স্বাধীনতাযুদ্ধে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর রণনীতি ও রণকৌশল : জেনারেল ওসমানীর বিশেষ সাক্ষাত্কার
হেদায়েত হোসাইন মোরশেদ
প্রশ্ন : মুক্তিবাহিনী কীভাবে সংগঠিত হয়েছিল এবং ২৬ মার্চের পর থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা কোন ধরনের রণনীতি ও রণকৌশল অবলম্বন করেছিলেন?
জেনারেল ওসমানী : আপনাদের মনে আছে ২৬ মার্চ থেকে শত্রুকে প্রতিরোধ এবং বাঙালিকে দমনে শত্রুদের কার্যক্রম প্রতিরোধ করতে প্রথমে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বীর বাঙালি সৈনিক, সাবেক ইপিআরের বীর বাঙালিরা এবং আনসার, মোজাহেদ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর বীর জওয়ানরা। সঙ্গে সঙ্গে এদের সঙ্গে এসে যোগ দিয়েছিলেন যুবক ও ছাত্ররা।
সর্বপ্রথমে যুদ্ধ হয় নিয়মিত পদ্ধতিতে। আর এ পদ্ধতিতে যুদ্ধ চালু থাকে মে মাস পর্যন্ত। শত্রুকে ছাউনিতে যথাসম্ভব আবদ্ধ রাখা এবং যোগাযোগের কেন্দ্রগুলো তাকে কব্জা করতে না দেয়ার জন্য নিয়মিত বাহিনীর পদ্ধতিতে যুদ্ধ করা হয়েছিল। এ জন্য পদ্ধতি ছিল—যত বেশি বাধা সৃষ্টি করা যায়, তা সৃষ্টি করা হবে; যেসব ন্যাচারাল অবস্টাকল বা প্রতিবন্ধক রয়েছে তা রক্ষা করতে হবে এবং এর সঙ্গে সঙ্গে শত্রুর প্রান্তভাগে ও যোগাযোগের পথে আঘাত হানা হবে। মূলত এ পদ্ধতি ছিল নিয়মিত বাহিনীর পদ্ধতি। আর সংখ্যায় কম হওয়া সত্ত্বেও নিয়মিত বাহিনী অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে এ পদ্ধতিতে যুদ্ধ করে। এ পর্যায়ে বেশ কয়েকটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ হয়েছে। যথা : ভৈরব-আশুগঞ্জের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি ব্যাটালিয়নের বিরুদ্ধে শত্রু পুরো দুটো ব্রিগেড নিয়োগ করে। এখানে শত্রুবাহিনীকে চারদিন আটকে রাখা হয়।
তবে একটা বিষয়ে আমি আলোকপাত করতে চাই। নিয়মিত বাহিনীর যেটা স্বাভাবিক কৌশল, তা আমাদের সংখ্যা কম হওয়ার জন্য কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছিল। আমরা ছোট ছোট অংশে অর্থাত্ ছোট ছোট পেট্রল বা ছোট ছোট কোম্পানি প্লাটুনের অংশ দিয়ে শত্রুবাহিনীর তুলনামূলক অধিকসংখ্যক লোককে রুদ্ধ করে রাখি এবং সঙ্গে সঙ্গে শত্রুর ওপর আঘাতও হানতে থাকি। এভাবে চট্টগ্রাম ও অন্যান্য অঞ্চলে সর্বপ্রথমে যুদ্ধ শুরু হয়।
সে সময় আমার ও আমার অধিনায়কদের কাছে একথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, আমরা কেবল নিয়মিত বাহিনীর পদ্ধতিতে যুদ্ধ করে চলতে পারব না। কারণ আমাদের সংখ্যা তখন সর্বমোট ৫ ব্যাটালিয়ন। এ ছাড়া আমাদের সঙ্গে সাবেক ইপিআরের বাঙালি জওয়ান, আনসার, মোজাহেদ, পুলিশ ও যুবকরাও ছিলেন। যুবকদের অস্ত্র দেয়া একটু কঠিন হয়ে পড়েছিল। আমরা ভেতর থেকে যে অস্ত্রগুলো নিয়ে গিয়েছিলাম, সেগুলো দিয়ে তাদের তাড়াতাড়ি মোটামুটি প্রশিক্ষণ দিয়ে দাঁড় করেছিলাম। আমাদের বিরুদ্ধে তখন শত্রু বাহিনীর ছিল তিন-চারটি ডিভিশন। এই তিনটি ডিভিশনকেই নিম্নতম সংখ্যা হিসেবে ধরে নিয়ে আমরা দেখতে পেলাম, এদের প্রতিরোধ করা, ধ্বংস করা সোজা নয়, সম্ভবও নয়। তাই এপ্রিল মাস নাগাদ এটি আমার কাছে পরিষ্কার ছিল যে, আমাদের একটি বিরাট গণবাহিনী গড়ে তুলতে হবে। এই গণবাহিনী শত্রুপক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে নিউট্রালাইজ করবে এবং এই গণবাহিনী এরকম হতে হবে যেমন মানুষের পেটের অন্ত্রের মধ্যে একটি শক্তিশালী জীবাণু অন্ত্রকে ধ্বংস করে দিতে পারে, তেমনি ভেতর থেকে শক্তিশালী গেরিলা বাহিনী শত্রুর অস্ত্রগুলো বিনষ্ট করে দেবে। এ ছাড়া শত্রুকে ধ্বংস করা সম্ভব হবে না। কারণ তাদের সংখ্যা বেশি, তাদের অস্ত্র বেশি, তাদের বিমান রয়েছে, আর আমাদের কাছে বিমান ছিল না। এ ছাড়া সম্বল তাদের অনেক বেশি।
কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে এটাও পরিষ্কার ছিল যে বইয়ে লেখা ক্লাসিক্যাল গেরিলা ওয়ারফেয়ার করে দেশ মুক্ত করতে হলে বহুদিন যুদ্ধ করতে হবে এবং এরই মধ্যে আমাদের দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাদের সবচেয়ে বড় জনসম্পদ ধ্বংস হয়ে যাবে। আর বিশেষ কিছু উদ্ধার করার থাকবে না। সেজন্য এপ্রিল মাসের শেষের দিকে এটাও আমার কাছে পরিষ্কার ছিল যে আমাদের একটি নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে সময় কমানোর জন্য। সেই পদ্ধতিতে বড় একটি গেরিলা বাহিনী গঠন করে ভেতর থেকে শত্রুর আঁতে আঘাত করতে হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত বাহিনীর ছোট ছোট ইউনিট অর্থাত্ কোম্পানি বা প্লাটুন দিয়ে শত্রুকে আঘাত করতে হবে এবং বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য তাকে বাধ্য করতে হবে—সে যেন কনসেনট্রেটেড না থেকে ডিসপার্সড হয়। এই বিচ্ছিন্নতার ফলে তার সংখ্যাগরিষ্ঠতাজনিত শক্তি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সে ছোট ছোট ট্রলিতে তার ফোর্সকে কমিট করতে বাধ্য হবে এবং তখন গেরিলা পদ্ধতিতে তার যোগাযোগর রাস্তা, তার সংযোগের রাস্তা, তার রি-ইনফোর্সমেন্টের রাস্তা ধ্বংস করে তাকে ছোট ছোট পকেটে আইসোলেট বা বিচ্ছিন্ন করা যাবে।
এ জন্য আমার অনেক নিয়মিত বাহিনীরও প্রয়োজন ছিল। এ প্রয়োজনের কথা আমি মে মাসের শুরুতে সরকারকে লিখিতভাবে জানাই এবং এর ভিত্তিতে মিত্রদের কাছ থেকে সাহায্যও চাই। তাতে আমার উদ্দেশ্য ছিল (ক) কমপক্ষে ৬০ থেকে ৮০ হাজার গেরিলা সমন্বিত বাহিনী ও (খ) ২৫ হাজারের মতো নিয়মিত বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। এই বাহিনী সত্বর গড়ে তুলতে হবে। কারণ একদিকে গেরিলা পদ্ধতি এবং সঙ্গে সঙ্গে শত্রুকে নিয়মিত বাহিনীর কমান্ডো ধরনের রণকৌশল দিয়ে শক্তিকে বণ্টন করার জন্য বাধ্য করতে হবে, যাতে তার শক্তি হ্রাস পায়।
এ পদ্ধতি আমরা কাজে পরিণত করি। ক্রমেই গড়ে উঠল একটি বিরাট গণবাহিনী—গেরিলা বাহিনী। জুন মাসের শেষের দিক থেকে গেরিলাদের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। প্রথমে বিভিন্ন জায়গায় ঘাঁটি বানানো হয় এবং জুন মাসের শেষের দিক থেকে আমাদের গণবাহিনী বা গেরিলা বাহিনী অ্যাকশনে নামে। তবে জুলাই-আগস্ট মাসের আগ পর্যন্ত শত্রুবাহিনী তাদের ওপর গেরিলা বাহিনীর প্রবল চাপ বুঝতে পারেনি। যদিও শুরু থেকে আমরা কিছুসংখ্যক যুবককে ট্রেনিং দিয়ে ভেতরে পাঠিয়েছিলাম। তারা চট্টগ্রাম বন্দরেও গিয়েছিল, ঢাকায়ও এসেছিল। তবে গেরিলাদের শত্রুরা জুলাই মাস থেকে অনুভব করতে শুরু করে।
এর সঙ্গে সঙ্গে আরেক দিকে দৃষ্টি নিবব্ধ হয়। আমাদের নৌবাহিনী ছিল না। আমার কাছে নিয়মিত নৌবাহিনীর বহু অফিসার, ওয়ারেন্ট অফিসার ও নাবিক আসেন। ফ্রান্সের মতো জায়গা থেকে কয়েকজন পাকিস্তানের ডুবোজাহাজ ছেড়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন। আমি তাদের ভিত্তি করে এবং আমাদের বড় শক্তি যুব শক্তিকে ব্যবহার করে নৌকম্যান্ডো গঠন করি। এই নৌকমান্ডো জলপথে শত্রুর চলাচল ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।
১৯৭১ সালের ১৪ আগস্ট থেকে আমাদের এ নৌকমান্ডোদের আক্রমণ শুরু হয়। তারা যে বীরত্ব ও কৃতিত্ব দেখিয়েছে, পৃথিবীর ইতিহাসে তার নজির নেই। তারা মংলায় বহু জাহাজ ডুবায়। তারা শত্রুর জন্য বিভিন্ন অস্ত্র-সামান নিয়ে যেসব জাহাজ আসছিল চট্টগ্রামে সেগুলো ধ্বংস করে। এ জন্য অত্যন্ত দুঃসাহসের প্রয়োজন ছিল। তারা শত্রুর দুটো বন্দর অচল করে দেয় এবং নদীপথেও তাদের যাতায়াত বন্ধ করে দেয়।
আমাদের কৌশল অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে প্রমাণিত হয়। সেপ্টেম্বরের শেষনাগাদ শত্রু রক্তহীন হয়ে ওঠে। তার ২৫ হাজারের মতো সৈন্য বিনষ্ট হয়। বহু যানবাহনের লোকসান হয়। ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত শত্রুর এ অবস্থা দাঁড়ায় যে একজন বক্সার রিংয়ের দ্বিতীয় রাউন্ডে ক্লান্ত হয়ে ঘুরছে এবং একটা কড়া ঘুষি খেলে পড়ে যাবে—তার যোগাযোগের অবস্থা সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। যেভাবে আমার উদ্দেশ্য ছিল, সেভাবে বিভিন্ন জায়গায় তারা ছোট ছোট পকেট বানিয়েছিল। তারা কোটি কোটি টাকা খরচ করে রি-ইনফোর্স কংক্রিটের বাঙ্কার বানিয়েছিল। সেগুলোর মধ্যে তারা ঢুকেছিল। রাতের বেলা তো বেরোতো না-ই, দিনের বেলায়ও বেশিসংখ্যক লোক ছাড়া বেরোতো না। শত্রুর তখন এ অবস্থা দাঁড়িয়েছিল।
