হাজার বছরেও এমন অভিজ্ঞতা হয় না
ফয়েজ আহ্মদ
গত প্রায় চল্লিশ বছর ধরে আমরা ডিসেম্বর মাসকে ভিন্ন প্রেক্ষিতে দেখি। আমাদের শৌর্য-বীর্য, জাতিগত গৌরব আর বীরত্ব কাহিনীর সঙ্গে এই মাস জড়িত। একটা বিশেষ দৃষ্টিকোণ ছাড়া আমরা এই মাসকে বিশ্লেষণ করতে পারি না। আমাদের জীবনের সঙ্গে ডিসেম্বর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা নিয়ে জড়িত হয়ে আছে।
একটা জাতি যে গৌরব পাঁচশ’ বছরেও অর্জন করতে পারে না, আমরা তা এই ডিসেম্বর মাসে অর্জন করেছি। পাঁচশ’ বছরেও পৃথিবীর কোনো জাতি বা দেশ, এমন গৌরবের মাস অর্জন করতে পারেনি। আমাদের দেশের ভবিষ্যত্ কোনো নাগরিক একাত্তরের ডিসেম্বরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত হতে পারবে না। সেই ডিসেম্বর আজ আমাদের একটি গৌরবের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে। এর গন্ধ, স্বাদ; এর পরিধি, প্রেক্ষিত; এর ইতিহাস, ইতিবৃত্ত এবং এর বোধ, বোধোদয় আর এমনভাবে কোনো দিন পাওয়া যাবে না। আমরা সাড়ে সাত কোটি মানুষ সে সময় যেভাবে এই ডিসেম্বরের গন্ধ ও স্বাদ উপলব্ধি করেছি, তার সেই স্বাদ আর কোনোদিন তেমন করে পাওয়া যাবে না। পরবর্তী সময়ে যারা জন্মগ্রহণ করেছে, তারা আমাদের কাছ থেকে ডিসেম্বরের গৌরবকে অর্জন করবে; কিন্তু একাত্তরের সেই ডিসেম্বর আমরা তাদের কোনোদিনই দিতে পারব না। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে শৌর্য-বীর্য, বীরত্ব, আশা-আকাঙ্ক্ষা আর চিরন্তন গৌরব—যা অদ্বিতীয়। এই মাসেই আমাদের দেশের জাতীয় গৌরবোজ্জ্বল বিজয়। শত্রুর বিপক্ষে আমাদের সেদিন যেভাবে দাঁড় করানো হয়েছে, সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠিক একইভাবে আর হবে না। কোনো জাতির ইতিহাস হচ্ছে পদ্মার পানির মতো প্রবহমান। কোনোদিন সে আর ফিরে আসে না। কিন্তু পথিমধ্যে সেই পানি যে ফল ও ফসলের উত্পাদন ঘটায়, তাকেই মানুষ আলিঙ্গন করে পদ্মার স্বাদ আহরণ করে। আমরা সেইভাবে ডিসেম্বরকে আলিঙ্গন করেছি; আপন সত্তার সঙ্গে বিলীন করেছি। আমরা সেই ডিসেম্বরকে সূর্যের মতো করে তুলে রেখেছি।
আমি এবং আমার পরম বন্ধু এম আর আখতার মুকুলের জীবনে এই ডিসেম্বরের স্বাদ আলাদা। আমরা দু’জনেই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম জীবন দান করার জন্য। কিন্তু নয় মাস আমরা খুঁজে বেড়িয়েছি তেমন এক শত্রুকে, যার পরিসমাপ্তি হয়েছে রণক্ষেত্রে—তাকে আমরা কোনোদিন পাইনি। আমরা পেয়েছি এক গৌরবময়, দুরন্ত, দুঃসাহসী দিনের সন্ধান। আমরা সেই গৌরবময় দিনটিকে খোঁজার জন্য রাজপথে ঘুরেছি, রণক্ষেত্রে গিয়েছি।
