। ’৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তানি বাহিনী থেকে বের হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন স্বাধীনতা যুদ্ধে। সাহসী এ সৈনিক ১৮ মার্চ পর্যন্ত যুদ্ধ করেন পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে। অবশেষে ২ নং প্লাটুনে থাকা অবস্থায় ’৭১ এর ১৮ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়ার গঙ্গা সাগরের দরুইন গ্রামে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন এ বীর মুক্তিযোদ্ধা। আখাউড়ার দরুইন গ্রামে তাকে সমাহিত করা হয়।
বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের মৃত্যুর পর থেকে শুরু হয় এ পরিবারটির অভাব-অনটনের জীবন। এরই মধ্যে মেঘনার ভাঙনে বিলীন হয় হাজিপুর গ্রামের বসতবাড়িটি। কিন্তু বাবা বেঁচে থাকায় শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরেন মাতা মালেকা বেগম। ২০০৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ৯০ বছর বয়সে মারা যান এ বীর মুক্তিযোদ্ধার বাবা হাবিলদার হাবিবুর রহমান।
১৯৭১ সালে সন্তান আর ২০০৫ সালে স্বামীকে হারিয়ে একেবারেই অসহায় হয়ে পড়েন বীর মাতা মালেকা বেগম। জীবিত একমাত্র ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান, তিন মেয়ে জাহানারা, হোসনেআরা ও হাসনেয়ারা এবং নাতি-নাতনিদের নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। দীর্ঘদিন ধরে এ পরিবারটি শুনে আসছে বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবারের বেঁচে থাকা সদস্যদের সরকারি চাকরি দেয়া হবে। কিন্তু ৩৮ বছরে তাদের পরিবারের কারও ভাগ্যে জোটেনি সোনার হরিণ নামের এ চাকরিটি।
বীর মাতা মালেকা বেগম জানান, সন্তান আর স্বামী হারানোর পর বেঁচে থাকার জন্য তাকে শুরু করতে হয় তৃতীয় যুদ্ধ। ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান আর নাতি-নাতনি নিয়ে ৬ সদস্যের পরিবার তার। বছরের বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে দাওয়াত করা হয় তাকে। তারপর সারা বছর খোঁজ নেয়ার থাকে না কেউ। এ নিয়ে ক্ষোভের অন্ত নেই সত্তরোর্ধ্ব মালেকা বেগমের। উপার্জনক্ষম একমাত্র সন্তান মোস্তাফিজুর রহমান দীর্ঘদিন ভাইয়ের নামে প্রতিষ্ঠিত বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে মাস্টার রোলে চাকরি করেছেন। সরকারিকরণের আশায় সামান্য বেতন পেয়েও অনেক দিন করেছেন চাকরিটি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভাগ্যে জোটেনি সরকারিকরণ। অবশেষে এক সময়ে তিনি ছেড়ে আসেন সেই চাকরি।
ভোলার বসতবাড়িটি মেঘনায় বিলীন হলে ১৯৮২ সালে সরকারের পক্ষ থেকে ভোলা সদর উপজেলার আলীনগরের মৌটুপি গ্রামে ছোট্ট একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। কিন্তু সংস্কারের অভাবে সে ঘরটির বেহাল দশা। নির্দিষ্ট আয়ের ব্যবস্থা না থাকায় এ পরিবার সীমাহীন দুর্দশায় আছে। আর্থিক সঙ্কটে উপযুক্ত চিকিত্সা হচ্ছে না মালেকা বেগমের। সরকারের পক্ষ থেকে মাসিক যে সম্মানী দেয়া হয়, তা দিয়ে তার চিকিত্সাও চলে না বলে ক্ষোভ তার।
:
অবহেলা আর বঞ্চনার কষ্ট সইছে রুহুল আমিনের পরিবার
--মজুমদার নাজিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম ব্যুরো
অবহেলা আর বঞ্চনার কষ্ট বুকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোহাম্মদ রুহুল আমিনের পরিবারের সদস্যরা। তাদের প্রত্যাশা আজও পূরণ হয়নি। এই প্রত্যাশা কোনো বৈষয়িক নয়, দেশের মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যাশা। লাখো শহীদের রক্তে দেশ স্বাধীন হলেও দেশের মানুষ এখনও স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল ভোগ করতে পারছেন না বলে বিশ্বাস রুহুল আমিনের পরিবারের সদস্যদের।
