সরকারের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ : নৌযান শ্রমিক ধর্মঘটে চরম যাত্রীদুর্ভোগ
সল্টাফ রিপোর্টার
স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রবর্তনসহ ২২ দফা দাবিতে সারাদেশে নৌযান শ্রমিকদের লাগাতার ধর্মঘট চলছে। গত শনিবার রাত ১২টার পর থেকে চলছে শ্রমিকদের এই ধর্মঘট। এ কারণে সারাদেশে লাখ লাখ যাত্রী চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। ঢাকা ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আটকা পড়েছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। মালিকরা বস্ল চেষ্টা করেও কোনো নৌযান চালাতে পারেননি। ধর্মঘট প্রত্যাহারে সরকারের সঙ্গে শ্রমিকদের সব আলোচনাও ব্যর্থ হয়েছে। দাবি মেনে না নেয়া পর্যন্ত ধর্মঘট অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন। অপরদিকে নৌযান মালিকরা বলছেন, নৌপরিবহন খাতকে অশান্ত করে তুলতে একটি সংঘবদ্ধ চক্র ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। কিন্তু সরকার ওই চক্রের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। উল্টো তারা মালিকদের নানামুখী চাপ দিচ্ছে।
ধর্মঘট শুরুর পর গতকাল নৌ-সচিব আবদুল মান্নান হাওলাদার শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। কিন্তু সে আলোচনায় কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী আশিকুল আলম। তিনি বলেন, কয়েক মাস ধরে আমরা আমাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন করে আসছি। কিন্তু সরকার সেদিকে কর্ণপাত করেনি। তিনি আরও বলেন, আমরা কোনো অন্যায় আবদার তুলিনি। নৌযান শ্রমিকদের বেতন স্কেল ঘোষণা, দক্ষ চালকদের সনদ মেয়াদিকরণ
বাতিল, মেরিন আইনের যথাযথ প্রয়োগসহ আমাদের দাবি মেনে নিলে আমরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করব। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের ধর্মঘট চলবে।
এদিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল যাত্রী পরিবহন সংস্থার (যাপ) ভাইস চেয়ারম্যান সাহাবুদ্দিন মিলন বলেন, শ্রমিকদের দাবি আদায়ের নামে যারা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন তারা নৌযানের সঙ্গে জড়িত নন। এ খাতে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে তারা সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে এই ঘর্মঘটের ডাক দিয়েছেন। তিনি বলেন, লঞ্চ চলাচল অব্যাহত রাখতে সরকার কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। তাই লঞ্চ পরিচালনার ব্যাপারে মালিকরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গতকাল কোনো রুটেই লঞ্চ চলেনি। শ্রমিকরা ধর্মঘটের ডাক দেয়ায় কোনো মালিক তাদের লঞ্চ চালানোর চেষ্টা করেননি। ব্যক্তিমালিকানাধীন অন্য কোনো জলযানও চলাচল করেনি। লঞ্চগুলো বুড়িগঙ্গার তীরে কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে নোঙর করে রাখা হয়েছে। এদিকে ধর্মঘটের ডাক দিয়েও সদরঘাট টার্মিনালে শ্রমিকরা কোনো অবস্থান ধর্মঘট কিংবা কোনো কর্মসূচি রাখেননি। আইন-শৃগ্ধখলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুরো লঞ্চ টার্মিনালে পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ ঘাটে এসে আবার ফেরত যান। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ এক্ষেত্রে বেশি অসহায় হয়ে পড়েছেন। নৌযান বন্ব্দ থাকায় বাসসহ অন্য যানবাহনের ওপরও অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। কোথাও বাসের টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না।