এই ডিসেম্বর আমাদের জীবনের সঙ্গে এক সূত্রে গ্রথিত হয়ে রয়েছে। একাত্তরে এই মাসের শুরু থেকেই আমরা জানতাম, বিজয়ের গৌরবময় জীবনকে আমরা আলিঙ্গন এই মাসেই করব। আমি খুলনার মুক্তাঞ্চলে এই রিপোর্টের সন্ধানে গিয়েছিলাম। বিজয়ীদের রণক্ষেত্রে গৌরবের দিনটিকে খুঁজে বেড়িয়েছি। আমি যশোর মুক্তাঞ্চলে ৯ ডিসেম্বরও মন্ত্রিসভার সঙ্গে জীবনের গৌরবকে খুঁজে বেরিয়েছি। আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তির স্বাদ আমরা যশোরেই পেয়েছিলাম। সেই সময়েই পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের দিন প্রায় ধার্য হয়ে আসছিল। আমাদের বলা হয়েছিল যে, আমরা প্রেস প্রতিনিধি হিসেবে কলকাতা থেকে ঢাকায় পৌঁছাব পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের আগে। সে মতে আমরা তাদের নির্দেশে ক্যামোফ্লেজ পোশাক তৈরি করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত এক রাতে খবর পেলাম পরদিন ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। আমাদের প্রতি নির্দেশ ছিল, সকাল আটটার মধ্যে যেন ভারতীয় বাহিনীর কলকাতার ডালহৌসি তথ্যকেন্দ্রে উপস্থিত থাকি। দুই বন্ধু সেই নির্দেশ মোতাবেক ডালহৌসি স্কয়ারের চৌদ্দতলা বিল্ডিংয়ে উপস্থিত হলাম। ১৬ ডিসেম্বর সকাল আটটায় (একাত্তর সালে)। আমরা এই দিনটিকে জীবনের পরম গৌরবের তারিখ হিসেবে চিহ্নিত করি। পাকিস্তানি বাহিনী বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী ১৪ ডিসেম্বরে অনানুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেছে বলে আমাদের জানা ছিল। ডালহৌসি স্কয়ারের অট্টালিকায় ভারতীয় বাহিনীর তথ্যকেন্দ্র ছিল। এখানে সকাল নয়টার মধ্যে স্থানীয়, বিদেশি প্রায় এক হাজার ফটোগ্রাফার ও সাংবাদিক উপস্থিত হয়েছিলেন ঢাকায় আসার জন্য। আমাদের ধারণা ছিল, সকাল দশটার ভেতরে যদি আমরা ভারতের সাহায্যে বিমানযোগে ঢাকা পৌঁছুতে পারি, তবে নিশ্চিতভাবে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের সময় উপস্থিত থাকতে পারব। এমন একটি ক্ষণের কথা মনে করে আমরা তখন শিহরিত হচ্ছিলাম। সমগ্র ভারতের বিভিন্ন পত্রিকার সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার তখন উপস্থিত। বিশ্বের আরও শতাধিক দেশের প্রতিনিধিরাও তখন আমাদের সঙ্গে উত্কণ্ঠায় নিমজ্জিত। প্রত্যেকে ঢাকার চিন্তায় নিমগ্ন। কারও অন্য কিছু চিন্তা করার সময় ছিল না।
এমনি এক অদ্ভুত শিহরনমূলক সময়ে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিলাম। ঢাকা থেকে কোনো সুস্পষ্ট বার্তা আমরা তখনও পাচ্ছিলাম না। সামরিক কর্তৃপক্ষের সংযোগ অবশ্য প্রতি মুহূর্তেই অব্যাহত ছিল।
দিন গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল। তারপর অপরাহ্নের মুহূর্তগুলো আমরা শিহরনের মধ্যে অতিবাহিত করি। ঢাকা থেকে কোনো সুসংবাদ আমাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। কয়েকজন পশ্চিমা সাংবাদিক ট্যাক্সি ভাড়া করে ঢাকার দিকে রওনা দেন। এই যাত্রায় ভারতীয় বাহিনীর কোনো সম্মতি ছিল না। অনেকেই ইতোমধ্যে ভারত পেরিয়ে যশোর বর্ডারের কাছে পৌঁছে গেছেন। আমি আর মুকুল অসহায় অবস্থায় অফিসের কাউন্টারগুলোতে খবর নিয়ে বেড়াচ্ছি—ঢাকায় যাওয়ার আহ্বান আসল কী?