গত চারদলীয় জোট সরকারের সময় চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের নামকরণ করা হয়েছিল বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের নামে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার ক’মাসের মধ্যেই তার নাম বদলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর নামে স্টেডিয়ামটির নামকরণ করে। এই অবহেলার কষ্ট কোনোভাবেই সইতে পারছেন না বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের পরিবারের সদস্যরা। তাদের প্রশ্ন, কেন এক সরকার তার নামে স্টেডিয়াম করল আর কেনই বা অন্য সরকার তার নাম বাদ দিল? তিনি তো রাজনীতি করতেন না। তাহলে তার নাম নিয়ে কেন চলছে নোংরা রাজনীতি? তারা মুক্তিযোদ্ধাদের দলমতের ঊর্ধ্বে রেখে যথাযথ মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন। আর যেন কোনো মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের প্রতি অবহেলা দেখানো না হয়, তার জন্য সরকার ও দেশের মানুষকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে
--জি. এম. বাবর আলী, বরিশাল
স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানের শিয়ালকোট থেকে পালিয়ে এসেছিলেন বীর সেনানী ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে গেছেন তিনি। পেয়েছেন বীরশ্রেষ্ঠ উপাধি। কিন্তু এ উপাধিতে পেট ভরেনি তার পরিবারের অবশিষ্ট সদস্যদের। অসহনীয় দরিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছেন দেশের শ্রেষ্ঠ এ সন্তানের ভাই ও অন্য স্বজনরা। বৃদ্ধা মাতা স্বাধীনতার তিন যুগ ধরে স্বপ্ন দেখেছেন এলাকার দুস্থ মানুষের সেবায় একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার। সব সরকারের কাছে ধরনা দিয়েও স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি তিনি। এ কষ্ট নিয়েই গত বছরের জুলাই মাসে চির বিদায় নিয়েছেন মাতা সাফিয়া খাতুন।
১৯৪৯ সালের ৮ মার্চ বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার আগরপুর ইউনিয়নের রহিমগঞ্জ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাকোরাম এলাকায় দায়িত্বরত ছিলেন ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর। ৩ জুলাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিয়ালকোট সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে আসেন তিনি। ৭ নং সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডার হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেন তিনি। বীর এ সেনানীর শেষ যুদ্ধ ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের বারভূঁইয়ায়। ১২ ডিসেম্বর শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে তিনি অবস্থান নেন মহানন্দা নদীর পাড় বারভূঁইয়ায়। পরদিন ৩/৪টি নৌকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে মহানন্দা পার হন। শুরু করেন সম্মুখযুদ্ধ। বিজয়ের শেষ মুহূর্তে ১৪ ডিসেম্বর পাক বাহিনীর ছোড়া একটি গুলি এসে বিদ্ধ হয় তার কপালে। শহীদ এ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে তার ইচ্ছা অনুযায়ী দাফন করা হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ আঙিনায়।
স্বাধীনতার পর থেকে সীমাহীন দৈন্য আর অসহায়ভাবে দিনাতিপাত করেছে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের পরিবারটি। বাবা বেঁচে থাকতে প্রতি মাসে ৮শ’ টাকা মাসিক পেনশন ভাতা দেয়া হতো এ পরিবারটিকে। তার মৃত্যুর পর এ টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৪শ’ টাকায়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ পরিবারকে নগদ ১ লাখ টাকা বীরশ্রেষ্ঠ সম্মানী দেয়া হয়। নদী ভাঙনে পৈতৃক সম্পত্তির অধিকাংশই হারিয়েছে এ পরিবারটি। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে নগরীর কাশিপুর এলাকায় নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে ছোট্ট একটি একতলা ভবন। সংস্কারের অভাবে যার অবস্থাও ভালো নয়। প্রতি বছর সশস্ত্র বাহিনী দিবসে দেয়া হতো নগদ টাকা। কিন্তু মা সাফিয়া খাতুন অনুদানের টাকা অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছেন এলাকার মানুষকে ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে।