অক্টোবর-নভেম্বর থেকেই শত্রুরা যুদ্ধকে আন্তর্জাতিকীকরণের প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল। যাতে তাদের জান বাঁচে। জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের পর একটা যুদ্ধবিরতি হয়, অবজারভার এসে যায় এবং জাতিসংঘের কাছে সমস্যাটি দিয়ে তাদের জান রক্ষা হয়—শত্রুপক্ষের এই ছিল প্রচেষ্টা। কারণ তখন তারা নিশ্চিন্ত হয়ে গিয়েছিল যে, তাদের পরাজয় একেবারে অনিবার্য। জাতিসংঘ যখন হস্তক্ষেপ করল না, তখন তারা একটা আন্তর্জাতিক যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালাল, যাতে জাতিসংঘ এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়। প্রথমে তারা আমাদের ঘাঁটি, পজিশন ও বেসগুলোর ওপর বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা করে। সঙ্গে সঙ্গে তারা পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরাঞ্চলেও গোলাগুলি শুরু করে।
আরেকটি ব্যাপারে আমি বলতে চাই। আমার কাছে বিমান ছিল না। তবে শেষের দিকে কয়েকটি বিমান নিয়ে আমি ছোটখাটো একটি বিমানবাহিনী গঠন করেছিলাম। আমি যে বিমান পেয়েছিলাম, তা ছিল দুটো হেলিকপ্টার, একটি অটার এবং আমার যানবাহন স্বরূপ একটি ডাকোটা। সেই অটার ও হেলিকপ্টারগুলোয় মেশিনগান লাগিয়ে যথেষ্ট সজ্জিত করা হলো। আমাদের যেসব বৈমানিক স্থলযুদ্ধে রত ছিলেন, তাদের মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক লোক নিয়ে অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে একটি ছোট বিমান বাহিনী গঠন করা হলো। এ বাহিনীর কৌশল ছিল গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ঘাঁটিতে হামলা করা এবং ইন্টারডিকসন অর্থাত্ শত্রুর যোগাযোগের পথকে বন্ধ করে দেয়ার জন্য লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত হানা।
আপনারা জানেন কিনা জানি না, শত্রুর ওপর প্রথম যে বিমান হামলা হয়েছে তা বাংলাদেশের বীর বৈমানিকরা করেছেন। ২৬ মার্চ থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত যে যুদ্ধ হয়েছে, তাতে যদিও আমাদের কাছে বিমান ছিল না, কিন্তু আমরা বিমান ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হেনেছি। শেষের দিকে একজন মুক্তিযোদ্ধা সিলেট বিমান ঘাঁটিতে একটি সি-১৩০ বিমানের ওপর অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে মেশিনগান চালায়। মেশিনগানের গুলিতে যদিও সি-১৩০ বিমানটি পড়ে যায়নি, তবে কোনো রকমে ঢুলু করে চলে গিয়ে শমসেরনগরে নেমেছিল এবং পরে অনেকদিন মেরামতে ছিল।
প্রশ্ন : ৩ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সম্মিলিত বাহিনীর রণনীতি ও রণকৌশল কী ছিল?
জেনারেল ওসমানী : প্রথমেই এ কথা বলে নিচ্ছি, শেষের দিকে অর্থাত্ ডিসেম্বরের আগে শেষ পর্যায়ে শত্রুবাহিনী ভারতের ওপর যথেষ্ট পরিমাণ হামলা শুরু করল। পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে ভারতীয়দের যুদ্ধে নামতে হবে—যদিও উপর থেকে তারা তখনও নির্দেশ পাননি। এমনকি শেষের দিকে যখন যশোর সীমান্তে ভারতের ওপর হামলা হয়েছে, তখনও ওপর থেকে ক্লিয়ারেন্স আসেনি।
একদিনের কথা আমার মনে পড়েছে। সেই অঞ্চলে যুদ্ধরত আমার মুক্তি বাহিনীর ওপর পাকিস্তানের ট্যাঙ্ক আক্রমণ হচ্ছে। আমাদের কাছে ট্যাঙ্ক ছিল না। পাকিস্তানি ট্যাঙ্কগুলো ভারতীয় অঞ্চলের ওপরও গোলাবর্ষণ করছে। আমি তখন ওদের জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা এর জবাব দিচ্ছেন না কেন? তারা বললেন, ‘পলিটিক্যাল ক্লিয়ারেন্স নেই।’ তখন আমার নিয়মিত বাহিনী ও গণবাহিনীর যোদ্ধারা অতি বীরত্ব ও কৃতিত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করেছে।
ভারতীয় বাহিনী ৩ ডিসেম্বর যুদ্ধে নামে এবং শত্রু আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত ১৩ দিন যুদ্ধ করেছিল। অবশ্য এর আগে তারা আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করেছিল। ভারতীয় বাহিনী যখন যুদ্ধে নেমে আসার সম্ভাবনা দেখা দিল, তখন আমরা সম্মিলিতভাবে পরিকল্পনা করে একটি রণনীতি অবলম্বন করি। সেই নীতি ছিল যেহেতু ভারতীয়দের কাছে ট্যাঙ্ক, কামান ও বিমান রয়েছে, সে জন্য যেখানে অধিক শক্তিশালী প্রতিরোধ রয়েছে এবং বড় অস্ত্রশক্তি প্রয়োজন, সেখানে তারা প্রথম লক্ষ্য দেবেন এবং আমাদের বাহিনী শত্রুকে ‘আউটফ্লাঙ্ক’ অর্থাত্ শত্রুকে দু’পাশ দিয়ে অতিক্রম করে—‘ক্রস কান্ট্রি’ দিয়ে গিয়ে ব্যূহের পার্শ্বভাগে আক্রমণ করবে অথবা ভারতীয়রা সামনের দিকে শত্রুকে ঠেকিয়ে রাখবে এবং আমাদের বাহিনী ‘আউটফ্লাঙ্ক’ করে পেছন দিক দিয়ে আক্রমণ করবে। যেহেতু অঞ্চলগুলো সম্পর্কে আমাদের বাহিনীর অভিজ্ঞতা ছিল, আমার বাহিনী হাল্কা ছিল ও ক্ষিপ্রতার সঙ্গে রণাঙ্গনে চলাচলে সক্ষম এবং যেহেতু অঞ্চলগুলো সম্পর্কে আমাদের বাহিনী সম্পূর্ণ সজাগ ছিল, সেজন্য এই কাজগুলো করার দায়িত্ব ছিল আমাদের ওপর। যেখানে অধিকসংখ্যক গোলাবারুদ, বিমান বা ট্যাঙ্কের আক্রমণ করতে হবে, সেখানে ভারতীয় বাহিনী শক্তি নিয়োগ করবে।