আমরা বেদনা ও আর্তনাদের মধ্যে খবর পেলাম, বিকেল ৪টায় ঢাকার সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে আত্মসমর্পণ হবে। জেনারেল নিয়াজীকে সেখানেই আনা হবে। এমন পুষ্পাশ্রিত খবর আর হয় না! কিন্তু আমরা ছিলাম অসহায়। শত শত সাংবাদিক, ফটোগ্রাফারের ঢাকায় যাওয়ার পথ রুদ্ধ। ভারতীয় সৈনিক কর্তৃপক্ষ আমাদের জানালেন, ঢাকা থেকে তারা আমাদের পাঠানোর কোনো সঙ্কেত পাননি। তাছাড়া ঢাকার প্রতিটি পথ অস্ত্রকীর্ণ। কোনো অজানা পথেই গাড়ি চালানো সম্ভব নয়। তাছাড়া বিমানে ঢাকার বিমানবন্দরে অবতরণও সম্ভব হয়ে উঠবে না। কারণ, মিত্র পক্ষেরই বোমাবর্ষণে ঢাকার তেজগাঁও এয়ারপোর্ট ক্ষত-বিক্ষত। এমনকি কোনো ‘স্টল’ বিমানের পক্ষেও ঢাকাতে অবতরণ সম্ভব নয়। তাছাড়া ঢাকাতে আপনাদের কোথায় রাখব তাও জানি না। রাজধানী ঢাকা এই মুহূর্তে রণক্ষেত্রের মধ্যমণি। সেখানে গুপ্ত হত্যাকারীদের সংখ্যা অবিশ্বাস্যভাবে অনেক বেশি।
ভারতীয় সেনা কর্তৃপক্ষ আমাদের এই বক্তব্য দেয়ার পর বিকাল ৪টায় কলকাতায় তারা আমাদের জানালেন—এইমাত্র ঢাকায় আত্মসমর্পণ হয়েছে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি আমরা ধরে রাখতে চেয়েছিলাম, পারিনি। তা সম্ভব হয়নি। কারণ, সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানের প্রধান সেনাপতি জেনারেল নিয়াজীর আত্মসমর্পণের সময় কোনো সাংবাদিক উপস্থিত থাকতে পারেননি। আত্মসমর্পণের সব কাহিনী আমরা পরে জেনারেলদের কাছ থেকে পাই।
পরের দিন বহুসংখ্যক বিদেশি সাংবাদিক নিজস্ব গাড়িতে করে কলকাতা থেকে ঢাকায় পৌঁছান। তারাই দেশ-বিদেশে আত্মসমর্পণ ও আনুষঙ্গিক খবর পরিবেশন করেন। আমরা দুই বন্ধু, মুকুল ও আমি অসহায় অবস্থায় সেই সন্ধ্যায় কলকাতার পার্ক সার্কাসের এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে উঠি।
১৬ তারিখ থেকে আমরা প্রতিদিন ঢাকা ও অন্যান্য যুদ্ধক্ষেত্রের সংবাদ সংগ্রহ করতে থাকি। আমি তখন পার্ক সার্কাসের পার্ক এভিনিউতে ডা. নন্দীর এক আত্মীয়ের বাড়িতে থাকি। সেখান থেকেও ঢাকার অনেক সংবাদ আমি সংগ্রহ করেছিলাম। প্রায় এক সপ্তাহ যাওয়ার পর ২১ ডিসেম্বর রাত ১২টায় আমি একটা টেলিফোন পাই। আমাকে বলা হয় ভোর ৪টার সময় যেন ঢাকায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকি। আমার জন্য গাড়ি আসবে এবং তারা আরও জানান যে, মুজিবনগর সরকারের সেক্রেটারিয়েট থেকে আমাকে এই সংবাদ দেয়া হলো।
