Amardesh
আজঃ ঢাকা, রোববার ১৩ ডিসেম্বর ২০০৯, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪১৬, ২৫ জিলহজ ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 জব সার্চ
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 বিশেষ বিভাগ
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

ভালো নেই সরকারি কর্মকর্তারা : অসন্তোষে কাজে ধীরগতি পদোন্নতি নিয়ে কথা বলায় ৬ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা তদন্ত কমিটির নামে হয়রানি, ঘন ঘন বদলি

কাদের গনি চৌধুরী
দুঃসময় অতিক্রম করছেন সরকারি কর্মকর্তারা। ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে ভিন্নমতের ও দলনিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেয়া হচ্ছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। কাউকে করা হচ্ছে ওএসডি, কাউকে শাস্তিমূলক বদলি। অনেকের বিরুদ্ধে বিনা কারণে নেয়া হচ্ছে বিভাগীয় ব্যবস্থা। ভিত্তিহীন গোয়েন্দা রিপোর্ট এনে কোনো কোনো কর্মকর্তাকে করা হচ্ছে হয়রানি। মীমাংসিত অনেক বিষয় পুনঃতদন্তের নামে মেধাবী কর্মকর্তাদের ফাঁসানোরও চেষ্টা চলছে। আবার অনেক কর্মকর্তাকে আগে যে পদে ছিলেন, তার চেয়ে নিচের স্তরের পদে নিয়োগ দিয়ে মানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এসব নিপীড়নের কারণে প্রশাসনজুড়ে অসন্তোষ বিরাজ করছে। ঠিকমত চলছে না সরকারি কাজ।
বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে যেসব সচিব আছেন, তাদের মধ্যে দলনিরপেক্ষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন ভূমি সচিব এহসান-উল-ফাত্তাহ। গত ৮ ডিসেম্বর মেধাবী এ কর্মকর্তাকেও ওএসডি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের আবদার ঠিকমত রাখতে না পারায় চেয়ার হারাতে হলো এ কর্মকর্তাকে। জানা যায়, বিগত বিএনপি সরকারের সময় পর্যটন নগরী কক্সবাজারে ৫৯টি প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়। কিছুদিন আগে বিএনপি সরকারের আমলে বরাদ্দ দেয়া এসব প্লট বাতিল করার নির্দেশ আসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। এরপর এ ব্যাপারে বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় জানতে পারে কক্সবাজরে যারা প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন, তাদের কেউ কেউ ঠিকমত কিস্তির টাকা পরিশোধ করেননি। আবার অনেকের বরাদ্দ সঠিকভাবে হয়েছে এবং তারা চুক্তির শর্তও মেনে চলছেন। এ ব্যাপারে ভূমিমন্ত্রী, সচিব ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা একাধিকবার বৈঠক করেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, এ ব্যাপারে আগে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া উচিত। কারণ, এখন প্লট বাতিল করে দিলে বরাদ্দপ্রাপ্তরা আদালতের শরণাপন্ন হবেন। আদালত যদি তাদের পক্ষে রায় দিয়ে দেন, তবে সরকারকে বিব্রত হতে হবে। এরপরও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কক্সবাজারের ৫৯ প্লটের বরাদ্দ বাতিলের জন্য চাপ আসে। কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা কক্সবাজারে বিএনপি সরকারের সময়ে বরাদ্দ দেয়া প্লট বাতিল না করার জন্য সচিবকে দায়ী করে টেলিফোনে দুর্ব্যবহার করেন। তিনি এ ব্যাপারে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ জানান। এ ঘটনার ২ দিন পরই ৮ ডিসেম্বর ভূমি সচিব জানতে পারেন তাকে ওএসডি করা হয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এছাড়াও এসি-ল্যান্ড নিয়োগের ব্যাপারে সরকারি দলের নেতাদের কিছু সুপারিশ ছিল। ওই সুপারিশ অনুযায়ী এসি-ল্যান্ড নিয়োগ না হওয়ায় সরকারি দলের অনেকেই সচিবের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। সচিব এহসান-উল-ফাত্তাহের এ ধরনের বিদায় অন্যান্য সচিব ভালো চোখে দেখছেন না। গতকাল আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপকালে প্রভাবশালী এক সচিব বলেন, এহসান-উল-ফাত্তাহকে যে কারণে তাড়িয়ে দেয়া হলো সেটি মোটেই