বীরশ্রেষ্ঠ এ মুক্তিযোদ্ধার বৃদ্ধ বাবা আবদুল মোতালেব হাওলাদার দরিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে ২০০৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ইন্তেকাল করেন। মা সাফিয়া খাতুন মৃত্যুবরণ করেন গত বছর জুলাই মাসে। মৃত্যুর আগে এ বীর মাতা তার এলাকায় অসহায় দুস্থ মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে এলাকায় একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার লড়াই করেছেন বহু বছর। এলাকার সব দলের নেতাদের ছাড়াও সরকারপ্রধানদের কাছে আবেদন-নিবেদন করেও বাস্তবায়িত হয়নি তার সে স্বপ্ন। বৃদ্ধা সাফিয়া খাতুনের মৃত্যুর পর এলাকাবাসী এখনও স্বপ্ন দেখছেন মহিউদ্দিনের নামে এখানে প্রতিষ্ঠিত হবে একটি সরকারি হাসপাতাল।
মেঝ ভাই মিজানুর রহমান ২৯ বছর আগে মৃত্যুবরণ করেন দুরারোগ্য ক্যান্সারে । ৪ বোনের মধ্যে ২ বোন এখনও বেঁচে আছেন। জীবিত বোন রাহানুর বেগমের বিয়ে হয় বাহেরচরে। স্বামী সেকান্দার আলী ফরাজী নৌবাহিনীতে ছিলেন। ১৯৮৯ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ছোট বোন খালেদা মুলাদীর একটি বেসরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। স্বামী কাজী নজরুল ইসলামও একটি কলেজের উপাধ্যক্ষ। তিন ভাইয়ের মধ্যে জীবিত একমাত্র ছোট ভাই মঞ্জুর রহমান বাচ্চু সেনানিবাসে ছোটখাটো ঠিকাদারি কাজ করে জীবন চালাচ্ছেন।
বাচ্চু বলেন, স্বাধীনতার ৩৬ বছর পর ২০০৭ সালে তাদের দান করা জমিতে তার ভাইয়ের নামে একটি জাদুঘর নির্মিত হয়েছে। কিন্তু এ জাদুঘর ও গ্রন্থাগারে দর্শনার্থীদের জন্য যা থাকা প্রয়োজন, তা নেই। তার এবং এলাকাবাসীর অনেক আশা ও স্বপ্ন ছিল বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের জন্মভূমি রহিমগঞ্জ দেশের একটি মডেল গ্রাম হিসেবে গড়ে উঠবে। যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা কোনো কিছুরই অভাব থাকবে না। কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি কিছুই।
:
রউফের স্মৃতি বৃদ্ধা মা মকিদুন্নেছাকে কাঁদায়
--আরিফ ইসলাম ফরিদপুর
স্বাধীনতা যুদ্ধে জীবন উত্সর্গকারী বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফের হাজারো স্মৃতি বুকে ধারণ করে এখনও বেঁচে আছেন ৯৮ বছর বয়সী তার বৃদ্ধা মাতা মকিদুন্নেছা। একমাত্র সন্তান আবদুর রউফকে হারিয়ে তিনি পেয়েছেন এ দেশের হাজারো সন্তানের স্নেহ-ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা। বর্তমানে পালকপুত্র আইয়ুবকে নিয়েই কেটে যাচ্ছে তার দিনগুলো। পালকপুত্র আইয়ুব মকিদুন্নেছাকে কখনও বুঝতে দেয়নি তার ছেলে হারানোর অভাব। স্বাধীনতা-পরবর্তী দীর্ঘকাল অভাব-অনটনের মধ্যে থাকার পর ২০০২ সালে সরকারের তরফ থেকে দেয়া হয় প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা, যা বর্তমানে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৭ হাজার ৫শ’ টাকা। সে টাকা দিয়েই এখনও সংসার চলছে মকিদুন্নেছার। বিডিআরের পক্ষ থেকে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কামারখালীতে তৈরি করে দেয়া হয়েছে একতলা একটি বাড়ি। বর্তমানে পালকপুত্র, পুত্রবধূ আর নাতি-নাতনিদের নিয়ে কেটে যাচ্ছে মকিদুন্নেছার সময়। বীরশ্রেষ্ঠ আবদুর রউফের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, রউফ ছোটবেলা থেকেই ছিল বেশ দুরন্ত ও সাহসী। যে কথা বলত, সেটাই করত। গোসল আর মাছ ধরা ছিল তার নেশা। সময় পেলেই খালি গায়ে গোসল করতে আর মাছ ধরতে ছুটে যেত পার্শ্ববর্তী গড়াই ও মধুমতি নদীতে।