সেই রাতে আর ঘুম হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ বিজয়ী বাংলাদেশে আমি সকালে প্রত্যাবর্তন করব—এই কথা ভেবেও শিহরিত হতে থাকি। ভোর ৪টায় ঠিকই একটা জিপ এলো পার্ক সার্কাসের সেই বাড়িতে। জিপের শব্দে আমি বেরিয়ে এলাম। আবার সেই জিপ চলল দ্রুতগতিতে কলকাতার রাজপথে আমাকে নিয়ে। এই জিপটা শত্রুপক্ষেরও হতে পারত; কিন্তু নয়, আমার জন্য সরকারের জিপ এসেছিল। ২২ ডিসেম্বর ভোর ৬টায় আমি দমদম এয়ারপোর্টে কুয়াশার মধ্যে পৌঁছাই। ওখানে গিয়ে দেখি আমার বন্ধু ও সহকর্মীরা ঢাকায় যাওয়ার জন্য ইতোমধ্যে পৌঁছে গেছেন। ওখানে বন্ধু মুকুল, কামাল লোহানী, মূসা, রেডিওর আশফাক, বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ সমর দাস ইতোমধ্যেই এসে গেছেন। আমরা সবশুদ্ধ সরকারের লিস্ট অনুযায়ী ১১ জন। এই ১১ জনকে স্বাধীন বাংলাদেশে আসার জন্য সরকার নির্বাচিত করে। কুয়াশার কারণে ঢাকাগামী বিমানটির ফ্লাইট বিলম্বিত হয়। বেলা প্রায় ১০টার দিকে আমাদের বিমান প্রস্তুতি নেয় ঢাকায় আসার জন্য।
দমদম বিমানবন্দরে প্রচ্ছন্ন কুয়াশার মধ্যে আমাদের যেই বিমানে ওঠার জন্য তাগিদ দেয়া হলো, সেটি ছিল ‘স্টল বিমান’— যার পেছন দিক থেকে যাত্রীদের উঠতে ও নামতে হয়। প্রধানত যুদ্ধক্ষেত্রে মাল টানার জন্য এই বিমান ব্যবহার করা হয়। বিমানের ভেতরে আমরা কয়েক বস্তা আলু ও চাল পেলাম। বসার কোনো আসন ছিল না। সাময়িক দ্রব্যাদির উপর বসেই আমরা ঢাকায় আসি।
এই বিমানটি ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে সকাল দশটার পরে এসে পৌঁছায়। প্রথম আমরা কাউকে দেখিনি বিমানবন্দরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করতে। বিমানের পেছন দিক দিয়ে আমরা নেমে এলাম রানওয়েতে। অকস্মাত্ তিন/চারজন লোক আমাদের সামনে উপস্থিত হলেন। তার মধ্যে দু’জনই অপরিচিত ফটোগ্রাফার, আরেকজন ছিলেন বন্ধু, ছোট একটি বিজ্ঞাপন কোম্পানির সালাম। আমরা তাদের আলিঙ্গনে আড়ষ্ট হয়ে গেলাম।
বিমানবন্দরে বুঝতে পারলাম, ১৬ ডিসেম্বরে কেন আমাদের আনা সম্ভব হয়নি। একটি মাত্র রানওয়েকে সারাই করা হয়েছে এই ক’দিনে, তাও শর্টল্যান্ডিং বিমান নামতে পারে। রেগুলার বিমান নয়। যুদ্ধের সময় ১২ দিনব্যাপী মিত্রপক্ষ ভারতের বিমানবাহিনী এই বিমানবন্দরে বোমা নিক্ষেপ করে। পাঁচশ’ পাউন্ড বোমায় সমগ্র বিমানবন্দর ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। কয়েকদিন দিবা-রাত্রি কংক্রিট ঢালার পর বিমানবন্দরের একটি অংশ অনেকটা ব্যবহারযোগ্য হয়। তাতেই আমরা নেমে আসি। এই বিমানবন্দরে যুদ্ধের সময় পাঁচ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল। মিত্রপক্ষের বোমাতেই ঢাকার বিমানবন্দর বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল।
২২ ডিসেম্বর এই স্টল বিমানটি চারবার কলকাতা থেকে ঢাকায় যাওয়া-আসা করে। আমাদের পরবর্তী সময়ে সেক্রেটারি ও অন্যদের আনা হয়। সন্ধ্যার আগে কলকাতা থেকে বহন করা হয় পূর্ণ মন্ত্রিসভা। এটাই ছিল শেষ ফ্লাইট।