ঠিক হয়নি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী চান, কিন্তু সচিবের কারণে ওই কাজ হচ্ছে না—এটি ভাবার কোনো কারণ নেই। তাছাড়া সচিবের সঙ্গে মন্ত্রীর ভালো সম্পর্ক ছিল বলে তিনি জানান। ভূমি সচিবকে তুচ্ছ কারণে তাড়িয়ে দেয়াকে অন্য সচিবদের জন্য অশুভ সংবাদ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গত ৭ সেপ্টেম্বর সরকার ৫৫৩ জন কর্মকর্তাকে সুপারসিড করে ৫০৩ জনকে দলীয় বিবেচনায় পদোন্নতি দিয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর সংস্থাপন সচিবের সঙ্গে দেখা করে এর প্রতিবাদ জানান পদোন্নতিবঞ্চিতরা। শতাধিক মেধাবী অফিসার সংস্থাপন সচিবের সঙ্গে দেখা করে তাদের বঞ্চনার কথা জানান। উপস্থিত সাংবাদিকরা পদোন্নতিবঞ্চিতদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে দুয়েকজন তাদের বঞ্চনার কথা জানান। তুচ্ছ এ ঘটনাকে বড় ইস্যু করে পরবর্তীকালে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় ১১ কর্মকর্তাকে শোকজ করে। কর্মকর্তারা শোকজের জবাবও দেন যথারীতি। এর পরপরই ৪ জন কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। এদের মধ্যে উপসচিব ইব্রাহীম খলিলকে (সিরাজগঞ্জের সাবেক ডিসি) কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, উপসচিব নিয়ামত উল্লাহ ভুঁইয়াকে (মাগুরা ও মাদারীপুরের সাবেক ডিসি) মেহেরপুর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, উপসচিব জামাল আবদুল নাসেরকে (সাবেক ডিসি জয়পুরহাট জেলা) কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উপসচিব জাফর সিদ্দিককে (বাগেরহাট জেলার সাবেক ডিসি) সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অথচ ওই চার জেলার বর্তমান ডিসিরা তাদের চেয়ে জুনিয়র। এতে কাজ করতে গিয়ে ডিসিদেরও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে।
সংস্থাপন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পদোন্নতিবঞ্চিত হওয়ার কথা জানানোর কারণে শোকজ পাওয়া ১১ কর্মকর্তার মধ্যে ২ জনকে এরই মধ্যে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। আরও তিনজনকে অব্যাহতি দিয়ে অন্যজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে সরকার। অন্য কর্মকর্তারা ভবিষ্যতে যাতে সরকারি কোনো সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানানোর সাহস না দেখান, সেজন্য সামান্য এ বিষয়টি সরকার গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনায় এনে তাদের শায়েস্তা করতে চাইছে বলে সূত্র জানায়।
অপছন্দের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরকার গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের লেলিয়ে দিয়ে হয়রানি করছে। বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা, যারা বিগত সরকারের সময় ডিসিসহ ভালো পদে ছিলেন, সেই সময়ের বিভিন্ন বিষয় তদন্তের নামে অহেতুক তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে জোট সরকারের আমলের একজন ডিসির বিরুদ্ধে একটি গোয়েন্দা সংস্থাকে দিয়ে রিপোর্ট তৈরি করে তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সংস্থাপন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তদন্তের নামে গত ২ মাস ধরে আজ এ টিম কাল অন্য মন্ত্রণালয়ের টিম গিয়ে তাকে হয়রানি করছে।
এছাড়াও ভিন্নমতের চৌকস সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে ফাঁসানোর চেষ্টা হচ্ছে। ৩ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করেছে সরকার। ২০০৮ সালের ৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবসে কেন্দ্রীয় কারাগারে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার অপরাধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব (বর্তমান ওএসডি) ড. শেখ আবদুর রশীদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি বিভাগীয় মামলা করেছে সরকার। এর আগে তাকে ওএসডি করা হয়। বর্তমান সরকারের আমলে দু’দফা পদোন্নতিবঞ্চিতও হন তিনি। যার ফলে তার ব্যাচের কর্মকর্তারা এখন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সচিবের দায়িত্ব পালন করলেও তিনি অতিরিক্ত সচিবই রয়ে গেলেন।