রাজধানী থেকে দক্ষিণাঞ্চলে চলাচলের প্রধান বাহন হচ্ছে লঞ্চ। কিন্তু লঞ্চ চলাচল বন্ব্দ থাকায় অসংখ্য যাত্রী গন্তব্যে যেতে পারছেন না। যাত্রীদের যাতায়াতের জন্য বিআইডব্লিউটিএ একটি পিএস টার্ন ঘাটের পূর্ব দিকে রেখেছে। কিন্তু যাত্রীরা তাতে কোনো টিকিট পাচ্ছেন না। লঞ্চ মালিক সমিতি জানায়, সদরঘাট থেকে ৬৫টি রুটে প্রতিদিন এক থেকে দেড়শ’ লঞ্চ চলাচল করে। প্রতিদিন যাত্রী চলাচল করে ৫০ থেকে ৬০ হাজার। কাল শত শত যাত্রী ধর্মঘটের কথা আগে থেকে না জানায় সদরঘাটে এসে হতাশ হয়ে পড়েন। হযরত আলী নামে এক ব্যক্তি তিনদিন আগে আমতলী থেকে ছেলের কাছে আসেন। কাল ছেলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি যেতে সদরঘাটে এসেই শোনেন ধর্মঘটের কথা। এমনিভাবে অনেক যাত্রী আটকা পড়েছেন সদরঘাটে। এদিকে যাত্রীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে বিআরটিসি সদরঘাট থেকে যাত্রীদের আনা-নেয়া শুরু করেছে। কিন্তু তাও খুব অপর্যাপ্ত। একটি বাস এলেই যাত্রীরা স্লমড়ি খেয়ে পড়ছেন বাসে উঠতে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুল মালেক মিয়া বলেন, সমঝোতার ভিত্তিতে শ্রমিকদের বেতন কাঠামো তিন মাসের মধ্যে নির্ধারণ করার কথা ছিল। শ্রমিকরা সেটা মেনেও নিয়েছিলেন। কিন্তু শ্রমিকদের একটি গ্রুপ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।
বন্দর অচল হওয়ার আশঙ্কা : চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, নৌযান শ্রমিক ধর্মঘটের প্রথম দিনে চট্টগ্রাম বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। বহির্নোঙরের ৩০টি জাহাজে গতকাল পণ্য খালাস হয়নি। তবে বন্দরের ভেতরে সীমিত পরিসরে কাজকর্ম হয়েছে। সদরঘাট থেকেও ব্যক্তিমালিকানাধীন যাত্রীবাহী কিংবা পণ্যবাহী কোনো জাহাজ ছাড়েনি। ধর্মঘটের কারনে ৬০০ লাইটার জাহাজ না চলায় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে পণ্য পরিবহন বন্ব্দ ছিল।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থানরত বড় আকারের জাহাজগুলো থেকে লাইটার জাহাজে করে পণ্য বন্দরে এনে খালাস করা হয়। লাইটার জাহাজগুলো শনিবার রাত থেকেই বুকিং নেয়া বন্ব্দ করে দেয়। এসব জাহাজ না চলায় বহির্নোঙরে অবস্থানরত জাহাজগুলো থেকে মাল খালাস হয়নি। বন্দর সূত্র জানিয়েছে, গতকাল বন্দরের বহির্নোঙরে ৩৭টি জাহাজ মাল খালাসের অপেক্ষায় ছিল। এর মধ্যে আগে বুকিং দেয়া ৭টি জাহাজের পণ্য খালাস হয়েছে। বাকি ৩০টি জাহাজকে পণ্য নিয়ে বসে থাকতে হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ এসব জাহাজের মাল খালাস না হওয়ার কথা স্বীকার করে জানান, অপেক্ষমাণ জাহাজগুলোর মধ্যে সার, গম, চিনি ও সিমেন্ট ক্লিঙ্কারসহ বিভিন্ন মালামাল রয়েছে। বন্দর জেটিতে আগে থেকে অবস্থানরত কিছু জাহাজে মাল খালাস হয়েছে। ধর্মঘট অব্যাহত থাকলে বহির্নোঙরে জাহাজজট লেগে যেতে পারে বলে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। ওদিকে তিনটি ডলফিন জেটি (তেল জেটি) থেকে গতকাল কোনো জাহাজ চলাচল করেনি। এসব জেটি থেকে প্রতিদিন গড়ে ৬টি জাহাজ দেশের বিভিন্ন তেলের ডিপোতে যায়, ৩টি জাহাজ ফিরে আসে। এসব জাহাজ না চলায় বন্দর থেকে তেল পরিবহনও বন্ব্দ হয়ে গেছে।