অনুলিখন : হাসান শান্তনু
একটা জাতি যে গৌরব পাঁচশ’ বছরেও অর্জন করতে পারে না, আমরা তা এই ডিসেম্বর মাসে অর্জন করেছি। পাঁচশ’ বছরেও পৃথিবীর কোনো জাতি বা দেশ, এমন গৌরবের মাস অর্জন করতে পারেনি। আমাদের দেশের ভবিষ্যত্ কোনো নাগরিক একাত্তরের ডিসেম্বরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত হতে পারবে না। সেই ডিসেম্বর আজ আমাদের একটি গৌরবের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে। এর গন্ধ, স্বাদ; এর পরিধি, প্রেক্ষিত; এর ইতিহাস, ইতিবৃত্ত এবং এর বোধ, বোধোদয় আর এমনভাবে কোনো দিন পাওয়া যাবে না। আমরা সাড়ে সাত কোটি মানুষ সে সময় যেভাবে এই ডিসেম্বরের গন্ধ ও স্বাদ উপলব্ধি করেছি, তার সেই স্বাদ আর কোনোদিন তেমন করে পাওয়া যাবে না। পরবর্তী সময়ে যারা জন্মগ্রহণ করেছে, তারা আমাদের কাছ থেকে ডিসেম্বরের গৌরবকে অর্জন করবে; কিন্তু একাত্তরের সেই ডিসেম্বর আমরা তাদের কোনোদিনই দিতে পারব না। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে শৌর্য-বীর্য, বীরত্ব, আশা-আকাঙ্ক্ষা আর চিরন্তন গৌরব—যা অদ্বিতীয়। এই মাসেই আমাদের দেশের জাতীয় গৌরবোজ্জ্বল বিজয়। শত্রুর বিপক্ষে আমাদের সেদিন যেভাবে দাঁড় করানো হয়েছে, সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠিক একইভাবে আর হবে না। কোনো জাতির ইতিহাস হচ্ছে পদ্মার পানির মতো প্রবহমান। কোনোদিন সে আর ফিরে আসে না। কিন্তু পথিমধ্যে সেই পানি যে ফল ও ফসলের উত্পাদন ঘটায়, তাকেই মানুষ আলিঙ্গন করে পদ্মার স্বাদ আহরণ করে। আমরা সেইভাবে ডিসেম্বরকে আলিঙ্গন করেছি; আপন সত্তার সঙ্গে বিলীন করেছি। আমরা সেই ডিসেম্বরকে সূর্যের মতো করে তুলে রেখেছি।
আমি এবং আমার পরম বন্ধু এম আর আখতার মুকুলের জীবনে এই ডিসেম্বরের স্বাদ আলাদা। আমরা দু’জনেই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম জীবন দান করার জন্য। কিন্তু নয় মাস আমরা খুঁজে বেড়িয়েছি তেমন এক শত্রুকে, যার পরিসমাপ্তি হয়েছে রণক্ষেত্রে—তাকে আমরা কোনোদিন পাইনি। আমরা পেয়েছি এক গৌরবময়, দুরন্ত, দুঃসাহসী দিনের সন্ধান। আমরা সেই গৌরবময় দিনটিকে খোঁজার জন্য রাজপথে ঘুরেছি, রণক্ষেত্রে গিয়েছি।
এই ডিসেম্বর আমাদের জীবনের সঙ্গে এক সূত্রে গ্রথিত হয়ে রয়েছে। একাত্তরে এই মাসের শুরু থেকেই আমরা জানতাম, বিজয়ের গৌরবময় জীবনকে আমরা আলিঙ্গন এই মাসেই করব। আমি খুলনার মুক্তাঞ্চলে এই রিপোর্টের সন্ধানে গিয়েছিলাম। বিজয়ীদের রণক্ষেত্রে গৌরবের দিনটিকে খুঁজে বেড়িয়েছি। আমি যশোর মুক্তাঞ্চলে ৯ ডিসেম্বরও মন্ত্রিসভার সঙ্গে জীবনের গৌরবকে খুঁজে বেরিয়েছি। আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তির স্বাদ আমরা যশোরেই পেয়েছিলাম। সেই