যেসব অঞ্চল কেবল বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী অর্থাত্ মুক্তিবাহিনী মুক্ত করেছিল, সেখানে আমাদের বাহিনী সম্পূর্ণভাবে নিজেদের পরিকল্পিত পদ্ধতিতেই যুদ্ধ করে। আমাদের বাহিনী যেসব অঞ্চল এভাবে মুক্ত করে, তার মধ্যে উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট অঞ্চল, সিলেটের সুনামগঞ্জ ও দুতিক অঞ্চল, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা, আখাউড়া ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উত্তরাঞ্চল, চট্টগ্রামের করেরহাট, হায়াকু, হাটহাজারী অঞ্চলের ‘এক্সেস অব এডভান্স’, কুষ্টিয়ার আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর অঞ্চল, যশোরের মনিরামপুর ও অভয়নগর অঞ্চল, খুলনার বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও কালিগঞ্জ অঞ্চল, ফরিদপুর সদর, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ অঞ্চল, বরিশাল ও পটুয়াখালী অঞ্চল এবং ঢাকা পৌঁছার শেষ পর্যায়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভৈরব, নরসিংদী, ঢাকা—এই ‘এক্সেস অব এডভান্স’ রয়েছে। শেষ পর্যন্ত মিত্ররাও এ পদ্ধতিটি বেশি কার্যকর বলে মেনে নিয়েছিলেন। এ পদ্ধতি ছিল—শত্রুর যেখানে পাকা বাঙ্কার বা রি-ইনফোর্সড কনক্রিটের শক্তিশালী ব্যূহ বা স্ট্রং পয়েন্ট রয়েছে, সেখানে গিয়ে সরাসরি ঢুঁ মারা বুরবকের কাজ। এ ক্ষেত্রে যা করতে হবে, তা ১৯৪২ সালে জাপানিরা ব্রিটিশ বাহিনীকে (যাতে আমিও ছিলাম) শিখিয়েছিল। এক্ষেত্রে সামনে দিয়ে শত্রুকে ব্যস্ত রাখতে হবে এবং তাকে ‘আউটফ্লাঙ্ক’ করে ওর পেছনে গিয়ে স্ট্রং পয়েন্ট বানিয়ে বসুন। সে যাবে কোথায় এবং ওর ‘রি-ইনফোর্সমেন্ট ও গোলাবারুদ, রসদ’ ইত্যাদি আসবে কোত্থেকে? এইভাবে তাকে বিচ্ছিন্ন করে তার ব্যূহের পেছনে ও পার্শ্বভাগে আঘাত করুন। প্রথম প্রথম মিত্রদের অনেকে ভাবতেন আমরা কি ভীতু নাকি! তারপর একটি অভিজ্ঞতা হওয়ার পর বুঝলেন যে, আমাদের পদ্ধতিই একমাত্র কার্যকর রণপদ্ধতি। এভাবে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কেবল একটি ব্যাটালিয়ন শত্রুর ১৪ নম্বর ডিভিশনকে আশুগঞ্জের যুদ্ধের পর ঘেরাও করে অকেজো করে দেয়।
তাই যেসব অঞ্চলে আমরা একা যুদ্ধ করেছি, সেখানে আমাদের পদ্ধতি ছিল শত্রুর শক্তিশালী ঘাঁটিকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে সম্মুখভাগে ব্যস্ত রেখে ‘আউটফ্লাঙ্ক’ করে পেছনে গিয়ে বসা এবং তারপর পার্শ্বভাগ ও পেছনের দিক থেকে আক্রমণ করে তাকে ধ্বংস করা। অভ্যন্তর ভাগের গেরিলাদের (গণবাহিনীর) ও আমাদের নিয়মিত বাহিনীর আক্রমণের সামঞ্জস্য বিধান করা। নির্দেশ থাকত, গেরিলারা যখন অমুক জায়গায় আক্রমণ করবে, তখন দৃষ্টিকে অন্যদিকে ধাবিত করতে হবে এবং শত্রুর যাতে গোলাগুলি ও রি-ইনফোর্সমেন্ট না আসতে পারে তার ব্যবস্থা করবে। গেরিলারা অমুক জায়গায় অমুক পুলটি উড়াবে। তবে আমরা বড় বড় পুলগুলোতে হাত দিইনি। সেই পুলগুলো শত্রুরাই আত্মসমর্পণের আগে ভেঙেছিল।
যেখানে সম্মিলিতভাবে কাজ করেছি সেখানে কৌশল ছিল—যেখানে অধিক অস্ত্র, গোলাবারুদ, ট্যাঙ্ক ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দেবে, ‘এক্সেস অব এডভান্স’—এ ভারত শত্রুর স্ট্রং পয়েন্টের ওপর চাপ প্রয়োগ করবে এবং বাংলাদেশ বাহিনী ‘আউটফ্লাঙ্ক’ করে গিয়ে পার্শ্বভাগে বা পেছনের দিক থেকে আক্রমণ করবে।
এর সঙ্গে সঙ্গে এটাও সুস্পষ্ট নীতি ছিল যে, স্ট্রং পয়েন্টগুলো ‘ক্লিয়ার’ করার পরবর্তী পর্যায়ে শত্রুর জন্য পজিশনগুলো আয়ত্ত করতে হবে, সেখানে মুক্তিবাহিনী অর্থাত্ বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী এগুবে। তাদের অগ্রাভিযানে ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনী যতটুকু সাপোর্ট দেয়ার ঠিক ততটুকু দেবে।
প্রশ্ন : মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী যখন এক সঙ্গে এগুতো, তখন অগ্রবর্তী দল হিসেবে মুক্তিবাহিনী যেত এবং সাপোর্ট আসতো ভারতীয় বাহিনীর কাছ থেকে—তাই কী?