রউফ ছিল বেশ সাহসী। কোথাও ঝগড়া-বিবাদ দেখলে ছুটে যেত তা ঠেকানোর জন্য। দেশের জন্য একমাত্র পুত্র রউফ জীবন দেয়ায় তার মনে কোনো দুঃখ নেই, এদেশের প্রতিটি ছেলেকেই তার হারানো রউফ বলে মনে করেন তিনি। মুন্সী আবদুর রউফ যুদ্ধে যাওয়ার সময় ছোটবোন হাজেরা খাতুনকে কথা দিয়েছিল লাল শাড়ি কিনে দেবে, আর এ লাল শাড়ি পরেই শ্বশুরবাড়ি যাবে ছোটবোন হাজেরা। তার আশা পূরণ হয়নি। দেশের জন্য জীবন দেয়ার কারণে ভাইয়ের লাল শাড়ি পরা হয়নি ছোটবোন হাজেরার।
সরেজমিন রউফনগর (সালামতপুর) গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বিডিআর কর্তৃক নির্মিত একতলা বিল্ডিং ঘরটি জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। সেখানে কথা হয় মুন্সী আবদুর রউফের বোন জোহরা বেগমের সঙ্গে। সে তার পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করছে এখানে। তারা বর্তমানে অসহায় জীবন যাপন করছে। জোহরার বক্তব্য—ঘরটি মেরামতের দায়িত্ব সরকার নিলে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফের জন্মস্থান এই ভিটেমাটির স্মৃতিটুকু রক্ষা পেত।
ফরিদপুরবাসী তথা সারা দেশবাসীর এক বিশাল অহঙ্কার বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ। তিনি ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজেলার কামারখালী ইউনিয়নের মধুমতি নদীর তীরে অবস্থিত বর্তমান রউফনগরে (সালামতপুর) এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৩ সালে। বাবা মরহুম মুন্সী মেহেদী হোসেন, মা মকিদুন্নেছা। বাবা-মা’র একমাত্র পুত্রসন্তান ছিলেন তিনি। বাবা মুন্সী মেহেদী হোসেন ছিলেন স্থানীয় এক মসজিদের ইমাম। তার স্বল্প আয়েই চলত তাদের সংসার। অভাব-অনটন আর বাল্যকালে বাবা মারা যাওয়ায় উচ্চ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন তিনি। ফলে ১৯৬৩ সালের ৮ মে তত্কালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসে ভর্তি হন। ১৯৭১ সালে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় চট্টগ্রামে ১১ নং উইংয়ে চাকরিরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি গ্রামে ছুটে আসেন। মায়ের দোয়া নিয়ে ছোটবোনদের সঙ্গে দেখা করে চাকরিতে ফিরে যান এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানীতে যোগদান করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। পাক বাহিনীর বর্বরতা ও চরম নির্মমতার প্রতিশোধ নিতে রউফ সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ঝাঁপিয়ে পড়েন শত্রুসেনাদের ওপর। যুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ২০ এপ্রিল পাক হানাদারদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে যুদ্ধরত অবস্থায় বর্তমানে রাঙামাটি জেলার নানিয়ারচর থানার বুড়িঘাটে চিংড়িখাল নামক স্থানে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ শহীদ হন।
:
হামিদুরের তিন ভাই কষ্টে আছেন
--আহসান কবীর যশোর
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের মা কায়দাছুন্নেসা মারা গেছেন কয়েক বছর হলো। এখন বেঁচে আছেন তার তিন ভাই ও তাদের স্ত্রী-সন্তানরা। এই তিনটি পরিবারের সম্বল মাত্র পাঁচ বিঘা চাষযোগ্য জমি আর নিম্নপদের একটি সরকারি চাকরি। বড় ভাই হামজুর রহমান সরকারের মত্স্য বিভাগে গার্ডের চাকরি করেন। অন্য দু’ভাই শুকুর আলী ও ফজলুর রহমানের আয়ের সুনির্দিষ্ট উত্স নেই। পারিতোষিক হিসেবে প্রাপ্য সাড়ে ১৪ হাজার টাকা ভাগাভাগি করে নেন তিন ভাই। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুরের ভাই ফজলুর রহমান দুঃখের সঙ্গে বললেন, এত কম টাকায় কীভাবে জীবনযাপন করতে পারে তিনটি পরিবার?