সময়েই পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের দিন প্রায় ধার্য হয়ে আসছিল। আমাদের বলা হয়েছিল যে, আমরা প্রেস প্রতিনিধি হিসেবে কলকাতা থেকে ঢাকায় পৌঁছাব পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের আগে। সে মতে আমরা তাদের নির্দেশে ক্যামোফ্লেজ পোশাক তৈরি করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত এক রাতে খবর পেলাম পরদিন ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। আমাদের প্রতি নির্দেশ ছিল, সকাল আটটার মধ্যে যেন ভারতীয় বাহিনীর কলকাতার ডালহৌসি তথ্যকেন্দ্রে উপস্থিত থাকি। দুই বন্ধু সেই নির্দেশ মোতাবেক ডালহৌসি স্কয়ারের চৌদ্দতলা বিল্ডিংয়ে উপস্থিত হলাম। ১৬ ডিসেম্বর সকাল আটটায় (একাত্তর সালে)। আমরা এই দিনটিকে জীবনের পরম গৌরবের তারিখ হিসেবে চিহ্নিত করি। পাকিস্তানি বাহিনী বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী ১৪ ডিসেম্বরে অনানুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেছে বলে আমাদের জানা ছিল। ডালহৌসি স্কয়ারের অট্টালিকায় ভারতীয় বাহিনীর তথ্যকেন্দ্র ছিল। এখানে সকাল নয়টার মধ্যে স্থানীয়, বিদেশি প্রায় এক হাজার ফটোগ্রাফার ও সাংবাদিক উপস্থিত হয়েছিলেন ঢাকায় আসার জন্য। আমাদের ধারণা ছিল, সকাল দশটার ভেতরে যদি আমরা ভারতের সাহায্যে বিমানযোগে ঢাকা পৌঁছুতে পারি, তবে নিশ্চিতভাবে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের সময় উপস্থিত থাকতে পারব। এমন একটি ক্ষণের কথা মনে করে আমরা তখন শিহরিত হচ্ছিলাম। সমগ্র ভারতের বিভিন্ন পত্রিকার সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার তখন উপস্থিত। বিশ্বের আরও শতাধিক দেশের প্রতিনিধিরাও তখন আমাদের সঙ্গে উত্কণ্ঠায় নিমজ্জিত। প্রত্যেকে ঢাকার চিন্তায় নিমগ্ন। কারও অন্য কিছু চিন্তা করার সময় ছিল না।
এমনি এক অদ্ভুত শিহরনমূলক সময়ে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিলাম। ঢাকা থেকে কোনো সুস্পষ্ট বার্তা আমরা তখনও পাচ্ছিলাম না। সামরিক কর্তৃপক্ষের সংযোগ অবশ্য প্রতি মুহূর্তেই অব্যাহত ছিল।
দিন গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল। তারপর অপরাহ্নের মুহূর্তগুলো আমরা শিহরনের মধ্যে অতিবাহিত করি। ঢাকা থেকে কোনো সুসংবাদ আমাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। কয়েকজন পশ্চিমা সাংবাদিক ট্যাক্সি ভাড়া করে ঢাকার দিকে রওনা দেন। এই যাত্রায় ভারতীয় বাহিনীর কোনো সম্মতি ছিল না। অনেকেই ইতোমধ্যে ভারত পেরিয়ে যশোর বর্ডারের কাছে পৌঁছে গেছেন। আমি আর মুকুল অসহায় অবস্থায় অফিসের কাউন্টারগুলোতে খবর নিয়ে বেড়াচ্ছি—ঢাকায় যাওয়ার আহ্বান আসল কী?