জেনারেল ওসমানী : দু’রকমের ছিল। সেটা হয়েছে প্রথম ‘স্ট্
জেনারেল ওসমানী : আপনাদের মনে আছে ২৬ মার্চ থেকে শত্রুকে প্রতিরোধ এবং বাঙালিকে দমনে শত্রুদের কার্যক্রম প্রতিরোধ করতে প্রথমে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বীর বাঙালি সৈনিক, সাবেক ইপিআরের বীর বাঙালিরা এবং আনসার, মোজাহেদ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর বীর জওয়ানরা। সঙ্গে সঙ্গে এদের সঙ্গে এসে যোগ দিয়েছিলেন যুবক ও ছাত্ররা।
সর্বপ্রথমে যুদ্ধ হয় নিয়মিত পদ্ধতিতে। আর এ পদ্ধতিতে যুদ্ধ চালু থাকে মে মাস পর্যন্ত। শত্রুকে ছাউনিতে যথাসম্ভব আবদ্ধ রাখা এবং যোগাযোগের কেন্দ্রগুলো তাকে কব্জা করতে না দেয়ার জন্য নিয়মিত বাহিনীর পদ্ধতিতে যুদ্ধ করা হয়েছিল। এ জন্য পদ্ধতি ছিল—যত বেশি বাধা সৃষ্টি করা যায়, তা সৃষ্টি করা হবে; যেসব ন্যাচারাল অবস্টাকল বা প্রতিবন্ধক রয়েছে তা রক্ষা করতে হবে এবং এর সঙ্গে সঙ্গে শত্রুর প্রান্তভাগে ও যোগাযোগের পথে আঘাত হানা হবে। মূলত এ পদ্ধতি ছিল নিয়মিত বাহিনীর পদ্ধতি। আর সংখ্যায় কম হওয়া সত্ত্বেও নিয়মিত বাহিনী অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে এ পদ্ধতিতে যুদ্ধ করে। এ পর্যায়ে বেশ কয়েকটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ হয়েছে। যথা : ভৈরব-আশুগঞ্জের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি ব্যাটালিয়নের বিরুদ্ধে শত্রু পুরো দুটো ব্রিগেড নিয়োগ করে। এখানে শত্রুবাহিনীকে চারদিন আটকে রাখা হয়।
তবে একটা বিষয়ে আমি আলোকপাত করতে চাই। নিয়মিত বাহিনীর যেটা স্বাভাবিক কৌশল, তা আমাদের সংখ্যা কম হওয়ার জন্য কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছিল। আমরা ছোট ছোট অংশে অর্থাত্ ছোট ছোট পেট্রল বা ছোট ছোট কোম্পানি প্লাটুনের অংশ দিয়ে শত্রুবাহিনীর তুলনামূলক অধিকসংখ্যক লোককে রুদ্ধ করে রাখি এবং সঙ্গে সঙ্গে শত্রুর ওপর আঘাতও হানতে থাকি। এভাবে চট্টগ্রাম ও অন্যান্য অঞ্চলে সর্বপ্রথমে যুদ্ধ শুরু হয়।
সে সময় আমার ও আমার অধিনায়কদের কাছে একথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, আমরা কেবল নিয়মিত বাহিনীর পদ্ধতিতে যুদ্ধ করে চলতে পারব না। কারণ আমাদের সংখ্যা তখন সর্বমোট ৫ ব্যাটালিয়ন। এ ছাড়া আমাদের সঙ্গে সাবেক ইপিআরের বাঙালি জওয়ান, আনসার, মোজাহেদ, পুলিশ ও যুবকরাও ছিলেন। যুবকদের অস্ত্র দেয়া একটু কঠিন হয়ে পড়েছিল। আমরা ভেতর থেকে যে অস্ত্রগুলো নিয়ে গিয়েছিলাম, সেগুলো দিয়ে তাদের তাড়াতাড়ি মোটামুটি প্রশিক্ষণ দিয়ে দাঁড় করেছিলাম। আমাদের বিরুদ্ধে তখন শত্রু বাহিনীর ছিল তিন-চারটি ডিভিশন। এই তিনটি ডিভিশনকেই নিম্নতম সংখ্যা হিসেবে ধরে নিয়ে আমরা দেখতে পেলাম, এদের প্রতিরোধ করা, ধ্বংস করা সোজা নয়, সম্ভবও নয়। তাই এপ্রিল মাস নাগাদ এটি আমার কাছে পরিষ্কার ছিল যে, আমাদের একটি বিরাট গণবাহিনী গড়ে তুলতে হবে। এই গণবাহিনী শত্রুপক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে নিউট্রালাইজ করবে এবং এই গণবাহিনী এরকম হতে হবে যেমন মানুষের পেটের অন্ত্রের মধ্যে একটি শক্তিশালী জীবাণু অন্ত্রকে ধ্বংস করে দিতে পারে, তেমনি ভেতর থেকে শক্তিশালী গেরিলা বাহিনী শত্রুর অস্ত্রগুলো বিনষ্ট করে দেবে। এ ছাড়া শত্রুকে ধ্বংস করা সম্ভব হবে না। কারণ তাদের সংখ্যা বেশি, তাদের অস্ত্র বেশি, তাদের বিমান রয়েছে, আর আমাদের কাছে বিমান ছিল না। এ ছাড়া সম্বল তাদের অনেক বেশি।
কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে এটাও পরিষ্কার ছিল যে বইয়ে লেখা ক্লাসিক্যাল গেরিলা ওয়ারফেয়ার করে দেশ মুক্ত করতে হলে বহুদিন যুদ্ধ করতে হবে এবং এরই মধ্যে আমাদের দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাদের সবচেয়ে বড় জনসম্পদ ধ্বংস হয়ে যাবে। আর বিশেষ কিছু উদ্ধার করার থাকবে না। সেজন্য এপ্রিল মাসের শেষের দিকে এটাও আমার কাছে পরিষ্কার ছিল যে আমাদের একটি নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে সময় কমানোর জন্য। সেই পদ্ধতিতে বড় একটি গেরিলা বাহিনী গঠন করে ভেতর থেকে শত্রুর আঁতে আঘাত করতে হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত বাহিনীর ছোট ছোট ইউনিট অর্থাত্ কোম্পানি বা প্লাটুন দিয়ে শত্রুকে আঘাত করতে হবে এবং বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য তাকে বাধ্য করতে হবে—সে যেন কনসেনট্রেটেড না থেকে ডিসপার্সড হয়। এই বিচ্ছিন্নতার ফলে তার সংখ্যাগরিষ্ঠতাজনিত শক্তি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সে ছোট ছোট ট্রলিতে তার ফোর্সকে কমিট করতে বাধ্য হবে এবং তখন গেরিলা পদ্ধতিতে তার যোগাযোগর রাস্তা, তার সংযোগের রাস্তা, তার রি-ইনফোর্সমেন্টের রাস্তা ধ্বংস করে তাকে ছোট ছোট পকেটে আইসোলেট বা বিচ্ছিন্ন করা যাবে।