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে ৬০০ লাইটার জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজ গতকাল বাংলাবাজার, সদরঘাট ও কর্ণফুলী নদীতে বসে ছিল।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সচিব মোঃ মামুন জানান, কর্মবিরতির কারণে গতকাল চট্টগ্রামে লঞ্চ, স্টিমার, ফিশিং ট্রলার, লাইটার জাহাজ, কার্গো, ট্যাঙ্কার, বার্জ, ভাউচার ট্যাঙ্কার, শ্যালো ট্যাঙ্কার, কার্গো ট্রলার চলাচল বন্ব্দ ছিল। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে তিনি জানান।
ওদিকে নৌযান শ্রমিকদের ২২ দফা দাবিতে কর্মবিরতির সমর্থনে গতকাল লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নসহ বিভিন্ন নৌযানের শ্রমিক সংগঠন নগরীর বাংলাবাজার এলাকায় মিছিল সমাবেশ করেছেন। সমাবেশে বলা হয়, সারাদেশের নৌযান শ্রমিকরা দাবি আদায়ে ঐক্যবদ্ধ।
আমাদের বরিশাল অফিস থেকে জি. এম. বাবর আলী জানান, নৌযান শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের ঘাটে ঘাটে সীমাহীন ভোগান্তির মুখে পড়েছেন অসংখ্য নারী-পুরুষ। শনিবার মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া ধর্মঘটের ফলে বরিশাল-ঢাকা, বরিশাল-চট্টগ্রামসহ এ অঞ্চলের অর্ধশতাধিক অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার নৌরুটে সব লঞ্চ চলাচল বন্ব্দ রয়েছে। গতকাল সন্ব্দ্যা পর্যন্ত ঢাকায় অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠক সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয় বলে জানান স্থানীয় নৌ-মালিক সমিতির নেতারা।
ধর্মঘট চলাকালে গতকাল সকাল থেকে বরিশাল অভ্যন্তরীণ লঞ্চঘাটের সব লঞ্চ পন্টুন থেকে সরিয়ে কীর্তনখোলা নদীর মাঝে নোঙর করে রাখা হয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে একাধিক এলাকা রয়েছে যেখান থেকে জেলা বা বিভাগীয় সদরে আসার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে নৌযোগাযোগ। কিন্তু নৌ-ধর্মঘটের ফলে এসব এলাকার মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। কোনো কোনো স্থানে ঝুঁকি নিয়ে ছোট ছোট ট্রলারে করে অসংখ্য মানুষ গন্তব্যে পৌঁছেছেন।
নৌযান শ্রমিক সংগঠনের স্থানীয় নেতারা জানান, ধর্মঘট অব্যাহত আছে। প্রত্যাহারের বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না তারা।
গতকাল শিডিউল অনুযায়ী বরিশাল থেকে সুন্দরবন-৭, কালাম খান ও পারাবাত-৭ লঞ্চ ছেড়ে যাওয়ার কথা। এ উদ্দেশ্যে লঞ্চগুলোর স্থানীয় বুকিং কাউন্টার থেকে টিকিটও বিক্রি করা হয়। কিন্তু সন্ব্দ্যার পর থেকে ধর্মঘট প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত না হওয়ায় টিকিট নেয়া যাত্রীদের টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে। একইভাবে ঢাকা থেকে গতকাল সুরভী-৭, পারাবাত-২ ও কীর্তনখোলা লঞ্চ ছেড়ে আসার কথা থাকলেও তারা কোনো যাত্রী ওঠাননি এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত। কোনো কোনো লঞ্চ যাত্রীর টাকা ফেরত দিয়েছে।
