শেষতক নিরীহ : বইয়ের ঘাড়ে?
জাকির হোসেন
কোনোকিছু একবার মাথায় ঢুকলে তা সহজেই মুছে ফেলতে পারেন না রহম আলী। এ কারণে ‘দিনবদল’ শব্দটি তিনি কোনোভাবেই মাথা থেকে দূর করতে পারছেন না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরও তিনটি শব্দ—বউ, বই এবং বিপ্লব। কারণ, তার সুদীর্ঘ জীবনে দিনবদলের ব্যর্থ প্রচেষ্টায় ‘দিনবদল’ শব্দটির সঙ্গে এই তিনটি শব্দ বার বার আবর্তিত হয়েছে। কৌশলে মা-বাবা হারা রহম আলীর নামমাত্র জমিতে যে ফসল জন্মাত, তাতে তার বছরের আহার জুটত না। বাধ্য হয়েই দিনমজুরের কাজ করতে হতো তাকে। অভাব ছিল তার নিত্যদিনের সঙ্গী। তাই প্রথম যৌবনে পাড়া-প্রতিবেশী মুরব্বীরা রহম আলীকে বলতেন, ওরে একটা বিয়ে কর। ঘরে লক্ষ্মী এলে তোর দিন বদলাবে, অভাব ঘুচবে, সুখ আসবে। পাড়া-প্রতিবেশীর কথায় রহম আলী বিয়ে করে। কিন্তু তাতে তার দিন বদলায় না, বরং কয়েকটি দরিদ্র শিশু সন্তানের জন্ম দিয়ে প্রান্তিক চাষী থেকে বর্গা চাষীতে পরিণত হয় সে। তার জীবন ও পরিবারে অভাব আরও তীব্র হয়। তখন পাড়া-প্রতিবেশী তাকে বলেন, রহম তোর ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করা। ছেলে-মেয়ে শিক্ষিত হলে তোর অভাব দূর হবে। পরামর্শ মোতাবেক সে তার ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠায়। কিন্তু অভাবের কারণেই তা বেশিদূর গড়াতে পারেনি। ফলে রহম আলীর নিরক্ষর ছেলেমেয়ে অক্ষরজ্ঞান লাভ করলেও তা রহম আলী এবং তার ছেলে-মেয়েদের দিনবদল করতে পারেনি। এমনকি কালের দীর্ঘ পরিক্রমায় ওর নাতি-নাতনীরাও তার মতো দরিদ্রই রয়ে গেছে। কারোই দিনবদল হয়নি। বই এবং বউয়ের পর দিনবদল প্রসঙ্গে তার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে ‘বিপ্লব’ শব্দটি। তার স্মৃতির রেলগাড়ি ফিরে যায় প্রথম যৌবনের স্টেশনে। রহম আলীর মনে পড়ে, স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে মণি সিং এবং মওলানা ভাসানীর লোকেরা প্রকাশ্যে তার কাছে আসতেন। আর রাতের অন্ধকারে আসতেন আব্দুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা, দেবেন শিকদার, সুখেন্দু দস্তিদার এবং অন্যপক্ষ আব্দুল মতিন, আলাউদ্দিন, টিপু বিশ্বাস ও শরদিন্দু দস্তিদারের সমর্থকরা। তারা গরিব-দুঃখী মেহনতি মানুষের মুক্তির জন্য সবাইকে সংগঠিত হওয়ার কথা বলতেন। বোঝাতেন গরিব মানুষের মিলিত প্রচেষ্টায় বিপ্লব হলে অভাব ঘুচবে—দিনবদল হবে। রাতের অন্ধকারে তারা লিফলেট বিলি করতেন। তাতে লেখা থাকত ‘তৃতীয় বিশ্বের মতবাদ : মার্কসবাদ-লেলিনবাদ’, ‘দিনবদলের সংগ্রাম—চলছেই চলবে’। কিন্তু এরা ব্যাপক আকারে গণভিত্তি তৈরি করতে পারেনি। ফলে বিপ্লব হয়নি—হয়নি গরিব মানুষের দিনবদল। রহম আলীর মনে পড়ে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাসদ গঠনের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রীরাও এই একই রকম স্লোগান দেন। কিন্তু তারাও ব্যর্থ হন। আরো মনে পড়ে ওই সময় মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আলোর মিছিল’ নামের একটি জনপ্রিয় সিনেমার একটি গান ‘দিনবদলের দিন এসেছে, কান পেতে ওই শোন, ন্যায়-অন্যায়ের হিসেব-নিকেশ হবেই এবার জেনো।’ সিনেমাটি দেখার পর ও এই গানটি স্মরণে এলে তখন রহম আলী কান পেতে এবং চোখ মেলে মানুষের হাহাকার ও নির্যাতন-নিপীড়ন ছাড়া অন্যকিছু দেখেননি এবং শোনেননি।
এরপর মনে পড়ে স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলনের কথা। ‘৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতন যখন সুনিশ্চিত, তখন বামপন্থী বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের স্লোগান ছিল—‘চলছে লড়াই গণতন্ত্রের : আসছে লড়াই সমাজতন্ত্রের’, ‘দিনবদলের সংগ্রাম—চলছেই-চলবে।’ আন্দোলনে এরশাদের পতন হয়—দীর্ঘ ১৯ বছর গণতান্ত্রিক সরকার দেশ পরিচালনা করে। তবে সেই আকারে সাধারণ মানুষের দিনবদলের মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।
এরই মাঝে কয়েক বছর আগে টিভি স্ক্রিনে একটি বহুজাতিক কোম্পানির বিজ্ঞাপনে চোখ রাখতেই দিনবদল শব্দের প্রথম বাণিজ্যিকীকরণে আঁেক ওঠে রহম আলী। ভাবে, ‘জাইলার ছেলে জাইলাই রইল’—এতে দিনবদলের হইলো কী?