এ জন্য আমার অনেক নিয়মিত বাহিনীরও প্রয়োজন ছিল। এ প্রয়োজনের কথা আমি মে মাসের শুরুতে সরকারকে লিখিতভাবে জানাই এবং এর ভিত্তিতে মিত্রদের কাছ থেকে সাহায্যও চাই। তাতে আমার উদ্দেশ্য ছিল (ক) কমপক্ষে ৬০ থেকে ৮০ হাজার গেরিলা সমন্বিত বাহিনী ও (খ) ২৫ হাজারের মতো নিয়মিত বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। এই বাহিনী সত্বর গড়ে তুলতে হবে। কারণ একদিকে গেরিলা পদ্ধতি এবং সঙ্গে সঙ্গে শত্রুকে নিয়মিত বাহিনীর কমান্ডো ধরনের রণকৌশল দিয়ে শক্তিকে বণ্টন করার জন্য বাধ্য করতে হবে, যাতে তার শক্তি হ্রাস পায়।
এ পদ্ধতি আমরা কাজে পরিণত করি। ক্রমেই গড়ে উঠল একটি বিরাট গণবাহিনী—গেরিলা বাহিনী। জুন মাসের শেষের দিক থেকে গেরিলাদের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। প্রথমে বিভিন্ন জায়গায় ঘাঁটি বানানো হয় এবং জুন মাসের শেষের দিক থেকে আমাদের গণবাহিনী বা গেরিলা বাহিনী অ্যাকশনে নামে। তবে জুলাই-আগস্ট মাসের আগ পর্যন্ত শত্রুবাহিনী তাদের ওপর গেরিলা বাহিনীর প্রবল চাপ বুঝতে পারেনি। যদিও শুরু থেকে আমরা কিছুসংখ্যক যুবককে ট্রেনিং দিয়ে ভেতরে পাঠিয়েছিলাম। তারা চট্টগ্রাম বন্দরেও গিয়েছিল, ঢাকায়ও এসেছিল। তবে গেরিলাদের শত্রুরা জুলাই মাস থেকে অনুভব করতে শুরু করে।
এর সঙ্গে সঙ্গে আরেক দিকে দৃষ্টি নিবব্ধ হয়। আমাদের নৌবাহিনী ছিল না। আমার কাছে নিয়মিত নৌবাহিনীর বহু অফিসার, ওয়ারেন্ট অফিসার ও নাবিক আসেন। ফ্রান্সের মতো জায়গা থেকে কয়েকজন পাকিস্তানের ডুবোজাহাজ ছেড়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন। আমি তাদের ভিত্তি করে এবং আমাদের বড় শক্তি যুব শক্তিকে ব্যবহার করে নৌকম্যান্ডো গঠন করি। এই নৌকমান্ডো জলপথে শত্রুর চলাচল ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।
১৯৭১ সালের ১৪ আগস্ট থেকে আমাদের এ নৌকমান্ডোদের আক্রমণ শুরু হয়। তারা যে বীরত্ব ও কৃতিত্ব দেখিয়েছে, পৃথিবীর ইতিহাসে তার নজির নেই। তারা মংলায় বহু জাহাজ ডুবায়। তারা শত্রুর জন্য বিভিন্ন অস্ত্র-সামান নিয়ে যেসব জাহাজ আসছিল চট্টগ্রামে সেগুলো ধ্বংস করে। এ জন্য অত্যন্ত দুঃসাহসের প্রয়োজন ছিল। তারা শত্রুর দুটো বন্দর অচল করে দেয় এবং নদীপথেও তাদের যাতায়াত বন্ধ করে দেয়।
আমাদের কৌশল অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে প্রমাণিত হয়। সেপ্টেম্বরের শেষনাগাদ শত্রু রক্তহীন হয়ে ওঠে। তার ২৫ হাজারের মতো সৈন্য বিনষ্ট হয়। বহু যানবাহনের লোকসান হয়। ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত শত্রুর এ অবস্থা দাঁড়ায় যে একজন বক্সার রিংয়ের দ্বিতীয় রাউন্ডে ক্লান্ত হয়ে ঘুরছে এবং একটা কড়া ঘুষি খেলে পড়ে যাবে—তার যোগাযোগের অবস্থা সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। যেভাবে আমার উদ্দেশ্য ছিল, সেভাবে বিভিন্ন জায়গায় তারা ছোট ছোট পকেট বানিয়েছিল। তারা কোটি কোটি টাকা খরচ করে রি-ইনফোর্স কংক্রিটের বাঙ্কার বানিয়েছিল। সেগুলোর মধ্যে তারা ঢুকেছিল। রাতের বেলা তো বেরোতো না-ই, দিনের বেলায়ও বেশিসংখ্যক লোক ছাড়া বেরোতো না। শত্রুর তখন এ অবস্থা দাঁড়িয়েছিল।
অক্টোবর-নভেম্বর থেকেই শত্রুরা যুদ্ধকে আন্তর্জাতিকীকরণের প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল। যাতে তাদের জান বাঁচে। জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের পর একটা যুদ্ধবিরতি হয়, অবজারভার এসে যায় এবং জাতিসংঘের কাছে সমস্যাটি দিয়ে তাদের জান রক্ষা হয়—শত্রুপক্ষের এই ছিল প্রচেষ্টা। কারণ তখন তারা নিশ্চিন্ত হয়ে গিয়েছিল যে, তাদের পরাজয় একেবারে অনিবার্য। জাতিসংঘ যখন হস্তক্ষেপ করল না, তখন তারা একটা আন্তর্জাতিক যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালাল, যাতে জাতিসংঘ এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়। প্রথমে তারা আমাদের ঘাঁটি, পজিশন ও বেসগুলোর ওপর বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা করে। সঙ্গে সঙ্গে তারা পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরাঞ্চলেও গোলাগুলি শুরু করে।