ফজলুর রহমান জানান, ১৯৮১ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার তাদের বসতবাড়ি তৈরি করে দেয়। ঠিকাদার বাড়িটির নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম করে। ফলে অল্পদিনেই বাড়িটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। নির্মাণের পর গত ২৮ বছরে সরকারিভাবে একবার এবং তারা নিজেরা দু’বার বাড়িটি সংস্কার করেছেন। তবু বাড়িটি বসবাসের উপযোগী হচ্ছে না। তিনি জানান, রাজধানীতে প্লট দিল না কোনো সরকার। বীরশ্রেষ্ঠের গ্রামটি নামেই হামিদনগর, খাতাকলমে এখনও খোর্দখালিশপুর। গ্রামটির রাস্তাঘাটের জীর্ণদশা। বহু তদবির সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এদিকে নজর দেয়নি। অথচ বীরশ্রেষ্ঠের গ্রাম হওয়ায় বহু ভিআইপির আগমন ঘটে গ্রামটিতে।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুরের নামে ঝিনাইদহে একটি স্টেডিয়াম রয়েছে। গ্রামে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে রয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। খালিশপুর বাজারের কাছেই গ্রামবাসীরা একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন বীরশ্রেষ্ঠের নামে। এ কলেজটিকে টিকিয়ে রাখতে বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে। কিন্তু এখনও কলেজটির সব শিক্ষকের বেতন হয়নি। এ কলেজেই সরকারিভাবে গড়ে তোলা হয়েছে গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুরের পোষ্যদের দাবি, সাতজন বীরশ্রেষ্ঠর শাহাদতবার্ষিকী রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হোক। বীরশ্রেষ্ঠদের জন্মস্থানে ধর্মীয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাকা রাস্তা নির্মাণ ও বিদ্যুত্ সংযোগ দেয়া হোক।
:
দৈন্য আর চিকিত্সার অভাবে ধুঁকছেন মোস্তফা কামালের মা মালেকা বেগম
--জি. এম. বাবর আলী/হুমায়ুন কবির, বরিশাল
সীমাহীন দৈন্য আর মাথা গোঁজার উপযুক্ত ঘরের অভাব এবং আর্থিক সঙ্কটে সুচিকিত্সা থেকে বঞ্চিত হয়ে বেঁচে আছেন দেশের সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন মোস্তফা কামালের মা মালেকা বেগম। স্বাধীনতা যুদ্ধে সন্তানকে হারানোর পর ৩৮ বছর ধরে নির্ধারিত কয়েকটি দিন সরকার আর স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ তাদের খোঁজ নিলেও অবসান হয়নি মানবেতর জীবনযাপনের। ছেলের মৃত্যুর পর তার পরিবারের কেউ সরকারি চাকরি পাবে এমন আশ্বাস শুনে আসছেন ৩৮ বছর ধরে। কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি তা। এ ক্ষোভ নিয়েই হয়তো বিদায় নিতে হবে তাকে।
দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান মোস্তফা কামাল ১৯৪৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভোলার দৌলতখান উপজেলার হাজিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা সেনাবাহিনীর হাবিলদার হাবিবুর রহমান চাকরিতে থাকা অবস্থায় ছেলেকেও উদ্বুদ্ধ করেন সেনাসদস্য হতে। বাবার উত্সাহ আর অনুপ্রেরণায় মাত্র ২০ বছর বয়সে ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। ’৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তানি বাহিনী থেকে বের হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন স্বাধীনতা যুদ্ধে। সাহসী এ সৈনিক ১৮ মার্চ পর্যন্ত যুদ্ধ করেন পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে। অবশেষে ২ নং প্লাটুনে থাকা অবস্থায় ’৭১ এর ১৮ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়ার গঙ্গা সাগরের দরুইন গ্রামে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন এ বীর মুক্তিযোদ্ধা। আখাউড়ার দরুইন গ্রামে তাকে সমাহিত করা হয়।
বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের মৃত্যুর পর থেকে শুরু হয় এ পরিবারটির অভাব-অনটনের জীবন। এরই মধ্যে মেঘনার ভাঙনে বিলীন হয় হাজিপুর গ্রামের বসতবাড়িটি। কিন্তু বাবা বেঁচে থাকায় শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরেন মাতা মালেকা বেগম। ২০০৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ৯০ বছর বয়সে মারা যান এ বীর মুক্তিযোদ্ধার বাবা হাবিলদার হাবিবুর রহমান।