আমরা বেদনা ও আর্তনাদের মধ্যে খবর পেলাম, বিকেল ৪টায় ঢাকার সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে আত্মসমর্পণ হবে। জেনারেল নিয়াজীকে সেখানেই আনা হবে। এমন পুষ্পাশ্রিত খবর আর হয় না! কিন্তু আমরা ছিলাম অসহায়। শত শত সাংবাদিক, ফটোগ্রাফারের ঢাকায় যাওয়ার পথ রুদ্ধ। ভারতীয় সৈনিক কর্তৃপক্ষ আমাদের জানালেন, ঢাকা থেকে তারা আমাদের পাঠানোর কোনো সঙ্কেত পাননি। তাছাড়া ঢাকার প্রতিটি পথ অস্ত্রকীর্ণ। কোনো অজানা পথেই গাড়ি চালানো সম্ভব নয়। তাছাড়া বিমানে ঢাকার বিমানবন্দরে অবতরণও সম্ভব হয়ে উঠবে না। কারণ, মিত্র পক্ষেরই বোমাবর্ষণে ঢাকার তেজগাঁও এয়ারপোর্ট ক্ষত-বিক্ষত। এমনকি কোনো ‘স্টল’ বিমানের পক্ষেও ঢাকাতে অবতরণ সম্ভব নয়। তাছাড়া ঢাকাতে আপনাদের কোথায় রাখব তাও জানি না। রাজধানী ঢাকা এই মুহূর্তে রণক্ষেত্রের মধ্যমণি। সেখানে গুপ্ত হত্যাকারীদের সংখ্যা অবিশ্বাস্যভাবে অনেক বেশি।
ভারতীয় সেনা কর্তৃপক্ষ আমাদের এই বক্তব্য দেয়ার পর বিকাল ৪টায় কলকাতায় তারা আমাদের জানালেন—এইমাত্র ঢাকায় আত্মসমর্পণ হয়েছে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি আমরা ধরে রাখতে চেয়েছিলাম, পারিনি। তা সম্ভব হয়নি। কারণ, সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানের প্রধান সেনাপতি জেনারেল নিয়াজীর আত্মসমর্পণের সময় কোনো সাংবাদিক উপস্থিত থাকতে পারেননি। আত্মসমর্পণের সব কাহিনী আমরা পরে জেনারেলদের কাছ থেকে পাই।
পরের দিন বহুসংখ্যক বিদেশি সাংবাদিক নিজস্ব গাড়িতে করে কলকাতা থেকে ঢাকায় পৌঁছান। তারাই দেশ-বিদেশে আত্মসমর্পণ ও আনুষঙ্গিক খবর পরিবেশন করেন। আমরা দুই বন্ধু, মুকুল ও আমি অসহায় অবস্থায় সেই সন্ধ্যায় কলকাতার পার্ক সার্কাসের এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে উঠি।
১৬ তারিখ থেকে আমরা প্রতিদিন ঢাকা ও অন্যান্য যুদ্ধক্ষেত্রের সংবাদ সংগ্রহ করতে থাকি। আমি তখন পার্ক সার্কাসের পার্ক এভিনিউতে ডা. নন্দীর এক আত্মীয়ের বাড়িতে থাকি। সেখান থেকেও ঢাকার অনেক সংবাদ আমি সংগ্রহ করেছিলাম। প্রায় এক সপ্তাহ যাওয়ার পর ২১ ডিসেম্বর রাত ১২টায় আমি একটা টেলিফোন পাই। আমাকে বলা হয় ভোর ৪টার সময় যেন ঢাকায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকি। আমার জন্য গাড়ি আসবে এবং তারা আরও জানান যে, মুজিবনগর সরকারের সেক্রেটারিয়েট থেকে আমাকে এই সংবাদ দেয়া হলো।