আরেকটি ব্যাপারে আমি বলতে চাই। আমার কাছে বিমান ছিল না। তবে শেষের দিকে কয়েকটি বিমান নিয়ে আমি ছোটখাটো একটি বিমানবাহিনী গঠন করেছিলাম। আমি যে বিমান পেয়েছিলাম, তা ছিল দুটো হেলিকপ্টার, একটি অটার এবং আমার যানবাহন স্বরূপ একটি ডাকোটা। সেই অটার ও হেলিকপ্টারগুলোয় মেশিনগান লাগিয়ে যথেষ্ট সজ্জিত করা হলো। আমাদের যেসব বৈমানিক স্থলযুদ্ধে রত ছিলেন, তাদের মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক লোক নিয়ে অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে একটি ছোট বিমান বাহিনী গঠন করা হলো। এ বাহিনীর কৌশল ছিল গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ঘাঁটিতে হামলা করা এবং ইন্টারডিকসন অর্থাত্ শত্রুর যোগাযোগের পথকে বন্ধ করে দেয়ার জন্য লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত হানা।
আপনারা জানেন কিনা জানি না, শত্রুর ওপর প্রথম যে বিমান হামলা হয়েছে তা বাংলাদেশের বীর বৈমানিকরা করেছেন। ২৬ মার্চ থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত যে যুদ্ধ হয়েছে, তাতে যদিও আমাদের কাছে বিমান ছিল না, কিন্তু আমরা বিমান ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হেনেছি। শেষের দিকে একজন মুক্তিযোদ্ধা সিলেট বিমান ঘাঁটিতে একটি সি-১৩০ বিমানের ওপর অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে মেশিনগান চালায়। মেশিনগানের গুলিতে যদিও সি-১৩০ বিমানটি পড়ে যায়নি, তবে কোনো রকমে ঢুলু করে চলে গিয়ে শমসেরনগরে নেমেছিল এবং পরে অনেকদিন মেরামতে ছিল।
প্রশ্ন : ৩ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সম্মিলিত বাহিনীর রণনীতি ও রণকৌশল কী ছিল?
জেনারেল ওসমানী : প্রথমেই এ কথা বলে নিচ্ছি, শেষের দিকে অর্থাত্ ডিসেম্বরের আগে শেষ পর্যায়ে শত্রুবাহিনী ভারতের ওপর যথেষ্ট পরিমাণ হামলা শুরু করল। পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে ভারতীয়দের যুদ্ধে নামতে হবে—যদিও উপর থেকে তারা তখনও নির্দেশ পাননি। এমনকি শেষের দিকে যখন যশোর সীমান্তে ভারতের ওপর হামলা হয়েছে, তখনও ওপর থেকে ক্লিয়ারেন্স আসেনি।
একদিনের কথা আমার মনে পড়েছে। সেই অঞ্চলে যুদ্ধরত আমার মুক্তি বাহিনীর ওপর পাকিস্তানের ট্যাঙ্ক আক্রমণ হচ্ছে। আমাদের কাছে ট্যাঙ্ক ছিল না। পাকিস্তানি ট্যাঙ্কগুলো ভারতীয় অঞ্চলের ওপরও গোলাবর্ষণ করছে। আমি তখন ওদের জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা এর জবাব দিচ্ছেন না কেন? তারা বললেন, ‘পলিটিক্যাল ক্লিয়ারেন্স নেই।’ তখন আমার নিয়মিত বাহিনী ও গণবাহিনীর যোদ্ধারা অতি বীরত্ব ও কৃতিত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করেছে।
ভারতীয় বাহিনী ৩ ডিসেম্বর যুদ্ধে নামে এবং শত্রু আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত ১৩ দিন যুদ্ধ করেছিল। অবশ্য এর আগে তারা আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করেছিল। ভারতীয় বাহিনী যখন যুদ্ধে নেমে আসার সম্ভাবনা দেখা দিল, তখন আমরা সম্মিলিতভাবে পরিকল্পনা করে একটি রণনীতি অবলম্বন করি। সেই নীতি ছিল যেহেতু ভারতীয়দের কাছে ট্যাঙ্ক, কামান ও বিমান রয়েছে, সে জন্য যেখানে অধিক শক্তিশালী প্রতিরোধ রয়েছে এবং বড় অস্ত্রশক্তি প্রয়োজন, সেখানে তারা প্রথম লক্ষ্য দেবেন এবং আমাদের বাহিনী শত্রুকে ‘আউটফ্লাঙ্ক’ অর্থাত্ শত্রুকে দু’পাশ দিয়ে অতিক্রম করে—‘ক্রস কান্ট্রি’ দিয়ে গিয়ে ব্যূহের পার্শ্বভাগে আক্রমণ করবে অথবা ভারতীয়রা সামনের দিকে শত্রুকে ঠেকিয়ে রাখবে এবং আমাদের বাহিনী ‘আউটফ্লাঙ্ক’ করে পেছন দিক দিয়ে আক্রমণ করবে। যেহেতু অঞ্চলগুলো সম্পর্কে আমাদের বাহিনীর অভিজ্ঞতা ছিল, আমার বাহিনী হাল্কা ছিল ও ক্ষিপ্রতার সঙ্গে রণাঙ্গনে চলাচলে সক্ষম এবং যেহেতু অঞ্চলগুলো সম্পর্কে আমাদের বাহিনী সম্পূর্ণ সজাগ ছিল, সেজন্য এই কাজগুলো করার দায়িত্ব ছিল আমাদের ওপর। যেখানে অধিকসংখ্যক গোলাবারুদ, বিমান বা ট্যাঙ্কের আক্রমণ করতে হবে, সেখানে ভারতীয় বাহিনী শক্তি নিয়োগ করবে।