এদিকে বরিশাল লঞ্চ মালিক সমিতির সহসভাপতি ও চেম্বার অব কমার্স সভাপতি শেখ আবদুর রহিম বলেন, সন্ব্দ্যা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে কোনো সমঝোতা হয়নি। তবে রাতে আবার বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একইসঙ্গে তিনি বলেন, ধর্মঘট ডাকার আগে ফেডারেশন থেকে মালিক সমিতিকে কোনো নোটিশ বা আল্টিমেটাম দেয়া হয়নি। এমনকি তাদের সঙ্গে দাবি নিয়ে কোনো বৈঠকও করা হয়নি।
নারায়ণগঞ্জ থেকে সল্টাফ রিপোর্টার জানান, নৌযান ধর্মঘট থাকায় নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় লঞ্চঘাট থেকে গতকাল কোনো লঞ্চ চলাচল করেনি। অনুরূপ অবস্থা ছিল ফতুলা লঞ্চ ঘাটেও। ধর্মঘটের কারণে লঞ্চ চলাচল না করায় চরম ভোগান্তি আর বিড়ম্বনার শিকার হন শত শত যাত্রী। লঞ্চের অপেক্ষায় দীর্ঘক্ষণ শত শত যাত্রী কেন্দ্রীয় ও ফতুলা লঞ্চ টার্মিনালে অবস্থান করে ফেরত যান। নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় টার্মিনাল থেকে শরীয়তপুর, মতলব, চাঁদপুর, তালতলা, সুরেশ্বরসহ ১৬টি রুটে নিয়মিত লঞ্চ চলাচল করে থাকে। এছাড়া ফতুল্লা ঘাট থেকে বরিশালসহ বিভিন্ন জেলায় লঞ্চ চলাচল করে। ধর্মঘট অব্যাহত থাকলে জনদুর্ভোগ আরও চরম আকার রূপ নেবে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি জানান, বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকা ধর্মঘটে সাড়া দেননি দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে চলাচলকারী লঞ্চ, ফেরি ও সব ধরনের নৌযানের শ্রমিকরা। ৪৪টি লঞ্চ, ৭টি ফেরিসহ শতাধিক ইঞ্জিনচালিত ট্রলার সার্বক্ষণিক সচল থাকায় নৌযান চলাচল স্বাভাবিক ছিল। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে চলাচলকারী নৌযান চালকরা জানান, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নির্ধারণসহ ফেডারেশনের ২২ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ডাকা ধর্মঘট সমর্থনযোগ্য নয়। স্থানীয় লঞ্চ চালক ও শ্রমিকরা মনে করেন আলোচনার মাধ্যমে সরকার আমাদের সব সমস্যার সমাধান করবে।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বাঘাবাড়ী নৌবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ব্দ রয়েছে। সার, তেল ও অন্যান্য পণ্যবাহী অন্তত ৩০টি কার্গো ট্যাঙ্কারের মালপত্র খালাসের অপেক্ষায় পড়ে আছে। একই কারণে বন্দরের বাঙ্কার সল্টক থেকে মালপত্র বিভিন্ন জেলায় পাঠানো যাচ্ছে না।
ধর্মঘট শুরুর পর গতকাল নৌ-সচিব আবদুল মান্নান হাওলাদার শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। কিন্তু সে আলোচনায় কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী আশিকুল আলম। তিনি বলেন, কয়েক মাস ধরে আমরা আমাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন করে আসছি। কিন্তু সরকার সেদিকে কর্ণপাত করেনি। তিনি আরও বলেন, আমরা কোনো অন্যায় আবদার তুলিনি। নৌযান শ্রমিকদের বেতন স্কেল ঘোষণা, দক্ষ চালকদের সনদ মেয়াদিকরণ
বাতিল, মেরিন আইনের যথাযথ প্রয়োগসহ আমাদের দাবি মেনে নিলে আমরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করব। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের ধর্মঘট চলবে।
এদিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল যাত্রী পরিবহন সংস্থার (যাপ) ভাইস চেয়ারম্যান সাহাবুদ্দিন মিলন বলেন, শ্রমিকদের দাবি আদায়ের নামে যারা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন তারা নৌযানের সঙ্গে জড়িত নন। এ খাতে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে তারা সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে এই ঘর্মঘটের ডাক দিয়েছেন। তিনি বলেন, লঞ্চ চলাচল অব্যাহত রাখতে সরকার কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। তাই লঞ্চ পরিচালনার ব্যাপারে মালিকরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গতকাল কোনো রুটেই লঞ্চ চলেনি। শ্রমিকরা ধর্মঘটের ডাক দেয়ায় কোনো মালিক তাদের লঞ্চ চালানোর চেষ্টা করেননি। ব্যক্তিমালিকানাধীন অন্য কোনো জলযানও চলাচল করেনি। লঞ্চগুলো বুড়িগঙ্গার তীরে কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে নোঙর করে রাখা হয়েছে। এদিকে ধর্মঘটের ডাক দিয়েও সদরঘাট টার্মিনালে শ্রমিকরা কোনো অবস্থান ধর্মঘট কিংবা কোনো কর্মসূচি রাখেননি। আইন-শৃগ্ধখলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুরো লঞ্চ টার্মিনালে পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ ঘাটে এসে আবার ফেরত যান। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ এক্ষেত্রে বেশি অসহায় হয়ে পড়েছেন। নৌযান বন্ব্দ থাকায় বাসসহ অন্য যানবাহনের ওপরও অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। কোথাও বাসের টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না।
রাজধানী থেকে দক্ষিণাঞ্চলে চলাচলের প্রধান বাহন হচ্ছে লঞ্চ। কিন্তু লঞ্চ চলাচল বন্ব্দ থাকায় অসংখ্য যাত্রী গন্তব্যে যেতে পারছেন না। যাত্রীদের যাতায়াতের জন্য বিআইডব্লিউটিএ একটি পিএস টার্ন ঘাটের পূর্ব দিকে রেখেছে। কিন্তু যাত্রীরা তাতে কোনো টিকিট পাচ্ছেন না। লঞ্চ মালিক সমিতি জানায়, সদরঘাট থেকে ৬৫টি রুটে প্রতিদিন এক থেকে দেড়শ’ লঞ্চ চলাচল করে। প্রতিদিন যাত্রী চলাচল করে ৫০ থেকে ৬০ হাজার। কাল শত শত যাত্রী ধর্মঘটের কথা আগে থেকে না জানায় সদরঘাটে এসে হতাশ হয়ে পড়েন। হযরত আলী নামে এক ব্যক্তি তিনদিন আগে আমতলী থেকে ছেলের কাছে আসেন। কাল ছেলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি যেতে সদরঘাটে এসেই শোনেন ধর্মঘটের কথা। এমনিভাবে অনেক যাত্রী আটকা পড়েছেন সদরঘাটে। এদিকে যাত্রীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে বিআরটিসি সদরঘাট থেকে যাত্রীদের আনা-নেয়া শুরু করেছে। কিন্তু তাও খুব অপর্যাপ্ত। একটি বাস এলেই যাত্রীরা স্লমড়ি খেয়ে পড়ছেন বাসে উঠতে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুল মালেক মিয়া বলেন, সমঝোতার ভিত্তিতে শ্রমিকদের বেতন কাঠামো তিন মাসের মধ্যে নির্ধারণ করার কথা ছিল। শ্রমিকরা সেটা মেনেও নিয়েছিলেন। কিন্তু শ্রমিকদের একটি গ্রুপ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।
বন্দর অচল হওয়ার আশঙ্কা : চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, নৌযান শ্রমিক ধর্মঘটের প্রথম দিনে চট্টগ্রাম বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। বহির্নোঙরের ৩০টি জাহাজে গতকাল পণ্য খালাস হয়নি। তবে বন্দরের ভেতরে সীমিত পরিসরে কাজকর্ম হয়েছে। সদরঘাট থেকেও ব্যক্তিমালিকানাধীন যাত্রীবাহী কিংবা পণ্যবাহী কোনো জাহাজ ছাড়েনি। ধর্মঘটের কারনে ৬০০ লাইটার জাহাজ না চলায় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে পণ্য পরিবহন বন্ব্দ ছিল।