জেলহত্যা দিবসে কেন্দ্রীয় কারাগারে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘটনায় অতিরিক্ত সচিব ড. শেখ আবদুর রশীদকে ফাঁসানোর চেষ্টার সমালোচনা করেছেন বেশ ক’জন সিনিয়র আমলা। তারা বলেন, এর জন্য যদি দায়ী করতে হয় ওই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী/উপদেষ্টা ও সচিবকে আগে দায়ী করতে হবে। কারণ, অতিরিক্ত সচিব হচ্ছেন সচিবের আজ্ঞাবহনকারী। তারা যথাযথ কর্তৃপক্ষ বাদ দিয়ে অতিরিক্ত সচিবের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরকে উদ্দেশ্যমূলক বলে মন্তব্য করেন।
বিমান বাংলাদেশের সাবেক এমডি ড. আবদুল মোমেনের বিরুদ্ধে সরকার বিভাগীয় মামলা দিয়েছে বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেক ও বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান নিয়ম-কানুন মেনে হয়নি এমন অভিযোগ এনে। সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষকে বাদ দিয়ে বিমানের এমডিকে ফাঁসানোর চেষ্টারও সমালোচনা করেছেন সিনিয়র কর্মকর্তারা। তাদের বক্তব্য, বিমানের আগ্রহী কর্মকর্তাদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেক করানোর সিদ্ধান্তটি ছিল সরকারি। বিমানের এমডি হিসেবে তিনি সরকারি নির্দেশনা মেনে কাজ করেছেন মাত্র।
সংস্থাপন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ড. মোমেন বিগত জোট সরকারের সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। তাই বর্তমান সরকারের সমর্থক আমলারা তাকে কট্টর বিএনপিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করে প্রথমে ওএসডি করেন। ওএসডি যুগ্ম সচিব গোলাম মুর্তুজার বিরুদ্ধে একটি হোটেলে মদ্যপ অবস্থায় মাতলামি করার অভিযোগ এনে বিভাগীয় মামলা করতে যাচ্ছে সরকার। এরই মধ্যে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্তও করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তিনি ১৭ অক্টোবর রাতে রাজশাহীর একটি হোটেলে মদপান করে মাতলামি করেন এবং হোটেল বয়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার এ ব্যাপারে একটি তদন্ত প্রতিবেদন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেন। ওই প্রতিবেদনে গোলাম মুর্তুজাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। কিন্তু গোলাম মুর্তুজা এক চিঠিতে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সাজানো বলে দাবি করেন।
এদিকে তথাকথিত উত্তরা বৈঠকে যোগদানের অভিযোগ এনে ২৬ সরকারি কর্মকর্তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা হচ্ছে। অথচ এ ব্যাপারে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, উত্তরায় একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তারা যোগ দিতে গিয়েছিলেন। ওই অনুষ্ঠানের রাজনৈতিক কোনো সংশ্রব ছিল, এমনকি কোনো রাজনৈতিক নেতাও উপস্থিত ছিলেন না। বর্তমান কেবিনেট সেক্রেটারি এম আবদুল আজিজ ওই তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন। এ তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকার যেসব কর্মকর্তা ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন, তাদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি প্রদান এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন জায়গায় পদায়নও করে। ভিন্নমত ও দলনিরপেক্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর যে নিপীড়ন শুরু হয়েছে তারই অংশ হিসেবে মীমাংসিত একটি বিষয়কে আবার তাজা করে ২৬ কর্মকর্তাকে হয়রানির চেষ্টা চলছে।
ভিন্নমতের চিহ্নিত করে বেশকিছু কর্মকর্তাকে ক’দিন পর পরই হয়রানিমূলক বদলি করা হচ্ছে। সহকারী এক সচিব আমার দেশকে জানান, গত ১১ মাসে ৮ বার তাকে বদলি করা হয়েছে। তাও আবার ঢাকার বাইরে মফস্বলে।
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?