যেসব অঞ্চল কেবল বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী অর্থাত্ মুক্তিবাহিনী মুক্ত করেছিল, সেখানে আমাদের বাহিনী সম্পূর্ণভাবে নিজেদের পরিকল্পিত পদ্ধতিতেই যুদ্ধ করে। আমাদের বাহিনী যেসব অঞ্চল এভাবে মুক্ত করে, তার মধ্যে উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট অঞ্চল, সিলেটের সুনামগঞ্জ ও দুতিক অঞ্চল, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা, আখাউড়া ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উত্তরাঞ্চল, চট্টগ্রামের করেরহাট, হায়াকু, হাটহাজারী অঞ্চলের ‘এক্সেস অব এডভান্স’, কুষ্টিয়ার আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর অঞ্চল, যশোরের মনিরামপুর ও অভয়নগর অঞ্চল, খুলনার বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও কালিগঞ্জ অঞ্চল, ফরিদপুর সদর, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ অঞ্চল, বরিশাল ও পটুয়াখালী অঞ্চল এবং ঢাকা পৌঁছার শেষ পর্যায়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভৈরব, নরসিংদী, ঢাকা—এই ‘এক্সেস অব এডভান্স’ রয়েছে। শেষ পর্যন্ত মিত্ররাও এ পদ্ধতিটি বেশি কার্যকর বলে মেনে নিয়েছিলেন। এ পদ্ধতি ছিল—শত্রুর যেখানে পাকা বাঙ্কার বা রি-ইনফোর্সড কনক্রিটের শক্তিশালী ব্যূহ বা স্ট্রং পয়েন্ট রয়েছে, সেখানে গিয়ে সরাসরি ঢুঁ মারা বুরবকের কাজ। এ ক্ষেত্রে যা করতে হবে, তা ১৯৪২ সালে জাপানিরা ব্রিটিশ বাহিনীকে (যাতে আমিও ছিলাম) শিখিয়েছিল। এক্ষেত্রে সামনে দিয়ে শত্রুকে ব্যস্ত রাখতে হবে এবং তাকে ‘আউটফ্লাঙ্ক’ করে ওর পেছনে গিয়ে স্ট্রং পয়েন্ট বানিয়ে বসুন। সে যাবে কোথায় এবং ওর ‘রি-ইনফোর্সমেন্ট ও গোলাবারুদ, রসদ’ ইত্যাদি আসবে কোত্থেকে? এইভাবে তাকে বিচ্ছিন্ন করে তার ব্যূহের পেছনে ও পার্শ্বভাগে আঘাত করুন। প্রথম প্রথম মিত্রদের অনেকে ভাবতেন আমরা কি ভীতু নাকি! তারপর একটি অভিজ্ঞতা হওয়ার পর বুঝলেন যে, আমাদের পদ্ধতিই একমাত্র কার্যকর রণপদ্ধতি। এভাবে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কেবল একটি ব্যাটালিয়ন শত্রুর ১৪ নম্বর ডিভিশনকে আশুগঞ্জের যুদ্ধের পর ঘেরাও করে অকেজো করে দেয়।
তাই যেসব অঞ্চলে আমরা একা যুদ্ধ করেছি, সেখানে আমাদের পদ্ধতি ছিল শত্রুর শক্তিশালী ঘাঁটিকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে সম্মুখভাগে ব্যস্ত রেখে ‘আউটফ্লাঙ্ক’ করে পেছনে গিয়ে বসা এবং তারপর পার্শ্বভাগ ও পেছনের দিক থেকে আক্রমণ করে তাকে ধ্বংস করা। অভ্যন্তর ভাগের গেরিলাদের (গণবাহিনীর) ও আমাদের নিয়মিত বাহিনীর আক্রমণের সামঞ্জস্য বিধান করা। নির্দেশ থাকত, গেরিলারা যখন অমুক জায়গায় আক্রমণ করবে, তখন দৃষ্টিকে অন্যদিকে ধাবিত করতে হবে এবং শত্রুর যাতে গোলাগুলি ও রি-ইনফোর্সমেন্ট না আসতে পারে তার ব্যবস্থা করবে। গেরিলারা অমুক জায়গায় অমুক পুলটি উড়াবে। তবে আমরা বড় বড় পুলগুলোতে হাত দিইনি। সেই পুলগুলো শত্রুরাই আত্মসমর্পণের আগে ভেঙেছিল।
যেখানে সম্মিলিতভাবে কাজ করেছি সেখানে কৌশল ছিল—যেখানে অধিক অস্ত্র, গোলাবারুদ, ট্যাঙ্ক ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দেবে, ‘এক্সেস অব এডভান্স’—এ ভারত শত্রুর স্ট্রং পয়েন্টের ওপর চাপ প্রয়োগ করবে এবং বাংলাদেশ বাহিনী ‘আউটফ্লাঙ্ক’ করে গিয়ে পার্শ্বভাগে বা পেছনের দিক থেকে আক্রমণ করবে।
এর সঙ্গে সঙ্গে এটাও সুস্পষ্ট নীতি ছিল যে, স্ট্রং পয়েন্টগুলো ‘ক্লিয়ার’ করার পরবর্তী পর্যায়ে শত্রুর জন্য পজিশনগুলো আয়ত্ত করতে হবে, সেখানে মুক্তিবাহিনী অর্থাত্ বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী এগুবে। তাদের অগ্রাভিযানে ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনী যতটুকু সাপোর্ট দেয়ার ঠিক ততটুকু দেবে।
প্রশ্ন : মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী যখন এক সঙ্গে এগুতো, তখন অগ্রবর্তী দল হিসেবে মুক্তিবাহিনী যেত এবং সাপোর্ট আসতো ভারতীয় বাহিনীর কাছ থেকে—তাই কী?
জেনারেল ওসমানী : দু’রকমের ছিল। সেটা হয়েছে প্রথম ‘স্ট্
-
মহান বিজয় দিবস


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