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থানরত বড় আকারের জাহাজগুলো থেকে লাইটার জাহাজে করে পণ্য বন্দরে এনে খালাস করা হয়। লাইটার জাহাজগুলো শনিবার রাত থেকেই বুকিং নেয়া বন্ব্দ করে দেয়। এসব জাহাজ না চলায় বহির্নোঙরে অবস্থানরত জাহাজগুলো থেকে মাল খালাস হয়নি। বন্দর সূত্র জানিয়েছে, গতকাল বন্দরের বহির্নোঙরে ৩৭টি জাহাজ মাল খালাসের অপেক্ষায় ছিল। এর মধ্যে আগে বুকিং দেয়া ৭টি জাহাজের পণ্য খালাস হয়েছে। বাকি ৩০টি জাহাজকে পণ্য নিয়ে বসে থাকতে হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ এসব জাহাজের মাল খালাস না হওয়ার কথা স্বীকার করে জানান, অপেক্ষমাণ জাহাজগুলোর মধ্যে সার, গম, চিনি ও সিমেন্ট ক্লিঙ্কারসহ বিভিন্ন মালামাল রয়েছে। বন্দর জেটিতে আগে থেকে অবস্থানরত কিছু জাহাজে মাল খালাস হয়েছে। ধর্মঘট অব্যাহত থাকলে বহির্নোঙরে জাহাজজট লেগে যেতে পারে বলে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। ওদিকে তিনটি ডলফিন জেটি (তেল জেটি) থেকে গতকাল কোনো জাহাজ চলাচল করেনি। এসব জেটি থেকে প্রতিদিন গড়ে ৬টি জাহাজ দেশের বিভিন্ন তেলের ডিপোতে যায়, ৩টি জাহাজ ফিরে আসে। এসব জাহাজ না চলায় বন্দর থেকে তেল পরিবহনও বন্ব্দ হয়ে গেছে।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে ৬০০ লাইটার জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজ গতকাল বাংলাবাজার, সদরঘাট ও কর্ণফুলী নদীতে বসে ছিল।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সচিব মোঃ মামুন জানান, কর্মবিরতির কারণে গতকাল চট্টগ্রামে লঞ্চ, স্টিমার, ফিশিং ট্রলার, লাইটার জাহাজ, কার্গো, ট্যাঙ্কার, বার্জ, ভাউচার ট্যাঙ্কার, শ্যালো ট্যাঙ্কার, কার্গো ট্রলার চলাচল বন্ব্দ ছিল। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে তিনি জানান।
ওদিকে নৌযান শ্রমিকদের ২২ দফা দাবিতে কর্মবিরতির সমর্থনে গতকাল লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নসহ বিভিন্ন নৌযানের শ্রমিক সংগঠন নগরীর বাংলাবাজার এলাকায় মিছিল সমাবেশ করেছেন। সমাবেশে বলা হয়, সারাদেশের নৌযান শ্রমিকরা দাবি আদায়ে ঐক্যবদ্ধ।
আমাদের বরিশাল অফিস থেকে জি. এম. বাবর আলী জানান, নৌযান শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের ঘাটে ঘাটে সীমাহীন ভোগান্তির মুখে পড়েছেন অসংখ্য নারী-পুরুষ। শনিবার মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া ধর্মঘটের ফলে বরিশাল-ঢাকা, বরিশাল-চট্টগ্রামসহ এ অঞ্চলের অর্ধশতাধিক অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার নৌরুটে সব লঞ্চ চলাচল বন্ব্দ রয়েছে। গতকাল সন্ব্দ্যা পর্যন্ত ঢাকায় অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠক সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয় বলে জানান স্থানীয় নৌ-মালিক সমিতির নেতারা।
ধর্মঘট চলাকালে গতকাল সকাল থেকে বরিশাল অভ্যন্তরীণ লঞ্চঘাটের সব লঞ্চ পন্টুন থেকে সরিয়ে কীর্তনখোলা নদীর মাঝে নোঙর করে রাখা হয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে একাধিক এলাকা রয়েছে যেখান থেকে জেলা বা বিভাগীয় সদরে আসার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে নৌযোগাযোগ। কিন্তু নৌ-ধর্মঘটের ফলে এসব এলাকার মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। কোনো কোনো স্থানে ঝুঁকি নিয়ে ছোট ছোট ট্রলারে করে অসংখ্য মানুষ গন্তব্যে পৌঁছেছেন।