সেই রাতে আর ঘুম হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ বিজয়ী বাংলাদেশে আমি সকালে প্রত্যাবর্তন করব—এই কথা ভেবেও শিহরিত হতে থাকি। ভোর ৪টায় ঠিকই একটা জিপ এলো পার্ক সার্কাসের সেই বাড়িতে। জিপের শব্দে আমি বেরিয়ে এলাম। আবার সেই জিপ চলল দ্রুতগতিতে কলকাতার রাজপথে আমাকে নিয়ে। এই জিপটা শত্রুপক্ষেরও হতে পারত; কিন্তু নয়, আমার জন্য সরকারের জিপ এসেছিল। ২২ ডিসেম্বর ভোর ৬টায় আমি দমদম এয়ারপোর্টে কুয়াশার মধ্যে পৌঁছাই। ওখানে গিয়ে দেখি আমার বন্ধু ও সহকর্মীরা ঢাকায় যাওয়ার জন্য ইতোমধ্যে পৌঁছে গেছেন। ওখানে বন্ধু মুকুল, কামাল লোহানী, মূসা, রেডিওর আশফাক, বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ সমর দাস ইতোমধ্যেই এসে গেছেন। আমরা সবশুদ্ধ সরকারের লিস্ট অনুযায়ী ১১ জন। এই ১১ জনকে স্বাধীন বাংলাদেশে আসার জন্য সরকার নির্বাচিত করে। কুয়াশার কারণে ঢাকাগামী বিমানটির ফ্লাইট বিলম্বিত হয়। বেলা প্রায় ১০টার দিকে আমাদের বিমান প্রস্তুতি নেয় ঢাকায় আসার জন্য।
দমদম বিমানবন্দরে প্রচ্ছন্ন কুয়াশার মধ্যে আমাদের যেই বিমানে ওঠার জন্য তাগিদ দেয়া হলো, সেটি ছিল ‘স্টল বিমান’— যার পেছন দিক থেকে যাত্রীদের উঠতে ও নামতে হয়। প্রধানত যুদ্ধক্ষেত্রে মাল টানার জন্য এই বিমান ব্যবহার করা হয়। বিমানের ভেতরে আমরা কয়েক বস্তা আলু ও চাল পেলাম। বসার কোনো আসন ছিল না। সাময়িক দ্রব্যাদির উপর বসেই আমরা ঢাকায় আসি।
এই বিমানটি ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে সকাল দশটার পরে এসে পৌঁছায়। প্রথম আমরা কাউকে দেখিনি বিমানবন্দরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করতে। বিমানের পেছন দিক দিয়ে আমরা নেমে এলাম রানওয়েতে। অকস্মাত্ তিন/চারজন লোক আমাদের সামনে উপস্থিত হলেন। তার মধ্যে দু’জনই অপরিচিত ফটোগ্রাফার, আরেকজন ছিলেন বন্ধু, ছোট একটি বিজ্ঞাপন কোম্পানির সালাম। আমরা তাদের আলিঙ্গনে আড়ষ্ট হয়ে গেলাম।
বিমানবন্দরে বুঝতে পারলাম, ১৬ ডিসেম্বরে কেন আমাদের আনা সম্ভব হয়নি। একটি মাত্র রানওয়েকে সারাই করা হয়েছে এই ক’দিনে, তাও শর্টল্যান্ডিং বিমান নামতে পারে। রেগুলার বিমান নয়। যুদ্ধের সময় ১২ দিনব্যাপী মিত্রপক্ষ ভারতের বিমানবাহিনী এই বিমানবন্দরে বোমা নিক্ষেপ করে। পাঁচশ’ পাউন্ড বোমায় সমগ্র বিমানবন্দর ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। কয়েকদিন দিবা-রাত্রি কংক্রিট ঢালার পর বিমানবন্দরের একটি অংশ অনেকটা ব্যবহারযোগ্য হয়। তাতেই আমরা নেমে আসি। এই বিমানবন্দরে যুদ্ধের সময় পাঁচ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল। মিত্রপক্ষের বোমাতেই ঢাকার বিমানবন্দর বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল।
২২ ডিসেম্বর এই স্টল বিমানটি চারবার কলকাতা থেকে ঢাকায় যাওয়া-আসা করে। আমাদের পরবর্তী সময়ে সেক্রেটারি ও অন্যদের আনা হয়। সন্ধ্যার আগে কলকাতা থেকে বহন করা হয় পূর্ণ মন্ত্রিসভা। এটাই ছিল শেষ ফ্লাইট।
অনুলিখন : হাসান শান্তনু
-
মহান বিজয় দিবস


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