এর দুই বছর পর যখন বর্তমান ক্ষমতাসীন মহাজোটের প্রধান দল আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় দিনবদল সামনে আনে তখন হতাশায় ভেঙে পড়ে রহম আলী। সে ভাবে, এতদিন যারা রাজনৈতিকভাবে দিনবদলের কথা বলেছেন, তারা ব্যর্থ হলেও তাদের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা খুব মুশকিল। কিন্তু বর্তমান বাজার অর্থনীতি যে বাজার রাজনীতির জন্ম দিয়েছে তাদের মাধ্যমে ‘দিনবদল’ শব্দটি দখল হয়ে যাওয়ার বিষয়টি সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। সে ভাবে এদের ব্যর্থতার কারণে এই শব্দটি এই দিনবদল শব্দটি আর কেউ কোনোদিন রাজনীতিতে টেনে আনবে না। সম্প্রতি সে যখন জানতে পারে এবারের ঢাকা বইমেলার স্লোগান করা হয়েছে ‘দিনবদলের জন্য বই’ তখন সে ভাবলো তাহলে কী দিনবদলের দায় এবার বইয়ের উপর চাপানো হলো!
এরপর মনে পড়ে স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলনের কথা। ‘৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতন যখন সুনিশ্চিত, তখন বামপন্থী বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের স্লোগান ছিল—‘চলছে লড়াই গণতন্ত্রের : আসছে লড়াই সমাজতন্ত্রের’, ‘দিনবদলের সংগ্রাম—চলছেই-চলবে।’ আন্দোলনে এরশাদের পতন হয়—দীর্ঘ ১৯ বছর গণতান্ত্রিক সরকার দেশ পরিচালনা করে। তবে সেই আকারে সাধারণ মানুষের দিনবদলের মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।
এরই মাঝে কয়েক বছর আগে টিভি স্ক্রিনে একটি বহুজাতিক কোম্পানির বিজ্ঞাপনে চোখ রাখতেই দিনবদল শব্দের প্রথম বাণিজ্যিকীকরণে আঁেক ওঠে রহম আলী। ভাবে, ‘জাইলার ছেলে জাইলাই রইল’—এতে দিনবদলের হইলো কী?
এর দুই বছর পর যখন বর্তমান ক্ষমতাসীন মহাজোটের প্রধান দল আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় দিনবদল সামনে আনে তখন হতাশায় ভেঙে পড়ে রহম আলী। সে ভাবে, এতদিন যারা রাজনৈতিকভাবে দিনবদলের কথা বলেছেন, তারা ব্যর্থ হলেও তাদের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা খুব মুশকিল। কিন্তু বর্তমান বাজার অর্থনীতি যে বাজার রাজনীতির জন্ম দিয়েছে তাদের মাধ্যমে ‘দিনবদল’ শব্দটি দখল হয়ে যাওয়ার বিষয়টি সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। সে ভাবে এদের ব্যর্থতার কারণে এই শব্দটি এই দিনবদল শব্দটি আর কেউ কোনোদিন রাজনীতিতে টেনে আনবে না। সম্প্রতি সে যখন জানতে পারে এবারের ঢাকা বইমেলার স্লোগান করা হয়েছে ‘দিনবদলের জন্য বই’ তখন সে ভাবলো তাহলে কী দিনবদলের দায় এবার বইয়ের উপর চাপানো হলো!


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