নৌযান শ্রমিক সংগঠনের স্থানীয় নেতারা জানান, ধর্মঘট অব্যাহত আছে। প্রত্যাহারের বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না তারা।
গতকাল শিডিউল অনুযায়ী বরিশাল থেকে সুন্দরবন-৭, কালাম খান ও পারাবাত-৭ লঞ্চ ছেড়ে যাওয়ার কথা। এ উদ্দেশ্যে লঞ্চগুলোর স্থানীয় বুকিং কাউন্টার থেকে টিকিটও বিক্রি করা হয়। কিন্তু সন্ব্দ্যার পর থেকে ধর্মঘট প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত না হওয়ায় টিকিট নেয়া যাত্রীদের টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে। একইভাবে ঢাকা থেকে গতকাল সুরভী-৭, পারাবাত-২ ও কীর্তনখোলা লঞ্চ ছেড়ে আসার কথা থাকলেও তারা কোনো যাত্রী ওঠাননি এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত। কোনো কোনো লঞ্চ যাত্রীর টাকা ফেরত দিয়েছে।
এদিকে বরিশাল লঞ্চ মালিক সমিতির সহসভাপতি ও চেম্বার অব কমার্স সভাপতি শেখ আবদুর রহিম বলেন, সন্ব্দ্যা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে কোনো সমঝোতা হয়নি। তবে রাতে আবার বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একইসঙ্গে তিনি বলেন, ধর্মঘট ডাকার আগে ফেডারেশন থেকে মালিক সমিতিকে কোনো নোটিশ বা আল্টিমেটাম দেয়া হয়নি। এমনকি তাদের সঙ্গে দাবি নিয়ে কোনো বৈঠকও করা হয়নি।
নারায়ণগঞ্জ থেকে সল্টাফ রিপোর্টার জানান, নৌযান ধর্মঘট থাকায় নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় লঞ্চঘাট থেকে গতকাল কোনো লঞ্চ চলাচল করেনি। অনুরূপ অবস্থা ছিল ফতুলা লঞ্চ ঘাটেও। ধর্মঘটের কারণে লঞ্চ চলাচল না করায় চরম ভোগান্তি আর বিড়ম্বনার শিকার হন শত শত যাত্রী। লঞ্চের অপেক্ষায় দীর্ঘক্ষণ শত শত যাত্রী কেন্দ্রীয় ও ফতুলা লঞ্চ টার্মিনালে অবস্থান করে ফেরত যান। নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় টার্মিনাল থেকে শরীয়তপুর, মতলব, চাঁদপুর, তালতলা, সুরেশ্বরসহ ১৬টি রুটে নিয়মিত লঞ্চ চলাচল করে থাকে। এছাড়া ফতুল্লা ঘাট থেকে বরিশালসহ বিভিন্ন জেলায় লঞ্চ চলাচল করে। ধর্মঘট অব্যাহত থাকলে জনদুর্ভোগ আরও চরম আকার রূপ নেবে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি জানান, বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকা ধর্মঘটে সাড়া দেননি দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে চলাচলকারী লঞ্চ, ফেরি ও সব ধরনের নৌযানের শ্রমিকরা। ৪৪টি লঞ্চ, ৭টি ফেরিসহ শতাধিক ইঞ্জিনচালিত ট্রলার সার্বক্ষণিক সচল থাকায় নৌযান চলাচল স্বাভাবিক ছিল। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে চলাচলকারী নৌযান চালকরা জানান, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নির্ধারণসহ ফেডারেশনের ২২ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ডাকা ধর্মঘট সমর্থনযোগ্য নয়। স্থানীয় লঞ্চ চালক ও শ্রমিকরা মনে করেন আলোচনার মাধ্যমে সরকার আমাদের সব সমস্যার সমাধান করবে।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বাঘাবাড়ী নৌবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ব্দ রয়েছে। সার, তেল ও অন্যান্য পণ্যবাহী অন্তত ৩০টি কার্গো ট্যাঙ্কারের মালপত্র খালাসের অপেক্ষায় পড়ে আছে। একই কারণে বন্দরের বাঙ্কার সল্টক থেকে মালপত্র বিভিন্ন জেলায় পাঠানো যাচ্ছে না।
-
প্রথম পাতা


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