১৯৭১ সালে সন্তান আর ২০০৫ সালে স্বামীকে হারিয়ে একেবারেই অসহায় হয়ে পড়েন বীর মাতা মালেকা বেগম। জীবিত একমাত্র ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান, তিন মেয়ে জাহানারা, হোসনেআরা ও হাসনেয়ারা এবং নাতি-নাতনিদের নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। দীর্ঘদিন ধরে এ পরিবারটি শুনে আসছে বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবারের বেঁচে থাকা সদস্যদের সরকারি চাকরি দেয়া হবে। কিন্তু ৩৮ বছরে তাদের পরিবারের কারও ভাগ্যে জোটেনি সোনার হরিণ নামের এ চাকরিটি।
বীর মাতা মালেকা বেগম জানান, সন্তান আর স্বামী হারানোর পর বেঁচে থাকার জন্য তাকে শুরু করতে হয় তৃতীয় যুদ্ধ। ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান আর নাতি-নাতনি নিয়ে ৬ সদস্যের পরিবার তার। বছরের বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে দাওয়াত করা হয় তাকে। তারপর সারা বছর খোঁজ নেয়ার থাকে না কেউ। এ নিয়ে ক্ষোভের অন্ত নেই সত্তরোর্ধ্ব মালেকা বেগমের। উপার্জনক্ষম একমাত্র সন্তান মোস্তাফিজুর রহমান দীর্ঘদিন ভাইয়ের নামে প্রতিষ্ঠিত বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে মাস্টার রোলে চাকরি করেছেন। সরকারিকরণের আশায় সামান্য বেতন পেয়েও অনেক দিন করেছেন চাকরিটি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভাগ্যে জোটেনি সরকারিকরণ। অবশেষে এক সময়ে তিনি ছেড়ে আসেন সেই চাকরি।
ভোলার বসতবাড়িটি মেঘনায় বিলীন হলে ১৯৮২ সালে সরকারের পক্ষ থেকে ভোলা সদর উপজেলার আলীনগরের মৌটুপি গ্রামে ছোট্ট একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। কিন্তু সংস্কারের অভাবে সে ঘরটির বেহাল দশা। নির্দিষ্ট আয়ের ব্যবস্থা না থাকায় এ পরিবার সীমাহীন দুর্দশায় আছে। আর্থিক সঙ্কটে উপযুক্ত চিকিত্সা হচ্ছে না মালেকা বেগমের। সরকারের পক্ষ থেকে মাসিক যে সম্মানী দেয়া হয়, তা দিয়ে তার চিকিত্সাও চলে না বলে ক্ষোভ তার।
:
অবহেলা আর বঞ্চনার কষ্ট সইছে রুহুল আমিনের পরিবার
--মজুমদার নাজিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম ব্যুরো
অবহেলা আর বঞ্চনার কষ্ট বুকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোহাম্মদ রুহুল আমিনের পরিবারের সদস্যরা। তাদের প্রত্যাশা আজও পূরণ হয়নি। এই প্রত্যাশা কোনো বৈষয়িক নয়, দেশের মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যাশা। লাখো শহীদের রক্তে দেশ স্বাধীন হলেও দেশের মানুষ এখনও স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল ভোগ করতে পারছেন না বলে বিশ্বাস রুহুল আমিনের পরিবারের সদস্যদের।
গত চারদলীয় জোট সরকারের সময় চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের নামকরণ করা হয়েছিল বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের নামে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার ক’মাসের মধ্যেই তার নাম বদলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর নামে স্টেডিয়ামটির নামকরণ করে। এই অবহেলার কষ্ট কোনোভাবেই সইতে পারছেন না বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের পরিবারের সদস্যরা। তাদের প্রশ্ন, কেন এক সরকার তার নামে স্টেডিয়াম করল আর কেনই বা অন্য সরকার তার নাম বাদ দিল? তিনি তো রাজনীতি করতেন না। তাহলে তার নাম নিয়ে কেন চলছে নোংরা রাজনীতি? তারা মুক্তিযোদ্ধাদের দলমতের ঊর্ধ্বে রেখে যথাযথ মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন। আর যেন কোনো মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের প্রতি অবহেলা দেখানো না হয়, তার জন্য সরকার ও দেশের মানুষকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে
-
মহান বিজয় দিবস


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


